গ্রামীণ জীবনের জন্য হাহাকার

সংখ্যা:

 

গ্রামে যাঁরা শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে গ্রাম ছেড়েছেন জীবনের নানান তাগিদে, তাঁদের কাছে গ্রাম শব্দটা একটা হাহাকারের মতো। গ্রামের আলাপ কিংবা গ্রামীণ যেকোনো দৃশ্য বা গল্পের বর্ণনায় গেলে নিদারুণ নস্টালজিয়া তাঁদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। বুক ফুঁড়ে বের হয় হাহাকার-ভরা দীর্ঘশ্বাস। শৈশব-কৈশোরের উচ্ছল স্মৃতি জীবন্ত হয়ে জ্বলজ্বল করে চোখের তারায়।

ব্যক্তিগত কাসুন্দি দিয়েই আলাপ টানি। পাকাপাকিভাবে গ্রাম ছেড়ে এসেছি অনেকদিন। জীবন-সংসারের নানা ব্যস্ততায় চাইলেই এখন আর গ্রামে যেতে পারি না। কিন্তু গ্রামের জন্য একটা হাহাকার সারাক্ষণ তাড়া করে ফেরে। গ্রামীণ পরিবেশে যারা বেড়ে ওঠে, তারা বোধহয় নাগরিক মানুষের চেয়ে অনেকগুণ বেশি স্মৃতিকাতরতায় ভোগে। অন্তত আমার বেলায় এটাই বাস্তবতা।

জীবনের নিষ্পাপ অধ্যায় শৈশব-কৈশোরের মধুর আর দুরন্তময় দিনগুলো ফেলে এসেছি গ্রামে। যুগ দেড়েকের ব্যবধানে গ্রামের চরিত্র ও পরিবেশে এখন অনেকখানি, বলা ভালো আমূল পরিবর্তন এসেছে। আমাদের বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে যে আনন্দ, হৈ-হল্লা কিংবা উচ্ছলতা ছিল, আজকের শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠার দিনে সে-সবের অনেকখানি দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন কিংবা প্রযুক্তি।

গ্রামীণ জীবনে শিশু-কিশোরদের জন্য সকালবেলার মক্তব-যাতায়াত ছিল আবশ্যকীয় একটা বিষয়। পরিবার ধনী হোক কিংবা গরিব, ভোরবেলা দিনের আলো ফুটবার আগে আগেই গ্রামের প্রতিটা ঘরের মায়েরা নিজেদের শিশু সন্তানদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন। ফজরের নামাজ পড়ে মুসল্লিরা যখন বাড়িমুখো হন, গ্রামের ছেলেমেয়েরা তখন একহাতে রেহাল-কুরআন বুকে জড়িয়ে আরেক হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে মক্তবের উদ্দেশে হাঁটে।

গ্রামের চিরায়ত এই দৃশ্যেও এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন ঘরের ছেলে-মেয়েরা মক্তব-গমন থেকে বিমুখ হচ্ছে। চলতি ও বিগত দশকে গ্রামাঞ্চলে কেজি স্কুল বা কিন্ডার গার্টেন নামে বাচ্চাদের জন্য বিশেষায়িত একধরনের বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। মোটামুটি ভালো অংকের বেতনের বিনিময়ে গ্রামের সম্পন্ন ঘরের ছেলে-মেয়েরা এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। এ ধরনের বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয় খুব ভোরে, মক্তবের সময়ে। ফলে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা ঘুম থেকে উঠে বিদ্যালয়ে যাবার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, মক্তবগমনের আর সুযোগ হয় না তাদের।

বাংলার মুসলিম শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষার ভিত হচ্ছে সকালের মক্তব শিক্ষা। মক্তবের এ শিক্ষার বাইরে ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনার খুব একটা সুযোগ ঘটে না অধিকাংশ ছেলে-মেয়ের। কেজি বা কিন্ডার গার্টেন ধারার স্কুলগুলো গত দুই দশকে মক্তব শিক্ষা থেকে অনেকটা কৌশলে দূরে সরিয়ে এনেছে তাদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশকে। ফলে গ্রামের সাবাহি মক্তবগুলো যেমন জৌলুস হারাচ্ছে দিন দিন, তেমনি প্রাইমারি বিদ্যালয়গুলোও হয়ে উঠছে কেবল নিম্নবিত্ত ও গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের পাঠশালা।

গ্রামীণ জীবনে নাগরিক ছোঁয়া লেগেছে। এই ছোঁয়ায় মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু গ্রাম্য সেই সৌন্দর্য আর ধর্মীয় আবহ নাগরিক ‘উন্নতি’র নিচে চাপা পড়ে পিষ্ট হচ্ছে দিন দিন। আমার নিজের গ্রামের কথাই বলি। একসময় বিদ্যুত ছিল না। সন্ধে রাত পেরোতে না পেরোতেই গ্রামজুড়ে নেমে আসত সুনসান নীরবতা। গ্রামের বাসিন্দাদের প্রায় সকলেই দিনমানের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর সন্ধ্যার পরপর রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে যেতেন। স্কুল-মাদরাসায় পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে যে ঘরে আছে, সেসব ঘরে কেবল সন্ধ্যারাত পেরিয়ে একটু সময় গড়াতো। ছেলে-মেয়েদের পরদিনের বিদ্যালয়ের পড়া তৈরি হওয়া অবধি খাবার-দাবারে বিলম্ব করা হতো। মা-বাবা বা ঘরের অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত সদস্যের তদারকিতে হারিকেন কিংবা কুপি বাতির লালচে আলোয় জলদি জলদি তাদেরকে পড়া তৈরি করে নিতে হতো। তারপর খাওয়া-দাওয়া করে ঘুম।

ফজরে বা ভোরের আলো ফুটবার সাথে সাথেই আবার প্রাণ-চঞ্চল হয়ে উঠত প্রতিটা ঘর। ছেলেমেয়েরা তড়িঘড়ি করে মক্তব-গমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঘরের পুরুষ লোকটি লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে গরু হাঁকিয়ে ক্ষেতের উদ্দেশে চলে যাচ্ছে, আর বউ-ঝিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ছে রান্না-বান্নার কাজে। সূর্য তখন সবে উঁকি দিতে শুরু করেছে।

এই ছিল গ্রামের সাধারণ নিয়ম। গ্রামজুড়ে কেবল চৌধুরী বাড়ির লোকেরাই গভীর রাত করে ঘুমোতো, আর সকালে ঘুম থেকে উঠত ঘড়ির কাঁটা নয়টা সাড়ে নয়টার ঘর পেরোলে। এর কারণ ছিল চৌধুরী বাড়িতে ব্যাটারি-চালিত একটি সাদাকালো টেলিভিশন ছিল। ছিল সিডি প্লেয়ারও। বাড়ির লোকজন গভীর রাত অবধি টিভিতে মগ্ন থাকত, রাত গভীর হলে পরে টিভি বন্ধ করে ঘুমোতে যেতো। এ নিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা কানা-ঘুঁষাও ছিল। মসজিদের ইমাম সাহেব থেকে নিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষ নাখোশ থাকতেন এবং আড়ালে আবডালে চৌধুরী বাড়ির ‘বদদীনি’ নিয়ে ব্যাপক গোস্বাও প্রকাশ করতেন। কিন্তু চৌধুরীদের প্রতিপত্তির কারণে সামনে কিছু বলার সাহস পেতেন না।

তারপর গ্রামে বিদ্যুত এলো। আলোর বন্যায় ভেসে গেল পুরো গ্রাম। প্রায় ঘরে ঘরে, একসময় যারা চৌধুরী বাড়ির সাদাকালো টিভি নিয়ে বদনাম করত তাদের ঘরেও, শোভা পেতে লাগল রঙিন টিভি। গভীর রাত অবধি সচল থাকে ঝলমলে রঙিন পর্দা। ফলে জৌলুশ হারায় ভোরের চঞ্চল-মুখর গ্রামীণ পরিবেশ। বিদ্যুতের কল্যাণে গ্রামে জন্ম নেয় অনেকগুলো ‘চৌধুরী বাড়ি’।

তারপর আরও সময় গড়ায়। প্রযুক্তির কল্যাণে স্মার্টফোন সহজলভ্য হয়ে ওঠে। এখন আর টেলিভিশনের জরুরত পড়ে না। গ্রামে টেলিভিশনের ব্যাপকতা লাভের পরও ধর্মের দোহাইয়ে যারা এসবের সমালোচনা করত, আর মানুষের মধ্যে ‘বদদীনি’র সয়লাব দেখে আফসোস ও হাহাকার করত, তাদের হাতেও এখন একেকটা ‘মিনি টেলিভিশন’।

প্রযুক্তির কল্যাণে গ্রামীণ জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে, পরিবর্তন আসাটা কাম্যও, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এতটাই পরিবর্তন এসেছে যে বাঙালি গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত যে জৌলুশ, তা হারিয়ে গেছে কালের গহীনে।

 

সেপ্টেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১