মানবজীবনে কবিতা যে কারণে প্রাসঙ্গিক, সাহিত্য যে কারণে জীবনের অংশ, বলতে গেলে একই কারণে ফররুখ আহমদও বাংলাসাহিত্যে প্রাসঙ্গিক। মানুষ উদ্দেশ্যহীনভাবে কিছুই করে না। শুধু মানুষ কেন, অবুঝ প্রাণীও বোধহয় লক্ষ্যহীন নয়। তবে ফারাক আছে। সব কাজের মতো সাহিত্য সৃষ্টিরও লক্ষ্য থাকা চাই। চাই আদর্শবোধ। আদর্শবাদী লেখক ছাড়া আরেক প্রকার সাহিত্যিক প্রাণী আছে, যারা স্বার্থবাদী, সুবিধাবাদী। আদর্শহীনতার কারণে আমাদের উদীয়মান সাহিত্যকর্মীদের প্রবীণদের বিরুদ্ধে নীতিহীনতার অভিযোগ তুলতে দেখি। দুঃখজনক হলো, এই অভিযোগকারীরাই আবার প্রতিষ্ঠা লাভের পর ফেলে যাওয়া সাপের খোলসে গা ডুবিয়ে বসে পড়েন। কারণ একটাই; আদর্শবোধ নেই, নেই বিশ্বাস।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-নজরুল অধ্যায়টা মোটেও এমন ছিলো না। আরো আগে, বঙ্কিমও বিশ্বাস স্থির করার কথা বলে গেছেন। আর তাঁর এ কথার বিরুদ্ধে শক্তি যুগিয়েছেন যিনি তিনি প্রমথ চৌধুরী। প্রমথ চৌধুরীকে সফলতার সাথে অনুসরণ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। এঁদের কাছে সাহিত্য স্রেফ রসের নাম। প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যকে দেখেছেন ‘খেলা’ হিসেবে। এ খেলায় যদি নীতিকথা, বিশ্বাস বা সমাজচেতন আসে, তাহলে খেলা হয়ে যায় জুয়াখেলা। খেলোয়াড় হোন জুচ্চোর। বাংলা কবিতায় তিরিশি কবিদের কেউ কেউ কোনো রকম আদর্শবোধ ছাড়াই, শুধু রোমান্টিকতায় ভর করে বাংলা কবিতায় বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন। আমার আলোচনা পরের দশকের একজন কবিকে নিয়ে।
চল্লিশের দশকটাই এমন যে, এখানে কবিকে সমাজ জীবনে যুক্ত না হয়ে উপায় ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা আর দেশভাগ কবিদের আদর্শবাদী বা বিশ্বাসী করে তুলেছিল। রোমান্টিকতার পাশাপাশি সমাজচেতন আর স্বতন্ত্র সংস্কৃতিচেতনমূলক কবিতাও তাঁরা উপহার দিয়েছেন।
চল্লিশের দশকে কবিতার প্রধান তিনটি ধারার সৃষ্টি হয়েছিল। রোমান্টিক কবিদের মধ্যমণি ছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও তাঁর প্রবাদপ্রতিম কবিতা পত্রিকা। সমাজচেতন কবিদের অগ্রজ ছিলেন বিষ্ণু দে। দূর-অগ্রজ ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এঁদের প্রধান মুখপত্র ছিল সুধীন্দ্রনাথ পরিত্যক্ত নবভূত পরিচয় ও সাহিত্যপত্র। এ ধারার কবিদের মধ্যে ছিলেন— সুকান্ত ভট্টাচার্য, বিমলচন্দ্র ঘোষ, সমর সেন, সিকান্দর আবু জাফর, সানাউল হক, আবুল হোসেন ও আহসান হাবীবসহ অনেকে। অন্যদিকে স্বতন্ত্র সংস্কৃতিচেতন কবিতার ধারাটির কেন্দ্রীয় উৎসে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সওগাত ও মোহাম্মদী ছিল এঁদের প্রধান পত্রিকা। এ কবিগোষ্ঠীতে ছিলেন সৈয়দ আলী আশরাফ, তালিম হোসেন, মুফাখখারুল ইসলাম ও সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ।
এ সকল কবির সবাই একেক ধারায় থাকলেও একা তিন ধারাতেই লিখেছিলেন যিনি, তিনি এ দশকের সবচেয়ে সফল ও প্রধানতম কবি ফররুখ আহমদ। তিনটি ধারাতেই তিনি ছিলেন সামর্থবান সাহসী শক্তিশালী ও ফসলী। তাঁর হাতে সমাজচেতনার সঙ্গে মিশেছিল অমর রোমান্টিকতা। তবে স্বতন্ত্র সংস্কৃতিচেতন ধারার কবিতায় তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। ইসলামের ঐতিহ্য ও বহিরাঙ্গ তাঁকে দারুণ মুগ্ধ করেছিল। ইসলামিচেতন ধারায় তাঁকে আধ্যাত্মিকতা ভর করতে পারেনি। মার্কসবাদে বিশ্বাসী একসময়ের ফররুখ আহমদ নানা বোঝাপড়া, তর্কাতর্কি আর নিজের সঙ্গে রক্তপাত ঘটিয়ে জাহাজ ভেড়ান ইসলামের বন্দরে। শুধু কবিতায় নয়, জীবনে চলার প্রতিটি মুহূর্তের জন্যও ইসলামকে গ্রহণ করেছিলেন।
অনমনীয়, নিরাপোষ, স্পষ্টবাদী এ কবি বাঙালি মুসলমানদের পুনর্জাগরণের ডাক দিয়েছিলেন। স্বাপ্নিক কবি ইসলামি রাষ্ট্রের স্বপ্ন ভঙ্গের উপর ক্ষোভ নিয়ে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন রাজ-রাজড়া নাটকটি। সমাজের অসঙ্গতি, ধর্মের নামে দাঙ্গা সৃষ্টির পর বন্ধু, নিজের রক্ত কবিতা লিখেছেন আর্তকবি। এক সময়ের মার্কসবাদী কবি সমাজচেতনার পাত্র বদল করে একটি আদর্শে শিখায়িত হন নিজের বহু কবিতায়। বিশেষত নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১) কাব্যনাট্যে। আরব্যোপন্যাস থেকে ফররুখ যে উপকরণ দু’হাত ভরে নিয়েছিলেন—তাঁর লক্ষ্য ছিল বিপর্যস্ত মানবতার পুনঃনির্মাণ।
হাতেম তায়ী মুসলমান ছিলেন না অথচ সে হাতেমই হলেন নৌফেল ও হাতেম কাব্যনাট্যের নায়ক। পুঁথি ঘেঁটে, সমালোচিত হয়ে হাতেমকে—একজন অমুসলিমকে তুলে এনেছেন শুধুই মানবতার পুণনির্মাণের জন্য। মানবতার; মানে শুধু মুসলমানদের জন্যই না—হিন্দুসহ সকল মানুষের জন্য। তবে অধঃপতিত বাঙালি মুসলমানেরা তাঁর কবিতার সবচে’ কাছের সম্বোধিত ছিল। সবাইকে আহ্বান করেছেন; বাঙালি মুসলমানের কানে করেছেন বজ্রপাত। ঘুম ভাঙাবার জন্য, খুন করার জন্য নয়।
চল্লিশের দশকে ফররুখ চারপাশে যে পঁচন দেখেছিলেন সে পঁচন এখনো জারি আছে। পঁচন থেকে সমাজ ও মানবতাকে বাঁচানোর জন্য ফররুখ চির প্রাসঙ্গিক। যদি কেউ চায় এ পথে তাঁর কবিতায় মুক্তি পেতে, তাহলে তো মুক্তি পাবেই; বাংলাসাহিত্যে এই একমাত্র ব্যক্তি, যদি কেউ চায় তাঁর জীবন সামনে নিয়ে বুজুর্গ হতে—নিঃসন্দেহে এতেও কেউ কানাগলিতে পা দেবে না। অতি আলোয় উদ্ভাসিত—চোখ খোলা যায় না, এমন পথ না পেলেও সূর্যসকালবিধৌত সরল পথটি তাঁর জীবন থেকে যে কেউ পেতে পারে। অন্য কোনো বাঙালি কবির এ গুণ নেই হলফ করে বলা যায়।
ফররুখের কাব্যবিশ্বাস কবিতার মূল্যে উত্তীর্ণ হয়েছিল। যদিও বিশ্বাস কবিতা নয়, তবে বিশ্বাসহীন কবিতা সোনার পাথরবাটির মতো। তাঁর এ বিশ্বাস শিল্পমূল্যে উত্তীর্ণ। প্রথম কাব্য সাত সাগরের মাঝিতেই সে মূল্য তিনি অর্জন করেছিলেন।
ফররুখগবেষক কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখছেন—‘বিস্ময়কর চিত্রকল্প, অক্ষরবৃত্ত ও ছয়মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দ, ধ্বনিময় আরবি-ফারসি শব্দ, আরব্যোপন্যাসের আশ্চর্য জগতের পুনর্নির্মাণ ও তার নতুন অন্তরাখ্যান বাঙালি-মুসলমানের জাতিগত উচ্চাকাক্সক্ষার প্রকাশ—সমস্ত মিলিয়ে সাত সাগরের মাঝি শুধু ফররুখের নয়, চল্লিশের কবিদেরই এককভাবে শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ।’ (ফররুখ আহমদ : জীবন ও সাহিত্য, আবদুল মান্নান সৈয়দ।)
প্রাথমিক ফররুখকে অগ্রজ কবি শামসুর রাহমান পূর্ববাংলার সাম্প্রতিক কবিতা নামক প্রবন্ধে মূল্যায়ন করেন এভাবে—‘ফররুখ আহমদ সেসব বিরল কবিদের অন্যতম যাঁরা খুব অল্প দিনেই অনুকারকের দল সৃষ্টি করেন।’
লেখক : তরুণ গল্পকার ও অনুবাদক। ছাত্র, ইসলামী বিশ্ব বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
অক্টোবর 2019

