আব্দুলের হাতে বাঁশের কঞ্চি। পাড়ার বুক বরাবর রাস্তা দিয়ে হাঁটছে সে। কুটির দোকান থেকে মায়ের জন্য কাপড় ধোয়ার সাবান কিনবে। মা বলে দিয়েছে, রাস্তায় সোজা হাঁটবি। পথে কারো সাথে উল্টা-পাল্টা করবি না। আব্দুল মাকে আশ্বস্ত করেছে-মা! আব্দুল ভাল হয়ে যাবে, তুমি ঠিক দেখে নিও! আব্দুলকে নিয়ে আর ভাবতে দেব না তোমায়।
হাতের কঞ্চিটাকে তালোয়ারে রূপ দিল আব্দুল। রাস্তার দু’পাশে অনিয়ন্ত্রিত বেড়ে ওঠা ঘাসের কচি মাথাগুলো কঞ্চির একেকটা কোপে ঘাসের শরীর থেকে আলাদা হচ্ছে আর আব্দুল তার কাল্পনার শত্রুগুলোর ধরাশায়ী অবস্থা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে।
আব্দুল তার কর্মকা- অব্যাহত রেখেই পথ চলছে। কখনো সে রাস্তার ও-ধারে কখনো এ-ধারে। হঠাৎ আব্দুলের চোখ পড়ল কাশেম আলির বড়ইগাছের দিকে।
রাস্তার পেটেই বাড়ি করেছেন কাশেম আলি। বড়ইগাছের একটা ডাল এসে রাস্তার উপর পড়েছে। বড় বড় পাকা বড়ই দেখে আব্দুলের জিবে পানি এসে গেল। ভাবে সে- একটা ঢিল মেরেই দেখি, দু’একটা পড়লে পড়তে পারে। আব্দুল কংক্রটের টকরো কুঁড়িয়ে নিয়ে ঢিল ছটুড়ল। ঢিল লক্ষ হারিয়ে গিয়ে পড়ল কাশেম আলির টিনের চালে। টিনের চাল এমনিতেই জংধরা। ঢিল পড়তেই টিনের একটা টুকরো ভেঙে গিয়ে পড়ল কাশেম আলির ছোটমেয়ের ভাতের প্লেটে। হঠাৎ কিছু পড়ায় ছোট্ট মেয়েটা ভয় পেয়ে বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে উঠল।
প্রায় বদমেজাজি কাশেম আলি ছিল কাঁচি দিয়ে মোচ কাটায়। মেয়ের চিৎকারে ভড়কে গিয়ে অজান্তেই লোকটা তার নাক কেঁটে ফেলল। রক্ত বেরোতে লাগল গলগল করে। নাক টিপে ধরে রক্ত আটকে রাখার চেষ্টা করছে কাশেম আলি। লোকটার চেহারা লাল হয়ে আছে রাগে। যত রাগ আর ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে ঢিলছোঁড়া আব্দুলের উপর। কাশেম আলি অসভ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
আব্দুল অনেক সময় নিয়ে কেঁদেছে। পিটুনিটা আজ একটু বেশিই চড়া ছিল। কাশেম আলি নালিশ দিতে এসে বলে গেছে- ছেলের হাড়গুড় ভেঙে দেব যদি আর কোনো দিন ঢিল ছুঁড়তে দেখি। মাকে শাসিয়ে গেছে- ছেলেকে গুটিয়ে রাইখো! এ ছেলে কখন কী আকাম কওে বসে কে জানে। পথেঘাটে ছেলেটা সোজা হয়ে চলতে পারে না। কার কিসে হাত দেবে, কার কী নষ্ট করবে এই চিন্তায় সে পথ চলে।
আব্দুলের মা কিছু বলতে পারেননি। পারার কথাও না। আব্দুলের জন্য তিনি অনেক মাথা নিচু করেছেন। কখনো বুক ভেঙে চৌচির হয়েছে। কখনো কখনো ঝাপসা চোখে প্রহরের পর প্রহর কেটেছে তার। বুক পিষে দীর্ঘশ্বাস বেরোত কখনো। ভাবতে ভাবতে তার দৃষ্টিটা কখনো আকাশের নীলে অথবা অন্য কোথাও হারিয়ে যেত। বিড় বিড় করে কী যেন বলতেন তিনি। খুব কাছে থাকলে হয়ত শোনা যেত অস্ফুট স্বরে তিনি বলছেনÑ ‘ইশ, যদি আমার আব্দুল ঠিক আমার মতো হত!’

