বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে ধর্মবিষয়ক একটি বিভাগ থাকে। চরম সেকুলার এবং ইসলাম-বিদ্বেষী পত্রিকায়ও এ বিভাগটি রাখা হয়। এ বিভাগ রাখাটা যেন নিয়ম। তবে তা খুব অবহেলিত ও উপেক্ষিতভাবেই রাখা হয়। এমন অবহেলা বা উপেক্ষার সঙ্গে বিভাগটি রাখার কীই-বা দরকার, সংশ্লিষ্টজনরাই ভালো বলতে পারবেন। সপ্তাহের ‘ধর্মবার’ বা ছুটির দিন শুক্রবারে এ বিভাগের জন্য কোনো পত্রিকা ভেতরের সাদা-কালো একটি পৃষ্ঠা কোনো পত্রিকা অর্ধ পৃষ্ঠা ‘খয়রাত’ করে রাখে। শুক্রবার দিন পাঠক একটু ধর্মমুখো হন, মসজিদে জুমা পড়তে যান, এ দিনে ধর্ম বিষয়ক কিছু কথাবার্তা তাঁদেরকে শোনাতে পারলে পত্রিকার প্রতি তাঁদের একটা ধার্মিক ধারণা তৈরি হবে যে, নাহ, পত্রিকাটা ধর্ম-কর্ম মানে—এই চিন্তা থেকেই হয়তো ধর্মপাতার প্রচলন হয়েছিল আমাদের জাতীয় দৈনিকগুলোতে।
গৎবাঁধা সেই প্রচলন এখনও চলমান। সাম্প্রতিক কালে দু-একটি পত্রিকায় কওমি ঘরানার আলেম লেখকদের সম্পৃক্তির কারণে এই বিভাগটিতে খানিকটা পরিবর্তন ও নতুনত্ব এলেও অধিকাংশ পত্রিকাই থেকে গেছে পুরোনো গৎবাঁধা আয়োজনে। গত কয়েক শুক্রবারের পত্রিকাগুলোর ধর্মপাতা ঘেটেঘুটে মনে হলো ইসলাম নিছক একটি ধর্ম; শবে মেরাজ, রজবের ফজিলত, দরুদ শরিফের আমল, নামাজ-রোজা—এসবের বাইরে যেন ইসলামের খুব কোনো কাজ নেই। কেমন যেন মনে হলো ইসলামকে খণ্ডিত ও পঙ্গু একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করার জন্যই পত্রিকাগুলোর এ আয়োজন।
দৈনিক ইত্তেফাকের ২৯ মার্চ ২০১৯ শুক্রবার সংখ্যায় ধর্মচিন্তা শিরোনামে ভেতরের একটি পৃষ্ঠার সিকিভাগ বরাদ্দ ছিল। কাজা নামাজের বিধান এবং রজব ও শাবানের করণীয় শিরোনামে ছোট্ট দুটো লেখা তাতে স্থান পেয়েছে। একই দিন দৈনিক সমকালে ইসলাম ও সমাজ শিরোনামে ভেতরের একটি পৃষ্ঠার অর্ধেক বরাদ্দ ছিল ধর্মবিভাগের জন্য। সেখানেও গৎবাঁধা আয়োজন। দৈনিক নয়া দিগন্তে পূর্ণ একপৃষ্ঠা বরাদ্দ থাকলেও বিষয়বস্তুতে কোনো নতুনত্ব নেই।
বাংলাদেশ প্রতিদিন এ ক্ষেত্রে নিজেদের উদারতার পরিচয় দিতে গিয়ে সম্পাদকীয় পাতার এক কোণায় প্রতিদিনই ইসলামের এবাদত-বন্দেগি ও ফজিলত সম্বন্ধীয় ছোট্ট একটি কলাম রাখে। শবে মেরাজের শিক্ষা ও করণীয়, দরুদের ফজিলত, নামাজের গুরুত্ব, ইসলামে নারী ও শিশুদের বিশেষ মর্যাদা—এই ধরনের বিষয়বস্তুর ওপরে নিতান্ত দায়সারা গোছের লেখা থাকে। জায়গার অপ্রতুলতার কারণে তাও প্রকাশিত হয় খুব সংক্ষেপে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ধর্ম বিষয়ক জীর্ণ শীর্ণ এই কলামের পাশেই থাকে তসলিমা নাসরিনের বিশাল লেখা। যেখানে এই মহিলা তার চিরায়ত নোংরা পদ্ধতিতে ইসলাম ও মুসলমানকে আচ্ছামতো তুলোধুনো করেন।
দৈনিক ইনকিলাবের ধর্মপাতা পূর্ণ পৃষ্ঠা জুড়ে থাকলেও সেখানে বিদআতি ও বিভ্রান্ত মতবাদের লেখাই বেশি স্থান পায়। এবং সেগুলোও যথামাফিক দায়সারা গোছের।
দৈনিক যুগান্তরেও প্রতি শুক্রবারে পূর্ণ এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ থাকে ইসলাম বিভাগের জন্য। উল্লেখিত পত্রিকাগুলোর তুলনায় যুগান্তরের আয়োজন খানিকটা ব্যতিক্রমধর্মী। বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ইসলামি ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার, ইসলাম বা মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ফিচার, নিবন্ধ থাকে তাদের আয়োজনে। ধর্মপাতার সম্পাদকের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে বেশ কয়েকজন কওমি পড়ুয়া তরুণ এই আয়োজনগুলো সাজান। তবে ধর্মপাতার এ সম্পাদকের ব্যক্তিগত আকিদা বিভ্রান্তিমূলক হবার কারণে মাজার ও বিদআতের সমর্থনেও মাঝে মাঝে বেশ কিছু লেখাজোখা ছাপা হয়।
দৈনিক কালের কণ্ঠের আয়োজন ব্যতিক্রমধর্মী না হলেও বেশ গোছালো এবং চমৎকার। তবে এ মাস থেকেই ইসলাম বিষয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজনের উদ্যোগ নিচ্ছে পত্রিকাটি। একদিনের পরিবর্তে এখন সপ্তাহে ছয় দিন রাখছে ইসলাম পাতা। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার অর্ধ পৃষ্ঠা আর শুক্রবার পূর্ণ পৃষ্ঠা নিয়ে থাকছে তাদের এ আয়োজন। কুরআনের ধারাবাহিক তাফসির, হাদিসের আয়নায় মানবজীবন, মুসলিম বিশ্বের সর্বশেষ খবরাখবর, ইসলামি সভ্যতা সংস্কৃতি অর্থনীতি ও বিজ্ঞান বিষয়ে ফিচার, আলোকিত জীবন গড়ার সার্বিক নির্দেশনা—এই বিষয়গুলো নিয়ে সাজানো হচ্ছে আয়োজনটি। নিঃসন্দেহে এটা প্রশংসনীয় এবং ইসলামের সার্বিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে তা বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
দৈনিক সময়ের আলো নামে নতুন একটা দৈনিক এসেছে বাজারে। গতানুগতিকতার বাইরে এসে এরাও আলাদা একটা গুরুত্ব দিচ্ছে ইসলাম পাতায়। অর্ধ পৃষ্ঠার আয়োজন হলেও সপ্তাহের প্রতিদিনই থাকছে এ আয়োজন। বিষয়-মান বিচারে তাদের কাজও প্রশংসাযোগ্য।
তবে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকার ইতিহাসে অভূতপূর্ব ও প্রশংসনীয় কাজটা করছে আলোকিত বাংলাদেশ। সপ্তাহের সাতদিনই আলাদা গুরুত্বের সঙ্গে পূর্ণ একটি রঙিন পৃষ্ঠা নিয়ে তারা ইসলাম বিষয়ক ব্যতিক্রমী আয়োজন করে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, সপ্তাহের একেক দিন ইসলাম সম্পর্কিত একেকটা বিষয়ের ওপর ভিন্ন শিরোনামে তারা কাজ করছে। এবং আক্ষরিকভাবে ইসলাম শব্দটা তারা শিরোনামে রাখে না। কিন্তু সপ্তাহের সবদিনের কাজ একত্রিত করলে ইসলামের সামগ্রিক সৌন্দর্যই যেন ফুটে ওঠে তাদের এ আয়োজনে।
এপ্রিল 2019

