তাঁর পায়ের অম্লান ছাপে ছাপে আমার শ্রদ্ধার ফুল

সংখ্যা:

 

স্মৃতির আকাশ থেকে সময়ের মেঘ ও মেদ ছাড়িয়ে সরিয়ে ব্যক্ত করছি এই আখ্যানের রোদ। অনেক আগের বৃষ্টিবাদলার দিনে পড়েছি ‘জীবনের শীলান্যাস’। সৈয়দ আলী আহসানের আত্মজীবনী, এই বইটা আমাদের বিশুদ্ধ ও শিল্পিত বাংলাভাষার একটা দলিল। এইখান থেকেই কুয়াশার ধুলো ঝেড়ে শুরু করা যাক।

আমরা দৃশ্যপটে দেখব একজন তরুণ, যার গায়ে খদ্দরের পাঞ্জাবি, কনুই-অব্দি গোটানো। তাঁর চোখের দৃষ্টি সারাক্ষণ যেন সাত সাগরের ওপারের কিছু চন্দ্রগ্রস্থ মানুষের মতো অবলোকন করছে। পুরনো দিনের ঢাকা শহরে, একটা বাসে সে চড়ে বসেছে, কলেজে যায়। হঠাৎ কী খেয়ালে সে পকেট থেকে বার করে তরবারির মতো একটা রুপালি কলম। বাসের টিকিটের সস্তা কাগজের উলটা পিঠে লিখতে শুরু করে মন্ত্র। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ফুটতে থাকে সিন্দাবাদের ঘাম।

কলেজে সে ব্যাকব্যাঞ্চার। নির্লিপ্ত। নির্জীব। অন্যদের মতো সিলেবাসের পৃষ্ঠা নিয়ে তার তুমুল হৈহুল্লোড় নেই। চট করে দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের প্রশ্নের পাণ্ডিত্যপূর্ণ উত্তর দেয়ার প্রবণতা, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের আহ্লাদ, তার নেই।

ক্লাসে স্যার কিছু একটা লিখতে দিয়েছে সবাইকে। কিন্তু পেছনে বসা ফররুখ তো আগ থেকেই লিখছিলেন কিছু একটা, মগ্নচৈতন্যে। শিক্ষক পায়চারি করতে করতে, অন্যেরা কী লিখছে যাচাই করতে করতে, তাঁর বেঞ্চে এসে দাঁড়ালেন, দাঁড়িয়ে পড়লেন, দাঁড়িয়েই রইলেন। ফররুখের বিকার নেই। স্যার একদৃষ্টিতে দেখছেন, নাকি পড়ছেন, তাঁর পঙক্তিতে পঙক্তিতে সাজানো লেখা। পুরো ক্লাস এই ঘটমানতার দিকে কৌতুকপ্রদভাবে চেয়ে আছে।

প্রভাষক হঠাৎ প্রচণ্ড ধমকে উঠলেন। ছেলেটার কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে অফিস রুমে হেডস্যারের সামনে ফেললেন। বললেন, ‘স্যার, আজকে আমার ইংরেজি ক্লাসে বাংলার উইলিয়াম শেকসপিয়ারকে আবিষ্কার করলাম!’

পৃথিবীতে আদর্শবাদী লোকেরা তাদের চিন্তার চর্চার জায়গা খুঁজে। স্বাপ্নিক ফররুখ জড়িয়ে পড়লেন সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে, কমিউনিজম। তখন আকাল, ঘোর আকাল। বাংলাদেশকে গ্রাস করে নিয়েছে নিদারুণ দুর্ভিক্ষ। শহরাভিমুখ হচ্ছে গ্রামকে গ্রাম মানুষ, লাখে লাখ। জোৎস্নার মতো সাদা এক মুঠো ভাতের আশা।

ফররুখ তো কবি, রক্তে কবি, জাতে কবি, তাঁর মনস্তত্বে তখন বিভীষিকা, অস্থির এক রাজত্ব। ঘরে থাকতে পারেন না, ছুটে বের হয়ে পড়েন, পথেঘাটে পীড়িত মানুষের দুর্দশা দেখে কিছুই করতে না পারার হতাশায় আবার বিছানায় এসে আছড়ে পড়েন। খেতে বসে, আধখাওয়া ভাত রেখেই কী ভেবে হঠাৎ উঠে পড়েন। হাত ধুয়ে কোথাও চলে যেতে যেতে বলেন, ‘ভাবি, দুয়ারে কেউ কড়া নাড়লে আমার ভাতগুলো তারে দিয়া দিয়ো।’

সমাজতন্ত্র তাঁকে একসময় হতাশ করে, পরাজিত করে। কেন হতাশ করে কীভাবে পরাজিত করে, সেসব তিনি বলে গেছেন তাঁর লেখায়, রচনায়, কবিতায়।

সোভিয়েত রাশিয়ারই এক অঞ্চলে জন্মানো মনীষী ঢাকা আলিয়ার মওলানা আবদুর রহমান কাশগরী, তাঁর তখনকার চেতনার তমসাচ্ছন্ন আকাশে অজস্র তারার মতো ঝিকমিকিয়ে ওঠেন। ফররুখ আহমদ দেখেন ‘নারঙ্গির বনে কাঁপছে সবুজ পাতা’। পাতারা তাঁকে ডাকছে। পথের একটা বাঁকে এসে তাঁর পথ ঘুরে যায়, যাত্রা শুরু হয় নতুন আলোকে, সুলুকের সন্ধানে।

আর সকল চিন্তা ও ভাবনার মতো রাজনীতি-চিন্তাও ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। অথচ হেরার রাজতোরণের দিকে তাঁর এই শাশ্বত সুন্দর অভিযাত্রাটাই পাপ হয়ে উঠলো ওদের স্থূল চেতনার মানদণ্ডে। তাঁর অদম্য শক্তিমান কবিসত্ত্বাকে তারা অস্বীকার করে, তারা ভুলে যাবার ভান করে। তাতে কী, এই যে অন্ধকারের মতো বিস্তারিত মিথ্যাচর্চার মাঠে আমরা তো মশাল জ্বেলে ফেলছি… আমরা বলছি।

বাংলাদেশের চল্লিশের কাব্যদশকের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই কবির একজন ফররুখ আহমেদ। বাংলাদেশের কাব্য ইতিহাসে চল্লিশের দশক যে বেশ ঘোলাটে, এর কারণ ফররুখকে বাদ দিতে চেয়ে ইতিহাস লিখতে যাওয়া।

১৯৭৪ সালের ৮ নভেম্বর হংকংয়ের এক পত্রিকায় প্রখ্যাত সাংবাদিক মার্টিন ডেভিডসন লেখেন : ‘দুসপ্তাহ আগে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি ফররুখ আহমদ মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর কারণ অনাহার।’

নিদারুণ অর্থকষ্টে তিনি দিন গুজরান করেন। রেডিও’র সামান্য চাকরিটি থেকে তাঁকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করার পর সরকারি বাসাটি ছেড়ে যেতে তাঁকে চাপ দেয়া হয়। কিন্তু ঢাকায় এ আদর্শবাদী কবির না ছিল বাসস্থান, না কোনো স্থায়ী ঠাঁই। শুভাকাঙখীদের তদবিরের ফলে বাসা ছাড়তে হয়নি, কিন্ত বাকি জীবন অভাবকে তাড়না করে কেটেছে সেখানে। শুধু আদর্শিক বিনাশকামীরা ব্যতীত মানুষ হিসেবে এই কবির কোনো শত্রু ছিল না, সদা অমায়িক, হাস্য মুখ, জমজম কূপের পানির মতো স্বচ্ছ অনাবিল ব্যক্তিত্ব।

ছোটবেলা থেকেই আমার বইপাঠের তুখোড় নেশা। ঈদের সালামি পেয়ে বই কিনতাম। একদিন একটা বই পাই, নাম হাতেম তায়ী। লেখক ফররুখ আহমদ। ছন্দে ছন্দে কী সুন্দর কাহিনিবর্ণনা, আবার ছবি। ঘোরগ্রস্ত সেই পাঠে হাতেম তায়ী চরিত্রটি মগজে রহস্য-রোমাঞ্চের উদ্দাম লীলাক্ষেত্র তৈরি করেছিল। নিজের ধনরত্ন কীভাবে সে নিজেরই প্রাণসংহারী ডাকাত দলে বণ্টন করে চলে যায় বিষণ্ন গোধূলীর পথ ধরে। এইখনে মনে পড়ে যায় ফররুখের কথা। বাংলাভাষার এই কুমিরভরা খালে কালো শেয়ালদের মধ্যেও নিজের কাব্যসুষমা আর আদর্শিক উপমার অজস্র ধন-রতন বিলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন মহাপ্রস্থানের পথে।

তাঁর পায়ের অম্লান ছাপে ছাপে আমার শ্রদ্ধার ফুল।

 

লেখক : নবীন গল্পকার

 

অক্টোবর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১