(বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। পথের পাঁচালী, অপরাজিতসহ অনেক পাঠকপ্রিয় উপন্যাসের সফল নির্মাতা। একজন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক। ১৯৪৪ সালের একদিন একটি রেডিও-অনুষ্ঠানে বলেছিলেন নিজের লেখক হয়ে ওঠা ও প্রথম লেখা প্রকাশের গল্প। চমৎকার সেই গল্পটা নবব্বনির পাঠকদের জন্য সংগ্রহ করে পাঠিয়েছে চট্টগ্রামের বন্ধু আমজাদ ইউনুস।)
আমি কেমন করে লেখক হলাম, এ আমার জীবনের, আমার নিজের কাছেই, অদ্ভুত ঘটনা। অবশ্য হয়তো এ কথা ঠিক, নিজের জীবনের অতি তুচ্ছতম অভিজ্ঞতাও নিজের কাছে অতি অপূর্ব। তা যদি না হতো, লেখক জাতটাই সৃষ্টি হতো না। নিজের অভিজ্ঞতাতে এরা মুগ্ধ হয়ে যায়। আকাশ প্রতিদিনের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে কত কল্পনাকে রচনা করছে যুগে যুগে—তারই তলে কত শত শতাব্দী ধরে মানুষ নানা তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজের দিন কাটিয়ে চলেছে; মানুষের জন্ম-মৃত্যু আশা-নৈরাশ্য হর্ষ-বিবাদ ঋতুর পরিবর্তন, বনপুষ্পের আবির্ভাব ও তিরোভাব—কত ছোট বড় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে পৃথিবীতে—কে এসব দেখে, এসব দেখে মুগ্ধ হয়?
এক শ্রেণীর মানুষ আছে যাদের চোখে কল্পনা সব সময়েই মোহঅঞ্জন মাখিয়ে দিয়ে রেখেছে। অতি সাধারণ পাখীর অতি সুরও তাদের মনে আনন্দের ঢেউ তোলে, অস্তদিগন্তের রক্তমেঘস্তুপ স্বপ্ন জাগায়, আবার হয়তো তারা অতি দুঃখে ভেঙে পড়ে। এরাই হয় লেখক, কবি, সাহিত্যিক। এরা জীবনের সাংবাদিক ও ঐতিহাসিক। এক যুগের দুঃখবেদনা আশা আনন্দ অন্য যুগে পৌঁছে দিয়ে যায়।
আমার জীবনের সেই অভিজ্ঞতা তাই চিরদিনই আমার কাছে অভিনব, অমূল্য, দুর্লভ হয়ে রইল। যে ঘটনা আমার জীবনের স্রোতকে সম্পূর্ণ অন্য দিকে বাঁক ফিরিয়ে দিয়েছে—আমার জীবনে তার মূল্য অনেকখানি।
১৯২২ সাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি নিয়ে ডায়মন্ডহারবার লাইনে একটা পল্লী গ্রামের হাইস্কুলে মাস্টারি চাকুরি নিয়ে গেলুম আষাঢ় মাসে। বর্ষাকাল, নতুন জায়গায় গিয়েছি। অপরিচিতের মহলে নিজেকে অত্যন্ত অসহায় বোধ করছি। বৈঠকখানা ঘরের সামনে ছোট্ট একটু ঢাকা বারান্দাতে একলা বসে সামনে সদর রাস্তার দিকে চেয়ে আছি, এমন একটি সময় ষোল-সতের বছর বয়সের ছেলেকে একখানা বই হাতে যেতে দেখে তাকে ডাকলাম কাছে। আমার উদ্দেশ্য, তার হাতে কী বই দেখব এবং যদি সম্ভব হয় পড়বার জন্যে চেয়ে নেব একদিনের জন্য। বইখানা দেখেছিলাম, একখানা উপন্যাস। তার কাছে চাইতে সে বললে, এ লাইব্রেরির বই, আজ ফেরত দেওয়ার দিন। আপনাকে তো দিতে পারছি নে, তবে লাইব্রেরি থেকে বই বদলে এনে দেব এখন।
‘লাইব্রেরি আছে এখানে?’
‘বেশ ভাল লাইব্রেরি, অনেক বই। দু আনা চাঁদা।’
‘আচ্ছা চাঁদা দেব, আমায় বই এনে দিয়ো।’
ছোকরা চলে গেল এবং ফেরবার পথে আমাকে একখানা বইও দিয়ে গেল। আমি তাকে বললুম—‘তোমার নামটি কী হে?’
সে বললে, ‘আমার নাম পাঁচুগোপাল চক্রবর্তী, কিন্তু এ গ্রামে আমাকে সবাই বালক কবি বলে জানে।’
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, ‘বালক কবি বলে কেন? কবিতা টবিতা লেখ নাকি?’
ছেলেটি উৎসাহের সঙ্গে বললে, ‘লিখি বৈকি। না লিখলে কি আমাকে এম্নি এম্নি বালক কবি নাম দিয়েছে? আচ্ছা কাল এনে দেখাব আপনাকে।’
পরদিন সে সকাল বেলাতেই এসে হাজির হলো। সঙ্গে একখানা ছাপানো গ্রাম্য মাসিক পত্রিকা গোছের। আমাকে দেখিয়ে বললে, ‘এই দেখুন, এই কাগজখানা আমাদের গাঁ থেকে বেরোয়। এর নাম ‘বিশ্ব’। এই দেখুন প্রথমেই ‘মানুষ’ বলে কবিতাটি আমার। এই আমার নাম ছাপার অক্ষরে লেখা আছে কবিতার উপরে’—বলেই ছোকরা সগর্বে কাগজখানা আমার নাকের কাছে ধরে নিজের নামটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে। হ্যাঁ সত্যিই লেখা আছে বটে, কবি পাঁচুগোপাল চক্রবর্তী। তাহলে তো নিতান্ত মিথ্যা বলেনি দেখছি। কবিতাটি সে-ই আমাকে পড়ে শোনালে। বিশ্বের মধ্যে মানুষের স্থান খুব বড়, ইত্যাদি কথা নানাভাবে তার মধ্যে বলা হয়েছে।
অবশ্য কাগজখানা দেখে আমার খুব ভক্তি হল না। স্টেশনের কাছে একটা ছোট প্রেস আছে এখানে, সেই প্রেসেই ছাপানো অতি পাতলা জিল-জিলে কাগজ। পত্রিকাখানিকে ‘মাসিক’ ‘পাক্ষিক’ ইত্যাদি না বলে ‘ঐকিক’ বললেই এর স্বরূপ ঠিক বোঝানো হয়। অর্থাৎ যে শ্রেণীর পত্রিকা গ্রামের উৎসাহী লেখা-বাতিকগ্রস্ত ছেলে-ছোকরার দল চাঁদা তুলে একটি বার মাত্র বের করে, কিন্তু পরের বারে উৎসাহ মন্দীভূত হওয়ার দরুন আশানুরূপ চাঁদা না ওঠাতে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, এ সেই শ্রেণীর পত্রিকা।
তবুও আমার ঈর্ষা না হয়ে পারল না। আমি লিখি না বা লেখার কথা কখনও চিন্তাও করি না। অথচ এতটুকু ছেলে—এর নাম দিব্যি ছাপার অক্ষরে বেরিয়ে গেল। এর উপর আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা হল, মনে মনে ভাবলাম, বেশ ছোকরা তো! অক্ষর মিলিয়ে মিলিয়ে কেমন কবিতা লিখেছে। সাহিত্যের সমঝদারি তার মধ্যে ছিল তা আমি জানি। তখনকার আমলের একজন বিশেষ লেখকের বই না থাকলে পল্লীগ্রামের কোনো লাইব্রেরি চলত না। সেই লেখকের এক একখানা বইয়ের তিন-চার কপি পর্যন্ত রাখতে হতো কোনো কোনো বড় লাইব্রেরিতে।
ছেলেটি বলত, ওসব ট্রাশ-ট্রাশ! দেখবেন ওসব টিকবে না।
এক একদিন পাঁচুগোপাল আমাকে নিয়ে গ্রামের মাঠে বেড়াতে যেত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চোখও তার বেশ ছিল। মাঝে মাঝে মুখে মুখে কবিতা তৈরি করে আমাকে শোনাত। অনেকগুলো কবিতা হলে পরে একটা কবিতার বই ছাপাবে এমন ইচ্ছাও প্রকাশ করত। সেই সময় কলকাতার কোনও পাবলিশিং হাউস ছয় আনা গ্রন্থাবলী প্রকাশ শুরু করে দিল। তার প্রথম বই লিখলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের বইখানি স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে পাঁচুগোপাল আমায় এনে দিয়ে বললে, এ বই নিতে ভিড় নেই। নতুন এসেছে, এক-আধজন নিয়েছিল, কাল ফেরত দিয়ে গিয়েছে, কিন্তু দেখুন গে যান অমুকের বইয়ের জন্য কি যে মারামারি। ডিটেকটিভ উপন্যাস না রাখলে লাইব্রেরি উঠে যাবে। কেউ চাঁদা দেবে না।
পরের মাসে আর একখানি বই বেরুল। সেখানা আমার কাছে নিয়ে এসে সে বললে, আমি একটা কথা ভাবছি, আসুন আপনাতে আমাতে এই রকম উপন্যাস সিরিজ বের করা যাক। খুব বিক্রি হবে, আর একটা নামও থেকে যাবে। আপনি যদি ভরসা দেন, আমি উঠে পড়ে লাগি। আমি বিস্ময়ের সুরে বললাম, তুমি আর আমি মিলে বইয়ের কারবার করব, এ কখনও সম্ভব? এ ব্যবসার আমরা কিই-বা জানি? তা ছাড়া বই লিখবেই বা কে? এতে লেখকদের পারিশ্রমিক দিতে হবে, সে পয়সাই বা দেবে কে?
সে হেসে বললে, বাঃ তা কেন, বই লিখবেন আপনি, আমিও দু-একখানা লিখব। পরকে টাকা দিতে যাব কেন?
বাংলাসাহিত্যকে ভালোবাসতাম বটে, কিন্তু নিজে কলম ধরে বই লিখব এ ছিল সম্পূর্ণ দুরাশা আমার কাছে। অবিশ্যি পাঠ্যাবস্থায় অন্য অনেক ছাত্রের মতো কলেজ ম্যাগাজিনে দু-একটা প্রবন্ধ, এক-আধটা কবিতা না লিখেছি তা নয়, প্রতিবেশীর অনুরোধে বিবাহের প্রীতি উপহারের কবিতায় দু-পাঁচটা না লিখেছিলাম তাও নয়, কিন্তু সে কে না লিখে থাকে?
সুতরাং আমি তাকে বললাম, লেখা কি ছেলেখেলা হে, যে, কলম নিয়ে বসলেই হল? ওসব খামখেয়ালি ছাড়। আমি কখনও লিখিনি, লিখতে পারবও না। তুমি হয়ত পারবে, আমার দ্বারা ওসব হবে না।
সে বললে, খুব হবে। আপনি যখন বি-এ পাস, তখন আপনার কাছে এমন কিছু কঠিন হবে না। একটু চেষ্টা করুন তাহলেই হয়ে যাবে।
তখন বয়স অল্প, বুদ্ধি-সুদ্ধি পাকেনি, তবুও আমার মনে হল, বি-এ পাস তো অনেকেই করে, তাদের মধ্যে সকলেই লেখক হয় না কেন? অথচ বি-এ পাস করা লোকদের ওপর পাঁচুগোপালের এই অহেতুক শ্রদ্ধা ভেঙে দিতেও মন চাইল না। এ নিয়ে কোনো তর্কও আমি আর তার সঙ্গে করিনি। কিন্তু করলেই ভালো হতো, কারণ এর ফল হয়ে দাঁড়াল বিপরীত। দিন দশেক পরে একদিন স্কুলে গিয়ে দেখি সেখানে নোটিশ বোর্ডে, দেওয়ালের গায়ে, নারকেল গাছের গুড়িতে সর্বত্র ছাপানো কাগজ টাঙানো। তাতে লেখা আছে, ‘বাহির হইল! বাহির হইল!! বাহির হইল!!! এক টাকা মূল্যের গ্রন্থমালা প্রথম উপন্যাস।’ লেখকের নামের স্থানে আমার নাম দেখলাম।
আমার তো চক্ষুস্থির। এ নিশ্চয় সেই পাঁচুগোপালের কীর্তি। এমন ছেলেমানুষি সে করে বসবে জানলে কি তার সঙ্গে মিশি! বিপদের উপর বিপদ, স্কুলে ঢুকতেই শিক্ষক-ছাত্রবৃন্দ সবাই জিজ্ঞেস করে, আপনি লেখক তা তো এতদিন জানতাম না মশাই? বেশ বেশ! তা বইখানা কি বেরিয়েছে না কি? আমাদের একবার দেখিয়ে যাবেন। হেডমাস্টার ডেকে বললেন, তাঁর স্কুল লাইব্রেরিতে একখানা বই দিতে হবে। সকলের নানারূপ সকৌতূহল প্রশ্ন এড়িয়ে চলি সারাদিন—কবে থেকে আমি লিখছি, আর কি বই আছে, ইত্যাদি। স্কুলের ছুটির পরে বাইরে এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। এমন বিপদেও মানুষ পড়ে!
তাকে খুঁজে বের করলাম বাসায় এসে। দস্তুরমতো তিরস্কার করলাম, এ তার কি কাণ্ড! কথার কথা একবার একটা হয়েছিল বলে একেবারে নাম ছাপিয়ে এরকমভাবে বার করে, লোকে কী ভাবে!
সে নির্বাক হয়ে দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বললে, তাতে কি হয়েছে? আপনি তো একরকম রাজিই হয়েছেন লিখতে। লিখুন না কেন! আমি বললাম, বেশ ছেলে বটে তুমি! কোথায় কি তার ঠিক নেই, তুমি নাম ছাপিয়ে দিলে কি বলে, আর দিলে দিলে একেবারে স্কুলের দেওয়ালে, নোটিশ বোর্ডে, সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছ, এ কেমন কাণ্ড? নামই বা পেলে কোথায়? কে তোমাকে বলেছিল ও নামে আমি কিছু লিখেছি বা লিখব?
যাক, পাঁচুগোপাল তো চলে গেল হাসতে হাসতে। এদিকে প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে সকলের প্রশ্নে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে হল, বই বেরুচ্ছে কবে? কত দেরি আছে আর বই বেরুবার? মহামুশকিলে পড়ে গেলাম। সে যা ছেলেমানুষি করে ফেলেছে তার আর চারা নেই। আমি এখন নিজের মান বজায় রাখি কেমন করে? লোকের অত্যাচারের চোটে তো অস্থির হয়ে পড়তে হয়েছে।
সাতপাঁচ ভেবে একদিন স্থির করলাম—এক কাজ করা যাক। সে এক টাকা সিরিজের বই কোনোদিনই বের করতে পারবে না। ওর টাকা কোথায় যে বই ছাপাবে? বরং আমি একখানা খাতায় যা কিছু লিখে রাখি, লোকে যদি চায় খাতাখানা দেখিয়ে বলা যাবে, আমার তো লেখাই রয়েছে, ছাপা না হলে আমি কি করব। কিন্তু লিখি কি? জীবনে কখনও গল্প লিখিনি, কি করে লিখতে হয় তাও জানা নেই। কীভাবে প্লট জোগাড় করে, কি কৌশলে তা থেকে গল্প ফাঁদে—কে বলে দেবে? আকাশ-পাতাল ভাবি প্রতিদিন, কিছুই ঠিক করে উঠতে পারি নে। গল্প লেখার চেষ্টা কোনদিন করিনি। পাঠ্যবস্থায় সুরেন বাঁড়ুজ্যে ও বিপিন পালের বক্তৃতা শুনে সাধ হতো, লেখক হতে পারি আর না পারি, একজন বড় বক্তা হতে হবেই।
কিন্তু লেখক হবার কোনো আগ্রহই কোনদিন ছিল না, সে চেষ্টাও করিনি। কাজেই প্রথমে মুশকিলে পড়ে গেলাম। সাতপাঁচ ভেবে প্লট সংগ্রহ আর করতে পারি না কিছুতেই। মন তখন বিশ্লেষণমুখী অভিব্যক্তির পথ খুঁজে পায়নি। সব কিছুতেই সন্দেহ, সব কিছুতেই ভয়।
অবশেষে একদিন এক ঘটনা থেকে মনে একটা ছোটগল্পের উপাদান দানা বাঁধল। সে পল্লীগ্রামের একটি ছায়াবহুল নিভৃত পথ দিয়ে শরতের পরিপূর্ণ আলো ও অজস্র বিহঙ্গকাকলীর মধ্যে প্রতিদিন স্কুলে যাই, আর একটি গ্রাম্য বধূকে দেখি পথিপার্শ্বের একটি পুকুর থেকে জল নিয়ে কলসি কক্ষে প্রতিদিন স্নান করে ফেরেন। প্রায়ই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়, কিন্তু দেখা ওই পর্যন্ত। তাঁর পরিচয় আমার অজ্ঞাত এবং বোধহয় অজ্ঞাত বলেই একটি রহস্যময়ী মূর্তিতে তিনি আমার মানসপটে একটা সাময়িক রেখা অঙ্কিত করেছিলেন। মনে মনে ভাবলাম এই প্রতিদিনের দেখা অথচ সম্পূর্ণ অপরিচিত বধূটিকে কেন্দ্র করে একটি গল্প আরম্ভ করা যাক তো, কি হয় দেখি! গল্প শেষ করে সেই গ্রামের দু-এক জনকে পড়ে শোনালাম—পাঁচুকেও। কেউ বলে ভাল হয়েছে, কেউ বললে মন্দ হয়নি। আমার এক বন্ধুকে কলকাতা থেকে নিমন্ত্রণ করে গল্পটি শুনিয়ে দিলাম। সেও বললে ভাল হয়েছে। আমি তখন একেবারে কাঁচা লেখক; নিজের ক্ষমতার ওপর কোনো বিশ্বাস আদৌ জন্মায়নি। যে আত্মপ্রত্যয় লেখকের একটি বড় পুঁজি, আমি তখন তা থেকে বহু দূরে, সুতরাং অপরের মতামতের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে উপায় কি। আমার কলকাতার বন্ধুটির সমঝদারিত্বের ওপর আমার শ্রদ্ধা ছিল, তার মত শুনে খুশি হলাম।
পাড়াগাঁয়ে স্কুলমাস্টারি করি কলকাতার কোনো সাহিত্যিক বা পত্রিকা-সম্পাদককেই চিনি না, সুতরাং লেখা ছাপানো সম্বন্ধে আমার একপ্রকার হতাশ হতে হল। এইভাবে পূজোর অবকাশ এসে গেল, ছুটিতে দেশে গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে এলাম। পুনরায় ফিরে এসে কাগজপত্রের মধ্যে থেকে আমার সেই লেখাটি একদিন বার করে ভাবলাম, আজ এটি কলকাতা নিয়ে গিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখা যাক।
ঘুরতে ঘুরতে একটা পত্রিকা আপিসের সামনে এসে পড়া গেল। আমার মত অজ্ঞাত অখ্যাত নতুন লেখকের রচনা তারা ছাপাবে এ দুরাশা আমার ছিল না, তবুও সাহস করে গিয়ে ঢুকে পড়লাম। দেখা যাক না কি হয়, কেউ খেয়ে তো ফেলবে না, না হয় লেখা না-ই ছাপবে। ঘরে ঢুকেই একটি ছোট টেবিলের সামনে যাঁকে কর্মরত দেখলাম, তাঁকে নমস্কার করে ভয়ে ভয়ে বলি, একটা লেখা এনেছিলাম। ভদ্রলোক মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, আর কোথাও আপনার লেখা বেরিয়েছি? আচ্ছা রেখে যান, মনোনীত না হলে ফেরত যাবে। ঠিকানাটা রেখে যাবেন।
লেখা দিয়ে এসে স্কুলের সহকর্মী ও গ্রামের আলাপী বন্ধুদের বলি, লেখাটা নিয়ে বলেছে শীগগির ছাপবে। চুপি চুপি ডাকঘরে গিয়ে বলে এলাম, আমার নামে যদি বুকপোস্ট গোছের কিছু আসে, তবে আমাকে স্কুলে বিলি যেন না করা হয়। কারণ লেখা ফেরত এসেছে এটা তাহলে জানাজানি হয়ে যাবে সহকর্মী ও ছাত্রদের মধ্যে। দিন গুনি, একদিন সত্যিই ডাকপিওন স্কুলে আমায় বললে, আপনার নামে একটা বুকপোস্ট এসেছে, কিন্তু গিয়ে নিয়ে আসবেন। আমার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। নবজাত রচনার প্রতি অপরিসীম দরদ যাঁরা অনুভব করেছেন তাঁরা বুঝবেন আমার দুঃখ। এতদিনের আকাশকুসুম চয়ন তবে ব্যর্থ হল, লেখা ফেরত দিয়েছে।
কিন্তু পরদিন ডাকঘর থেকে বুকপোস্ট নিয়ে দেখি যে, আমার রচনা বটে, কিন্তু তার সঙ্গে সহকারী সম্পাদকের একটি চিঠি। তাতে লেখা আছে, রচনাটি তাঁরা মনোনীত করেছেন, তবে সামান্য একটু-আধটু অদল-বদলের জন্য ফেরত পাঠানো হল, সেটুকু করে আমি যেন লেখাটি তাঁদের ফেরত পাঠাই, সামনের মাসে ওটা ছাপা হবে।
অপূর্ব আনন্দ আর দিগ্বজয়ীর গর্ব নিয়ে ডাকঘর থেকে ফিরি। সগর্বে নিয়ে গিয়ে চিঠিখানা দেখাতেই সবাই বললেন, কারও সঙ্গে আপনার আলাপ আছে বুঝি ওখানে? আজকাল আলাপ না থাকলে কিছু হবার জো-টি নেই। সব খোশামোদ, জানেনই তো। তাঁদের আমি কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না, যাঁর হাতে লেখা দিয়ে এসেছিলাম, তাঁর নাম পর্যন্ত আমার জানা নেই! তারপর সে গ্রামের এমন কোনও লোক রইল না, যে আমার চিঠিখানা একবার দেখলে। কারও সঙ্গে দেখা হলে পথে তাকে আটকাই এবং সম্পূর্ণ অকারণে চিঠিখানা আমার পকেট থেকে বেরিয়ে আসে এবং বিপন্ন মুখে তাকে বলি, তাই তো, ওরা আবার একখানা চিঠি দিয়েছে, একটা লেখা চায়, সময়ই বা তেমন কই!
হায়! সে সব লেখকজীবনের প্রথম দিনগুলি। সে আনন্দ, সে উৎসাহ, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার বিস্ময় আজও স্মরণে আছে, ভুলিনি। নিজেকে প্রকাশ করার মধ্যে যে গৌরব এবং আত্মপ্রসাদ নিহিত, লেখকজীবনের বড় পুরস্কার সবচেয়ে তাই-ই। স্বচ্ছ সরল ভাবানুভূতির যে বাণীরূপ কবি ও কথাশিল্পী তাঁর রচনার মধ্যে দিয়ে যান, তা সার্থক হয় তখনই, যখন পাঠক সেই ভাব নিজের মধ্যে অনুভব করেন। এইজন্য লেখক ও পাঠকের সহানুভূতি ভিন্ন কখনও কোনো রচনাই সার্থকতা লাভ করতে পারে না।
বালক কবির নিকট আমি কৃতজ্ঞ। সে-ই একরকম জোর করে আমাকে সাহিত্যরচনার ক্ষেত্রে নামিয়েছিল। পাঁচুগোপালের সঙ্গে মাঝে দেখা হয়েছিল। সে এখন চব্বিশ পরগণার কাছে কী একটা গ্রামের উচ্চ প্রাথমিক পাঠশালায় হেডমাস্টার। এখনও সে কবিতা লেখে।

