কাগজের দেহ যদিও দুর্বল, কিন্তু আমানতদারিতায় যথেষ্ট পোক্ত। বিশ্বস্ত লোকজনকেও যখন আস্থাহীন বোধ হয়, মনের ব্যথা প্রকাশের সকল পাত্র যখন অনুপোযুক্ত হয়ে পড়ে, দেহের দুর্বলতাসত্ত্বেও শক্ত বিশ্বস্ততা নিয়ে কাগজই দেয় তখন বন্ধুত্বের আসল পরিচয়। কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার ভাষাটাও তো হওয়া চাই হৃদয়াকর্ষক। তাই ভাবলাম, কলমের ভাষাটা তাহলে করেই নিই খানিকটা মেরামত। শেখার এ আগ্রহ থেকেই আমার এক বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। বললেন মেয়েকে নিয়ে আমার অনুভূতি লিখে দেখাতে। কী লিখবো! আমি তো কোনো লেখক নই যে, চাইলেই নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করবো! তবু চেষ্টা অব্যাহত রাখলাম। শেষমেষ কলম সায় দিলো। মেয়েকে ঘিরে আমার ভবিষ্যত-পরিকল্পনা ও সঠিক চিন্তা নিয়ে লিখবো, ঠিক করলাম।
লিখতে গিয়ে কাগজ-কলম নিয়ে বসে আছি দীর্ঘ সময়। কিন্তু কোত্থেকে শুরু করব, বুঝতেই পারছি না। ভাবতে ভাবতে মাথায় এল—আচ্ছা, কতজন কত কী-ই না ভাবে বিয়ের আগে, আমিও তো ভেবেছিলাম সন্তান জন্মের আগে এমন অনেক কিছু। সেখান থেকেই না হয় শুরু করি।
২০১৮-এর ১৮ মার্চ, জমাদিউল আখরের ১৮ তারিখ। দিনটি ছিল শনিবার। খুব ভোরের কথা। আগের দিন রাত বারোটার দিকে মুহতারামাকে নিয়ে ক্লিনিকে গেলাম। স্বাভাবিক ডেলিভারির জন্য ডাক্তার-নার্সদের প্রেসার দিলাম খুব। বাড়তি টেনশনে কপালে আমার শিশির বিন্দুর মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমছিলো অনবরত। পায়চারি করছিলাম হাসপাতালের করিডোরে। বিড়বিড় করে বিপদের দোআ আওড়াচ্ছিলাম। অবশেষে ঘড়ির কাঁটা যখন আটটার ঘরে, ভেতর থেকে খবর এল—‘বাচ্চা নরমালেই হবে, ইনশাআল্লাহ। দুশ্চিন্তার কিছু নেই।’
আমি একরকম স্বস্তির হাঁফ ছাড়লাম। গভীর মনোযোগী হলাম প্রার্থনায়। সৃষ্টিকর্তার স্মরণে পড়লাম তাঁর কালাম। সন্তান অথবা স্ত্রীর কোনো বিপদ হলে কী করবো আমি? কী করা উচিত আমার? দুঃখিত নাকি অন্য কিছু? সন্তান বেঁচে থাকলে, আনন্দে ঘর উজ্জ্বল হলে, তার সঙ্গে কেমন হবে আমার সম্পর্ক? তার প্রতি কী হবে আমার কর্তব্য? ডুবে গেলাম এমন নানা অদ্ভুত ভাবনায়।
কিছুক্ষণ বাদে সংবাদ এল—‘আপনার মেয়ে হয়েছে। মা-মেয়ে দু’জনই সুস্থ।’ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়ে কৃতজ্ঞতার ঢেঁকুর তুললাম। নবাগতের আগমনে উল্লসিত সবাই। ছেয়ে গেল সর্বত্র আনন্দ। নার্সরাও দাবি করলেন উপরি বখশিশ। সৃষ্টিকর্তার করুণায় পূর্ণ হলো আমাদের জীবন। খুশি হয়েছি বৈ কি! তবে আত্মহারা হইনি। শুধু ভাবছিলাম তাঁর সম্মানে আমার কর্তব্যের কথা। তাঁর কাছ থেকে প্রাপ্তির আশা বা লোভ নয়, বরং দানের আনন্দের কথা। কারণ সন্তান তো স্রষ্টার পূর্ণ দানের অমূল্য এক অধ্যায়। নিঃসন্তান পিতার আশার প্রদীপ। লা-ওয়ারিসের রক্ষক। প্রেমের উচ্ছ্বাস থেকেই যার সৃষ্টি। নিষ্পাপ বান্দারূপে যার জন্ম। সৃষ্টির সেরা মানব প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অনুসারী হয়ে যার শুভাগমন। সর্বকালের সর্বাধুনিক শ্রেষ্ঠ ইসলামই যার স্বভাবধর্ম। পিতামাতার কাছে সৃষ্টিকর্তার সে এক আমানত ও অতুলনীয় অতিথি। কন্যা হলে বয়ে আনে সে পালনকর্তার করুণা। তাঁর নির্দেশেই ছেলে হয় বাবার সাহায্যকারী।
বাইরে বসে বসে ভাবছিলাম এতোক্ষণ। ভেতরে যাবার অনুমতি নেই। ডাক্তার চলে গেলে সুযোগ বুঝে যাওয়া যেতে পারে। আরও কতক্ষণ এদিক-ওদিক করলাম। হঠাৎ জানতে পারলাম ডাক্তারবাবু কেবিন ত্যাগ করেছেন। অমনিই তড়িঘড়ি ঢুকে পড়লাম। মুহতারামা আমার শুয়ে আছেন বিছানায়। অসুস্থতা বেশ জাপটে ধরেছে তাঁকে। পাশেই বসে আছেন মা। মুহতারামার কপালে হাত বুলিয়ে সান্ত¦না দিলাম খানিকটা।
বেশিক্ষণ থাকা গেল না তাঁর পাশে। ডাক্তারবাবু এসে পড়তে পারেন। দেখে ফেললে এক নিঃশ্বাসে ভূরি ভূরি শোনিয়ে দেবেন। চটজলদি তাই বেরিয়ে পড়াই ভালো। এতসব মাথায় নিতে নিতে এলাম পাশের কেবিনে। সেখানে শ্বশুরের কোলে আমার মেয়ে। টুকটুকিকে কোলে নিলাম। এই প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতি। কী চমৎকার! কী ফুটফুটে! আহ, কী অপরূপা আমার মেয়েটি! প্রশংসায় পঞ্চমুখ একেবারে আমি। আনন্দে মন ভরে গেল। দেহমনে দোলা দিয়ে গেল এক স্বর্গীয় ভালোবাসা, নিজের অজান্তেই। ওর প্রতি দায়িত্ববোধ আমাকে ফের চিন্তায় ফেলল সহসাই।
ভাবতে লাগলাম গভীর মনে। আমি কি পারব আদর্শ বাবা হতে! সাহায্য করবে কি আমাকে স্বার্থমুক্ত বাবা হতে আমার চিন্তাধারা! কারণ বাবা-মেয়ের আত্মিক এ পবিত্র সম্পর্ক স্বার্থপরতার বেড়াজালে ধ্বংস করে দিচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতার ধর্মহীন জীবনযাপন। আর আধুনিকতার নামে অবুঝ মুসলিমরাও গা ভাসাচ্ছে এ ধ্বংসলীলায়। ধার্মিক-অধার্মিক সকলেই আক্রান্ত হচ্ছে এ মহামারিতে। অশান্তি ছড়িয়ে নরকে পরিণত হচ্ছে আমাদের সুন্দর জীবন।
তবে দয়াময় স্রষ্টার অসীম কৃপা থেকে নিরাশ হতে নেই ভেবে আশাবাদীও হলাম। সঙ্গে সংকল্প করলাম, সন্তানের আদর্শ গঠনে যেহেতু প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মাতাপিতা, সন্তানের প্রতি এ দায়িত্বের পূর্ণতা থেকেই যেহেতু শেখে সন্তান তার সর্বপ্রকার দায়িত্ব-কর্তব্য, ভালো-মন্দও শেখে সে অন্যকে দেখে, সবচেয়ে বেশি শেখে মাতাপিতা থেকে, তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক, ব্যবহার ও মানসিকতা থেকে, তাই নিজের আত্মপ্রচেষ্টা ও প্রার্থনায় সর্বশক্তি নিয়োগ করলে ওর জন্য ভালো কিছু হওয়া অসম্ভবও নয় বটে। নিজের আত্মশুদ্ধিসহ ওর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ত্রুটি না করলে এ স্বপ্ন হতে পারে উজ্জ্বল। কারণ সন্তানের মন হলো চুম্বকাকর্ষণ। মা-বাবার ভালো-মন্দ অপ্রকাশ থাকলেও অদৃশ্য শক্তিতে হুবহু ধরা দেয় তার মনে। আজ এতটা দিন বাদে বাস্তব দেখছি এসব আমার মেয়ের মধ্যে। ওর বয়স এখন বছর দেড়েক। আমার মানসিক ও আমলের কোনো পরিবর্তন হলেই ওর মধ্যেও বদল দেখি। কান্নাকাটি থেকে আরম্ভ করে যত অশান্তি শুরু হয় তখন।
জন্মের পর বড় আদর করে নাম রাখলাম ‘আমাতুল্লাহ মুহসানা’। ওকে কোলে করে মনের আনন্দে স্বপ্ন দেখছিলাম সেই তখন থেকেই। প্রথমবার যখন কেঁদে ওঠে খিদেয়, নিয়ে যাই মুহতারামার কাছে। দুনিয়ায় সেটাই ছিল ওর প্রথম খাবার গ্রহণ। ক্লিনিকে থাকাকালে মুহতারামা বললেন—‘বাবুর জন্য একটা টিস্যু, প্রেসক্রিপশনের কিছু ওষুধ ও গরম চা আনা দরকার।’ তখনকার সময় আমার পকেটের পরিস্থিতি ছিল বেশ নড়বড়ে। শ-পাঁচেক টাকা হয়তো ছিল সর্বসাকুল্যে। একজনের কাছ থেকে কিছু ধার করে গেলাম জিনিসগুলো আনতে। ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে ধারে-কাছে তেমন দোকানপাটের দেখা নেই। মিনিট পাঁচেক পায়ে হেঁটে এগোলেই হয়তো মিলতে পারে কোনো হদিস। চলতে চলতে ময়লাপোতা গিয়ে খুঁজলাম ওষুধের দোকান। চুচু কম্পানির টিস্যু নিলাম একটি। কিন্তু ওষুধটা মিলল না ঠিকমতো। কয়েক দোকান ঘোরাঘুরি করে পেলাম অবশেষে।
ক্লিনিকে ফেরার পথে আবার হারিয়ে গেলাম ভাবনার রাজ্যে। ‘আমাতুল্লাহ’র আগামীর জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। কিন্তু কী পরিকল্পনা করব! লক্ষ্য স্থির করতে গিয়ে পড়লাম বিপাকে। মাথায় ঘুরপাক খেল হাজারও চিন্তা। অনেক ভাবনার পর মনে এল একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন, সত্যিকারার্থে কারোর বাবা-মা কেমন দেখতে চান নিজ সন্তানকে? পার্থিব জগতে থাকুক সে যতই ভালো, হোক সে যেকোনো শিক্ষায় শিক্ষিত, অবশ্যই প্রত্যেকে দেখতে চান সন্তানকে সন্তোষভাজন ও আদর্শবান; চান না সন্তান অবাধ্য কিংবা বখাটে হোক।
এর একমাত্র সফল উপায় সন্তানের মন অবুঝ ও নিষ্পাপ থাকতেই তাকে আদর্শরূপে গড়ে তোলা। মাঝে মাঝে একগাদা উপদেশ, নির্দেশ ও প্রয়োজন পূরণেই শুধু আদর্শিক পূর্ণতা অর্জন হয় না তার। তাকে শুদ্ধ করার নিয়তে বেশি বেশি ভুল ধরলে বিগড়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। এসবেই কেবল মা-বাবার দায়বদ্ধতা ও আংশিক কর্তব্য পূর্ণ হয়। পূর্ণতা লাভ করবে তো সে মা-বাবার পরিশুদ্ধ মন থেকে। আদর্শের স্বরূপ পিতামাতার থেকেই তৈরি হতে পারে এক আদর্শ সন্তান। সৃষ্টির সেরা মহাপুরুষ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতিপালনেই তৈরি হয়েছেন স্বর্গের শ্রেষ্ঠ নারী হজরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা। জান্নাতের শ্রেষ্ঠ নারীর প্রতিপালনেই তৈরি হয়েছেন স্বর্গের শ্রেষ্ঠ যুবকদ্বয় হজরত হাসান ও হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। ঘর-সংসার পরিচালনা ও সন্তান গঠনে এঁরা হলেন আমাদের উত্তম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেলাম। মনে পড়ে গেল—আহা, চা তো নেওয়া হয়নি! ক্লিনিক-লাগোয়া এক দোকানে পেয়ে গেলাম ধূমায়িত চা। চা হাতে আবার পথ ধরলাম ক্লিনিকের। দু’-চোখে ফের ভেসে উঠল আমার স্বপ্নসুখের ফুটফুটে কন্যার সুন্দর অবয়বখানি। তাকে ঘিরে রাজ্যির কল্পনা করতে করতে কখন যে আবার মিলে গেলাম এক ভিন্ন জগতে, গতান্তর নেই নিজেরও।
সকাল থেকে কিচ্ছু খাইনি আমরা। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। চিন্তায় চিন্তায় পার হয়ে গেল সময়। সকাল গড়িয়ে এখন দুপুর। শ্বশুর অবশ্য বাসায় গিয়েছিলেন। এনেছিলেন কিছু খাবার। মুরগির বাচ্চার ঝোল দিয়ে রোগীকে খেতে দিলেন। তার মাও খেয়ে নিলেন সঙ্গে। রোগীর কারণে হাসপাতাল, ক্লিনিকে আলাদা একটা গন্ধ থাকে। সুস্থ লোক গেলেও অসুস্থ হয়ে ওঠার উপক্রম। আমার তো দম বন্ধ হয়ে যায় যায় অবস্থা। সহ্য হয় না একটুও। খেতে পারলাম না তাই। চলে গেলাম চাইনিজ হোটেলে। আমার আবার এ সমস্ত খাবার পছন্দ খুব। সুযোগ পেলে ছাড়ি না মোটেও। তারওপর খিদের জ্বালা। চোঁ চোঁ করছে পেট। হেঁটে গেলাম দ্রুত। গিয়ে বসলাম মাঝের টেবিলে। অর্ডার করলাম চিকেন ফ্রাই—‘এই যে ভাই! একটা রান, আর একটা সিনার মাংস, সঙ্গে একটা পাকোড়া। ঠাণ্ডাও দেবেন কিন্তু।’ খেতে বসলাম কোমর বেঁধে। পেটের টান থাকলে খাবার যে কতো স্বাদের লাগে, বুঝতে পারছি। খাবারটা তেমন স্বাস্থ্যকর না হলেও ভালো লাগছে।
খেতে বসে বারবার মনে আসছে একটি কথা, আমি তো এখন বাবা; দায়িত্বও অনেক। এজন্য নানারকম চিন্তা হচ্ছে মাথায়। কখনও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি। আবার তার মায়ের অসুস্থতা নিয়ে টেনশন করছি। তখনই মাথায় এলো মা নিয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা। বলেছিলাম একবার শিক্ষার্থীদের মাঝে। সস্তানের প্রতি মা-বাবার রয়েছে অসংখ্য কর্তব্য। কিন্তু এমন একটি কর্তব্য আছে, যা অবহেলার কারণে ব্যর্থ হয় সমস্ত চেষ্টা। নষ্ট হয় ছেলেমেয়েদের জীবন। যাকে নির্মাণের ভিত্তি বা গাছের শেকড়ের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। কথাটি বেশ নাড়া দিলো তাদের মনে। অতি উৎসাহে জানতে চাইলো কর্তব্যটির কথা। তাদের তীব্র ইচ্ছে দেখে আমিও উৎসাহ পেলাম। মনে হলো আজ বুঝি না বলা কথাগুলো প্রকাশের কোনো মওকা এলো।
আমি মন খুলে কথা বলতে আরম্ভ করলাম—‘শোনো! বর্তমানে এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল করে ছেলেরা। শয়তানের ধোঁকায় সৃষ্টিকর্তার বৈধ বিয়ের পরিবর্তে বেছে নেয় ব্যভিচারের পথ। মনের তাড়নায় অপব্যবহার করে দৈহিক শক্তি। শয়তানের কুমন্ত্রণায় সাড়া দিয়ে ধ্বংস করে নিজেকে। অসময়ে লিপ্ত হয়ে যায় অন্যায়ে। অপরিপক্ক গাছ থেকে কামনা করতে শুরু করে ফল। অবশেষে মরে যায় অকালেই তার বৃক্ষমূল।
ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ডক্টর আইডমিয়াম-এর গবেষণা পড়লে অনুভব করা যাবে এসবের করুণ পরিণতি। বোঝা যাবে, কতো অধঃপতন হয় এর দ্বারা সমাজের। যা তিনি ‘সেক্স কালচার’গ্রন্থে লিখেছেন। যদি কখনও কোনো জাতির উন্নতি বা অবনতি পরিলক্ষিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে, তারা তাদের যৌন-বিষয়ক আইনে রদবদল করেছে। তিনি আশিটিরও বেশি গোত্রের সভ্যতা-সংস্কৃতি অধ্যয়ন করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। যে সকল গোত্রে বিয়েপূর্ব যৌনতার অবাধ স্বাধীনতা ছিলো, তারা সভ্যতার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলো। যাদের ছিলো এ বিষয়ে মোটামুটি আইনানুগ ব্যবস্থা, তারা ছিলো সভ্যতার মধ্যস্তরে। আর যারা বিয়েপূর্ব যৌনতাকে অপরাধ-ই মনে করতো; তা থেকে পবিত্র ছিলো। তারাই সভ্যতার সর্বোচ্চ শেখরে আরোহন করেছেন।
আবার ভালো সঙ্গীনীও গ্রহণ করতে চায় প্রত্যেকে। কিন্তু ভালোর তো জমানা-ই নেই। তাই পছন্দের মানুষটিকে আজকাল নিজেই বেছে নিতে চায় সবাই। ফেসবুক আইডি খোলে ফেইক নামে। চালায় রাতভর। আরও নানান উপায়-উপকরণ বের করে। অযথা নষ্ট করে সময়। খোঁজে মেয়েদের মুঠোফোন নম্বর। চ্যাট করে এফবি’র আইডিতে আইডিতে। কথা বলে ইমোর ভিডিও-কলে। যখন তখন রিচার্জ করে ইন্টারনেট। বাপের টাকা নিজে না খেয়ে ব্যয় করে নিষিদ্ধ নারীর পেছনে। তাদের ভাষায়—‘এটা ব্যভিচার নয়, ভালোবাসা।’ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে ভেতরের মানুষটিকে চেনার জন্য।
আমার কথা শুনে ছাত্ররা মিটিমিটি হাসছে। কেউ বা অন্যের দিকে টেরা চোখে তাকাচ্ছে। কিন্তু শ্রোতাদের একটা ভালো গুণ আছে। কোনো কথা শুনে পালন করতে পারুক চাই না পারুক, কথাটা সত্য ও বাস্তব হলে সায় দেয় অন্তত। আর ‘ঠি…ক’ বলে স্বজোরে সম্মতি জানায়। এবারও তাই করলো। আমি সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললাম—‘মনোযোগ দিয়ে শোনো আর ভাবো বিয়েপূর্ব প্রেমের ভালো-মন্দ নিয়ে। একটি যুক্তির আলোকে আমরা অনুধাবন করতে পারি এসব কিছু—
চুলকানি রোগ সম্পর্কে জানি সবাই। খুঁজলি হলে খুব চুলকোতে ইচ্ছে করে। কী যে আরাম! ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ডাক্তারবাবুরা কিন্তু নিষেধ করেন চুলকোতে। বাঁধা দিলে রেগে যায় তবু এ ধরনের রোগীরা। চড়ও কষতে পারে, বলা যায় না। তবু সেখানে হাত দিতে হয় তাদের। আরামের চুলকানি শেষ হলেই বোঝে আসল মজা। চামড়া ছিলে গিয়ে শুরু হয় যতো জ্বালা। বিয়ের আগে প্রেমও ঠিক তেমন। কোনোভাবে দায়িত্বশীল স্বজনরা জেনে গেলে মিথ্যের আশ্রয় নেয়। বাঁচার চেষ্টায় বলে বানোয়াট কথা। আত্মীয়-স্বজন রাজি না থাকলে পালিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। মা-বাবাও তখন বনে যান তাদের শত্রু। মনে করে, তারা আমাদের ভালো চান না। বিয়ের কাজটা সেরে ফেলে তাদের অসন্তুষ্টিতে। দাম্পত্যজীবনে সমস্যা হলে তখন আর মেটাতে চান না তারা। বলেন—‘শিক্ষা হোক। ভুলের অনুভূতি আসুক।’ এভাবে থাকতে থাকতে সেই দম্পতির একে অপরকে বিপদের কারণ ভাবে। তখন আলাদা হওয়াই বিপদমুক্তির একমাত্র কারণ বোধ হয় তাদের।
তাছাড়া দুজনই বিয়ের আগে কথা বলে চুরি করে, ঘর ফাঁকি দিয়ে, মা-বাবাকে ধোঁকা দিয়ে। বিয়ের পরবর্তীর জন্য নারী পুরুষের কাছে চায় অগ্রিম অনেক কিছু। দাবি করে সীমাহীন ভালোবাসা। করতে থাকে যতো কল্পনা-জল্পনা। পুরুষও তাকে আকৃষ্ট করার জন্য দেয় মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। বিয়ের পর পুরুষ যায় উপার্জনে। নারী থাকে ঘরোয়া কাজে। তখন একজন অপরজনের কৃত প্রতিশ্রুতি ও আকাঙ্খা পূরণে হয় ব্যর্থ। এই অবমূল্যায়নের অনুভূতিও ঝগড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায় শেষমেষ।
আবার বিয়ের আগে উভয়ই নিজেদের ছোটো ছোটো ভুলগুলো এড়িয়ে যেতো ভালোবাসার ছলে। বলতো—‘এগুলো কিচ্ছু না, ঠিক হয়ে যাবে সব।’ অথচ এখন সেগুলো আর সহ্য করার ক্ষমতা নেই তাদের। এবার স্মরণ করতে থাকে আগের কৃত প্রতিশ্রুতি; সেগুলো এখন পূর্ণ না করা। এভাবে অবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতে থাকে তাদের মাঝে। যদি নিকাহের ভিত্তি হয় বিয়েপূর্ব ভালোবাসা, তাহলে এ ভিত্তি কতো-ই না নড়বড়ে আর দুর্বল!
ভালোবাসা পরবর্তী বিয়ের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকে ফ্র্যাঙ্ক বা অবাধ। কারণ তারা তো প্রচলিত স্বামী-স্ত্রী নয়, আধুনিক যুগের কপোত-কপোতি। তাদের মাঝে নেই স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সেই পবিত্র সম্মানবোধ। নেই স্ত্রীর প্রতি স্বামীরও দায়িত্বানুভূতি। নেই মার্জিত সঠিক ভালোবাসাও। উভয়ে চলতে চায় নিজ নিজ সম্মান ও অধিকারের মানসিকতা নিয়ে। এসব অমিল দেখে শুরু হয় পারস্পারিক মনোমালিন্য। যেহেতু উভয়ের সৃষ্টিগত জাতি ও লিঙ্গ ভিন্ন, তাই সৃষ্টিকর্তাও তাদের প্রাপ্য অধিকার নির্ধারণ করেছেন তাদের সত্ত্বা মোতাবেক। এসব ভিন্নতা দেখেও ধোঁকায় পড়ে এরা। অবুঝের মতো দাবি করে সম-অধিকার। বোঝে না, সমান চাইলে হতে হবে সব দিক থেকে; অধিকারে ও লিঙ্গে, নামে ও কর্মে, বুদ্ধিমত্তা ও স্বভাবে। এভাবেই সোনালি সংসার যায় ভেঙে। দেখা যায় তখনই তার চেহারায় যতো দুশ্চিন্তার ছাপ। এটা তো হবারই ছিলো। কারণ দুজনই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছে। হেঁটেছে ভুল পথে।
সুখ পেতে হলে মানতে হবে সৃষ্টিকর্তার বিধান। যিনি বলেছেন—‘ভালোর জন্য ভালো, মন্দের জন্য মন্দ।’ দু-এক জায়গায় বিপরীত দেখা গেলেও তার যৌক্তিক কারণ থাকে রাব্বে কারিমের কাছে। অর্থাৎ উত্তম সঙ্গীনী পেতে হলে নিজেকেই হতে হবে ভালো। গড়ে উঠতে হবে দায়িত্বশীল স্বামী হিসেবে। প্রস্তুত হতে হবে ‘মিসালি’ বাবা-রূপে। হতে হবে আমল-আখলাকের উত্তম দৃষ্টান্ত, নম্রতা ও সবরের মহান প্রতীক। অবলম্বন করতে হবে সৎপথ। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে হবে অনবরত। তাহলেই অর্জন সম্ভব হবে উত্তম সঙ্গীনীর। প্রাপ্ত হবে সুখময় জীবন। পরস্পর থাকবে না কোনো সন্দেহের অবকাশ। কারণ দুজনই তো সৎপথের পথিক। এবার কথায় খানিকটা বিরতি নিলাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম— স্মরণে আছে তো কী কথা বলছি? প্রধান সে কর্তব্য হলো, সঠিক পদ্ধতি অবলম্বনে সন্তানের জন্য আদর্শ মা নির্বাচন করা। এ কাজ শুদ্ধভাবে করতে হলে বেঁচে থাকতে হবে যে ভুলগুলো থেকে, তা আলোচনা করা হলো মাত্র। কারণ ছেলেমেয়ে আশিভাগেরও বেশি প্রতিপালিত হয় মায়ের হাতেই। আমার সম্মানিত পিতার কথা কানে বাজে এখনও। বলেছিলেন—‘সন্তান মা-বাবার ভালোর চেয়ে খারাপটাই সহজে শেখে। পরবর্তীতে ঐ কাজ সে তাদের থেকেও দশগুণ বেশি করে। এজন্য আগে শুদ্ধ নির্মল হতে হয় পিতাকে। তারপর তৈরি হতে হয় মাকেও।
বিখ্যাত দার্শনিক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন—‘তুমি আমায় একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমায় একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো।’ আমি বলি—‘আমায় আদর্শ মা দাও, আমি তোমায় একটি আদর্শ জাতি উপহার দেবো, ইনশাআল্লাহ।’ কারণ কুশিক্ষা আদর্শ হয় না কখনও। উত্তম চরিত্র ও সুশিক্ষার নামই আদর্শ। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, আগথেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে নিজেকে। সঠিক করতে হবে চিন্তা-চেতনা। পরিশুদ্ধ করতে হবে মন। প্রার্থনা করতে হবে আল্লাহর কাছে। দমন করতে হবে মন ও শয়তানের কুমন্ত্রণা। সাধনা করতে হবে সুন্দর যৌথজীবনের জন্য।
ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলা সেদিনকার কথাগুলো বারবার স্মরণ করছিলাম খুব করে। আর মিল দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম নিজের জীবনে। মেয়ের জন্য কতোটা পেরেছি আমি ‘মিসালি’ বাবা হতে। কতোটা প্রস্তুত করতে পেরেছি তার মাকে আদর্শ জননীরূপে। ভালো কাজে অবশ্যি অল্পেই তুষ্ট হতে নেই। এজন্য আরও ভালো কামনা করি নিশ্চয়ই। কিন্তু মনও আশাবাদী খুব। আমি চেষ্টা করেছি সত্য, করছিও। সফলও হয়েছি অনেকাংশে হয়তো বা। উজ্জ্বল ভবিষ্যত ও কামনা করি রাব্বে কারিমের কাছে।
ভাবতে ভাবতে খাবার ফুরিয়ে এলো। ওয়েটারকে ডেকে বললাম—‘বিল কতো হলো?’ কাঁধের গামছার এক কোণে হাত রেখে বললো—‘একশো টাকা হুজুর!’ বিল চুকিয়ে আরও চারখানা চিকেন ফ্রাই সঙ্গে করে ফেরার পথ ধরলাম।
লেখক : শিক্ষক, আল-জামিআতুল ইসলামিয়া ইসলামপুর (ভবানিপুর মাদরাসা), গোপালগঞ্জ

