ফররুখ-জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

সংখ্যা:

মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাঝআইল গ্রামে তাঁর জন্ম ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুন। পিতা খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে খুলনা জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে সম্পন্ন করেন ইন্টার মিডিয়েট। তারপর স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেও পড়াশোনা আর সম্পন্ন করেননি।

কিশোর বয়স থেকে কাব্য-চর্চার শুরু। স্কুলে পড়া অবস্থায়ই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। এবং একজন নবীন কবি হিসেবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তাঁর উন্মেষের ওই সময়টা ছিল গেল শতাব্দীর চল্লিশের দশক, তাই তাঁকে চল্লিশের দশকের কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ২৬ বছর বয়সে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ প্রকাশিত হয় এবং ব্যাপক আলোড়ন তোলে। তাঁর কবিতা ও কাব্যপ্রতিভা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হয়, এমনকি কলকাতা রেডিওতে তাঁর ওপর আলোচনা সম্প্রচারিত হয়। স্বল্পকালের মধ্যেই তিনি একজন অসাধারণ প্রতিভাবান কবি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

কলকাতার আই জি প্রিজন অফিস এবং সিভিল সাপ্লাই অফিসে চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা। পরে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন এবং বেশ কয়েক বছর মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ভারত বিভাগের পর ঢাকায় এসে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন। রেডিও পাকিস্তানে ছোটদের খেলাঘর অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।

ছাত্রাবস্থায় এম এন রায়ের র‌্যাডিক্যাল মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রথম জীবনে বামপন্থী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করলেও ৪৭-এর দেশ বিভাগের সময়ে এই মোহ তাঁর ভেঙে যায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়কালে ইসলামি আদর্শ ও মুসলিম জাগরণের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্টার পক্ষে কাজ করেন। ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলন যখন প্রবল হয়, সে-সময়ে স্বাধীনতার পক্ষে গণজাগরণমূলক কবিতা লিখে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকলেও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সেসময়ে জোরদার লেখনী পরিচালনা করেন। তিনি ধর্মকে কখনো রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন না।

‘সাত সাগরের মাঝি’ তাঁর প্রথম এবং সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ গ্রন্থে মূলত তাঁর স্বাধীনতা-প্রীতি ও মানবতাবোধের সুস্পষ্ট বিকাশ ঘটেছে। গীতি কবিতা, মহাকাব্য, সনেট, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সঙ্গীত, প্রবন্ধ, বেতার কথিকা, গীতি-নকশা প্রভৃতি সৃষ্টিশীল রচনায় তিনি নৈপূণ্য প্রদর্শন করেন। তবে কবিতা রচনায় তিনি অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৫। ১. সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪)। ২. আজাদ কর পাকিস্তান (১৯৪৬)। ৩. সিরাজম মুনীরা (১৯৫২)। ৪. নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১)। ৫. মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩)। ৬. হাতেম তা’য়ী (১৯৬৬)। ৭. হে বন্য স্বপ্নেরা (১৯৭৬)। ৮. ইকবালের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮০)। ৯. কাফেলা (১৯৮০)। ১০. হাবেদা মরুর কাহিনী (১৯৮১)। ১১. তসবির নামা (১৯৮৬)। ১২. দিলরুবা (১৯৯৪)। ১৩. ঐতিহাসিক অনৈতিকহাসিক কাব্য (১৯৯৪)। ১৪. অনুস্বার। ১৫. ধোলাই কাব্য।

 

কাব্য নাটক রচনার ক্ষেত্রে মুসিলম কবিদের মধ্যে তিনিই পথিকৃৎ। তাঁর ‘নৌফেল ও হাতেম’ একটি সফল কাব্য নাটক। সনেট রচনায়ও তিনি সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করেছেন। সম্ভবত, বাংলা সাহিত্যে মাইকেলের পর সংখ্যায় এত বেশি সনেট হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আজ পর্যন্ত আর কেউ রচনা করতে পারেননি। ফররুখের পূর্ণাঙ্গ সনেট গ্রন্থের মধ্যে ‘মুহূতের কবিতা’, ‘দিলরুবা’, ও ‘অনুস্বার’ প্রধান। মুহূর্তের কবিতায় ৯৪টি, দিলরুবায় ৪৯টি, অনুস্বারে ৮৫টি, সিরাজম মুনিরায় ১০টি, সাত সাগরের মাঝিতে ৭টি, আজাদ করো পাকিস্তানে ১টি এবং হাতেমতা’য়ীতে বেশ কিছু সনেট রয়েছে। তাঁর সমগ্র রচনা প্রকাশিত হলে হয়তো সমগ্র সনেট সংখ্যার হিসাব পাওয়া যাবে। ‘রাত্রি’ নামে একটি সনেট রচনার মধ্যদিয়ে তাঁর কাব্য জীবনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং ১৯৭৪-এ ‘একটি আলেখ্য’ সনেটটি রচনার মধ্যদিয়ে সে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল।

ব্যঙ্গ কবিতা রচনার ক্ষেত্রেও বেশ সফলতা দেখিয়েছেন তিনি। প্রায় ১৫টি ছদ্মনামে এসব ব্যঙ্গ কবিতা রচিত হয়েছে। স্বনামেও লিখেছেন প্রচুর। ব্যঙ্গ কবিতা গ্রন্থের মধ্যে অনুস্বার (ব্যঙ্গ সনেট), ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক কাব্য, তসবির নামা এবং ধোলাই কাব্য উল্লেখযোগ্য।

‘হাবেদা মরুর কাহিনী’ গদ্য কবিতা গ্রন্থ। গদ্য কবিতা রচনায় তিনি যে সিদ্ধহস্ত ছিলেন এটা তার স্বাক্ষর বহন করে। শিশু-কিশোরদের জন্যও প্রচুর ছড়া-কবিতা লিখেছেন। এসব ছড়া-কবিতা খুব জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। এ ছাড়া নয়া জামাত (১ম ভাগ, ২য় ভাগ, ৩য় ভাগ, ৪র্থ ভাগ) নামে শিশু-কিশোরদের উপযোগী চারটি পাঠ্য পুস্তক রচনা করেন, যা ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয়।

মূলত কবি হলেও বেশ কিছু স্বার্থক গল্পও লিখেছেন তিনি। এর মধ্যে ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’, ‘মৃত বসুধা’, ‘বিবর্ণ’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর এসব গল্প ‘ফররুখ আহমদের গল্প’ নামে আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। সিকান্দার শা’র ঘোড়া নামে একটি উপন্যাস রচনায়ও তিনি হাত দিয়েছিলেন কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি।

ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বেশকিছু প্রবন্ধও আছে তাঁর। আছে ভাষা বিষয়ক কিছু কবিতাও, যা রেডিওতে নিয়মিতভাবে প্রচার হতো। কবিতা রচনার পাশাপাশি অসংখ্য হামদ, নাত, দেশাত্মবোধক সংগীত, প্রেম ও ভক্তিমূলক গান এবং আধুনিক বাংলা সংগীত রচনা করেন। মানের দিক থেকে এ গানগুলো প্রশংসনীয় ও জনপ্রিয় ছিল। এক সময় বেতার ও টিভিতে খ্যাতনামা শিল্পীদের কণ্ঠে এগুলো নিয়মিত প্রচার হতো।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’, ১৯৬৬ সালে আদমজী পুরস্কার এবং একই বছরে ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। উপরন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ঢাকা বেতারের চাকরি থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হয় এবং সরকারি বাসা ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। অবশ্য বিভিন্ন মহল থেকে এর প্রতিবাদ করার ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাসা ছাড়তে হয়নি। ইস্কাটন গার্ডেনের সে সরকারি বাসাতেই অনাহারে অর্ধাহারে এবং বিনা চিকিৎসায় ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম জাগরণের এ মহাকবি একবুক কষ্ট আর বঞ্চিতি ও অবমূল্যায়নের সীমাহীন যাতনা নিয়ে পৃথিবীকে শেষ বিদায় জানান।

১৯ অক্টোবর কবির ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম।

 

ইন্টারনেট অবলম্বনে সাজিয়েছেন হামমাদ রাগিব

 

অক্টোবর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১