আমাদের নুরু ভাই

সংখ্যা:

 

নুরু ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় মাদরাসার ক্যান্টিনে। ক্লাস বিরতির এই সময়টাতে সবাই যখন কোক, বিস্কুট নিয়ে ব্যস্ত, নুরু ভাই তখন হাতদুটো পেছনে বেঁধে মুখ ভার করে পায়চারি করছেন। ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়ালাম। ঘন কালো দাড়িতে ঢাকা ভরাট মুখ, বড় বড় চোখ আর পেশীবহুল শরীরের মানুষটাকে পাহলোয়ান বললে অতিশয়োক্তি হবে না কোনোক্রমেই।

‘তুই এবার প্রথম বর্ষে, তাই না?’

আকস্মিক ‘তুই’ সম্বোধন শুনে খানিক হকচকিয়ে গেলাম। কোনওরকমে সামলে নিয়ে বললাম, ‘জি।’

নুরু ভাই গম্ভীর ভঙ্গিতে ঠোঁট ওল্টালেন। আমাদের মাঝে নুরু ভাইয়ের জনপ্রিয়তা ছিল অনেক। সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি মজা পেতেন। অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা ছিল তাঁর প্রিয়। খেলার মাঠে তিনি ছিলেন ‘দ্য গেইল’। ওভার-প্রতি তিনটা করে ছক্কা হাঁকানো তাঁর জন্য ডাল-ভাত। চোখ ধাঁধানো পুল, ব্যাকফুট পাঞ্চগুলো ছিল সত্যিই উপভোগ্য।

নুরু ভাই প্রায়ই একটা পাঞ্জাবি গায়ে দিতেন। গাঢ় হলুদ রঙের। কোনও এক সময় উজ্জ্বল ছিল রঙটা। বহু বছরে ময়লার হালকা একটা আস্তর জমে গিয়ে মেটে বর্ণ ধারণ করেছে। একদিন পাঞ্জাবিটার কথা জিজ্ঞেস করতেই গর্বে নুরু ভাইয়ের বুক দুইঞ্চি ফুলে উঠল। খুক করে একটা কাশি দিয়ে ভরাট গলায় বললেন, ‘এটা আমার পারিবারিক ঐতিহ্য। আমার বয়স যখন দশ তখন আমার দাদা মুনশি আব্দুর রউফ এটা গিফট করেছিলেন।’

আমি আহত স্বরে বললাম, ‘তা কী করে হয়? দশ বছরের পর আপনি একটুও লম্বা হননি?’

‘আরে হাঁদারাম, এটাতো ছিল জুব্বা। বছর কয়েক আগে কেটে পাঞ্জাবি বানিয়েছি।’

আমি তখন হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছি না। নুরু ভাই গলায় খুশি খুশি ভাবটা ধরে রেখে বললেন, ‘তুই তো নিয়মিত লেখালেখি করিস, আমার এই গল্পটাও লিখে রাখবি। শিরোনাম হবে “দশ বছরের জুব্বা পঁচিশ বছরে ফাড়া পাঞ্জাবি।”’

আমি সম্মতির মতো মাথা নাড়লাম। নুরু ভাই অদ্ভুত ভঙ্গিমায় হাসতে লাগলেন। যেন এই মাত্র বিরাট কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছেন। এই জন্য তাঁকে নোবেল প্রাইজ দেয়া উচিত।

একদিন, বসন্তের বিকেলে নুরু ভাইসহ আমরা বের হলাম। আমীন ভাইয়ের দোকানে নাকি মিসওয়াক খুব ভালো পাওয়া যায়। দোকানে পা রাখতেই মিসওয়াকের ডালাটা ধপাস করে আমাদের সামনে রাখলেন আমীন ভাই। মুহূর্তেই নির্দোষ ডালাটার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম আমরা। মিসওয়াক করার বিশেষ পদ্ধতি আছে। সে অনুযায়ী উপযুক্ত মিসওয়াকটা সবার চাই। সামান্য চওড়া, মাথার দিকটা ঈষৎ বাঁকা, বাকিটা সটান। সবাই তখন মিসওয়াক বাছাইয়ে ব্যস্ত, আমি আড়চোখে নুরু ভাইয়ের দিকে তাকালাম। ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝে-মাঝে বিশেষ পদ্ধতিতে দাঁত দিয়ে নখ কাটছেন।

সবার পছন্দসই মিসওয়াক কেনা শেষ হলো। এবার নুরু ভাই ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। এলোমেলো ডালাটায় যেগুলো পড়ে আছে সেগুলো একেকটা ধনুকের মতো ত্যাড়া। এগুলো ব্যবহার করা দাঁতের বিরুদ্ধে সিপাহি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার মতো। নুরু ভাই শান্ত গলায় বললেন, ‘এসব এখন কী করবেন?’

দোকানি হতাশার ভঙ্গিতে ঠোঁট উল্টে বলল, ‘কী আর করুম। লস খাইলাম আরকি।’

তারপর নুরু ভাই যেটা করলেন আমাদের জন্য সেটা ছিল এক অপার বিস্ময়। প্রায় অব্যবহারযোগ্য চারটা মিসওয়াক কিনলেন দ্বিগুণ দামে। টাকাটা দোকানির কাঁপা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেচারার হা করা মুখটা বন্ধ হবার আগেই দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এলেন।

ক্লাসে একটা পরিবর্তন ঘটেছে। বড়সড় পরিবর্তন। নুরু ভাই পড়ছেন। শুধু পড়ছেনই না, রীতিমতো ডুব মেরেছেন। যেন অনন্তকাল এভাবেই কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়টা হলো, তিনি ক্লাসের কোনো বই পড়ছেন না। চোখ-মুখ কঠিন করে দিনরাত কোরআন তেলাওয়াত করছেন। কাতার প্রতিযোগিতার ঠিক আগে ইমাম-হাফেজরা যেরকম পড়া দেন, ঠিক সেরকম। যদিও নুরু ভাইয়ের কাতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। কৌতূহলী প্রশ্নটা তাই অনেকের কাছ থেকেই এসেছিল। কিন্তু নুরু ভাই নির্বিকার। হঠাৎ একদিন আমাদেরকে জড়ো করলেন। ছোটখাটো প্রস্তুতি পর্ব সেরে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘তোরা তো জানিস, যে ব্যক্তি পুরা কোরান মুখস্ত করবে সে বিনা বাধায় জান্নাতে যাবে। আর যে মুখস্ত করে ভুলে যাবে তার ঠিকানা নির্ঘাত জাহান্নাম। এখন আমায় বল, তোরা কয়জন পুরো কোরআন এক বসায় শুনাতে পারবি। পরকালে আল্লাহ যখন আদেশ করবেন, পড় দেখি। কোথাও যদি আটকে যাস, অবস্থাটা তখন কী দাঁড়াবে?’

চিলেকোঠার মতো ছোট্ট কামড়াটায় রাজ্যের নীরবতা নেমে এল। সবার মুখ থমথমে। সবাই যেন স্ট্যাচু। খাঁ খাঁ করা ক্লাসরুমটায় হঠাৎ গর্জে উঠল আমার কণ্ঠস্বর—‘তাই বলে সব কাজকর্ম ফেলে কোরআন নিয়ে বসে থাকার কোনো অর্থ নেই। যথাসাধ্য চেষ্টা করলে, কোরআনের বিধিনিষেধ মেনে চললে কল্যাণ তার জন্যই।’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বললাম। গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে ঢোক গিললাম। নুরু ভাই স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার কাছ থেকে এই উত্তর হয়তো তিনি আশা করেননি। আমি ঝট করে চোখ নামিয়ে ফেললাম। অতল সেই দৃষ্টি ভেদ করে মনের ভাষা পড়ে ফেলার সাহস আমার হয়নি। কোনোদিন ছিলও না।

শ্রাবণের ভেজা হাওয়া বইছে। বৃষ্টিস্নাত পরিবেশ। জানালাঘেঁষা অতিকায় আম গাছটা বৃষ্টিস্নানে মজেছে। কালচে সবুজ পাতাগুলো মৃদু বাতাসের ঝাপটায় তিরতির করে কাঁপছে। সন্ধ্যা থেকে নুরু ভাইয়ের পাত্তা নেই। আধভেজা পাঞ্জাবিটা নিয়ে যখন রুমে ঢুকলেন ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা পেরিয়েছে। একটু যেন অস্বাভাবিক মনে হলো নুরু ভাইকে। চোখ-মুখ ভীষণরকম ফোলা। প্রচুর কেঁদেছেন বোঝা যায়। ঠিক এই পর থেকে আমরা আবিষ্কার করলাম সম্পূর্ণ অন্য জগতের এক নুরু ভাইকে। যে নুরু ভাই সারাদিন ঘরকুণো হয়ে বসে থাকেন। ক্লাসে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয়, কোনো এক অসহনীয় যন্ত্রণা বুকে চেপে রেখে বেঁচে চলেছেন।

নুরু ভাই ছিলেন মাঝারি মানের ছাত্র। ক্লাসের পড়া কোনওরকম শেষ করে পরীক্ষায় টেনেটুনে পাশ করার ক্ষমতা তার ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করলেন। তার বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠল। শিক্ষাবর্ষের শেষদিন সহসা একটু নির্জনতায় তাকে পেয়ে গেলাম। আমূল পরিবর্তনের রহস্যটা জেনে নেয়ার মোক্ষম সুযোগ। পরক্ষণেই ভেতর থেকে প্রবল বাধার সামনে পড়লাম। পৃথিবীর তাবৎ রহস্য জেনে ফেলার অধিকার আমার নেই।

 

তিনটি বসন্ত কেটে গেল। সময়ের গতি অতি তীব্র। সময়ের স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় সুখ-দুখ আর হাসি-কান্নার গল্পগুলো। স্মৃতির ক্যানভাসে ধুলো জমতে থাকে। একেক সময় উজ্জ্বল হয়ে উঠে ফেলে আসা দিনগুলোর নির্মল প্রতিচ্ছবি। ভেতরটা তখন হু হু করে ওঠে।

অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই একদিন পেয়ে যাই নুরু ভাইয়ের খবর। শহরের অদূরে একটি মাদরাসায় অধ্যায়নরত। নুরু ভাই এখন আর হলদে জামা পরেন না। পেছনের বেঞ্চে বসে আশ্চর্য ভঙ্গিতে ঝিমান না। নুরু ভাই এখন ক্লাসের সবাইকে তাকরার করান। তিনি এখন সকলের মধ্যমণি। ছাত্র-শিক্ষক সবার গর্বের পাত্র।

আমার কেন যেন শূন্য শূন্য লাগে। ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মাঝে মাঝে চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়। গলা ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছে হয়—‘নুরু ভাই, ভাল থাকুন আপনি। ভাল থাকুক আপনার আশপাশের মানুষগুলো।’

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢালকানগর মাদরাসা, ঢাকা

সেপ্টেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১