নবপ্রকাশের পাঠক-আদৃত বই ‘সুলতান কাহিনি’। বইটি যখনই আমি হাতে নিয়েছি, চলে গিয়েছি সুলতানি আমলে। উসমানি সাম্রাজ্যে। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ইস্তাম্বুলের পাথুরে পথঘাট। তোপকাপি প্রাসাদ। হারেমের অভ্যন্তর। মনে হয়েছে, এই তো দেখতে পাচ্ছি সুলতানের কানের কাছে নিচু স্বরে পরামর্শ দিচ্ছেন সদরে আজম। দূত মারফত ফতওয়া প্রেরণ করছেন শাইখুল ইসলাম। সুলতানের সামনে বসে আছে ভীত দরবারের সন্ত্রস্ত সভাসদ।
বইটি পড়ার সময় আমি হয়ে উঠি সুলতানি আমলের সেই মুসাফির, যার সামনে ঘটতে থাকে একের পর এক সুলতানের পরিবর্তন। সালতানাতের সিংহাসন দখলে ভাইয়ের হাতে হয় ভাই খুন! ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পিতার আদেশে হয় পুত্রের হত্যা।
আমি বিস্ময়-ভরা দৃষ্টিতে দেখি, নিজ সাম্রাজ্যের বিচারের কাঠগড়ায় অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়েছেন সুলতান। ভরা দরবারে সভাসদদের সামনে মাথা উঁচু করে সুলতানের প্রতিবাদ করছেন শাইখুল ইসলাম। ইহুদির সামান্য কুঁড়েঘরের জায়গা মসজিদের জন্য ক্রয় করতে বিনয়ের সাথে মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ প্রস্তাব করছেন স্বয়ং সুলতান।
আমি দেখি, অবাক হই। মুসলিম শাসকের মহানুভবতা দেখে গর্বিত হই। আবার নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখে হই মর্মাহত।
একসময় দুই মলাট বন্ধ করে ফেলি। তখন ফিরে আসি আবার এই আমলে। বুঝতে পারি, আমি শুধু সেই আমলের মুসাফির। আমার সুলতানি আমলের মুসাফিরি জিন্দেগির সময়সীমা ততক্ষণ, যতক্ষণ দুই মলাট খুলে কালো অক্ষরে ডুবে থাকবে মন। মাত্র আড়াইশ পৃষ্ঠায় দীর্ঘ ৬২৪ বছরের ইতিহাস এতোটা জীবন্ত হতে পারে তা আমি কখনোই জানতে পারতাম না এই গ্রন্থটি না পড়লে।
ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, মুসলিম বিশ্বের সর্বশেষ ধারাবাহিক শাসনব্যবস্থা হলো উসমানি খেলাফত। এই কারণে উসমানি সাম্রাজ্যকে জানার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু মাত্র নয় দশক আগে সমাপ্ত হওয়া এই সালতানাতের ইতিহাসগ্রন্থ বাংলাভাষায় নেই বললেই চলে। তাই ছাতি-ফাটা পিপাসা থাকা সত্ত্বেও শুকনো মুখেই অতিবাহিত হচ্ছিল দিনরাত।
অবশেষে নবপ্রকাশ হাতে এনে দিলো ৬২৪ বছর ধরে তিন মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস ও সুলতানদের জীবন-সংগ্রামের ধারাবাহিক ফিরিস্তি ‘সুলতান কাহিনি’। বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে উসমানি সাম্রাজ্যের পরিধি ও ব্যাপ্তি নিয়ে। প্রকাশ পেয়েছে সেকালের সামাজিক ও নাগরিক জীবনের নানারকম ছবি। তুলে ধরা হয়েছে সুলতানদের ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বৈচিত্রময় বিভিন্ন ঘটনা। এ ছাড়াও বর্ণনা করা হয়েছে উসমানি সাম্রাজ্যের সুদীর্ঘ ইতিহাস থেকে চুম্বক-অংশ সমূহ। যা এই বই পাঠের স্বাদকে করেছে অতুলনীয়।
লেখক তামীম রায়হান সহজ সাবলীল ভাষায় এবং আকর্ষণীয় বর্ণনায় এমনসব তথ্য ও ঘটনা বইটিতে লিপিবদ্ধ করেছেন, যেগুলো আমার মুখে কখনো হাসি ফুটিয়েছে, আবার কখনো বুক চিড়ে বের করেছে দীর্ঘশ্বাস।
বইটি পড়ে আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে উসমানি সাম্রাজ্যের চরম উত্থানের গল্প এবং ক্ষমতা ও শক্তির শীর্ষচূড়া থেকে পতনের কারণ।
লেখক রাজ্য দখল ও যুদ্ধবিগ্রহের রক্তাক্ত ইতিহাস এড়িয়ে সুলতানদের জীবন ও কর্ম এবং তাঁদের বৈচিত্রময় চরিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ঘটনা পাঠককে জানাতে চেষ্টা করেছেন।
আমার মনে হয়েছে লেখকের প্রচেষ্টা অনেকটাই সফল হয়েছে। বইটি পড়ে আমি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উসমানি সাম্রাজ্য সম্পর্কে একটি নির্মোহ চিত্র পেয়েছি। যা আমার পাঠক-হৃদয়ের পিপাসা মেটালেও অনুসন্ধানী মনের তৃষ্ণাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাভাষী ইতিহাস পাঠকদের জন্য ‘সুলতান কাহিনি’ এক অসামান্য উপহার। গ্রন্থটি প্রকাশ করায় অসংখ্য কৃতজ্ঞতা জানাই নবপ্রকাশ পরিবারকে।
নবপ্রকাশের পঞ্চম বর্ষপূর্তিতে জানাই অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা। এই পাঁচ বছরে অনেকটাই ভালোবেসে ফেলেছি নবপ্রকাশকে। সেই ভালোবাসার দাবি থেকেই আবদার জানাব, তাঁরা যেন ‘সুলতান কাহিনি’র মতো বই আরও উপহার দেন আমাদের। এই আবদারটা বিশেষ করে আমার পক্ষ থেকে। কারণ আমি চাই, আবার কোনো না কোনো সালতানাতের সুলতানি মুসাফির হতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ, মিরপুর ১, দারুস সালাম, ঢাকা
ডিসেম্বর 2019

