স্মৃতি দিয়ে শুরু
রাত তখন বেশ গভীর হয়ে গেছে। মাঘ মাসের ঝুম শীতের রাত। ছোটকাকুর ঘরে তাঁর পাশে শুয়ে আছি। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কেন যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছে। প্রথম সাময়িকের ছুটিতে বাড়ি এসেছি। ছুটি শেষ হবার আর কয়দিন বাকি আছি, কবে ফিরতে হবে মাদরাসায়—শুয়ে শুয়ে সাত-পাঁচ ভাবছি।
হঠাৎ মনে পড়ল—আরে আজ তো আমার ডায়েরি লেখা হয়নি! কী করি এখন! ডায়েরি তো আম্মুর ঘরে রাখা। রাতও অনেক গভীর হয়ে গেছে। আম্মুরা ঘুমিয়ে পড়েছেন সেই কখন। কিন্তু ডায়েরি লেখা তো মিস করা যাবে না। দু’লাইন হলেও লিখতে হবে। মোটামুটি ভালোরকমের পেরেশানিতে পড়ে গেলাম। এত রাতে ছোটকাকুর পাশ থেকে উঠে যাওয়া বেশ দুরুহ কাজ। ছোটকাকু ঘুমোচ্ছেন ঠিক, আমি উঠতে গিয়ে নড়াচড়া করলে জেগে যাবার সমূহ আশঙ্কা বিদ্যমান। জেগে গেলে ঘাড় ধরে আবার শুইয়ে দেবেন। তকদিরে চড়-থাপ্পড় দু’-একটা লেখা থাকলে সেগুলোও বুঝে নিতে হবে। তাছাড়া এত রাতে আম্মুর ঘুম ভাঙানোও কতটা ঠিক হবে! কিন্তু ডায়েরি আমাকে লিখতে হবে। মাস তিনেক আগে নিয়মিত ডায়েরি লেখার যে প্রতিজ্ঞা করেছি নিজের কাছে, প্রতিজ্ঞা ভাঙা যাবে না।
ছোটকাকু-সংক্রান্ত যাবতীয় আশঙ্কা ও চড়-থাপ্পড়ের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে সন্তর্পণে বিছানা থেকে নামলাম। না, ছোটকাকু জাগেননি, ঘুমোচ্ছেন। তারপরও ভয় কিন্তু কাটেনি, দরোজা খুলতে শব্দ হলে জেগে যেতে পারেন—এ আশঙ্কা মোটেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। খুব সতর্কতার সঙ্গে ছিটকিনিতে হাত রাখলাম। দরোজাটা অল্প খানিক ফাঁক করে আলগোছে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। ছোটকাকু জাগেননি।
আম্মুর দরোজায় বারকয়েক নক করতে ধড়মড়িয়ে উঠে দরোজা খুলে দিলেন। তাঁর চোখে-মুখে অজানা শঙ্কা—এত রাতে কেন উঠে এলাম? তাঁকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একটা কিছু বলে বুঝ দিলাম। কী বলেছিলাম, এখন আর মনে নেই। আসল ব্যাপারটা বললে তিনি ভালো করে বুঝতেন না, বোঝার কথাও না এবং বকা দিতেন।
যাই হোক, আম্মুর ঘর হয়ে ছোটবোনের পড়ার টেবিলে রাখা ডায়েরিটা খুলে ডিমলাইটের অস্পষ্ট আলোতে তিন-চার লাইনের রোজনামচা লিখেছিলাম সেদিন। শুধু ধারাবাহিকতা রক্ষা করা; যেন নিয়মিত ডায়েরি লেখায় কোনো ছেদ না পড়ে এবং নিজের কাছে করা প্রতিজ্ঞার ব্যত্যয় না ঘটে।
এই কাহিনিটা যখন মিজান পড়ি, তখনকার। কোথায় যেন পড়েছিলাম, খুব সম্ভব আদীব হুজুরের ‘এসো কলম মেরামত করি’র কোনো এক জায়গায়—লেখক হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হচ্ছে নিয়মিত রোজনামচা লেখা। আদীব হুজুর সম্ভবত এও বলেছিলেন, তিনি নিয়মিত রোজনামচা লিখতেন, একদিনও মিস দিতেন না, আর এ থেকেই তাঁর লেখালেখির প্রাথমিক মশকটা হয়ে গিয়েছিল। এ ধরনের কিছু কথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মিজানের বছর আমি প্রতিজ্ঞা করি যে এখন থেকে নিয়মিত রোজনামচা লিখব। চোখে তখন ‘লেখক’ হওয়ার দুর্দমনীয় স্বপ্ন। ভালো লেখক হওয়ার জন্য যেকোনো ধরনের কসরত করতে সদা প্রস্তত থাকতাম।
ডায়েরি লেখার উপকারিতা
নিয়মিত ডায়েরি লেখার প্রতিজ্ঞাটা মিজান শেষ করে নাহবেমিরের বছর অবধি অটুট ছিল। একাধারে প্রায় দেড় বছরের মতো লিখেছিলাম রোজনামচা। এর ভেতর একদিনও ব্যত্যয় হয়নি। যেখানেই যেতাম, অনিবার্যভাবে ডায়েরি আমার সঙ্গে থাকত। এমনকি বিভিন্ন ছুটি-ছাটায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়াতে গেলেও। ফলে যেটা হয়েছে, লেখালেখির প্রাথমিক মশকটা বেশ সফলতার সঙ্গেই সেরে ফেলা গেছে। একসময় লিখতে বসলে লেখা বের হতে চাইত না কলম থেকে, এই সমস্যাটার সমাধান করা গেছে নিয়মিত ডায়েরি লেখার মাধ্যমে। এখন লিখতে বসলে হাত থমকে থাকে না, লেখার মান ভালো-মন্দ যেমনই দাঁড়াক, লিখে ফেলা যায়। একজন লেখকের জন্য এই যোগ্যতাটা অনেক বড় কিছু। এই যোগ্যতা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম নিয়মিত ডায়েরি লেখা।
তাছাড়া নিজের ফেলে আসা জীবনের বড় একটা স্মৃতি ধরে রাখে ডায়েরি। ধরে রাখে প্রতিটা দিনের যাপিত জীবনের ভাবনাগুলো। কৈশোর-তারুণ্যে ঘটে যাওয়া যেকোনো বড় বড় ইস্যুতে কী ভেবেছিলেন আপনি, নিজের ডায়েরি বের করলে সব জীবন্ত হয়ে ধরা দেবে।
আপনি যদি বিখ্যাত কেউ হতে পারেন পরবর্তী জীবনে, তাহলে কৈশোর-তারুণ্যে লেখা আপনার ডায়েরিগুলো, ডায়েরির ভেতরের ভাবনাগুলো অসংখ্য বোদ্ধা দ্বারা ব্যাপকভাবে চর্চিতও হতে পারে।
অনলাইন-নির্ভরতার ভালো-মন্দ
নাহবেমিরের শেষ দিকে এসে ফেসবুকে নিয়মিত হই। প্রতিদিনের ভাবনাগুলো স্ট্যাটাসে লিখে ফেলতাম। নিয়মিতই লিখতাম ফেসবুকে। বেশ কিছু মানুষ উৎসাহ দিতেন কমেন্টবক্সে এসে। ফলে ডায়েরি লেখা থেকে মনযোগ উঠে যায়। প্রথমে এক-দুই দিন, পরে চার পাঁচ-দিন—এ রকম ছেদ পড়তে পড়তে ডায়েরি লেখার কথা একসময় বেমালুম ভুলেই যাই। মাস পেরিয়ে গেলেও এখন আর ওভাবে ডায়েরি খোলা হয় না। এখন ডায়েরি খুলি অতীত রোমন্থনের জন্য। এর চেয়ে বেশি কিছু না। অনলাইন-নির্ভরতা ডায়েরি লেখার আবেদনকে ম্লান করে দিয়েছে।
কিন্তু ডায়েরি-কলমে লিখতে যে আরাম, যে অনাবিল ভালোলাগা, কি-বোর্ড-মোবাইল-ল্যাপটপের যান্ত্রিকতায় সে আরাম-ভালোলাগার পরশ পাওয়া যায় কই? ফেসবুকে যেহেতু নিজের লেখা অন্যরা পড়তে পারে, তাই ডায়েরিতে যেভাবে নিজের মনের একান্ত গোপন কথাগুলো নির্ভাবনায় লেখা যেত, ফেসবুকে তা পারা যায় না। হ্যাঁ, অনলি মি করে লেখা যায়, কিন্তু ও-তে ডায়েরিতে লেখার আরাম বা ভালোলাগা পাওয়া যায় না। অনেক সময় অনলি মি প্রাইভেসিতে লিখতে ভালোও লাগে না। যেখানে সবাইকে নিজের ভাবনাগুলো পড়ানোর সুযোগ আছে, সেখানে কেন অনলি মি করে লিখব? ফলে সবাই পড়তে পারে—এমনভাবেই ভাবনাগুলো তৈয়ার করতে হয়, নিজের একান্ত ভাবনাগুলো নিজের মতো করে আর লেখা হয় না। যাপিত জীবন থেকে পাওয়া নিজের একান্ত দুঃখ-সুখের কথা ডায়েরির গোপন পাতায় লিখে নিজেকে নির্ভার করার যে সুখ পাওয়া যেত, ফেসবুক বা অনলাইন সেটা আমাদের দিতে পারছে কই?
আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি
একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ দিয়েই লেখাটা শেষ করি। ডায়েরি বা ডায়েরি সংক্রান্ত বাতচিতে অনিবার্যভাবে একটা ডায়েরির আলাপ আমাদের সামনে চলে আসে, আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি। আনা ফ্রাঙ্ক ইহুদি মেয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ইহুদিরা। সেই ধারাবাহিকতায় আনা ও তার পরিবারও ছিল। নাৎসি বাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে বেশ কিছুদিন আনা ও তার পরিবার মাটির নিচে বাংকারে আত্মগোপনে ছিল। আনা ১৩ বছরের কিশোরী। আত্মগোপনে থাকাকালীন তাঁর রোজকার ভাবনাগুলো প্রতিদিন ডায়েরির পাতায় লিখে রাখত। লিখে রাখত ইহুদিদের ওপর চলা নাৎসি বাহিনীর নির্মমতার কথা। তার ও তার পরিবারের ভীত-বিহ্বল জীবনযাপনের কথা।
যুদ্ধ শেষ হবার প্রাক্কালে আনার পুরো পরিবার ধরা পড়ে নাৎসি বাহিনীর হাতে। আনা টাইফয়েডে আক্রান্ত হয় এবং চিকিৎসাহীনতায় একদিন মারাও যায়। তার কিছুদিন পর নাৎসি বাহিনী তার পরিবারকে মেরে ফেলে। কিন্তু আনার বাবা বেঁচে যান। আনার ডায়েরি তাঁর হস্তগত হয়। তিনি পরবর্তী সময়ে সেটা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি প্রচারমাধ্যমের কল্যাণে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অনূদিত হয় অসংখ্য ভাষায়। মানুষ তুমুল আগ্রহ নিয়ে পাঠ করে নিষ্পেষিত এক ইহুদিকন্যার অবরুদ্ধ কৈশোরের দিনলিপি। বিবেকবান মানুষের হৃদয় থেকে ঝরে পড়ে তার জন্য নিদারুণ সমবেদনা।
কিন্তু সময়ের কী পরিবর্তন! একসময়কার নিষ্পেষিত সেই আনা ফ্রাঙ্কের ভাই-বেরাদররাই আজ শোষকের ভূমিকায়। ফিলিস্তিনের লাখো মানুষ তাদের নিষ্পেষণের শিকার হয়ে আজ বাস্তুহারা। ফিলিস্তিনিদের ওপর তাদের নৃশংস নির্মমতার মাত্রা এতটাই ছাড়িয়ে গেছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের ওপর আপতিত নাৎসি বাহিনীর জুলুম নির্যাতন এর তুলনায় কিছুই না। একাধারে ৭০টি বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের তারা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বঞ্চনা ও নির্মমতার আঘাতে নিষ্পেষণ করে আসছে। আনা ফ্রাঙ্ক আজ বেঁচে থাকলে আর স্বজাতির এই নৃশসংসতা দেখলে কী করত? নিষ্পেষিত মানুষের পাশে দাঁড়াত? নাকি কট্টর ইহুদি মেয়ে হিসেবে চোখ বুঁজে স্বজাতির পক্ষাবলম্বন করত? নির্যাতিতা হিসেবে আনার প্রতি আমাদের সহমর্মিতা আছে ঠিক, কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আনার মতো লাখো কিশোরী আজ ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে ডুকরে কাঁদছে। আনার ভাই-বেরাদরের হাতেই নিষ্পেষিত হচ্ছে অসংখ্য মুসলিম ‘আনা’। তাদের কেউ কেউ হয়তো শরণার্থী শিবিরের জীর্ণ কুটিরে বসে আনার মতোই লিখে রাখছে নিজেদের বঞ্চনার দিনলিপি।
নবধ্বনির সহকারী সম্পাদক
ফেব্রুয়ারি 2019

