কোনো জাতির সার্বিক অগ্রগতির মূলমন্ত্র হলো শিক্ষা। শিক্ষা বিষয়টি একটি সার্বজনীন, ব্যাপক ও বিস্তৃত অধ্যায়। তাই একে কোনো সংজ্ঞা বা তত্ত্ব দ্বারা সার্বজনীন রূপে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাধারণত শিক্ষা বলতে মন-মানসিকতার উৎকর্ষ সাধন করে ব্যক্তি গঠনের পাশাপাশি আত্মিক উৎকর্ষ সাধনপূর্বক সমাজে সাফল্যজনক অবদান রাখাকেই বুঝায়। এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও সম্পদের সুষম ব্যবহারের জন্য শিক্ষা একটি মৌলিক ব্যবস্থা। আমাদের দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে নিম্নমানের ও দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। যা আমাদের জাতির মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিচ্ছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো এই জাতির মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙেই যাবে, যা পরে হাজার চেষ্টা করলেও দাঁড় করানো যাবে না। দেখা যাবে, একদিন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বাংলাদেশ নামক দেশটি মুছে গেছে। জাতিকে এই বিপদের হাত থেকে বিশেষ করে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ উপহার দিতে হবে। আর তার জন্য বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে কঠিনভাবে। শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সমস্যাগুলো নির্ণয় করে তার সমাধানের সঠিক পথ বের করে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
মূলত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক ধাঁচে গড়া। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল করে শিক্ষাব্যবস্থার বিন্যাস করেছিল। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন সময়ে সরকারিভাবে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের লক্ষে বিভিন্ন শিক্ষাকমিশন গঠন করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন জাতি গঠনে সক্ষম হচ্ছে না। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী হয়তো শিক্ষার হার বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, কিন্তু সেবাধর্মী নৈতিকতাসম্পন্ন জাতি গঠিত হচ্ছে না। এদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষাব্যবস্থা তার কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে পারেনি।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার কিছু সমস্যা :
শিক্ষার স্তর : আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাঁচটি স্তরে বিভক্ত। যেমন : প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। শিক্ষার এসব স্তরের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় ও ধারাবাহিকতা না থাকার ফলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় এক অরাজকতা ও বেহাল দশা পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর এখনো অবহেলার পর্যায়ে। হাতেগোনা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি হিসেবে সুযোগ সুবিধা পেলেও এখনও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান সেসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অথচ শিক্ষা-কারিকুলাম অনুযায়ী অভিন্ন সিলেবাস ও একই পদ্ধতিতে পরীক্ষা হচ্ছে। বিস্তর ব্যবধান পরিলক্ষিত হয় সাধারণ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্য পুস্তকের সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যম ও-লেভেল কিংবা এ-লেভেল শিক্ষাব্যবস্থায়। এসব স্তরের সমন্বয় সাধন একান্ত জরুরি হলেও সরকার এখনও অনেকটা উদাসীন বলে মনে হচ্ছে।
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক : বর্তমান সময়ে শিক্ষার অবনতির ফলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানচর্চার প্রতি নিবিষ্ট নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এখনকার ছাত্ররা যতটা বেপরোয়া এবং উন্নত জীবনযাপনের ধান্ধায় ব্যাপৃত শিক্ষকরাও ঠিক ততটা বৈষয়িক। এর ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে এবং শিক্ষাঙ্গনে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
ছাত্ররাজনীতি : স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এখন রাজনীতির ক্যাম্পাসে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতা পেয়ে তা আঁকড়ে থাকার রাজনীতি ছাত্রসমাজের মধ্যে দুষ্ট প্রভাব ফেলেছে, তারই ফলে দেশের বিদ্যাপীঠগুলো যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এতে শিক্ষার মানের ঘটেছে চরম অবনতি।
ডিগ্রি অর্জনের স্পৃহা : আজকাল জ্ঞানার্জনের থেকে ডিগ্রি অর্জনের দিকে অনেকের দৃষ্টি বেশি। তাই লেখাপড়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের মনোযোগ অনেকটা কমে আসছে। কোনোরকম একটা ভালো ডিগ্রি অর্জনের প্রত্যাশায় তারা অবৈধ উপায় অবলম্বন করছে। সহজে পাশ করার লোভে অনেকেই ছুটে চলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারের দিকে। কম পড়ে পাশ করার জন্য অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবই পরিহার করে ঝুঁকে পড়ছে নোট-গাইডের প্রতি।
শিক্ষকদের উদাসীনতা ও ব্যবসায়িক মনোভাব : শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সন্তোষজনক নয় বিধায় তারা লাভের আশায় গৃহশিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের প্রতি অধিক তৎপর। বিদ্যা যেখানে অর্থের বিনিময়ে বেচাকেনা হয় সেখানে শিক্ষার মান বড় কথা নয়, ডিগ্রিই মূল লক্ষ। তাই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়, ফলাফল তৈরিতে কারচুপি হয়, এতে দেখা যায় অনেকের পরীক্ষা না দিয়েও ভালো রেজাল্ট আসে আবার কেউ ভালো পরীক্ষা দিয়েও কাঙ্খিত ফল পায় না। এতে অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত অন্ধকারে তলিয়ে যায়।
অপসংস্কৃতির প্রভাব : সমাজ এখন অপসংস্কৃতির জোয়ারে ভাসছে। রেডিও টেলিভিশনের অশ্লীল অনুষ্ঠান, কুরুচিপূর্ণ চলচ্চিত্র, স্যাটেলাইট চ্যানেল ইত্যাদি নবীন শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাই অধ্যয়ন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তারা। আমাদের অভিভাবক সচেতন হলে এরকমটা কখনো হতো না।
শিক্ষাব্যবস্থার এ করুণ হালাত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, সরকার- মোট কথা আমাদের সবাইকে বিদ্যমান এ সমস্যা সমাধান কল্পে সচেতন হতে হবে।

