নবপ্রকাশের সঙ্গে আমার পথচলার গল্প

সংখ্যা:

 

নবপ্রকাশের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে, নবপ্রকাশের সঙ্গে আমার পথচলার তিন বছর। তবে প্রতিষ্ঠানের যাত্রালগ্ন থেকেই এর চিন্তা এবং স্বপ্নের সঙ্গে পরিচয়। তারও পাঁচবছর আগে নবপ্রকাশের ‘বীজ’ নবধ্বনির সঙ্গে সখ্যতা। সেই সুবাদে তামীম রায়হান এবং সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর সম্পর্কে জানাশোনা। রাজধানী শহর থেকে প্রায় দু আড়াই শ’ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চল থেকে রাজধানীর কোনো পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম না থাকলে বেশ কঠিন ব্যাপার ছিল।

২০১২ সালের শেষ দিকে একদিন ফেসবুকের একটি গ্রুপে তামীম রায়হান নামের আইডি দেখে বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম। ইনিই নবধ্বনির সম্পাদক কি না নিশ্চিত হতে টাইমলাইনে গেলাম। নবধ্বনি নিয়মিত সংগ্রহ করতাম ২০০৯-এর শেষ দিক থেকে সম্ভবত। কিন্তু ফেসবুকে এভাবে হঠাৎ করে নবধ্বনি-সম্পাদকের দেখা পেয়ে যাব, ভাবিনি। বলা বাহুল্য, ফেসবুক তখন পর্যন্ত এতো বেশি ব্যাপকতা লাভ করেনি, উপরন্তু আমি সেসময় সবে ফেসবুক আইডি খুলেছি।

টাইমলাইনে গিয়ে নবধ্বনির সম্পাদক নিশ্চিত হয়ে সেদিনই ইনবক্সে নক করলাম। তারপর থেকে তামীম ভাই আমার জীবনে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। তাঁর উৎসাহ ও পরামর্শে বছর দুয়েকের মাথায় আমার ঢাকা আসা।

হিফজখানায় পড়ার সময় একবার ইজতেমায় এসেছিলাম আমার হিফজের হুজুরের সঙ্গে, এ ছাড়া আর কখনো সিলেট-মৌলভীবাজারের বাইরে আসা হয়নি। এক রমজানের পর, তামীম ভাই তখন ছুটিতে দেশে এসেছেন। পড়াশোনার জন্য ঢাকা আসব কি আসব না ইতস্তত করছিলাম, এলেও পরিচিত কেউ নেই, কোন মাদরাসায় কীভাবে ভর্তি হবো না হবো, কিছুই জানি না। তামীম ভাই বললেন, ‘ঢাকার বাসে উঠে তুমি সোজা চলে আসো সায়দাবাদ। সায়দাবাদ নেমে আমাকে ফোন কোরো।’

তামীম ভাইয়ের ওপর ভরসা করে রমজানের ছয়/সাতদিন পর এক সকালে মৌলভীবাজার থেকে বাসে চড়ে বসলাম। সায়দাবাদ নেমে তামীম ভাইকে ফোন করতেই তিনি বাসার ঠিকানা বলে দিলেন। রিকশায় করে গেলাম তাঁর বাসায়। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে বের হলেন আমাকে নিয়ে। রিকশায় ঢাকার পথঘাট দেখালেন। পুরো বিকেল এবং সন্ধ্যা ঘুরলাম তাঁর সঙ্গে। ফাঁকে নিজের জরুরি কিছু কাজ সেরে নিলেন তিনি। রাতে একসঙ্গে ফিরে গেলাম তাঁর বাসায়।

পরদিন ভর্তি করিয়ে দিলেন ফরিদাবাদ। ভর্তির বিড়ম্বনার সঙ্গে আমার নতুন পরিচয়। সিলেটে এই বিড়ম্বনা পোহাতে হয়নি কোথাও। ফরম সংগ্রহে সিরিয়াল, ভর্তি পরীক্ষায় সিরিয়াল, ফরম জমা দিতে সিরিয়াল—তারপরও ভাগ্য ভালো, তামীম ভাইয়ের পরিচয় থাকায় কিছু কাজ সহজে হয়েছে।

ভর্তির ঝামেলা শেষ করতে করতে প্রায় বিকেল হয়ে গিয়েছিল। তামীম ভাই নিয়ে এলেন লালবাগে। লালবাগের ছোট্ট একটি দোকানে নবপ্রকাশের যাত্রা সবে শুরু হয়েছে। পুরো বিকেল এই দোকানেই কাটালাম। দোকানে নবধ্বনির বেশ অনেকগুলো সংখ্যা ছিল, যেগুলো আমি সংগ্রহ করতে পারিনি। সংখ্যাগুলো উল্টে-পাল্টে দেখছিলাম। তখনও পর্যন্ত কল্পনাও করিনি, দু বছরের মাথায় প্রিয় এই পত্রিকাটি গোছানোর দায়িত্ব আমিই পাবো।

 

দুই

ফরিদাবাদ ভর্তি হয়েছিলাম জালালাইন জামাতে। মাদরাসায় সে বছর ফোন ব্যবহার করতাম না ওভাবে। ফলে তামীম ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তবে নবধ্বনি নিয়মিতই পড়া হতো। আমি এখন যে দায়িত্বে আছি, সেখানে তখন ছিলেন মীর হেলাল। বেশ চমৎকার করেই সাজাতেন সেই সময়কার সংখ্যাগুলো। নবধ্বনি ছাড়াও তখন নবপ্রকাশ থেকে তামীম ভাইয়ের ‘শাহজাদা’ ও ‘তবুও আমরা মুসলমান’ বেরিয়েছে।

মেশকাতের বছর নবধ্বনির আর কোনো খোঁজ পেলাম না। তামীম ভাইকেও ওভাবে কিছু জিজ্ঞেস করি না। একদিন জানতে পারলাম নবধ্বনি আর বেরোচ্ছে না। শুনে কষ্ট লাগল। তবে নবধ্বনি বন্ধ হলেও নবপ্রকাশ তখন পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করেছে। নবধ্বনি থেকে বাছাই করে বেশ কয়েকটি গল্পের সমন্বয়ে একটা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে নবপ্রকাশ থেকে। সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ‘ইতিহাসের জানালা’ এবং ‘বদরের বীর’ও বেরিয়েছে।

ততদিনে মেশকাত শেষ করে আমি দাওরায়ে হাদিসে পড়ি। নবপ্রকাশ লালবাগ ছেড়ে বাংলাবাজার এসেছে বছর দেড়েক হয়ে গেছে, কিন্তু কখনো যাইনি। যাইনি কারণ, পরিচিত কেউ ছিলেন না। তামীম ভাই ছাড়া নবপ্রকাশের কারও সাথে ওভাবে পরিচয় ছিল না তখন অবধি।

জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সাথে ইনবক্সে টুকটাক আলাপ হলেও, আমার ধারণা ছিল, হয়তো ভালোভাবে চিনবেন না। দাওরার বছর তাঁর ‘বদরের বীর’ বেরোনোর পর কী মনে করে একদিন গেলাম নবপ্রকাশে। ঘটনাচক্রে বিক্রয়কেন্দ্রে সেদিন তিনিও ছিলেন।

সরাসরি যদিও এই প্রথম দেখা, কিন্তু ফেসবুকের কল্যাণে তাঁর চেহারা চিনতে অসুবিধা হলো না। বই কিনে অটোগ্রাফের জন্য তাঁর মনযোগ আকর্ষণ করলে নাম জানতে চাইলেন। নাম বলতেই স্বভাবজাত হাসিটা প্রশস্ত করে বাহুতে মৃদু একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, ‘চুপচাপ বই নিয়ে চলে যাচ্ছেন পরিচয় না দিয়েই? আপনাকে পাত্থর মেরে সঙ্গেসার করা উচিত।’

তারপর বেশ খানিকক্ষণ কথা হলো তাঁর সঙ্গে। আন্তরিক আলাপ। বই কী কী পড়ছি, কী লিখছি ইত্যাদি জানতে চাইলেন। উত্তর তাঁর মনঃপুত হলো না। বললেন—‘নাহ, হামমাদ সাব, আপনার দ্বারা কিচ্ছু হইব না।’

আমার প্রতি ‘কিচ্ছু হইব না’র আক্ষেপ সেই যে শুরু হয়েছিল তাঁর, আজও অব্যাহত আছে।

নবপ্রকাশ থেকে ফিরে সে রাতেই তামীম ভাইকে ম্যাসেঞ্জারে নক করলাম। করলাম, নবপ্রকাশ থেকে ঘুরে এসেছি যে, কেবল এটুকু বলার জন্য। এটুকু বলতে গিয়ে আলাপ একটু দীর্ঘায়িত হয়ে গেল। হঠাৎ তামীম ভাই বললেন, আমার সম্পাদনা-সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি না। বলা বাহুল্য, সম্পাদনার কাজ সেই নাহবেমির জামাতে থাকতেই শুরু করেছিলাম। সিলেটের গহরপুর জামিয়ার আন-নুর ছাত্রকাফেলার সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বে থাকার সুবাদে কাফেলার দেয়ালিকা এবং বার্ষিক ম্যাগাজিনে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। এ ছাড়াও শখের বশে আরও দুই-তিনটা সাময়িকী বের করেছিলাম বন্ধুদের নিয়ে। এ ছাড়া আমাদের এলাকার প্রয়াত একজন বুজুর্গের স্মারকগ্রন্থের কাজও করছিলাম তখন। তামীম ভাইকে জানালাম এসব।

তামীম ভাই বললেন, ‘নবধ্বনি বন্ধ হয়ে আছে বেশ কিছু দিন ধরে, জানোই তো। আমি ব্যস্ত, জাহাঙ্গীর ভাইও ব্যস্ত, পত্রিকাকে গোছিয়ে ছাপার উপযোগী করার মতো ওভাবে কাউকে পাচ্ছি না। তুমি পারবা?’

দুই ফর্মার একটা পত্রিকা গোছানোর মতো অভিজ্ঞতা আমার আছে, কিন্তু নবধ্বনির মতো বহুল প্রচারিত ও পরিচিত পত্রিকার দায়িত্ব আমি কীভাবে নিই, ভয় পাচ্ছিলাম মনে মনে। কিন্তু তামীম ভাইকে সেটা বুঝতে দিলাম না। কারণ, নবধ্বনির জন্য সেই কৈশোর থেকে যে ভালোবাসা গেঁথে আছে আমার ভেতর, এবং যে উচ্চতায় নবধ্বনির অবস্থান, এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।

তামীম ভাইকে আমি সোৎসাহে জানালাম, ‘অবশ্যই পারব।’

এবার আমার চেনা-জানা তামীম ভাইকে অন্য এক রূপে পেলাম। এর সঙ্গে মোটেও পরিচিত ছিলাম না। এতক্ষণ ইনবক্সে কথা হচ্ছিল, তামীম ভাই বিস্তারিত আলাপের জন্য এবার ফোন দিলেন। বললেন, ‘তোমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এতদিন ছিল, এখনও সেটা থাকবে। কিন্তু নবধ্বনিতে যদি তুমি জয়েন করো, তাহলে কাজের সময় পূর্ণ পেশাদারিত্ব রক্ষা করতে হবে। কাজ বাবদ তোমার জন্য অল্পকিছু সম্মানীও নির্ধারিত থাকবে। তোমাকে আদর করি ঠিক, কাজের ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো ছাড় দেবো না। কাজের ক্ষেত্রে পূর্ণ পেশাদারিত্ব রক্ষা করতে হবে। প্রতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যে পরবর্তী মাসের নবধ্বনির জন্য লেখা সংগ্রহ, বাছাই এবং প্রাথমিক সম্পাদনা শেষে আমাকে মেইল করতে হবে। একদিন সময় দিলাম, পেশাদারিত্ব রক্ষা করতে পারবে কি না, ভেবে আগামীকাল আমাকে জানিয়ো।’

আমি হেসে বললাম, ‘পেশাদারিত্ব কীভাবে রক্ষা করতে হয়, সেটা তো শেখার জিনিস, অভ্যাসেরও। আমি যদি কাজেই জয়েন না করি, আর কেউ যদি আমাকে না শেখায়, তাহলে শিখব কীভাবে?’

তামীম ভাই এবার তাঁর স্বভাবজাত রাগী গলায় বললেন, ‘পেশাদারিত্বকে তোমরা খুব হালকাভাবে দেখো, এই হলো তোমাদের সমস্যা। পেশাদারী মনোভাব নেই, এই জন্যই অনেকের লেনদেনে যত অস্বচ্ছতা। আমাদের সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানগুলো টেকে না কেবল এই পেশাদারী মনোভাবের অভাবে।’

পেশাদারিত্বের শক্ত তাগিদের পাশাপাশি তামীম ভাই সেদিন নরম আরেকটি কথা বলেছিন। বলেছিলেন, ‘হামমাদ, নবপ্রকাশ আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ওখান থেকে আমি লাভের আশা করি। কিন্তু নবধ্বনি সম্পূর্ণ এর বিপরীত। এটা আমার নিরেট একটি ভালোবাসা’র জিনিস। নবধ্বনি বাবদ যে খরচটা হবে, সেটা আমার প্রতি মাসের উপার্জনের একটা অংশ থেকে ব্যয় হবে। তাই কেবল পেশাদারি মনোবৃত্তিই যথেষ্ট নয়, আমি আশা করব পত্রিকাটাকে তুমি ভালোবাসা দিয়ে সাজাবে। পত্রিকাটা মনে করো তোমার, এর সাজানো-গোছানো এবং উন্নতি-অগ্রগতির ব্যাপারে তুমি স্বাধীনভাবে কাজ করবে। পত্রিকাটা দেখতে ছোট, কিন্তু এর ক্ষমতা অনেক। আমার কাতার আসা এবং এখানে পড়াশোনার পেছনে মূলত এই পত্রিকাই ভূমিকা রেখেছে। তুমিও চাইলে এই পত্রিকা দিয়ে অনেক দূর এগোতে পারো।’

 

তিন

তামীম ভাইয়ের সঙ্গে যেদিন আলাপ হয়, সেদিন খুব সম্ভব ২০১৬ সালের নভেম্বরের শুরুর দিক ছিল। তামীম ভাই বলেছিলেন, এ মাস থেকেই কাজ শুরু করতে। ডিসেম্বরে পত্রিকা বেরোবে। আমি ২০ তারিখের মধ্যে লেখা সংগ্রহ করে ফাইল জমা দিলাম। তামীম ভাই ফাইল দেখে সন্তুষ্টই হলেন। তবে বললেন, যেহেতু আমরা নতুনভাবে আসছি, নতুন বছর থেকেই শুরু করি। ডিসেম্বরে পত্রিকা আর না করি।

২০১৭-এর জানুয়ারি থেকে নতুন আঙ্গিকে আবার শুরু হলো নবধ্বনির যাত্রা। নতুন রূপের এ যাত্রায় তামীম ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ কওে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রতি মাসে যেকোনো একটা প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে পত্রিকা করা হবে। প্রতিপাদ্য বিষয়কে অবলম্বন করে হবে প্রচ্ছদ। সে মুতাবিক জানুয়ারি সংখ্যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল সদ্য প্রয়াত পাকিস্তানি সংগীত শিল্পী জুনায়েদ জামশেদ রহমতুল্লাহি আলায়হিকে ঘিরে। বেশ কিছু চমৎকার লেখা জোগাড় করতে পেরেছিলাম। সংখ্যাটিও হয়ে উঠেছিল দুর্দান্ত। পত্রিকা প্রকাশ হয়ে বাজারে আসার দুদিনের মাথায় সবগুলো সংখ্যা নিঃশেষ! আমি তো খুশিতে বাগবাগ।

আলহামদুলিল্লাহ, পরবর্তী প্রায় সবকয়টি সংখ্যাই এভাবে যাচ্ছে। প্রকাশের সপ্তাহ খানেকের মাথায় পর্যাপ্ত পরিমাণের পত্রিকা আর থাকে না আমাদের হাতে।

নবধ্বনিতে কাজের সুবাদে কার্যত আমি নবপ্রকাশের অংশ হয়ে গিয়েছিলাম শুরু থেকেই। কিন্তু শুরুর দিকে দাওরার পড়াশোনা থাকবার কারণে বই-সম্পাদনায় জড়ানো হয়নি। এদিকে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গেও দু-একমাসের মধ্যে একটা আন্তরিকতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। দাওরার পরীক্ষার পর কী করব ভেবে আমি যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম, এমনকি ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার প্রায় এরাদা করে ফেলেছিলাম, জাহাঙ্গীর ভাই তখন নানাভাবে উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়ে আমাকে ঢাকা রেখেছিলেন। বলতে গেলে অনেকটা বাধ্যই করেছেন ঢাকা থাকতে। এ ক্ষেত্রে তামীম ভাই অবশ্য এখতিয়ার দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তুমি যেখানেই থাকো, সেখান থেকেই নবধ্বনির কাজ করতে পারবা। যদি শিক্ষকতা করতে চাও, বা গ্রামে কিছু করতে চাও, যেতে পারো। আবার ঢাকায় থেকে নবপ্রকাশের বই-সম্পাদনা, অনুবাদ, নিজের মৌলিক বইয়ের কাজও করতে পারো। নবপ্রকাশ এ ক্ষেত্রে তোমাকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে।

কিন্তু জাহাঙ্গীর ভাইয়ের এককথা ছিল, ঢাকা ছাড়া যাবে না। অবশেষে ঢাকায়ই থিতু হই। নবধ্বনি, নবপ্রকাশের বই সম্পাদনা এবং তামীম ভাইয়ের সম্পাদিত মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটি অনলাইন পোর্টালের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকি বেশ কিছুদিন। সাথে এহসান সিরাজ ভাইয়ের জীবন্তিকায়ও সময় দিই। পরবর্তী সময়ে ফাতেহে যোগদান এবং তার আগের কিছু ব্যস্ততার কারণে অনলাইন পোর্টাল এবং জীবন্তিকার কাজ ছেড়ে দিলেও নবপ্রকাশ ও নবধ্বনির সঙ্গে জড়িয়ে আছি এখন পর্যন্ত। এর মধ্যে ২০১৮ থেকে আমার সঙ্গে কন্টেন্ট বাছাই ও নানামাত্রিক পরামর্শের জন্য নতুন সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন নবপ্রকাশের সম্পাদক ও অনুবাদক নাজমুস সাকিব। নাজমুস সাকিবের যোগদানে যেন নতুন গতি এলো নবধ্বনির কাজে। এলো কন্টেন্ট বাছাইয়েও বৈচিত্র ও ভিন্নতা।

 

চার

নবপ্রকাশের সঙ্গে আমার পথচলার তিনবছর হলেও অফিসিয়ালি সম্পাদনার কাজে জড়িয়েছি দু বছর হলো। এই দুই বছরে আমার মৌলিক দুটি বই এসেছে নবপ্রকাশ থেকে। সম্পাদনা করেছি আরও বেশ কয়েকটি বই। সম্মান এবং সম্মানীর ব্যাপারে যদি বলি, একজন পূর্ণ পেশাদার লেখক-সম্পাদকের মূল্যায়নই পেয়ে আসছি।

আমার প্রথম বই ‘গল্প বলি ফিলিস্তিনের’ প্রকাশ হবার পর প্রায় বছর খানেক চলে গেছে। তামীম ভাই এরমধ্যে বেশ কয়েকবার বলেছেন নতুন বইয়ের কাজ ধরতে। আমি ধরছি ধরব করে সময় ক্ষেপণ করেছি। কুরবানি ঈদের একমাস আগে একদিন বললেন, ‘বাসায় তো প্রতিবছর বাপের টাকায় করা কুরবানির গোশত খাও, এ বছর নিজের টাকায় কুরবানি দাও। আমি তথ্য-উপাত্ত দিচ্ছি, কুরবানি ঈদের আগে যদি একটা গল্পের পাণ্ডুলিপি জমা দিতে পারো, তবে মোটা দেখে একটা খাসি কুরবানির টাকা পাবা।’

আমি খাসি কুরবানির টাকার প্রলোভনে যতটা না, তারচেয়ে বেশি তামীম ভাইয়ের আন্তরিক উৎসাহে বইয়ের কাজ ধরি। কারণ এটা ভালো করেই জানি, আমি এমন আহামরি কিছু লিখি না, যার জন্য আমাকে আলাদা অফার দিয়ে বই লেখাতে হবে। দেশে মানসম্মত অসংখ্য লেখক এমন আছেন, যাঁরা অগ্রীম নয় পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার পর সম্মানী পেলেও বই দিতে প্রস্তুত। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে আন্তরিকতা। কিন্তু এই আন্তরিকতাকে আমি মূল্যায়ন করতে পারিনি। কিছুটা আলসেমি আর কিছুটা অফিসিয়াল কাজের চাপের কারণে কুরবানি ঈদের আগে পাণ্ডুলিপি পুরোপুরি তৈরি করতে ব্যর্থ হই।

তামীম ভাই এবার সত্যি সত্যি হয়তো রাগ করেছেন। বরাবরের চেয়ে এবার একটু ভিন্নভাবেই প্রতিক্রিয়া জানালেন—‘কোনো বারই তো আমার বেঁধে দেওয়া সময়ের ভেতরে কাজ দাও না, এ কাজটা ভেবেছিলাম সময়ের ভেতরে দেবে, কিন্তু তোমার অপেশাদারিত্বটা আর গেল না।’

রাগ করুন আর যাই করুন, কাজ না দিলেও খাসি কুরবানির টাকা ঈদের আগে ঠিকই আমার অ্যাকাউন্টে এসে জমা হয়েছিল।

অবশেষে পাণ্ডুলিপিটি নবপ্রকাশের প্রধান সম্পাদক মহোদয় সমীপে পৌঁছেছিল কুরবানি ঈদেরও আরও এক মাস পরে। যেটা এখন ‘সোনালি দিনের গল্প’ নামে পাঠকদের হাতে হাতে পৌঁছুচ্ছে।

এই তিন বছরে নবপ্রকাশ ও নবধ্বনিতে কাজের সুবাদে তামীম ভাই যে জিনিসটা আমাকে এবং আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি শিখিয়ে যাচ্ছেন, সেটা হচ্ছে পেশাদারিত্ব। বছরখানেক ধরে নবপ্রকাশ ও নবধ্বনির বাইরেও আমি বেশ কিছু কাজ করি, এসব কাজের ক্ষেত্রে পূর্ণ পেশাদার হিসেবেই আমাকে পাওয়া যায়, যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি এবং করছি তাঁরা নিশ্চয় এটা স্বীকার করবেন। পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে কারও কারও সঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে রূঢ় আচরণও করেছি, করি। কিন্তু যাঁর কাছ থেকে এই পেশাদারিত্বের প্রেরণা নিচ্ছি, শিখছি, তাঁর কাছে দিনশেষে অপেশাদারই থেকে যাই। নবধ্বনিতে কাজ শুরুর পর সেই যে প্রথম মাসে ২০ তারিখের ভেতর ফাইল জমা দিয়েছিলাম, তারপর মনে পড়ে না, আর কোনো মাসে ২০ তারিখের মধ্যে ফাইল জমা দিয়েছি।

নবধ্বনি ও নবপ্রকাশের সঙ্গে এই হলো আমার পথচলার গল্প।

 

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নবধ্বনি ও সম্পাদক, নবপ্রকাশ

ডিসেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১