রহস্যঘেরা এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকবার অসামান্য প্রচেষ্টার পাশাপাশি আমার কত কিছু যে ইচ্ছে করে, তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে! যেমন শঙ্খচিল, অথবা কৃষ্ণচন্দন কিংবা অনেকের মাঝে এক অদ্বিতীয় আমাকে খোঁজার ব্যাকুলতা ঘিরে রাখে সময়ে সময়ে। কেবলই কামনাপরাগ জ্বলজ্বল করে আমার চোখে-মুখে। দিনশেষে প্রাপ্তির পেয়ালা শুধুই শূন্য। খড়খড়ে মাঠ। উদ্ভিদহীন মরুর প্রকাণ্ড বালুকতাময় ধোঁয়াশা।
আমার ইচ্ছে করে কবিতার প্যাপিরাস যুদ্ধ যুদ্ধ মাঠে ঘটাতে মহাবিপ্লব। দহন। জ্বলন। ফুঁসে ওঠা তারুণ্যের নীরব আন্দোলন। কবিতার লাগাম ধরে যেন তিরতির করে বেয়ে ওঠে কলুষিত জাতিরাষ্ট্র। নিদ্রাবেশে নয়, এ স্বপ্ন আমার সকালের রৌদ্রের ঝাঁজে। বিকালের নরম পরিবেশে। মেলে দুটো চোখ। আমার প্রায়শ এমন মনে হয়, সংকটগ্রস্ত পৃথিবীতে জ্বালাতে শান্তির মশাল। ওড়াতে শুদ্ধতার পতাকা। তবে বর্ণের নিবদ্ধতা আর সকল সীমাবদ্ধতার অবসান ঘটিয়ে প্রতিটি কবিতার নির্মাতা হয়ে উঠুক মশালবাহক। তারুণ্যনির্ভর এ আন্দোলনে ধ্বনিত হোক বিজয়ের গান। হাত ধরে কবির। হৃদয়ে গেঁথে কবিতা।
আমাকে সত্যিই অলীক এসব কল্পনা বারে বারে আবেগতাড়িত করে তোলে। আমাকে ভাসায় সে নদে যেখানে কূলের দেখা খুব থেকে খুব দূরে। তাই আমার ছোট্ট কবিমনকে আমি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলি। একান্ত সন্তর্পণে খুব নির্জনে আমি মত্ত হই কবিতার নির্মাণে। এ নির্মাণশৈলী কেউ না জানুক। আর কেউ না দেখুক।
ভাবনার অভূতপূর্ব লাল লাল কালিমা আর চোখ বিস্মিতকরণ, এমনতর ভয়াবহতার মধ্যিখানে যখন দাঁড়িয়ে খুব একলা আমি, তখনি আসে সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাইয়ের নরম সুরে এক সবুজ আবদার। এই যে গুছিয়ে কিংবা খুব অগোছালো এ জীবনে তুই কী হতে চাস যিয়াদ? সুচারু ব্যঞ্জনায়, সমাত্রিক আল্পনায় গড়ে তোলা এক ঝকঝকে গদ্য। এমন নিদারুণ সুর শোনার পর আমাকে ভাবিত করে তোলে এসব। আমি কী হবো? কিংবা ভাবনার বিস্তীর্ণ এক বিরাট আঙিনায় আমার চাওয়ার নেই যে শেষ, সেসব আমি কী করে সামান্য কতক হরফে লিখে ফেলব?
আমার কত কিছু ভালো লাগে। আমার ভালো লাগে যখন আমি আমার সুবিশাল গ্রন্থাগারে দিনে-রাতে বসে থাকি খুব নিমগ্নতা মিশিয়ে। পড়ি অনেক বই। শেলফে গুছিয়ে রাখা এ সমাহার দেখে আমি হারিয়ে যাই ভাবনার খুব গভীরে। এই যে বিস্তীর্ণ সবুজ এক প্রান্তর, যেখানে মধুমক্ষিকার গুঞ্জন। জ্ঞানের সমাহার। আমি হুট করে লুফে নিতে চাই। আমার অনেক ইচ্ছে করে। আমার ইচ্ছে করে জ্ঞানী হতে। আনতে পৃথিবীকে এক হাতের মুঠোয়। আমি তো জানি জ্ঞানের ঊর্ধ্বে কোনো কিছু নেই। আমার সমস্তটা জুড়ে আমি রাঙাতে চাই অসীম জ্ঞানের সমাহার দিয়ে। গেঁথে যেতে চাই হৃদয়ে হৃদয়ে। মম অন্তরে।
জ্ঞানের পরিধিরেখা করতে বিস্তর, আমি ছুটে যেতে চাই অনেক অনেক দূরে। বিদেশ বিভূঁইয়ে আমি দেশান্তরের নীল ছুঁইবো। ওখানে আমার জন্য মিশরের বৈশ্বিক বিদ্যালয় অপেক্ষারত। অপেক্ষারত জ্ঞানভাণ্ডার। আমার জন্য, ঠিক আমারই জন্যে, আমার সহপাঠীদের হাতে মিশরীয় মুদ্রার মহাভার। আমি এই কসম খোদার, স্বদেশের বুকে খুব মায়াকান্নার স্রোতে হাঁকাব। তাই আমাকে ছুটতে হবে ভেবে এখনও আমি হাসফাস করি প্রায়শ। অনিয়ন্ত্রিত আমি কিভাবে সামাল দেব?
আখেরে আমার মনে হয়, যত অবক্ষয় আর যত সংকট চিরসক্রিয় হয়ে জগতে ঘুরছে আর বাড়ছে দিন দিন। মরছে মানুষ। হাহাকার উঠছে দিগ্বিদিক। সমস্ত পৃথিবীজুড়ে অপশাসন আর সত্যের চরম বিরুদ্ধাচার করে ঠাঁই পেয়ে যাচ্ছে মানুষখেকো পিশাচেরা। সবকিছুর অবসান হতে প্রয়োজন আমাকেই। আমিই পারব শান্তির কেতন ওড়াতে। আমাকে আর দেখতে হবে না কাঁটাতারের কিনারায় দাঁড়িয়ে শিশুর আর্তচিৎকার। বিতাড়িত হবে না মুসলমানের সন্তানেরা ধর্মের প্রতি মমতাবোধের জন্যে। তাই আমি চাই জেগে উঠুক আমার অন্তঃসত্তা। নিমগ্ন হোক জ্ঞানের পরম গভীরতায়। আমি জানি তারুণ্যের এ বিপ্লব একদিন আকাশ ছুঁতে সম্ভব হবে। বিপ্লব আর বিদ্রোহের নল ধরে একদিন বেজে উঠবে এদিক ওদিক উম্মতে মুহাম্মদির জয়গান। তারুণ্যের চেতনাগুলো উঠুক জেগে। দোলায়িত হোক মম অন্তরে।

