বিক্ষিপ্ত চিন্তার সংক্ষিপ্ত কথন

সংখ্যা:

এক সময় মনে হতো পলিটিক্যাল পাওয়ার ছাড়া শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানে হলো সাগরে মাটি ফেলে দ্বীপ তৈরির প্রচেষ্টা। এর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এখন যে চিন্তাটাকে পুরোপুরি ভুল মনে করি, ব্যাপারটা তাও নয়। এখন মনে হয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা যুগপৎ হতে হবে। অন্যথায় কোনোটিই টিকে থাকতে পারবে না।

তুরস্কে যখন ধর্মনিরপেক্ষতা চালু হয়, তখন সেখানকার সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ইসলাম প্রভাবিত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তির কাছে তখন সংস্কৃতির পরাজয় ঘটে। পরের ইতিহাস আমাদের জানা। আবার তালেবানসহ বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দলের শাসন দেখে এই অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া শুধু বন্দুকের জোরে কখনো ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না।

আমাদের দেশে এক সময় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ইসলামি চেতনার প্রতিনিধিত্ব করতেন সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। তাদের কাছে ইসলাম ছিল কিছু আচার-আচরণ পালন এবং আধ্যাত্মবাদ চর্চার নাম। নজরুলের লেখায় জিহাদি চেতনার দেখা পাওয়া গেলেও তা ছিল তার মানসিক বিদ্রোহী চেতনা-উদ্ভূত। ফলে তার লেখায় সামগ্রিক ইসলাম অনুপস্থিত। অন্যদিকে ফররুখ ছিলেন স্বাপ্নিক কবি। তিনি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন কিন্তু তা বাস্তবায়নের পথ বলে যাননি। ফলে এদেশের সংস্কৃতিতে ইসলাম বলতে বুঝায় শরিয়ত-মারেফত নিয়ে পালাগান।

সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ইসলামি প্রতিনিধিত্বের এই দীর্ঘ স্থবিরতার সুযোগে এদেশের জনমানসের উপর চেপে বসেছে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি আর পশ্চিমা কালচার। এখন আর এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পিউর ইসলামি চেতনা লালন করে না। তারা মনে করে শুক্রবারে নামাজ পড়াই হলো ইসলাম।

মোঘল পরবর্তী যুগে বাংলা অঞ্চলে মুসলমাদের রাজনৈতিকভাবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের অনেকেই ইসলামি মনোভাবাপন্ন ছিলেন। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা তর্কবাগীশ, মাওলানা ভাসানী জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বরণীয় হয়েছেন। মাওলানা ভাসানী কমিউনিজমে বিশ্বাসী হলেও সেটা ছিল মডিফাইড কমিউনিজম। ইসলামকে ত্যাগ করে তিনি কমিউনিস্ট হননি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামের এই ইনফ্লুয়েন্স পরবর্তীতে আর ধরে রাখা যায়নি।

আমরা সব কাজে পিছিয়ে থাকি এটা তো পুরনো কথা। এই পিছিয়ে থাকার পেছনে সঙ্গত কারণ আছে। আমরা নতুনকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত নই। আর সেটা যদি হয় বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার, তাহলে তো আস্তাগফিরুল্লাহ। এই মনোভাবটাই আমাদের সবকিছুতে পিছিয়ে দেয়। আরেকটা ব্যাপার হলো আর্থিক অস্বচ্ছলতা। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবাইকে আবু জর গিফারি হতে শেখানো হয় কিন্তু কাউকে উসমান গনি হতে শেখানো হয় না। অথচ ইসলামের বেঁচে থাকার সঞ্জীবনীর জন্য দুজনকেই দরকার। তাই দুনিয়ায় তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লব হলো আর আমরা চোখ বুজে থাকলাম। ওয়েব দুনিয়ায় ওরা নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করল আর আমরা ওদের দাস হলাম। আমাদের ছেলেরা ২০১৩ সালে এসেও ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালাল।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব করতে হলে যোগ্য বিপ্লবী ও কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের তা নেই। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর বিকাশেরও সুযোগ নেই। সত্যি বলতে ওই দেয়ালিকা প্রকাশ আর কয়েকটা ইসলামি সঙ্গীত সর্বস্ব সংস্কৃতি চর্চা দিয়ে আগামী একশো বছরেও কিছু হবে না। বরং ক্রমশ আমাদের অবস্থান দুর্বল হতে থাকবে।

আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক কর্মী আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু আমাদের জামিয়াগুলো এর উল্টো। এর পরিবর্তন না হলে সামনের পরিস্থিতি হবে খুবই কঠিন।

সামগ্রিক প্রচেষ্টা ছাড়া ব্যক্তিগত কাজ দিয়ে জাতীয় সফলতা অর্জন করা যায় না। তাই মানুষের মাঝে নিজেদের চেতনা ছড়িয়ে দিতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। আবার কোনো কিছু হওয়ার না হলে জোর করে হওয়ানোও যায় না। কলামিস্ট মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন একবার বলেছিলেন- ‘সবাই বলে আমাদের মিডিয়া করতে হবে। আমি বলি মিডিয়া করতে গেলে হবে না। তবে হয়ে গেলে হয়ে যাক।’ কথাটার তাৎপর্য তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারি। জোর করে কিছু হওয়ানো যায় না। যেটা হওয়ার এমনিতেই হয়ে যায়। এর জন্য দরকার সময়ের প্রয়োজনটাকে অনুভব করতে পারা। আমরা সব সময় মুক্তাজায়ে হালের কথা বলি। আমাদের মধ্যে সমষ্টিগতভাবে এর আমল নেই। সময়ের পালস বুঝা ছাড়া কখনো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায় না। যে সময়ের দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়, সময় তাকে বরবাদ করে দেয়।

আজকের বাংলাদেশের কনটেক্সটে এদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ইসলাম সংখ্যালঘু। এর দায় কার, সে আলাপ করতে গেলে বিতর্কের সৃষ্টি হবে। তার চেয়ে একটু আশাবাদী হওয়া যাক।

আজকে নবধ্বনির মতো একটা পত্রিকা তাদের পথচলার দশ বছর পূরণ করছে। এর অর্থ পরিবর্তন আসছে। মুহিউদ্দিন খানের হাত ধরে বাংলা ভাষায় পিউর ইসলামের যে প্রতিনিধিত্ব, তা ধরে রাখার স্বেচ্ছাসেবকের বড়ই অভাব। আমাদের অঙ্গনের পত্রিকাগুলো অনেক আগে থেকেই ধুকছে। অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এর জন্য অনলাইন লেখালেখির আগ্রাসন থাকলেও আসল সমস্যা হলো পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। নবধ্বনি সেই সমস্যা মুকাবেলা করে টিকে আছে বলে নবধ্বনি পরিবারকে আমাদের শুকরিয়া জানানো কর্তব্য।

আমি আশাবাদী মানুষ। আমি বিশ্বাস করি সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন তিমিররাত্রি বিদর্ঢু করে উদিত হবে প্রভাত-সূর্য। কারণ, আমি জানি, আমাদের তারুণ্যের চেতনার মশালে আবার নতুন করে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়েছে। এই আলো একদিন তাড়িয়ে দেবে জাতির আকাশ থেকে অশুচির যতো অন্ধকার।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১