অনেক কষ্টে একটা বকরি কুরবানি করা ছাড়া এ যাবত কোনো কুরবানিই করা হয়নি রাজুদের বাড়িতে। কাজেই পাড়ার আর দশটা ছেলেপুলের সাথে গোশত টোকাতেই অভ্যস্ত ও। গরিব ঘরের ছেলেরা এভাবেই কুরবানির গোস্ত সরবরাহ করে। গ্রামের ছোটছোট ছেলেমেয়ে একটা ব্যাগ হাতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। গোস্ত সবাইকেই দেওয়া হয়। এদিনে কেউ মান বিচার করে না।
রাজুদের ফ্যামিলি মেম্বারদের তালিকা মোটামুটি ছোটই- সে, আব্বা, আম্মা, ছোট দুটো বোন আর বৃদ্ধ দাদু ভাই। রাজুর বেড়ে ওঠা গ্রামেই। তবে পিএসসি পাশ করার পর ঢাকায় খালার বাসায় থিতু হয়েছে। পড়াশোনায় ওর ভালোই মন আছে। এসএসসি রেজাল্ট গোল্ডেন এ-প্লাস। এখানে থেকেই পড়াশোনাটা শেষ করতে চায় ও। ছুটিতে কেবল গ্রামে আসে। তাও কোনো বিশেষ উপলক্ষে। তেমনি একটা জোরালো উপলক্ষ সামনে। কুরবানি ঈদ।
রাজু এখন গ্রামে। হৈ-হুল্লোড় আর মাতামাতিতে বেলা পার হয়। ছুটিতে গ্রামটাই ওর কাছে ভ্রমণবিলাস হয়ে ওঠে। গ্রামের পুরান বাড়ি, ভাঙা মন্দির আর বিলে ঝিলে ঢুঁ মারা ওর অভ্যাস। বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে বেশ পটু সে; চাঁই, দুয়াইর এবং টেঁটা দিয়ে যতটা নয়।
ওর সমবয়সী ছেলেরা বাবা-বড় ভাইদের সাথে হাটে গরু কিনতে যায়। আর ও গরু কিনতে নয় বরং চোখ ভরে দেখার জন্যই বন্ধুদের সাথে হাটখোলায় আসে। এখন পাড়াজুড়ে বাড়ি বাড়ি নতুন হৃষ্টপুষ্ট গরু। দেশি-বিদেশি গরু। হরেক রকমের গরু। বিকেল হলেই গরু দেখতে ভিড় জমায় রাজুরা। গরু দেখেই বুঝা যাচ্ছে কুরবানির ঈদ নাকের ডগায়।
দাদা-নাতির মধ্যে বিরল ভাব ছিল। অত্যন্ত সখ্যতা। ও দাদুকে যতটা না ভালবাসত তার চেয়ে দাদু ভালবাসতেন, স্নেহ করতেন হাজার গুণ বেশি। একমাত্র নাতি বলে কথা!
গত ঈদেও দাদু ছিলেন খাবারের টেবিলে। রাজুকে গোশতের বড় টুকরোটা দাদু নিজ হাতে দিতেন। তখন রাজুও দিতে চাইত এক টুকরো দাদুর প্লেটে। দাদু অমত করতেন। গরুর গোশত খাওয়া নাকি দাদুর বারণ ছিল। নিজের উপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন দাদু নিজেই। দাদু মনে করতেন, বাতব্যথা, অ্যালার্জি, চর্মরোগের জন্য গরুর গোশত যমের মতো। একদিন খেলেই পরদিন নাকি শরীর ফুলে যাবে, ব্যথা বেড়ে যাবে, আরো কত কী! কুরবানির গোশত একটু-আধটু খেলে কিচ্ছু হয় না বলে রাজু এক টুকরো এগিয়ে দিত। বরাবরের মতো অমত করতেন দাদু। দুম্বার গোশত, বকরি-খাসির গোশত আবার আয়েশ করে খেতেন ঠিকই। শুধু গরুতেই যত্তসব বিপত্তি!
গেল বছর কুরবানি ঈদের পরের দিন। ফ্যামিলির সবাই একসাথে যখন খাবারের টেবিলে তখন চালাকি করে রাজু গরুর গোশতের টুকরোটা নিয়ে দাদুর প্লেটে দিতে দিতে বলল, ‘এই দুম্বার গোশতটা তুমি খাও দাদু।’ মা দেখেও কিছু বললেন না। মাও রাজুর কথায় একমত ছিলেন। একটু আধটু খেলে কিছু হয় না। তাও আবার কুরবানির গোশত। সেদিন খুব মজা করে চেটেপুটে খেলেন দাদু। কিন্তু পরদিন দাদুর কিচ্ছুটি হলো না। তার পরের দিনও না। বরং কোনো দিনই না। সেই থেকে সবাই জেনে গেল ওসব কেবল দাদুর ‘বিশ্বাস’ ছিল।
মেম্বার চাচার ছেলে গ্রামবাসীর জন্য সৌদি থেকে দুম্বার গোশত পাঠিয়েছেন। তার খানিকটা রাজুদের ভাগেও পড়েছে। সদ্য ভুনা করা দুম্বার গোশত রাজুর প্লেটে। সবে মুখে পুরবে অমনি তার গাল বেয়ে দরদর করে গড়িয়ে পড়ল ক’ফোঁটা অশ্রু। মা অবাক হলেনÑ ‘কী হইছে বাপ, তোর? ঈদের দিনে চোখে পানি! দুম্বার গোশত না তোর খুব প্রিয়! মজা করে খাবি। কিন্তু কাঁদছিস কেন?’
‘মা! দাদু…’
‘হ্যাঁ দাদু…! কিন্তু কী হয়েছে, বল!’
‘দাদু না দুম্বার গোশত…’
অস্ফুট থরথর ঠোঁটে দাদুর কথা বলতে গিয়ে কান্নার গমকে ফুলে ফুলে উঠছিল রাজু। মা বুঝতে পারলেন দাদুকে বড্ড মনে পড়ছে ওর।
‘দাদুর কথা খুব মনে পড়ছে বুঝি?’
‘হু।’
মাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা গুঁজে হেচকি টেনে কাঁদছে রাজু- ‘জানো মা, আজ দুম্বার গোশত আছে কিন্তু দাদু নেই। দাদু থাকলে নিজ হাতে আমার পাতে দুম্বার গোশত তুলে দিতেন। আমিও দুষ্টুমি করতাম। আমি একা একা দুম্বার গোশত খাব না, মা। আমার দাদুভাইকে এনে দাও!’
মাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। প্লেটের ভাতগুলো আর খাওয়া হলো না রাজুর। খাওয়া হলো না দুম্বার এক টুকরো গোশতও।

