মানুষের গল্প

সংখ্যা:

মাজু মিয়ার মন খারাপ। গতকাল থেকে কুকুরটা কিছুই খাচ্ছে না। মুখের সামনে আধখাওয়া এক প্যাকেট বিরিয়ানি এখনো গন্ধ ছড়াচ্ছে। ডাস্টবিন ঘেটে কষ্ট করে নিয়ে আসা বিরিয়ানির প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে আছেন মাজু মিয়া। ইচ্ছে করছে চেখে দেখার। বাসি হওয়াটা নিশ্চিত। তাই মুখে দিলেন না। বুঝতে পারছেন না কী করবেন। নতুন বিরিয়ানি আনবেন নাকি ডাক্তারের দ্বারস্থ হবেন। মাজু মিয়া উঠে দাঁড়ালেন। একজন ডাক্তারকে খবর দিতেই হবে।

রঙধনু নীড়ের দারোয়ান মাজু মিয়া। বয়েসের দিক থেকে তিনি যথেষ্ট বৃদ্ধ। এই বয়েসে দারোয়ানের চাকরি মানায় না। এই বয়েসে আসলে কোনো চাকরিই মানায় না। নিয়তি তবু তাকে দারোয়ান বানিয়ে রেখেছে। গেটের পাশে ছোট্ট একটা টুল রাখা। মাজু মিয়ার দিন কাটে টুলে বসে। কেউ এলে অথবা বের হলে গেইটটা খুলে দিতে হয় কেবল। এছাড়া তেমন কোনো কাজ নেই তার।

ইদানীং একটা কাজ জুটেছে মাজু মিয়ার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি টুলে বসা ছিলেন। দৃষ্টি তার রাস্তার দিকে। পরিচিত দৃশ্য। প্রতিদিনই দেখতে হয়। খারাপ লাগে না তার। কতো রঙের, কতো ঢঙের মানুষ যে চোখে পড়ে! মাঝে মধ্যে বিষণ্ন চোখে তাকান। তখন মন চলে যায় অতীতে। অশ্রুতে চোখ ভর্তি হয়।

মাজু মিয়ার চোখ সেদিনও ঝাপসা ছিলো। মনটা ছিলো অতীতে। হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়লো। মাজু মিয়া তাকিয়ে আছেন রাস্তায়। একটা প্রাইভেট কার প্রচণ্ড গতিতে ধাক্কা দিলো একটা কুকুরকে। রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে কুকুরটা। চোখ মুছে দৌড় দিলেন মাজু মিয়া। কুকুরটা তখন তড়পাচ্ছে। বড় মায়া হলো মাজু মিয়ার। কুকুরটাকে কোলে নিলেন। মানুষের আদরের সাথে রাস্তার কুকুরের পরিচয় থাকার কথা না, কিন্তু এই কুকুরটা মাজু মিয়ার আদর বুঝতে পারলো। কুকুরটাকে নিয়ে বাড়ির পাশের ঝুপে এলেন মাজু মিয়া। কুকুরটা গোঙাচ্ছে। মাজু মিয়া কুকুরটাকে একবার জড়িয়ে ধরলেন পরম আদরে। সাজু যখন ছোটো ছিলো, ঠিক এভাবেই জড়িয়ে ধরতেন তিনি। এরপর কপালের ঠিক মাঝখানটায় লম্বা করে চুমু খেতেন। অতীত আবার মনে পড়ে তার। চোখটা ঝাপসা হয়ে ওঠে। ছেলেটা মারা গিয়েছিলো পানিতে ডুবে। বেঁচে থাকলে কি মাজু মিয়াকে বৃদ্ধ বয়েসে দারোয়ানগিরি করতে হতো! করুণ সুরের ঘেউঘেউয়ে ভাবনায় ছেদ পড়ে মাজু মিয়ার। কুকুরটা কাঁদছে, স্পষ্ট বুঝতে পারছেন তিনি। কিন্তু কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা লক্ষ করছিলো জাবেদ। বাড়িওয়ালার একমাত্র ছেলে। মাজু মিয়াকে প্রচুর সম্মান দেখায়। এই বয়েসি ছেলেরা এতো অমায়িক হয় না। বাড়ির কাজের লোকের সাথে তো প্রশ্নই ওঠে না। জাবেদ অন্যদের থেকে যথেষ্ট আলাদা। মাজু মিয়াকে সে দাদা ডাকে।

‘দাদা!’ ডাক শুনে মাজু মিয়া পেছনে তাকান। ভরসার নিঃশ্বাস ছাড়েন একবার। জাবেদের মুখেও অভয়ের হাসি। একখ- কাপড় এগিয়ে দেয় সে মাজু মিয়ার দিকে- ‘এই কাপড় দিয়ে কুকুরের পা’টা ভালোমতো ব্যান্ডেজ করেন। আমি পানি নিয়ে আসি।’

মাজু মিয়া পরম যত্নে পা ব্যান্ডেজ করে দেন। জাবেদ পানি নিয়ে আসে। মাজু মিয়া কুকুরটাকে পানি খাওয়ান। দেখা গেলো কুকুরটা দাঁড়াতে পারছে না। মাজু মিয়ার প্রচণ্ড দয়া হয়। কুকুরটার জন্য গ্যারেজের কোণায় পড়ে থাকা টিন দিয়ে ঝুপের পাশে ঘর বানান। জাবেদ সকালবেলা ভার্সিটি যাবার আগে প্রতিদিনই কুকুরটার জন্য খাবার দিয়ে যায়। সেই খাবার রাত পর্যন্ত চলে।

সেদিন জাবেদ বাসায় নেই। বন্ধুদের সাথে ট্যুরে গেছে দু’দিন হলো। মাজু মিয়া কুকুরটার জন্য খাবার নিয়ে এলেন ডাস্টবিন ঘেটে। সকালে দিয়েছেন, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও কিছুই মুখে দেয়নি কুকুরটা। ভালো জিনিস খেয়ে খেয়ে বজ্জাতটা লাই পেয়ে গেছে। মাজু মিয়া চিন্তিত। কী করা যায়! না খেলে যে কুকুরটা নির্ঘাত মারা যাবে!

মাজু মিয়া হার্টের রোগী। নিয়মিত অষুধ খেতে হয়। রাতের অষুধ নেই। পকেটে অষুধ কেনার জন্য একশো’টা টাকা আছে। সাত-পাঁচ কিছু না ভেবে মাজু মিয়া একশো’ টাকা দিয়ে একটা বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে আসেন। বজ্জাত কুকুরটা নইলে যে না খেয়ে মরবে!

 

সৃজনঘর, মৌলভীবাজার

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১