কাশ্মীরিদের জীবনযন্ত্রণা : প্রিয়জন যখন কারারুদ্ধ

সংখ্যা:

 

আগ্রার কেন্দ্রীয় কারাগারের বারান্দায় স্টিলের টুলে বসে আছেন ৭০ বছর বয়সী হামিদা বেগম। ভারতের জবর দখলে থাকা কাশ্মীরের হিমালয় অঞ্চল থেকে ৯৬৫ কিলোমিটার (৬০০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছেন তিনি। মুখের প্রতিটি ভাঁজে ক্লান্তির করুণ দাগ। তবুও ভেঙে পড়ছেন না, সটান বসে আছেন। এত দূর শহরে এসে হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল, তবে তাঁরই মতো আরেক হতভাগ্য গওহার মাল্লার সঙ্গে দেখা হওয়াতে ভাগ্যিস বেঁচে গেছেন। এখানে এসে দেখেন আরও অনেকেই বসে আছে মনমরা হয়ে, অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে তিক্ত হয়ে। তাঁরা সবাই এসেছেন কাশ্মীরে আটক হওয়া তাদের আত্মীয়-স্বজনদের দেখতে। হামিদা বেগম এসেছেন তাঁর ছেলেকে দেখতে।

২০ বছরের এক তরুণ হামিদা বেগমের সামনে একটি পানির বোতল এগিয়ে ধরল। হামিদা বেগম পানিটা হাতে নিলে তরুণটি বলল, নিরাশ হবেন না। আপনি একা নন। ছেলের দেখা অবশ্যই পাবেন। হামিদা বেগম আকাশের দিকে হাত তুলে বললেন, আল্লাহ আমাদের ধৈর্য দিন।

হামিদা বেগমের বড্ড মনে পড়ে, সেই কারাগারের বারান্দায় বসে থেকে, গত ৫ আগস্টের একটি ভয়কাতর সকালের কথা। ভারতীয় সেনারা ঘরে এসে টানতে টানতে নিয়ে গেল ছেলেকে। ছেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। টানা দশদিন কাশ্মীরের বিভিন্ন কারাগারে দৌড়ালেন, এমনকি পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কারাগারগুলোতেও। চোখের সামনে থেকে এমন নির্দয়ভাবে টেনে নিয়ে গেলো, এখন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার মনে তখন ঝড় বইছে। মাঝেমধ্যে ছেলের শহিদ হয়ে যাওয়ার কল্পনাও দানা বাঁধছে। ঠিক এমন সময় খবর নিয়ে এল এক আগন্তুক, ‘আপনার ছেলে আগ্রার জেলে আছে।’

ছেলেকে দেখার জন্য ৬০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন। অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। তাঁর ডাক পড়ল ভেতরে। ১৫-২০ মিনিট পর ভেতর থেকে বাইরে এসে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলেন হামিদা বেগম। সুখের আবরণে কেমন মুখের ক্লান্তির দাগ মুছে গেছে। তিনি বললেন, ‘আমি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। আমার ছেলেকে যখন দেখলাম—আমার মনে হলো আজ আমার ঈদ। আমি তো একজন মা। কতদিন পর দেখলাম আমার ছেলেটাকে।’

 

দুই

হামিদা বেগম যাঁর সাহায্যে পথ চিনে এসেছেন, সেই গওহার মাল্লাও পরিবার নিয়ে এসেছেন কেন্দ্রীয় কারাগারে বোন-জামাই আমির পারভেজকে দেখতে। ৬ আগস্ট সকালে তাঁকে ভারতীয় সেনারা ধরে নিয়ে যায়। এতদিন কাশ্মীরের বিভিন্ন কারাগারে আটকে রাখার পর এখন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে কাশ্মীরের বাইরে আগ্রায়।

এক হাজার ডলার ঋণ করে তিনি বোন-জামাইকে দেখতে এসেছেন। বোন-জামাইকে দেখে যখন রুম থেকে বেরোলেন, কী অদ্ভুত এক প্রশান্তি খেলা করছিল তাঁর মুখের চাহনিতে। আবেগ-উদ্বেলিত কণ্ঠে তিনিও বললেন, ‘তাকে দেখার পর আমার মনে হয়েছে পুরো পৃথিবী হাতের মুঠোয় পেয়েছি। টাকা গেছে যাক।’

আমির পারভেজের স্ত্রী মরিয়ম রসূল স্বামীর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কান্নাভেজা কণ্ঠেই বললেন, ‘প্রচণ্ড গরমের কারণে তাঁর মুখ ফুলে গেছে। আমরা একে অপরকে জড়িয়ে কান্না করেছি। এই গুমোট পরিবেশে তাঁকে যদি বেশিদিন রাখা হয়, তাহলে তাঁকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে।’ মরিয়মের শ্বাশুড়ি আচল দিয়ে বৌয়ের চোখের জল মুছে দিচ্ছেন। এদিকে মরিয়ম তাঁর উষ্ণ মমতার বুকে জড়িয়ে রেখেছেন তাঁর পাঁচ বছরের ছেলেকে। সে হয়তো ঠিক বুঝতে পারছে না তাঁর মায়ের যন্ত্রণাদগ্ধ কান্নার কারণ।

 

তিন

আশরাফ মালেকের হাতে কিছু ডকুমেন্টস। তিনি কারাগারের এখানে-সেখানে দৌড়াদৌড়ি করছেন। তাঁর ছেলে আাসিফ আশরাফ আগ্রার এই কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক। আগস্টের সেই থমথমে সময়ে তিনটি গুলি বিদ্ধ হয় আসিফের পেটে। কেবল আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে গেছে। কিন্তু এটাকে বেঁচে যাওয়া বলে? হাসপাতালের বেড থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে। বুলেটের ক্ষত এখনো সারেনি যার, তাকেও জেলে পুরে দিয়েছে ভারত। মালেকের প্রশ্ন—‘আর কোনো দেশ এতটা নৃশংসতা দেখিয়েছে?’

 

চার

গত ৫ আগস্ট ২০১৯ তারিখে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার দেশটির জবর দখলে থাকা জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা সম্বলিত ৩৭০ ধারা বাতিল করে দেয়। সেই সঙ্গে কাশ্মীরি জনগণের বিক্ষোভ দমাতে বন্ধ করে দেয় কাশ্মীরের মোবাইল-ইন্টারনেট পরিষেবাসহ যাবতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস নিউজ অ্যাজেন্সির এক প্রতিবেদন মতে বিশেষ মর্যাদা বাতিলের এক মাসের মাথায় চার সহস্রাধিক কাশ্মীরিকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় হানাদার বাহিনী। এদের মধ্যে অধিকাংশই যুবক। ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার যুবককে মুক্তি দেয়া হয়েছে। কিন্তু আড়াইশ যুবককে কাশ্মীরের বাইরে বিভিন্ন কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জননিরাপত্তা আইনে তিনশ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এতে তারা দুই বছর বিনা বিচারে আটক থাকবে কারাগারে।

বহু বছর ধরেই মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি জনগণকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং অযৌক্তিকভাবে গ্রেপ্তারের অভিযোগ করে আসছে। কিন্তু বরাবরই এই অভিযোগ চতুরতার সাথে এড়িয়ে গেছে ভারত। বলেছে, এগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপপ্রচার। তারা স্বাধীনতা চায় বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়।

চল্লিশের দশকের শেষদিক থেকেই কাশ্মীর সমস্যাটির শুরু। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ১৯৮৯ সালে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর এই পর্যন্ত কাশ্মীরের ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার কত, তার কোনো হিসেব নেই। ৫ আগস্টের পর উপত্যকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেছে।

কাশ্মীর কিংবা বাইরের কারাগারগুলোতে সাক্ষাৎপ্রার্থী স্বজনদের ভিড়। কেউ এসেছে বাবার সঙ্গে দেখা করতে, কেউ স্বামীর সঙ্গে, কেউ ভাইয়ের সঙ্গে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ১৫-২০ মিনিট সময়ের জন্য দেখা করার সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু ঠিকমতো কথাও বলা যায় না। কারাকর্তৃপক্ষ তাদেরকে তাড়াতাড়ি বের করে দেয়।

৬০০ মাইল পাড়ি দিয়ে আরও কত হামিদা বানু ছেলের সঙ্গে এক পলক দেখা করতে আসেন, কিন্তু মনভরে কথাও বলতে পারেন না। ফিরে আসতে হয় হানাদার বাহিনীর তাড়ায়। তখন হয়তো ছেলেটা চোখের জলে মাকে বিদায় দিয়েই বলে, ‘চলে যাও মা। ওরা ভালো না। আমি অচিরেই ফিরে আসব।’

কাশ্মীর এখন অজানা অচেনা এক আতঙ্কেও উপত্যকা। গ্রেপ্তারের যেমন নিয়ম-নীতি নেই, তেমনি নেই ছাড়া পাবার কোনো কানুনও। প্রিয়জনদের কারাগারে রেখে কাশ্মীরি স্বজনরা পার করছেন যন্ত্রণাদগ্ধ এক সময়। কবে আসবে আজাদি, ভারতীয় আগ্রাসনের এই কালো থাবা থেকে মুক্ত করার জন্য কবে আসবেন একজন বিপ্লবী শাহসওয়ার, সেই ইন্তেজারেই কাটছে প্রতিটা কাশ্মীরির অপেক্ষার প্রহর।

 

জানুয়ারি 2020

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১