আজ শুক্রবার। সাপ্তাহিক ঈদের দিন। আমলেরও দিন। এমন পবিত্র দিনে কারো মন খারাপ থাকে কি?
বাবা বলতেন- শুক্রবার হলো পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার দিন। এই দিনটি পরিচ্ছন্ন শরীর আর পবিত্র হৃদয় নিয়ে সবার কাটানো উচিত।
আমি তখন প্রশ্ন করে বসতাম- শরীর পরিস্কার রাখার ব্যাপারটি তো বুঝা গেলো, কিন্তু হৃদয় পবিত্র করার উপায় কী? আবার উপায় জানা থাকলেও পবিত্র হলো কি না, তা বুঝবো কিভাবে? হৃদয় তো দেখা যায় না!
আমার কথা শুনে বাবা হাসতেন। বলতেন- মা রে, হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, চোগলখোরি, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি খারাপ স্বভাব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমেই হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জিত হয়।
আমি ছেলেমানুষি স্বরে আবারও প্রশ্ন করতাম- তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু হৃদয়টা পবিত্র হলো কি না, হলেও কতোটা হলো, বুঝবো কী করে?
বাবা তার স্বভাবসুলভ মুচকি হাসিটা আগের মতোই ঠোঁটে ধরে রেখে উত্তর দিতেন- শরীরে রোগ হলে বুঝিস তো? নাকি সেটাও বুঝিস না?
বিজ্ঞের মতো মাথা দুলিয়ে বলতাম- হুম, বুঝি তো! কিন্তু এর মধ্যে আবার রোগকে টেনে আনলে কেন?
বাবা এবার একটু গম্ভীর গলায় বলতেন- যা জিজ্ঞেস করি উত্তর দিবি।
: ঠিক আছে। তোমার যা কিছু জিজ্ঞেস করার, করো।
: আচ্ছা বল তো, অসুস্থ অবস্থায় তোর কেমন লাগে? আবার সুস্থ হবার পর বোধটা কেমন হয়?
: অসুস্থ হলে তো কিছুই ভালো লাগে না। বিরক্তিকর একটা অস্থিরতার ভেতর সময় কাটে। আর সুস্থাবস্থায় হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে সব কাজে স্বতঃস্ফূর্ত ভাব আসে, ভালো লাগে।
বাবা এবার রাজ্যজয়ের হাসি নিয়ে বলতেন- ঠিক এভাবেই পবিত্র হৃদয় নিয়ে আল্লাহর সব কাজে আনন্দ পাওয়া যায়। আমল করতে ভালো লাগে, আমলে স্বতঃস্ফূর্ততা আসে। যার হৃদয় যতো বেশি পবিত্র সে আমলে ততোটাই অগ্রগামী, যার হৃদয় মোটামুটি পরিস্কার সে আমলেও মোটামুটি আর যে মানুষের অন্তর একেবারেই অপবিত্র, পাপের রোগ-জীবাণুতে ভরপুর, সে কখনো সৎকাজে আগ্রহী হতে পারে না। এভাবেই আমলের বিচারে হৃদয়ের পবিত্রতা-অপবিত্রতা নির্ণয় করা যায়।
২.
নীরব গুরুগম্ভীর পরিবেশে টিকটিকির ‘ঠিক ঠিক’ আওয়াজে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পাই। এ কি, চোখ দিয়ে জল ঝরছে কেন!
দু’বছর ধরে প্রায়ই এমন হচ্ছে। মাঝে মাঝেই আনমনা হয়ে যাই, অশ্রুরা কখন যে এসে চোখে ভিড় জমায়, কপোল বেয়ে ঝরতে থাকে অবিরাম ধারায়- বুঝতে পারি না।
এমনটা কেন হয়? কেন চারপাশে এতো শূন্যতা! তুমি পাশে নেই বলেই কি বাবা?
দুই বছর হলো বাবাকে হারিয়েছি। শ্রাবণের এক বৃষ্টিঝরা দিনের বিষণ্ন বিকেলে বাবাটা চলে গেলো না ফেরার দেশে। সেদিনও ছিলো শুক্রবার। সেই তো শুরু, নিজেকে ভালো রাখার আয়োজনে প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সফলও বলা যায়। তবে আশ্চর্য হই এ কথা ভেবে, বাবা চলে যাওয়ার কয়েক বছর আগ থেকেই শুক্রবার বিকেলে মনটা বিষণ্ন হয়ে যেতো! সারাদিন যতো আনন্দেই কাটুক, বিকেলটা হতো বিষণ্নতায় ছাওয়া। (তখনকার ডায়েরিতে একথা লিখেও রেখেছিলাম!) ভাবতাম, কেন এমন হয়! কারণহীন এমন বিষণœতায় প্রায়ই অবাক হয়ে যেতাম। দু’বছর পর কারণটা খুঁজে পেলাম। যার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না। অপ্রস্তুত সে সময়কে আজ ভীষণ প্রস্তুত মনে হয়। ভীষণ।
মাদরাসা খাতুনে জান্নাত, বগুড়া
