ফররুখ আহমদ : মুসলিম জাগরণের কবি

সংখ্যা:

 

বিংশ শতাব্দীর শক্তিমান কবি ফররুখ আহমদের কবিতা তৎকালীন বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজকে পুনর্জাগরণের প্রেরণা জোগায়। দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষের হাহাকার, আর্তনাদ, অনাহার, কষ্টের করুণ পরিণতি, সমকালের সংকট এবং সাম্প্রদায়িকতার হিংস্রতা দেখে তিনি আঘাত পান। সমাজব্যবস্থার এ সকল অসঙ্গতি তাঁকে সাহিত্য সাধনায় অনুপ্রেরণা জোগায়।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতম, শক্তিমান ও সৃজনশীল কবি হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো আত্মপরিচয় ভোলেননি। কখনো আত্মবিমুখ হননি। তাঁর কবিতায় বাঙালি মুসলিম পরিচয়টি নানাভাবে তিনি নিয়ে এসেছেন।

অবশ্যি ছাত্রাবস্থায় তিনি ভারতবর্ষের কমরেড এম. এন রায়ের র‌্যাডিক্যাল মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বামপন্থী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু জন্মসূত্রে ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্যের অধিকারী কবি একসময় বামপন্থা থেকে ফিরে ধর্মীয় চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁর কবিতায় ইসলামি সমাজব্যবস্থা মূর্ত হয়ে ওঠে।

কবি ফররুখ আহমদ ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে গনজাগরণ মূলক কবিতা লিখে জনপ্রিয়তা পান। তিনি ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণে বিশ্বাসী। ইসলামি আদর্শ ও আরব-ইরানের ঐতিহ্য তাঁর কবিতায় ব্যাঙময় হয়ে ওঠে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের যে স্বার্থক প্রয়োগ শুরু করেন, মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ তা আরও বেগবান করেন।

কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন ভাষা-সৈনিক। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর ‘মধুর চেয়েও মধুর যে ভাই আমার দেশের ভাষা’ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। পাকিস্তান আন্দোলন চলাকালীন ভাষা বিতর্কের সময় থেকেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরদার ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর তিনি মাসিক সওগাত (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯৪৭) সংখ্যায় ‘পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ নিবন্ধে লিখেন : ‘গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমস্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যারা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীদের সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ বায়ান্নর রক্তাক্ত ঘটনার পর রেডিওতে কর্মরত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল হালিম চৌধুরীদেরকে নিয়ে তিনি ধর্ম ঘটে যোগ দেন। তিনি তদানীন্তন পাকিস্তানি শাসকদের ব্যাঙ্গ করে ‘রাজ-রাজড়া’ নামে একটি নাটক লেখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়। প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী এতে অভিনয় করেন।

কবি ফররুখ আহমদ সৃষ্ট সাহিত্যসম্ভার বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। দর্শনগতভাবে তিনি ছিলেন মানবতাবাদী কবি। নীতি-আদর্শের প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন। ‘কে আসে কে আসে সাড়া পড়ে যায়/ কে আসে কে আসে নতুন সাড়া/ জাগে সুষুপ্ত মৃত জনপদ জাগে শতাব্দী ঘুমের পাড়া’, কিংবা ‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?/এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?/ সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?/ তুমি মাস্তুলে আমি দাঁড় টানি ভুলে;/ অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা হেরি’ এমন অসংখ্য কালজয়ী কাব্য-পঙক্তির রচয়িতা কবি ফররুখ আহমদ।

১৯৪৩ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে অনেকগুলো কবিতা রচনা করেন তিনি। তাঁর ১৯টি কবিতায় তখন বাংলার চিত্র ফুটে ওঠে। ১৯৪৩ সালে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘আকাল’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন। তাতে কবি ফররুখ আহমদের বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতাটি স্থান পায়। দুর্ভিক্ষ নিয়ে অদ্যবধি বাংলা সাহিত্যে ‘লাশ’-এর মতো কবিতা আর কেউ লিখতে পারেননি। ‘লাশ’ কবিতায় ব্যথিত কবির উচ্চারণ ছিল এমন—

‘যেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে জমিনের ’পর;

সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখে না সে মৃতের খবর।’

‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এটি কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ। প্রকাশক ছিলেন কবি বেনজীর আহমদ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। মুসলিম ঐতিহ্যের পুনর্জ্জীবন কামনা করে রোমান্টিকতার আবহে কবি জাতিকে জেগে ওঠার আহ্বান করেছেন এ গ্রন্থে। অন্যরা যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যে এগিয়ে যাচ্ছে কবি তখন পিছিয়ে পড়া তাঁর নিজ জাতিকে জেগে ওঠার ডাক দেন। কবির আহ্বান—

‘কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা

নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।

দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা

তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?

সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে

ডাকে জাহাজ

অচল ছবি সে, তসবীর যেন দাঁড়ায়ে

রয়েছে আজ।’

‘সাত সাগরের মাঝি’ বিস্ময়কর এক কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশের এতো বছর পরও এ গ্রন্থ সমানভাবে জাগ্রত ও প্রাণবন্ত। পাঞ্জেরী কবিতাটি আজও জাগরণন্মোখ মুসলিম তরুণদের প্রেরণা জোগায়। কবির কী উদাত্ত জিজ্ঞাসা—

‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?

এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?

সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?

তুমি মাস্তুলে আমি দাঁড় টানি ভুলে;

অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরী।’

কবি ফররুখ আহমদকে চরম দারিদ্র্যের সাথে জীবন যাপন করতে হয়েছে। কিন্তু অর্থের প্রতি, ক্ষমতার প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। দারিদ্রতাকে তিনি সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। ভোগ-বিলাসিতা তিনি ঘৃণা করতেন। নিজের কবিতার মতোই ছিল কবির দৈনন্দিন জীবন।

‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া

তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।’

 

অক্টোবর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১