পড়ালেখা শেষ করে আমি নিয়মিত গ্রামে বসবাস করছি আজ পাঁচ বছর, কিন্তু গ্রামের প্রতি আমার মুগ্ধতাটা কমছে না। দিন দিন বাড়ছে কেবল। আমি এখনো সীমাহীন আনন্দ নিয়ে গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকি। গ্রামীণ প্রকৃতির ছোট ছোট ব্যাপারগুলোও আমাকে টান দিয়ে ধরে রাখে। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটা বাঁশঝাড় আছে, ওখানে আগে ঘন জঙ্গল ছিল। কিছু জায়গা এমন ছিল, সূর্যের দিনেও সেখানে রোদ ঢুকতো না। বাঁশঝাড়, বুনো গাছপালা, কবরস্তান, আলোছায়া, উঁচুনিচু ঢেউ খেলানো ছোট্ট ভূমি।
বেশ কয়েক বছর আগে আমি জায়গাটাতে মাঝে মাঝে পিচ্চিদেরকে নিয়ে ক্যাম্পিং করতাম। খোলামেলা একটা জায়গায় পাটি বিছিয়ে রাখতাম। চেয়ার-টেবিল থাকতো। টিফিন বাটিতে করে খাবার নিয়ে যেতাম। তখন তো আজকালের মতো মোবাইল ছিল না, টেপরেকর্ডার নিতাম। খাতা-কলম, বই, ছবি আঁকার জন্য জলরঙ, ক্যানভাস ইত্যাদি নানাবিধ আয়োজন। একদম পিচ্চিদেরকে পাটিতে বসিয়ে রাখতাাম। একটু বড় যারা, তারা থাকতো একদম স্বাধীন। কেউ জঙ্গলের ভেতর ঢুকে আনন্দ আর ভয় নিয়ে এদিক-সেদিক হাঁটতো। কেউ কেউ পাখি, পিপীলিকা, মাকড়সার জাল বোনা ইত্যাদির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো। আর আমি একটু ছবি আঁকতাম, একটু বই পড়তাম, সংগীত শুনতাম, কখনো গাছপালা মাঠ আর শিশুদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
আমাদের একটা এয়ারগান ছিল। আমার নিশানা ভালো ছিল না কোনোকালে। সারা জীবনে আমি পাখি মারতে পেরেছি মাত্র দুইটা। তবু, মাঝে মাঝে ঠুশঠাশ করতাম। এটা মূলত আমার ক্ষুদ্র অ্যাডভেঞ্চারের অংশ ছিল। আরেকটা ব্যাপার ছিল বেশ মজার। চারকোণা একটা ছোট্ট জায়গা ছিল। ছোট ছোট লতাগুল্ম ছিল পুরো জায়গাটা জুড়ে। ওখানে অনেক প্রজাপতি থাকতো। বলতে পারেন, প্রজাপতির হাট বসতো সেখানে। আমি পিচ্চিদেরকে নিয়ে এর ভিতরে ছেড়ে দিতাম। শিশুদের সাড়া পেয়ে প্রজাপতির রাজ্যে একটা হইচই পড়ে যেত। কয়েকটা শিশু রঙবেরঙের অসংখ্য প্রজাপতির মাঝখানে ঢুকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আছে, উচ্ছ্বল হাসিতে মুখ ভরে আছে, এবং এগুলোকে ধরার জন্য প্রাণপণ দৌড়াচ্ছে—এসবের চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে!
মাঝে মাঝে আমি একাও যেতাম। গ্রামের ঝিম ধরা দুপুরে নিঃসঙ্গ হয়ে বেতবনের পাশে বসে থাকতাম লম্বা সময় ধরে। সে সময় আমার মনে একটা গোপন ইচ্ছাও কাজ করতো। আমি মনে মনে সাপ দেখতে চাইতাম। সাপকে আসলে আমি অনেক ভয় পাই। কিন্তু সাপের শারীরিক সৌন্দর্য অসাধারণ। এবং নিরাপদ দূরত্ব থেকে তাদের মসৃণ পথচলা, আচরণ গতিবিধি—ব্যাপারগুলো দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।
শুধু গাছপালাই নয়, একটা জিনিসে যখন আপনি মুগ্ধ হয়ে থাকবেন, তখন এর ছোটখাটো ব্যাপারগুলোও আপনার মধ্যে আনন্দ ছড়াবে। একদিন আমি পথ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম, হঠাৎ দেখলাম দুটো মোরগ এতো ভীষণভাবে ঝগড়া করছে, আমি শিশুদের মতো দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘ সময় এদের ঝগড়া দেখলাম। পথের পাশে যখন ভাঁটফুল ফুটে, অন্ধকারে ফুলের থোকাগুলো ধবধবে আলোর মতো লাগে। আমি দেখি আর জীবনানন্দের কথা মনে পড়ে।
আরেকটা ব্যাপার বলি। ঘর থেকে বের হয়েই আপনি গ্রামজুড়ে নানা রকমের শিশুদের দেখা পাবেন। কেউ পাতাকুড়োনি, কেউ স্কুল যাচ্ছে। টুকটুক করে মাত্র হাঁটতে শিখেছে, এরকম পিচ্চিদেরকেও দেখবেন এখানে-সেখানে অযথাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি ওদের জীবনধারাটা বোঝার চেষ্টা করি। এরকম একটা শিশুকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার মতো আনন্দের আর কিছু হয় না। গ্রামের মানুষগুলোও বিচিত্র রকমের। ওদের জীবনের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু অনুভব করার আছে।
গ্রামে খুব ঘন হয়ে অন্ধকার নামে। আমি মাঝে মাঝে অন্ধকার দেখতে বের হই। অন্ধকার রাতে একা একা নক্ষত্র দেখার আনন্দ অন্যরকম। এই বয়সেও তুমুল বৃষ্টির দিনে চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি। বেশ লজ্জা লজ্জা লাগে। এতো বড় একজন মানুষ অযথাই বৃষ্টিতে ভিজছে, ব্যাপারটা একটু হাস্যকরই তো।
গ্রামের আরেকটা বিশেষ দিক আমার কাছে মনে হয় এর নীরবতা ও প্রশস্ততা। আপনি ঘরে-বাইরে চতুর্দিকে একটা উন্মুক্ততা ও অনাবদ্ধতার আনন্দ পাবেন। এই উন্মুক্ততায় অভ্যস্ত হয়ে যাবার কারণে শহরে গিয়ে আমার হাঁসফাঁস লাগে।
গ্রামের প্রতি আমার যে মুগ্ধতা এর নানাবিধ দীর্ঘ এবং বিশ্লেষণপূর্ণ বিবরণ আছে। এতে লেখা অনেক লম্বা হয়ে যাবে। কিন্তু চোরাস্রোতের মতো গ্রামীণ জীবনের কিছু দুঃখও আছে। আমার দেখামতে গ্রামের নারীগণ অনেক বেশি নির্যাতিত। ঘরে ঘরে একেকজন নারী যেন একটা দুঃখনদী। বিশেষ করে গ্রামের নারীদের নিয়ে আমাদের একান্ত হয়ে ভাবা উচিত। অশিক্ষিত একটা পরিবারে একটা নারী কতভাবে যে নির্যাতিত হতে পারে আপনি ভাবতেও পারবেন না। গ্রামের যে শালিসপদ্ধতি, মৌলিকভাবে এটি খুবই সুন্দর একটি ব্যাপার। কিন্তু এই সালিশকে ঘিরে যে মাতব্বর শ্রেণীটির উদ্ভব হয়েছে, এর অন্তরালে আছে জুলুমের উৎস। গ্রামের প্রচলিত পঞ্চায়েত প্রথাকেও আমি নিন্দা করতে চাই। পঞ্চায়েতের সূত্রে মহল্লাকেন্দ্রিক যে সংঘবদ্ধতা, এর উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই মহৎ, কিন্তু আমার দেখামতে এই প্রথা মানুষের মধ্যে একটা ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদকে গড়ে তুলেছে এবং মানুষের হৃদয়ের ভেতর ‘পর’-অনুভূতির বাঁধ নির্মাণ করে দিয়েছে।
একটা গ্রামে এই পঞ্চায়েতের মতো আরো নানাবিধ সীমানা আছে। ফ্যামিলি, গোষ্ঠী, পাড়া-মহল্লা, দিক, এবং গ্রামের সীমানা। কোনো এক সীমানার কেউ একজন যখন কোথাও ঝগড়ায় লিপ্ত হয়, তখন সে সীমানার সবাই তার পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নটি তখন খুবই হাস্যকর লাগবে। এ প্রশ্নটি শুধু আসতে পারবে হানাহানি শেষে সবাই মিলে শালিসে বসার পর। গ্রামে গ্রামে মারামারির ব্যাপারটি তো বাংলাদেশের বিখ্যাত একটি বিষয় এবং আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষত। এর বাইরে আছে ‘আশরাফ’-‘আতরাফ’-এর বিভাজন। হিংস্র গ্রামীণ রাজনীতি, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা হানাহানি। এই সমস্যাগুলো শহরে যে নেই এমন না। কিন্তু গ্রামে এগুলোর প্রকাশ হয় বেশি এবং প্রকটতরভাবে। শহরে পরিবারগুলো যার যার মতো থাকে। একে অপরের সাতে-পাঁচে নেই। ফলে, শহরের জীবন অনেকটা বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত। যে যার মতো থাকে। এ কারণে গ্রামীন আপনত্বটা তারা না পেলেও এই আপনত্বের ক্ষতির দিকটি থেকেও তারা বেঁচে থাকতে পারে।
আমাদের সমাজটি এখন পর্যন্ত গ্রামপ্রধান। ফলে, গ্রামের বৈষয়িক উন্নতির বাইরে ভেতরগত এই সমস্যাগুলো নিয়ে সিরিয়াস রকমের কাজ হওয়া দরকার বলে মনে হয়। কিন্তু করবেটা কে?
লেখক : সমালোচক আলেম ও মাদরাসাশিক্ষক, হবিগঞ্জ
সেপ্টেম্বর 2019

