শিরোনামটি দেখে যে কারো হাসি পাবার কথা। কথাটি শুনেছিলাম ছোটবেলার একজন শিক্ষকের কাছে। এখন শুনে হাসি পেলেও যার কাছে শুনেছিলাম তিনি বলতেন বড় বেদনা নিয়ে।
বছরের একটা সময় সপ্তাহের প্রায় দিনই মাদরাসার আশেপাশে কোথাও না কোথাও মাহফিল থাকত। আর মাহফিল যেখানেই থাকুক তার একটা মাইক থাকত মাদরাসার বারান্দার ঠিক সামনে। ভলিউম বাড়ানো থাকত উচ্চ মাত্রায়। বিকাল থেকে নিয়ে রাত বারোটা পর্যন্ত কান ঝালাপালা হয়ে যেত আমাদের। রাতে মাহফিল শেষ হবার আগ পর্যন্ত ঘুম হত না কারো।
ওয়াজ মাহফিলকে শব্দদূষণের এই অত্যাচার বাংলাদেশের সব জায়গায় চলে। মাহফিল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত মাইক লাগানো হয়। কেউ যেন মাহফিল থেকে বঞ্চিত না থাকে সেজন্য হয়ত এই ব্যবস্থা।
নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। অনেকে হয়ত মাঠে বসে ওয়াজ শুনতে পারেন না। তারা দূরে বসে শুনতে পারেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এত দূর পর্যন্ত মাইক দেয়াটা অনেকের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক বাড়িতে বৃদ্ধ বা ছোট শিশুরা থাকে। মাইকের শব্দে তাদের অবশ্যই কষ্ট হয়। তার ওপর আমাদের দেশের খুব কম বক্তাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওয়াজ করেন। ওয়াজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা এমনভাবে তর্জন গর্জন করেন, শুনে যে কারও পিলে চমকে যায়। সেখানে ছোট শিশু বা দুর্বল হার্টের অসুস্থ কেউ হলে তো কথাই নেই।
সত্যি সত্যি ওয়াজ মাহফিলের মত পবিত্র ও পুণ্যময় একটা কাজ আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে মসিবত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা শহরে বেশিরভাগ এলাকাতে মাঠ নেই। তাই রাস্তা বন্ধ করে চলে মাহফিল। সেসময় মানুষকে চলাফেরা যে দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা চোখে পড়ে না কারোরই।
ওয়াজ মাহফিল আমাদের দেশে এখন শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর অক্টোবর নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত শত সহস্র মাহফিল হয় সারাদেশে। এসব মাহফিলে আয়োজক থাকে মসজিদ-মাদরাসা, বিভিন্ন সমিতি ও এলাকার লোকজন। কোনো কোনো মাহফিলে রাজনৈতিক বা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কার মাহফিল কতটা জাঁকজমক হবে এবং কত বেশি নাম হবে সেই চেষ্টায় থাকেন সবাই। ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা নিজেদের তুলে ধরার একটা সুযোগ পান মাহফিলকে কেন্দ্র করে।
ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন অনেক ভালো কাজ। মানুষকে দীনের কথা শোনানোর জন্য অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করে এই আয়োজন করা হয়। কিন্তু তাতে উদ্দেশ্য যদি এমন নড়বড়ে থাকে তাতে সওয়াব তো পণ্ড হয়ই সাথে মানুষ কতটা উপকৃত হয় তাও চিন্তার বিষয়।
মাহফিলগুলোতে যারা বক্তা হয়ে আসেন তাদের কথাও একটু বলি। সুর আর কেচ্ছা-কৌতুক বলে ওয়াজ করতে বেশিরভাগ ওয়ায়েজ পছন্দ করেন। কেউ কেউ বলেন, মানুষ এসব পছন্দ করে। নিতান্ত খোঁড়া যুক্তি।
বক্তা যদি মানুষের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে কথা বলেন তাহলে তার কথা শ্রোতা আর কী মানবে? তিনিই তো তাদের অনুগত হয়ে গেলেন। শ্রোতার চাহিদা তৈরি করা তো বক্তারই কাজ। তিনি এমন কিছু বলবেন যাতে শ্রোতারা তার কথায় আগ্রহবোধ করে। কখন কী বলা দরকার তা বক্তার নিজেকে বুঝতে হবে। শ্রোতার চাহিদার ওপর নির্ভর করলে তাহলে আর বক্তার স্বকীয়তা থাকল কই?
ওয়াজ মাহফিলগুলো কেন্দ্র করে আয়োজকরা যেমন প্রতিযোগিতায় নামেন তেমনি এসময় নিজেকে জাহির করার একরকম অপচেষ্টা করেন অনেক ওয়ায়েজই। মাহফিলের পোস্টারে নিজের নামের শুরু ও শেষে প্রয়োজনীয় উপাধি যেন লেখা হয় সেজন্য আয়োজকদের বেশ সাবধান করেন তারা। মতপার্থক্য রয়েছে এমন কোনো বক্তা যেন সেই মাহফিলে আমন্ত্রিত না হোন সেজন্যও কড়াভাবে সতর্ক করেন। মাহফিলে শ্রোতাদের আকর্ষণ করতে আয়োজকরাও নির্দ্বিধায় নানা হীন কাজের আশ্রয় নেন। পোস্টারে বিশেষ বক্তার নামের শেষে হুজুর হেলিকাপ্টার থেকে নামবেন, শিশু বক্তা, অন্ধ বক্তা, হিন্দু থেকে মুসলমান, মহিলা থেকে পুরুষ ইত্যাদি লিখে আয়োজকগণ শ্রোতা আকর্ষণের চেষ্টা করেন। পোস্টার ওয়াজ মাহফিল নাকি নানা কিসিমের বক্তার প্রদর্শনী তা বুঝতে আমরা দ্বিধায় পড়ে যাই।
ওয়াজ মাহফিল একটি ধর্মীয় আয়োজন। এতে শ্রোতাদের লাভটাই মুখ্য হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক লাভ বা নাম প্রচার-এসব উদ্দেশ্য হলে ওয়াজ মাহফিল পুণ্যের বদলে পাপের উৎস হয়ে যাবে। ধর্মের লাভ হওয়ার বদলে উল্টো ক্ষতিই হবে। এই ক্ষতির দায় সবার আগে থাকবে মুফতি, মুহাদ্দিস, পীর সাহেবগণের ওপর। তাই সচেতন হওয়ার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়।

