বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কাব্যধারায় ইসলামের গৌরব মহিমা পুনরুদ্ধার এবং মুসলিম পুনর্জাগরণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের শ্রেষ্ঠ রূপকার বলা যায় কবি ফররুখ আহমদকে। মুসলিম রেঁনেসার এই কবি সকল জড়তা পায়ে দলে দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষের অনাহার ক্লিষ্টের জরাস্রস্ত বাস্তবতা এবং সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ হিংস্রতা দেখে জেগে উঠবার অনন্য ইশতেহার দিয়ে গেছেন যেমন করে, তেমনই খোদাপ্রীতি আর ইশকে রাসুলের অসামান্য দৃষ্টান্তও এঁকে গেছেন না’ত কিংবা কবিতার পাতায় পাতায়। উল্লেখযোগ্য উপষঙ্গগুলোর সাথে সাথে চর্চায় এসেছে সিরাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। এমনকি তাঁর কবিতায় সিরাতের উপস্থিতি এতটা বিস্তৃত পরিসরে দেখা গিয়েছে, চলমান সময়ে নানাবিধ বিচারে অবশ্যই তা তুলনাহীন নজির। আদর্শিক লড়াইয়ের প্রশ্নে একেবারে সুসংহত থেকে হাতেগোনা যে কলমগুলো পরিচালিু হতে পেরেছে সেসবও ফররুখ আহমদের এসব কর্মের কাছে পরাজিতমুখ। ‘সিরাজাম মুনিরা’ আর ‘সাত সাগরের মাঝি’র সঙ্গে কুলিয়ে ওঠার সাহসিকতাও কি কারো ছিলো কোনো কালে? বয়ে গেছে ছন্দের তালে নবিপ্রেমের অজস্র ঝিরিপথ। দেখিয়েছেন কবিতায় কীভাবে চর্চিত হতে পারে সিরাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। জন্ম থেকে শুরু করে জীবনের খণ্ড খণ্ড অধ্যায় ফুটে এসেছে অপরূপ সৌন্দর্যে। নবিজি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জন্মের কিছু আগে দুলে ওঠা তাবৎ পৃথিবীর আগমনী বার্তা দিয়ে হুল্লোড় খেলে যাওয়ার প্রসঙ্গে লিখেছেন তিনি—‘কে আসে কে আসে সাড়া পড়ে যায়, কে আসে কে আসে নতুন সাড়া/ জাগে সুষুপ্ত মৃত জনপদ জাগে শতাব্দী ঘুমের পাড়া/ হারা সম্বিত ফিরে দিতে বুকে তুমি আনো প্রিয় আবহায়াত/ জানি ‘সিরাজাম মুনিরা’ তোমার রশ্মিতে জাগে কোটি প্রভাত।’
তারপর যখন এ পৃথিবীতে উদ্ভাসিত হলো নতুন এক সূর্য, এলেন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম, কবি সে সময়ের শান্তির জয়গানের সঙ্গে মুখ মিলিয়ে লিখলেন—‘তুমি না আসিলে মধুভাণ্ডার ধরায় কখনো হতো না লুট/ তুমি না আসিলে নার্গিস কভু খুলতো না তার পত্রপুট।’
সিরাতের ক্রমধারায় তারপর চর্চায় এলো জীবনের নানাদিক। যে লক্ষ্য নিয়ে মহান রাব্বে কারিম প্রেরণ করেছিলেন তাঁর এই মহান দূতকে, সে মহাবাণী আল কোরআন নাজিল হবার প্রসঙ্গেও কবি ফররুখ লিখলেন। ধ্যানমগ্ন হেরাগুহার উজ্জ্বল নুরের বিচ্ছুরণ এবং কোরআনের মোজেযায় উদ্ভাসিত নবিজিকে নিয়ে পাঠ করলেন—‘প্রবল বাহুতে টেনে নিয়ে ঐ বিরাট নিখিল ভরানো দিল/ বলে, ‘পাঠ করে’ ফুকারে বিশাল দীপ্ত বক্ষ জিবরাইল।’
কিন্তু নবীজির এই আগমন মেনে নিতে পারলো না লাত মানাত আর উযযার পূজায় মত্ত মক্কার মুশরিক কুরাইশ। অন্যায়ের সীমা পেরিয়ে গেলো যখন, নবিজি চললেন দূর মদিনার পথে। সেখানকার আনসারেরা অভূতপূর্ব সাড়া দিয়ে বরণ করলেন নবিজিকে। এ প্রসঙ্গেও কবি লিখছেন—‘সেদিন পূর্ণ মাটির মানুষ আনলে যে দান পূর্ণতার/ আরব ঊষার নিখিল চিত্তে আজও সে জাগায় গুলে আনার/ মক্কার মরু নিল না তোমার প্রাণ রসে ভরা, আবহায়াত/ দূর ওয়েসিস পারে, মদিনার দরদি আকাশ বাড়ালো হাত।
অপরদিকে সাহাবিদের নিঃস্বার্থ সাড়াদানের ঘটনাও তাঁর কবিতায় এসেছে যথাযথ মর্যাদায়। কেননা সাহাবায়ে কেরাম হিজরতের এই আদেশ মেনে সম্পদ, সন্তানসন্ততি আর ঘর সংসারের মোহ ছেড়ে হুট করে মদিনার পথে যেভাবে ছুটে চলেছিলেন তা অবশ্যই নবিপ্রেমের তাগিদে ত্যাগ ও বিসর্জনের মহাদৃষ্টান্ত। ফররুখ এ কারণেই লিখেছেন সে মানুষদের নিয়ে—‘গলেছে পাহাড়, জ্বলেছে আকাশ, জেগেছে মানুষ তোমার সাথে/ তোমার পথের যাত্রীরা কভু থামেনি চরম ব্যর্থতাতে/ তাই সিদ্দিক পেয়েছে বক্ষে অমন সত্য সিন্ধু দোল/ তাই উমরের পাতার ডেরায় নিখিল জনেরও কলরোল।
সর্বোপরি নবিজীবনের নানা ঘটনা-উপঘটনাকে কেন্দ্র করেই ফররুখের সিরাত-সাহিত্য ভরপুর সমৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছিল। নবিজির আগমন, নবুওয়তের ঘোষণা, কোরআন নাজিল আর এসবকে কেন্দ্র করে নিজ বংশ-গোত্রের আক্রোশ, এমনকি হত্যার অপচেষ্টা—সবই খণ্ড খণ্ডভাবে উল্লেখ আছে। এ ছাড়া মদিনায় হিজরত-পরবর্তী বদর-ওহুদ যুদ্ধ এবং শান্তিকামী এ জনগোষ্ঠীকে মুছে দেয়ার জন্য আবু জাহেলদের কূটকর্ম-সহ মদীনার দিনরাত, বিলালের দিকদিগন্ত বিস্তৃত আজানের ধ্বনিও ফররুখের কবিতায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
এসেছে নবিজীবনের সবচাইতে বেশি সান্নিধ্য লাভ করা খুলাফায়ে রাশেদদিনের অমোঘ বর্ণনা। নবিজির সুখ কিংবা দুঃখে, সবখানে যে ছায়ামূর্তিটি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতেন, সে আবু বকরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিয়ে কবি দিয়ে গেছেন সওর পর্বতের অন্ধকার রজনীতে নবিপ্রেমের সুনিপুণ বর্ণনা। লিখেছেন—‘দরদির বুকে প্রেম সমুদ্র বিরাট, স্নেহের সেকি পাহাড়/ নিল সে তনুতে সাপের ছোবল, নিল সে আঘাত অত্যাচার/ সেই সমব্যথী হেসে নেয় দেহে বিষদংশন বিষের চুম/ তার বিশ্বাসী কোলে বিশ্রান্ত নবিজির যেন ভাঙে না ঘুম।’
চারিত্রিক ঐশ্বযের বয়ানে হজরত আবু বকরকে খেতাব করে বলেছেন—‘নিজ সত্তার পরিচয় তুমি জেনেছ কি নিভৃতে/ তাই কি পেয়েছ নিজের চিত্তে অমনি বিলায়ে দিতে?/ তাই কি মাটিতে মিশায়েছ অহমিকা?/ তাই কি পেয়েছ ওই দুর্লভ মানুষের জয়টিকা?’
অপরদিকে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়ে বর্ণিত ‘উমর দরাজ দিল’ও যেন ইশকের এক দরিয়া। সমাত্রিক আল্পনায় কী মায়ার খেলা এখানে। মানবতার জন্য নিবেদিত অর্ধজাহানের এ খলিফাকে নিয়ে লিখেছেন কবি—‘দেখি সে চলেছে মরু মুসাফির কোথায় কে জানে/ পিঠে বোঝা নিয়ে মৃত বিয়াবান ছাড়ায়ে কী টানে।/ চলেছে সে দূরে ভৃত্যের সাথে মরু পথে/ চলেছে সে দূরে ভৃত্যের সাথে মরু পথে।’
সেই সাথে কবি কলুষতায় ভরপুর এ সমাজকে বিনির্মাণের প্রত্যাশায় কামনা করেছেন উমরের মতো কোনো মহান সত্ত্বার আগমন। কেননা এ রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিশ্ব পালটে যেতে পারে এমন কোনো আবির্ভাবের মধ্য দিয়েই। বলেছেন—‘আজকে উমরপন্থী পথীর দিকে দিকে প্রয়োজন/ পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ি দেবে যারা প্রান্তর প্রাণপণ/ বন্ধু তোমার দারাজ হস্তে শিলাদৃঢ় যে আইন/ তার সম্মুখে সমান কাতারে খলিফা ও মিসকিন/ সূর্য প্রখর ন্যায় রশ্মিতে নাই তিল অন্যায়/ সকলে সমান নবিজির দেওয়া সে বিধান বন্যায়।’
তেমনি হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মতো মহার্ঘ্য ব্যক্তি যিনি ভূষিত ছিলেন ‘যিননুরাইন’ উপাধিতে, তাঁকে নিয়েও কবি রচনা করেছেন ‘ওসমান গনি’। অকাতরে সম্পদ ব্যয় আর নবীর জন্য ত্যাগের যুদ্ধে অপরাজিত এ মহান মানুষকে নিয়ে বলেছেন—‘সত্যের পতাকা দেখ ওড়ে নভে বিপুল সম্মানে/ শাহি বালাখানা কার মুক্ত হলো অকৃপণ দানে?/ ওগো শ্রেষ্ঠ ধনী/ সে তোমারি ওসমান গনি!/ যার অফুরন্ত দানে জনপদে বেড়েছে সুষমা/ জীবনের শেষে কড়ি প্রয়োজনে রাখো যে জমা।’
হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’র পরিচয়ও তাঁর কবিতায় চিরভাস্মর। মহান এ খলিফার অনন্য সাহসের তারিফ কে না জানে! ফররুখও লিখছেন তাই—‘পাহাড়ে পাহাড়ে তাহার গর্জন জাগে মরু প্রান্তর/ আলী হায়দর আলী হায়দর আসে আলী হায়দর।/ শামাদানে জ্বলে প্রেমের শিখায় বেদনায় অবগাহি/ কোটি মুসলিম পেয়েছে ফিরিয়া চিত্তের বাদশাহী!’
সেইসাথে তাঁর কবিতায় নবিপ্রেম ও সিরাত চর্চার প্রধানতম ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে নবিজির সৌভাগ্যবান আত্মীয়দের দিকে ছুড়ে দেয়া কবিতার অসংখ্য পঙক্তি। সাইয়িদা শাবাবি আহলিল জান্নাহ হজরত হাসান ও হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে নিয়ে তাঁর কবিতার ভাষা ও রাগ অনুরাগের ফিরিস্তি এটা নিশ্চিত সাব্যস্ত করতে সক্ষম হবে যে কী পরিমাণ ভালোবাসা তাঁর ভেতরে কাজ করেছে। কারবালার রক্তক্ষয়ী ঘটনা তাঁর ভেতর কী জ্বলুনি তৈরি করেছে তাও একেবারে স্পষ্ট হয়ে আছে। যেমন লিখেছেন হজরত হোসাইনকে নিয়ে—‘হোক দুশমন অগণন তবু হে সেনানী, আজ দাও হুকুম/ মৃত্যু সাগরে ঝাঁপ দিয়ে মোরা ভাঙব ক্লান্ত প্রাণের ঘুম।’
কিন্তু আশ্চর্যজনক সত্য হলো সিরাত সাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদের কবিতার এ বিস্তৃত পাঠ আমাদেরকে বরাবের মতো আপ্লুত করলেও কবি যেন তারপরও অতুষ্ট, অসন্তুষ্ট, অতৃপ্ত। সিরাতের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করে যতক্ষণ না তিনি বলতে পারতেন—‘কুল্লুনা ফিদাকা ইয়া রাসুলাল্লাহ’, ততক্ষণই হয়তো চলত কবিতায় নবিপ্রেমের বয়ান। ব্যপ্ত হতো সিরাতসাহিত্যের নির্মল আঙিনা। সৈয়দ আলী আহসান কবি ফররুখ আহমদের সিরাতসাহিত্যে তুমুল আগ্রহের কথা জানিয়ে লিখেছিলেন—‘কলকাতায় থাকতে ফররুখ মহানবির (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) জীবনী নিয়ে দীর্ঘ কবিতা লেখার কথা আমাকে বলেছিলো। মনে আছে সে যে পরিকল্পনা করেছিলো তা অনেকটা এমন— মহানবির জন্ম যখন হলো, একই সময়ে তখন ইরানের অগ্নিপূজকদের শাশ্বত অগ্নি নির্বাপিত হয়ে গেলো আর জামসিদের পানপাত্র ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। উল্লাস জেগেছিল ফেরেশতাকুলের মাঝে। কেননা আবির্ভাব হচ্ছে এক মহান পুরুষের। এরকম নানা বিষয়কে উপজীব্য করে বর্ণাঢ্য নবিজীবনের একটি দীর্ঘ বর্ণনা ফররুখ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ তার ভাগ্যাকাশে উদিত হয়নি।’
সে কাজ তাঁর হাতে না হলেও যে কাজ হয়ে গেছে, এ অবিস্মরণীয় অবদান ভুলে যাবার মতো? অবশ্যই না। সিরাত সাহিত্যে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া এ মহান কবি নিজ আদর্শের ওপর পরিপূর্ণ জমে ছিলেন আমৃত্যু। আদর্শ প্রচারের প্রয়াস যেমন তাঁর কাব্যকলা ব্যহত করতে পারেনি ঠিক তেমন তাঁর কবিতার চর্চা সঠিক ও সুন্দর আদর্শে সামান্য কালিমাও লিপ্ত করতে পারেনি। সিরাতে সিরাতে কীভাবে চলে কবিতার গতি প্রকৃতি এবং কবিতা যে হতে পারে নবিপ্রেমের অনন্য মাধ্যম, সে তা’রিফ আমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে মানুষটি, তিনি ইসলাম ও মুসলমানের কবি, কবি ফররুখ আহমদ।
লেখক : ছাত্র, মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামিয়া, ঢাকা
অক্টোবর 2019

