খলিফা সুলাইমান ও আবু হাজেম

সংখ্যা:

 

সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক ছিলেন উমাইয়া খলিফাদের একজন। তিনি একবার মদিনা মুনাওয়ারায় আগমন করলেন। সেখানে তিনি সভাসদদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মদিনায় কি এমন কেউ আছেন, যিনি সাহাবিদের সাক্ষাত লাভ করেছেন?’ তারা বলল, ‘জি, আছেন। তাঁর নাম আবু হাজেম। তিনি সাহাবিদের শিষ্যত্ব লাভ করেছেন। খলিফা তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠালেন। আবু হাজেম খলিফার দরবারে এলেন। খলিফা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার সাথে কেন এ বিচ্ছেদ?’ আবু হাজেম বললেন, ‘আপনি আমার মধ্যে কীসের বিচ্ছেদ দেখলেন?’

‘মদিনার সবাই আমার সাক্ষাতে এলো, অথচ আপনি এলেন না।’

‘বিচ্ছেদ তো হয় বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে। আর আপরি তো আমাকে আগে থেকে চিনতেন না। আমিও আপনাকে কখনো দেখিনি।’

খলিফার পাশে ছিলেন মুহাম্মদ বিন শিহাব জুহরি। আবু হাজেমের জবাব শুনে খলিফা তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইনিই ঠিক বলেছেন। ভুল আমি বলেছি। এরপর খলিফা বললেন, ‘আবু হাজেম, মৃত্যুকে কেন আমরা অপছন্দ করি?’

‘কারণ, আপনারা দুনিয়াকে সজ্জিত করেছেন আর আখেরাতকে বিরান কওে দিয়েছেন, তাই সাজানো দুনিয়া থেকে পরকালের বিরানভূমিতে যাওয়া আপনাদের অপছন্দ লাগে।’

‘যথার্থই বলেছেন। তো, আল্লাহর সামনে আমরা কীভাবে উপস্থিত হবো?’

‘নেককার ব্যক্তি উপস্থিত হবে যেভাবে মানুষ প্রিয়জনের সাথে মিলিত হয়। আর বদকার উপস্থিত হবে পালিয়ে যাওয়া গোলামের মতো।’ খলিফা তখন কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, ‘হায় আফসোস! আল্লাহর কাছে আমাদের ভাগ্যে কী আছে?’

‘কুরআনে তা বলা হয়েছে।’

‘কী বলা হয়েছে?’

‘বলা হয়েছে—“নিশ্চয় পূণ্যবানগণ থাকবেন নেয়ামতের স্বাচ্ছন্দ্যে আর পাপীরা  জাহান্নামে।’

‘আল্লাহর রহমত কাদের জন্য?’

‘নেককারদের জন্য।’

‘সর্বোত্তম আমল কোনটি?’

‘আল্লাহর আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা।’

‘সবচেয়ে সঠিক কথা কোনটি?’

‘যাঁকে আপনি ভয় করেন অথবা যাঁর থেকে কিছু আশা করেন তাঁর সামনে হক কথা বলা।’

‘মানুষের মধ্যে কে সবচেয়ে জ্ঞানী?’

‘যে নিজে ভালো কাজ করে এবং মানুষকে করতে বলে।’

‘আর কে বেশি মূর্খ?’

‘যে মন্দকাজে অন্যকে সাহায্য করে। সে তো নিজের আখেরাতকে অন্যের দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।’

‘ঠিক বলেছেন।’

‘আমাদের বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য?’

‘আমিরুল মুমিনিন, আপনি আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না তো?’

‘না, আপনি কিছু উপদেশ দিন।’

‘আপনার পূর্বপুরুষগণ মানুষকে তরবারি দিয়ে ভয় দেখিয়েছেন। তাঁরা কোনো পরামর্শ এবং মানুষের কোনো রায় ও সিদ্ধান্ত ছাড়াই খেলাফত ছিনিয়ে নিয়েছেন। তাঁরা যা বলেছেন এবং মানুষ তাঁদেরকে যা বলেছে তা শুনলে অবশ্যই আপনি বুঝতে পারতেন।’ আবু হাজেমের এ কথা শেষ হতেই খলিফার সভাসদদের একজন বলে উঠলো, ‘আবু হাজেম ঠিক বলেননি।’ আবু হাজেম তখন বললেন, ‘তুমি ভুল বলেছ। আল্লাহ ওলামাদের থেকে সত্য প্রকাশ করার এবং সত্য গোপন না করার প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন।’ তখন খলিফা  বললেন, ‘তাহলে সংশোধনের উপায় কী?’

‘অহংকার পরিত্যাগ করুন। নম্র আচরণ করুন, আর ইনসাফের সঙ্গে বণ্টন করুন।’

‘খলিফা আবু হাজেমেকে অনুরোধ করে বললেন, ‘আপনি আমাদের সঙ্গ দেবেন কি? তাহলে আমরা আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতাম আর আপনিও আমাদের থেকে কিছু লাভ করতেন।’ আবু হাজেম বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমি যদি আপনাদের সাথে থাকি তাহলে তো আল্লাহ জীবন এবং মৃত্যুর দ্বিগুণ সাঝ দেবেন।’ এরপর খলিফা  আবু হাজেমের কিছু চাওয়ার আছে কিনা জানতে চাইলেন। আবু হাজেম বললেন, ‘আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন এবং জান্নাতে প্রবেশ করান।’

‘আমার তো সে ক্ষমতা নেই।’

‘তাহলে এ ছাড়া আমার চাওয়ার আর কিছু নেই।’

সবশেষে খলিফা বললেন, ‘আমার জন্য দুআ করুন।’ আবু হাজেম দুআ করলেন, ‘আয় আল্লাহ! সুলাইমান যদি তোমার ওলি হয়ে থাকে তাহলে তুমি দুনিয়া ও আখেরাতের সবকল্যাণ তাঁর অধীন করে দাও। আর যদি তোমার শত্রু হয় তাহলে তুমি তাকে যা ইচ্ছা করো।’ এরপর আবু হাজেম চলে গেলেন। খলিফা তাঁর পিছু পিছু  মূল্যবান উপঢৌকন পাঠালেন। আবু হাজেম তখন বললেন, ‘এ উপঢৌকন যদি আমার নসিহতের বিনিময়ে হয় তাহলে তো বিপদের অবস্থায় মৃত পশু বা শুকরের গোশত আমার জন্য এর চেয়ে বেশি হালাল। আর যদি তা আমার জন্য বায়তুল মালের পক্ষ থেকে হয় তাহলে এর তো আরও অনেক অংশীদার আছে। তাদেরকেও যদি সমানভাবে দেয়া হয় তবে আমি নিতে রাজি আছি, অন্যথায় আমার এর কোনো প্রয়োজন নেই।’

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১