স্পর্ধিত দুটো স্বপ্ন

সংখ্যা:

ছোটবেলায় আমি কিছু অদ্ভুত কিসিমের স্বপ্ন দেখতাম। পাখির মতো দু’হাত ঝাপটাচ্ছি, আর ফরফর করে এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছি! পেছনে শত্রুরা ধাওয়া করছে। আমি উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছি: কখনো উঁচু কোনো গাছে, কখনো বা বড় বড় দালানে, ইট-কাঠের ঢাকায় সেই স্বপ্নেও কখনো কখনো গলার কাঁটা হয়ে এসেছিল ইলেকট্রিকের থাম আর তারগুলো। অদ্ভুতুরের ষোল আনা!

একসময় যখন স্বপ্নটা ভেঙে যেত, নিজেকে আবিষ্কার করতাম আমার সেই ছোট্ট বিছানায় গুটিশুটি হয়ে শুয়ে। তখন যেন স্বপ্নের সাথে ছোট্ট মনটাও ভেঙে যেত। এই ওড়াওড়ি তাহলে স্বপ্ন ছিল? আরও উড়তে মন চাইত। তাই আবার ঘুম লাগাতাম। যদি আবার সেই বিলাসী স্বপ্নটা দেখা যায়!

যেত না।

কোথায় যেন পড়েছিলাম- স্বপ্ন তো সেটাই যা মানুষকে ঘুমোতে দেয় না। ছেঁড়া কাথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার জন্য ঘুমিয়ে থাকলে তা শুধু স্বপ্নই রয়ে যাবে। তবে না-ঘুমিয়ে যদি কাজ করা হয়, তাহলে আল্লাহ চাইলে, স্বপ্ন একদিন বাস্তবও হতে পারে। আমার ঘুম নষ্টকারী দুটো স্বপ্ন আছে। যখন স্বপ্নগুলো মধুর যন্ত্রণা শুরু করে, তখন আর শুয়ে থাকতে পারি না। উঠে বসি। একটু একটু করে নিজের স্বপ্নটাকে বাস্তব, মূর্ত করার চেষ্টা করি। এরপর ক্লান্ত হয়ে একসময় ঘুমে ঢলে পড়ি। উড়ি!

আমি যখন প্রথম ইসলামে আসি, তখন কুরআনের অনুবাদ পড়তাম ইংরেজিতে। ২০১১ সালের কথা। সেসময় শুধু বাংলা অনুবাদ সম্বলিত বই বাজারে সহজলভ্য ছিল না। ৭ বছর বয়সে প্রথম কুরআন খতম দিই- তারপর আরও বহুবার খতম দিয়েছি। তবে কখনো বুঝে পড়া হয়নি। দীর্ঘ একটা সময় পর আল্লাহ যখন হেদায়েত দিলেন, তখন কুরআনের অনুবাদ পড়ে পড়ে ইসলামিক পড়াশোনার শুরু। আবিষ্কার করি সম্পূর্ণ ‘নতুন’ এক কুরআন। প্রথম স্বপ্নটার দানা বাঁধা শুরুও এ থেকে।

বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাভাষী হিসেবে যেকোনো বই বাংলাতে পড়তেই বেশি আরাম লাগে। বুঝতেও সহজ হয়। কিন্তু আমি যখন কুরআনের বাংলা অনুবাদগুলো হাতে নিলাম তখন খুব মর্মাহত হলাম। এরই মধ্যে ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা থেকে জেনেছি: কুরআনের ভাষার সৌন্দর্য আর সাহিত্যরস সম্পর্কে। দেখেছি এই কুরআন ‘লাইভ’ শুনে শুনে কত কাফের, কত মুশরিক মুসলিম হয়েছে। জায়গায় শুনে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছে আনমনে। কিন্তু সেই কুরআনের অনুবাদগুলোর এ কি হাল?

কঠিন কঠিন শব্দ। জটিল বাক্যগঠন। একটু পরপর থুবড়ে পড়ছি। ইংরেজি অনুবাদ যেভাবে তরতর করে পড়ে যেতে পেরেছি, বাংলায় সেভাবে পারছি না। আবার বিন্যাসগুলো চিরাচরিত বইয়ের মতো না। হয় এক লাইন এক লাইন করে দেওয়া। নয়তো পুরো পাতাজুড়ে গাদাগাদি করে শব্দের পর শব্দ দিয়ে ভরা। দুয়েকটা অনুবাদ প্যারা করে করে ভাগ করা, কিন্তু সেই প্যারা পুরো একটা রুকুজুড়ে। চোখ ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। বই পড়ার মজা পাওয়া যাচ্ছে না। বুঝা তো পরে, মনোযোগও থাকছে না।

সেই পিয়াস থেকে জন্ম আমার প্রথম স্বপ্নের। আল-কুরআনের সহজ, সুন্দর ও সাহিত্যম-িত ভাবানুবাদের। যে-অনুবাদ পড়ে মানুষ একই সাথে সাহিত্যের স্বাদ পাবে। বই পড়ার মজা পাবে। আবার কুরআনের সৌন্দর্যে অভিভূত হবে। এজন্য অল্প অল্প করে ধীর লয়ে নিজেকে গুছিয়ে এনেছি প্রায়। আরবি শিখেছি, নিয়মিত বিভিন্ন অনুবাদ ও লেখালেখি চর্চা করে যাচ্ছি। গতবছর পরীক্ষামূলকভাবে শেষ জুজের (পারা) কিছু সুরার ভাবানুবাদ করেছিও। অনেকে তারিফ করেছেন। ঠিক যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই চেষ্টা, সেটা যে প্রায় অনেকটাই সফল হচ্ছে তা তাঁদের ফিডব্যাক থেকে বুঝেছি। সব প্রশংসা আল্লাহর। তিনি চাইলে শিগগিরই কাজটা পুরোদমে শুরু করব।

আমার দ্বিতীয় স্বপ্নটা আরেকটু চ্যালেঞ্জিং। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের জীবনীটাকে ঠিক কাহিনি বিন্যাসের মতো সাজানো। যেন পাঠক পড়তে গিয়ে কল্পনার টাইম মেশিনে করে চলে যান ১৪ শ’ বছর আগের আরবে। যেন নিজের চোখে দেখতে পান সবকিছু। যেন ‎নবিজির হাসি, ‎নবিজির কান্না, ‎নবিজির রাগ-সব নিজের মনচোখে দেখতে পারেন। ঠিক ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির জগতে যেভাবে হয়।

নবিজিকে নিয়ে এ পর্যন্ত বাংলায় মৌলিক বা অনূদিত যত সিরাত আছে, সবগুলোই একটা নির্দিষ্ট ধাঁচের। সেখানে কাহিনি আছে, বিশ্লেষণ আছে। ফাঁকে ফাঁকে কুরআনের আয়াত আর হাদিসের পাঠ আছে। এ ধরনের লেখনী পাঠকের পড়ার গতিকে থামিয়ে দেয়। কাহিনির ধারাবাহিক বিন্যাস না থাকাতে একটা ফিকশন পড়ে যে স্বাদ সাধারণ পাঠক পান, তা পান না। অথচ খেয়াল করলে দেখা যায়, আমাদের নবিজির জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অ্যাডভেঞ্চার। রোমাঞ্চ। ট্র্যাজেডি। লড়াই। বিজয়। মানবজীবনের ওঠা-নামা। সাসপেন্স। একটা সফল উপন্যাসের জন্য একজন লেখক যা যা তৈরি করেন, তার সবই বিদ্যমান তাঁর গোটা জীবনীতে। অথচ তারপরও আমাদের কেউ তাঁর জীবনটাকে সেভাবে উপস্থিত করতে পারেননি।

একথা তো অস্বীকার করার জো নেই, বর্তমান সময়টা ভিজুয়াল মিডিয়ার যুগ। এখন মানুষ পড়ার চেয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করে। অথচ বেশ কিছু শরয়ি সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা চাইলেও নবিজির জীবনকে সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব না ভিজুয়াল মিডিয়া ব্যবহার করে। আর ভিজুয়াল মিডিয়ারও কিছু বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে যা বইয়ের ভাষায় নেই। আমি যখন বলব, ‘এই তো সেই নবিজি, যিনি ওয়ারাকার মুখে যখন শুনেছিলেন, তাঁকে তাঁর নিজের পরিচিত লোকেরা, আপনজনেরা সখেদে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে, তখন বিশ্বাস করতে পারেননি। অথচ আজ, এই নির্জন বালুতটে, আগুনগরম সূর্য আর উত্তপ্ত বালির উনুন পার হচ্ছেন- সঙ্গী সবসময়ের বন্ধু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। সত্যের পথে ডেকে ডেকে নিজের জীবনকে যিনি তুচ্ছ করেছিলেন, যাদের ভালোর জন্য দিনরাত অশ্রু আর ঘাম ঝরিয়েছেন, কী সুন্দর প্রতিদান তাদের তরফ থেকে!’ -এই বর্ণনা কীভাবে চিত্রিত রূপ পাবে? কারণ, নবিজিকে তো আমরা মরুভূমি পার হতে দেখাতে পারব না। আর ভিজুয়াল মিডিয়ার আসল কাজই হলো দেখানো। তাই সুন্দর সাহিত্যিক বর্ণনাই সেরা আশ্রয়। লেখক লিখে যাবেন সাদা জমিনের কালো হরফে। আর পাঠক কল্পনা করে নেবেন তার মানসপটে।

সন্দেহ নেই খুব চ্যালেঞ্জিং আর স্পর্ধিত দুটো স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখলে তো এমনই দেখতে হয়। ‎নবিজি যেদিন ওহি পাওয়া শুরু করেন, সেদিন তিনি কি স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন : একদিন এই ইসলাম মক্কার অলিগলি ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে সারা পৃথিবীর কোণে কোণে? হেরা গুহার সেদিনের সেই পাঁচ আয়াত বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে সাফ করবে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়? ইসলাম একদিন বিজয়ী হবেই-এই ভরসাবাণী যদি আল্লাহর কাছ থেকে তিনি না পেতেন, মনের গহীনে খোদাই করে না নিতেন, তাহলে এত উল্টো স্রোত, এত খানাখন্দ আর পাহাড়সম প্রতিকূলতা মাড়িয়ে দিনের পর দিন এভাবে লেগে থাকতে পারতেন না। দ্বারে দ্বারে যেয়ে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও দীন প্রচার করে যেতেন না। বলে যেতেন না-‘যেখানেই দিন আছে, রাত আছে, সেখানেই এই দীন পৌঁছে যাবে।’

আমিও ঠিক সেভাবে আল্লাহর ভরসা নিয়ে আমার স্বপ্ন দুটোকে পূরণ করতে চাই। বাস্তব রূপ দিতে চাই। পাখি যদি প্রতিদিন খালি পেটে বের হয়ে সন্ধ্যায় ভরা পেটে ঘরে ফিরতে পারে স্রেফ তাওয়াক্কুল করে, তাহলে আমি সৃষ্টির সেরাদের একজন হয়ে কেন পারব না?

আল্লাহ সহায়!

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১