আক্কাস চাবুক লয়ে খাড়া হয়ে গেলো
হাতে লই সেই চাবুক মাজিতে লাগিলো
দেখিয়া আসহাবগণ করে হায় হায়
সবে বলে এ হালেতে কী হবে উপায়?
পিঠ পাতি দিলো নবি চাবুক মারিতে
কোড়া হাতে আক্কাস যায় নবির পিছেতে
হাজের যতেক ছিলো উঠিলো কাঁপিয়া
আবু বকর হুহু করে উঠিলো কান্দিয়া…।
দুই.
টানা কয়েকদিন বৃষ্টি শেষে রোদের একক আধিপত্যে ফসলি জমি শুকিয়ে চৌচির প্রায়। পুকুর জলাশয়ের পানি অনেকটা কমে গেছে। তেজিয়ান রোদের দাপটে মেঘেরা আকাশের দখল নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত উড়িয়েছে সাদা পতাকা । ভ্যাপসা গরমে হাঁপিয়ে উঠছে জনজীবন। দিনের বেলা কেউ কেউ একটু ঠাণ্ডা পরশের জন্য চলে যান গাছতলায়। কেউবা চেয়ার, মোড়ায় বসে বসে হাতপাখা ঘুরাচ্ছেন। গৃহিণীরা টুকটাক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কোনো কোনো যুবা মেয়ে রাখালের বাঁশিতে তন্ময় হয়ে আপন মনে পাখায় ফুল তুলছে। কখনো পুকুর থেকে ভেসে আসে একঝাঁক পাতিহাসের প্যাক প্যাক ডাক। আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি দেখে মনে হয় শেষ বিকালে অথবা সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামবে। সেই আশায় কোনো কোনো কৃষক তীব্র রোদে তালপাতার ছাতা মাথায় নিয়ে কোদাল কাঁধে চলে চলে যান জমিনে। ক্ষেতের আইল ভালো করে বেঁধে রাখেন যাতে পানি আটকে। রোদ্দুর দিন শেষে গ্রামে যখন সন্ধ্যা নামে তখন স্বস্তির জন্য শীতলপাটি নিয়ে বসে পড়েন আপন আঙিনায়। গল্প গুজবে রাত গড়ায়। আমাদের বাড়ির উঠানও এর ব্যতিক্রম নয়। সন্ধ্যার পর পরই সবাই খোলা আকাশের নিচে বসে পড়েন। আমাদের আলাদা একটা পাটি বিছিয়ে দেয়া হয় পড়ার জন্য। আম্মু হারিকেনের বাতিটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে নিজেরা গপ-গল্পে মেতে ওঠেন। আমাদের মন তখন কি আর পড়ার মধ্যে থাকতো? যদিও চোখ বইয়ের ওপর থাকতো, কিন্তু আমরা নিজেদের তাদের গপ-গল্পে ডুবিয়ে রাখতাম। কখনো পড়ার গুণগুণ অভিনয় করি। কখনো তাও না। হা করে তাকিয়ে আকাশের তারা গুণি। একটা তারা অবিরাম দৌড়াচ্ছে। আমরা তীক্ষè নজর রাখি শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়। দেখতে দেখতে একসময় নিজেরা দৌড় দিই। আমাদের দৌড়ে চাঁদটাও দৌড়ায়। আমরা চাঁদকে নিয়ে টানাটানি করি। চাঁদকে সাথে নিয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়াই। শান্ত স্থির পানিতে থালার মতো চাঁদ দেখে সহ্য হয় না। সাথে সাথে ঘাটে পা ডুবিয়ে পুকুরকে নাড়িয়ে দিই। চাঁদ ভেঙে ফালিফালি। আমাদের মুখে তৃপ্তির হাসি। আমাদের হাসিতে তখন চাঁদনী রাতের হাসি আরো প্রসারিত হয়। আকাশ থেকে চাঁদ তার জোৎস্নার জাল জমিনে আরো বিস্তৃত করে বিছিয়ে দেয়। তখন আমাদের চোখ পড়ে পাতাবনে জোনাকিদের ওপর। দৌড় দিই জোনাকিদের পিছুপিছু। এরি মধ্যে আমরা আঙিনা পেরিয়ে, পুকুর ছাড়িয়ে পাশের নালার পাড়ে চলে এসেছি খেয়াল নেই। আমাদের হাতে মুঠো ভরা জোনাকি। এগুলোকে কাঁচের বোতলে ভরে রাখতে হবে। বোতল দখল করার জন্য ঘরের দিকে ভো-দৌড়। উঠানে এসে থমকে দাঁড়াই চাচার ধমকে! লম্বা কঞ্চি হাতে সেপাইর মতো দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে আমাদের গলা ঠোঁট তখন খরায় পোড়া জমির মতো শুকিয়ে যায়। এই তোদের হাতে কী? -ধমকানো প্রশ্নে আমাদের হাতের মুঠি এমনিতেই খুলে যায়। সাথে সাথে মুঠি মুঠি জোনাকিরা আলো ছড়িয়ে আমাদের পাক খেতে খেতে শূন্যে উড়তে থাকে। আমরা কেবল অসহায় চোখে তাকিয়ে আছি। এই, বই রেখে কোথায় গিয়েছিলি? চাচার আবারও ধমক। আমরা কোনো উত্তর না দিয়ে অনুগ্রহ কামনায় দাদির চোখে চোখ রাখি। দাদি আমাদের পক্ষে উকালতি করে বলেন- আচ্ছা বাদ দিলা। আর করতো নায়। চাচা কঞ্চি হাতে আরেকবার ধমক দিয়ে বলেনÑ আর যদি দেখি একেবারে পিঠের চামড়া তুলে নিবো। আমরা চুপচাপ নতশিরে গিয়ে বইয়ের পাশে বসি। চাচা কঞ্চি ফেলে তিন ব্যাটারি টর্চ জ্বালিয়ে চলে যান। খুব তাড়াতাড়ি ফিরবেন না নিশ্চিত।
হারিকেনের বাতি নিভে যাচ্ছে। হুইল ঘুরিয়ে সলিতা আরো একটু তুললাম। বাতি এবারও নিভে যাচ্ছে। আম্মুকে বললাম- হারিকেনে তেল নেই! আম্মু জানালেন- ঘরেও তেল নেই। দাদু বাজারে আছেন। যাওয়ার সময় কেরোসিনের বোতল নিয়ে গেছেন। আসার সময় নিয়ে আসবেন। একটা অজুহাত দাঁড় হওয়াতে মন আবারও খুশিতে বাকবাকুম। আজ আর পড়তে হবে না। আজ আমাদের ছুটি। হারিকেনের হুইলটা উল্টাপাল্টা ঘুরিয়ে সেটাকে নিভিয়ে দিলাম। আশপাশ কোথাও একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। অবিরাম ডাকে কান ঝালাপালা। আমরা দৌড়ালাম সেই ঝিঁঝিঁ পোকার সন্ধানে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম। একটা গর্তের মুখে মাথা বের করে ঝিঁ ঝিঁ করছে। আমাদের দেখেই গর্তে ঢুকে পড়ে। তমাল দৌড়ে গিয়ে এক বদনা পানি নিয়ে আসে। আমি চাচার ফেলে দেওয়া কঞ্চি হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম সেপাইর মতো। অর্ধ বদনা পানি ঢালতেই সে আর টিকে থাকতে পারলো না। বাইরে বের হয়ে আসলে পূর্ব প্রস্তুত আমি শপাং করে একটা বসিয়ে দিই। অব্যর্থ আঘাতে একটাতেই শেষ। এমন সময় দাদু তার নিভু নিভু টর্চ জ্বেলে উঠানে এসে হাজির। পকেট থেকে আমাদের হাতে চার আনা দামের লজেন্স বের করে দেন। আমরা তাতে মহাখুশি। হাতের ব্যাগটা শীতলপাটির ওপর রাখেন। চাচি কেরোসিনের বোতল আর হারিকেন নিয়ে ঘরে চলে যান। দাদি জিজ্ঞাস করলেন- ব্যাগে কী আনছেন? দাদু জানালেন- গুড় এনেছি পায়েস রান্নার জন্য। কাল বাড়িতে পুঁথির আসর। সবাইকে বলে দিয়েছি। রুস্তম মুন্সি,নন্দিঘোষ সবাই আসবেন। দাদি গুড়ের মচা নেড়েচেড়ে বললেন- এই গরমের দিনে এসব ঝামেলার কী দরকার! দাদু বলেন- ঝামেলা আর তেমন কী? সবাই উঠানে বসে যাবে। বড় ডেগে কিছু পায়েস রান্না করে নিলে সবাই একটু একটু খেয়ে নিলো। আমারও ইচ্ছে ছিলো না। বাজারে ইরফানের দোকানে বসেছিলাম চা খেতে। আরো সবাই বসেছে। রুস্তম মুন্সি চা খেতে খেতে হঠাৎ হালতুন্নবির দু লাইনে টান দিলো। বললাম ধরছো যখন থামলে কেন? আরো কিছু বলো। বলল- ভাইসাব, চায়ের দোকানে কি এসব জমে? তোমার বাড়িতে না হয় একদিন আয়োজন করো, যাবো নে। কালার বাপও বলল- হ মিঞা ভাই, আপনের বাড়িতে অনেক দিন থেকে পুঁথির আয়োজন হয় না। একদিন জমাও না সবেরে। সাজনার বাপও সায় দিলো- মিঞা ভাই দেরি কিসের, একরাত বসে যাই! সবাই ঝেঁকে ধরলো- অতো ডরাও ক্যান মিয়া, বাজার থাকি গুড় দুই কেজি নিয়া পাতলা ক্ষীর কওে নিবেন। হক্কলে খাইলাইমু। অনেক দিন থেকে মেঘ পানি নাই, মনটাও ভালা নাই। জমিন সব এমনি পড়ি আছে। মাঝে মাঝে পুঁথি-টুথি না হুনলে ভালা লাগে না। সবার কথায় ফেঁসে গেলাম!
আমরা কান পেতে দাদু-দাদির আলাপ শুনছি। বাড়িতে পুঁথির আসর। উঠানে হ্যাজাক লাইট জ্বালানো হবে। গ্রামের সবাই আসবে। লোকে লোকারণ্য হবে। আমাদের আনন্দ বাঁধ মানছে না। সে রাতে বুকভরা খুশি নিয়ে ঘুমোতে যাই।
তিন
সবার কানে কানে খবর পৌঁছে যায়।
সন্ধ্যায় পাড়ার গৃহিণীরা ঘরের কাজ-কর্ম সেরে সবাই হাজির। বিকালে ফুপুও এসেছেন তার শশুড়কে নিয়ে। পাড়ার ছেলে-মেয়েদের হৈচৈয়ে আমাদের বাড়ি সরগরম। আমরা উঠানে দৌড়াদৌড়ি খেলছি। অতিষ্ট হয়ে কখনো মাতব্বর গোছের কেউ আমাদের ধমক দেন। আমরা তেমন কান দিই না।
রান্নাঘরে বড় ডেগে ফুপু পায়েস জ্বাল দিচ্ছেন। আরো মহিলারাও সেখানে ব্যস্ত। ততোক্ষণে উঠানে বড় বড় মাদুর-পাটি বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা আনন্দে তাতে গড়াগড়ি দিই। একে একে পাড়ার সবাই জমতে শুরু করছেন। কেউ পাটিতে কেউ খাট টেনে, কেউবা চেয়ারে আসন নিয়েছেন। আড্ডায় আড্ডায় হুক্কা-তামাকের গড়গড় শব্দ হচ্ছে। তারা চাষবাসের কথা বলছেন। খরা ও চৌচির জমি, ফসল ও মহাজনের ঋণ, হাল-বলদ, ঘর-গেরস্তি এসব বৃত্তে তাদের গল্প। মহিলারাও বারান্দায় মাদুরে বসে বিভিন্ন খোশ গল্পে মগ্ন। সেই খোশ গল্পের মধ্যে থেকে কখনো হাসির ঢেউ উঠে বাতাসে মিশে যায়। রুস্তম মুন্সি উঠানের এক কোণে মোড়ায় বসে হুক্কা টানছেন। তাকে ঘিরে সবাই কথার পিঠে কথা বুনছেন। নন্দিঘোষ গলা কেঁশে বলেলন- কী আর পুঁথি পড়বো, এখন গলায় কুলায় না। রুস্তম মুন্সি হুক্কায় গড়গড় শব্দ তুলে ধোঁয়া ছেড়ে বলেন- এতো তাড়াতাড়ি ডেট ওভার হয়ে গেলে নন্দি? কতো মানতো,গত পরশু গিয়েছিলাম তেলিবিল। উঠান ভর্তি মানুষ ছিলো। সারা রাত গাজিকালু টানছি। সকালে দেখি গলা ভাঙ্গি গেছে। দুদিন থেকে নুনের চা আর আদা খেয়ে মোটামুটি ঠিক করছি।
রস্তম মুন্সি হুক্কাটা নন্দি ঘোষের দিকে বাড়িয়ে দেন।
গাল-গল্পে রাত ঘনাচ্ছে। পান,তামাক চলছে সমান তালে। পুরো উঠান এখন লোকে ভর্তি। চাচা বড় হেজাক লাইট ইতিমধ্যে জ্বালিয়ে দিয়েছেন। ভিড়ের মধ্যে বুড়ো মজিদের কর্কশ গলা সহসা চড়াও হলো। তার গরুর রাখাল চুপি চুপি এসে উঠানের এককোণে বসেছিলো। হঠাৎ তার চোখে পড়ে যায়। আঙ্গুল তুলে ধমক দিয়ে বলেন- এই হারামজাদা, তুই এখানে কী? যা, বাড়ি গিয়া ঘুমা। ধমকে রাখাল ছেলেটি একেবারে নার্ভাস। তার চোখ দুটি আশ্রয় খুঁজছে। দাদু সুপারিশ করে বলেন- ছেলে মানুষ আশা করে এসেছে, থাক।
আরে কী কন, সকালে কতো কাম-কাজ, তারে ঘুম থেকে ডেকে তোলা যায় না। কালার বাপ বললেনÑ এসেছে যখন কিছু শুনে তার পর যাবো নে। এই তুই কিছু শুনে চলে যাইছ। বুড়ো মজিদ আর কিছু না বলে বসে পড়েন। রাখাল ছেলেটি আশ্বস্ত হয়ে সেও কাচুমাচু হয়ে বসে পড়ে।
নন্দিঘোষ রুস্তম মুন্সির দিকে ইশারা করে বললেন- সবাই তো এসে গেছে! শুরু করে দেন তাইলে। রুস্তম মুন্সি মোড়ায় বসে পান চিবাতে চিবাতে পুঁথির বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন। সবার দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে বললেন- কী কন, শুরু করে দেই নাকি? সবাই সমস্বরে বলেন- হ, শুরু করে দেন।
এককোণা থেকে একজন দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো- কথা থামাও, শুরু হয়ে যাচ্ছে।
রুস্তম মুন্সি কেঁশে গলা পরিস্কার করে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলেন-
বিশ্ব অধিপতি মহাপ্রভু নৈরাকার – সীমাহীন সংখ্যাহীন প্রশংসা অপার
দিক হইতে দিগন্তরে অনন্ত মহিমা – ব্যোম বিশ্বে বিরাজিত জ্বলন্ত গরিমা
সুকৌশলে সুসজ্জিত বিশ্ব কুঞ্জবন – কোটি বাগবান করিয়া সৃজন
রবি শশী গ্রহ নক্ষত্র শোভিত – গগণের রূপ মুগ্ধকর বিমোহিত
নাহি আনি নাহি সঙ্গী পরিজন – সর্ব সৃষ্টিকর্তা নহে সৃষ্ট কদাচন
বৈজ্ঞানিক যোগী ঋষি বিস্তর তত্ত্বে – কোথা পাবে যিনি জ্ঞানের অগোচর।
রুস্তম মুন্সি এমনভাবে দুলে দুলে পড়ছেন, মুহূর্তের মধ্যে পুরো উঠান কবরস্থানের নীরবতায় ছেয়ে যায়। হামদ-নাতের ছন্দে সবাই হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ছেন। যেন সবাই মহান সৃষ্টিকর্তার প্রশংসায় মগ্ন।
চার
ভূমিকার সরু পথ পেরিয়ে সুরে সুরে এগিয়ে যাচ্ছে মূল পটভূমির দিকে। পুঁথির ছন্দের ঝঙ্কারে ভিড় জমাচ্ছে আকাশের তারকারাজিরাও । দ্বাদশী চাঁদ তার পূর্ণ যৌবন ঢেলে সবাইকে জোস্নায় ডুবিয়ে রেখেছে। অদূরে পাতাবনে জোনাকিরা ওড়াউড়ি করলেও আজ আমাদের কোনো তোড়জোড় নেই। দূরে কোথাও একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। ঝিঁঝিঁ পোকার দল অবিরাম ডাকছে। পুঁথির দোলনায় আসরের সবাই দুলছেন। রুস্তম মুন্সি তার সুরের সুতায় বেঁধে টেনে টেনে আনতে লাগলো সহস্রাধিক বছরের আরবকে। মক্কা, মদিনা, তায়েফ, বদর, উহুদ, খন্দক- সব চোখে ভাসছে চলচ্চিত্রের মতো।
যখন নবিজির ওফাত পবের্র্র বর্ণনা এলো, সবার চোখ অশ্রুসিক্ত। শেষ বিদায়ের সায়াহ্ণে রাসুল তার সাথীদের বলছেন- আমার কাছে যদি কারো কোনো পাওনা থাকে পেশ করো। আমাকে ঋণী করে রাখো না। আমি কোনো ঋণ নিয়ে কবরে যেতে চাই না। সবাই যখন নীরব বোবা কান্নায়, এমনি সময় আছহাব আক্কাস এক মর্দ দাঁড়িয়ে আরজ করলো- হে রাসুল! আমার একটা পাওনা আছে। রাসুল বিনয়ের সাথে বললেন- এক্ষুণি বলো হে প্রিয়সাহাবি!
নবিজি! একদিন আমরা যাচ্ছিলাম যুদ্ধে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে। যাওয়া সময় আপনি ঘোড়ার পিঠে একটি চাবুক মেরেছিলেন। আর সে আঘাত ঘোড়ার পিঠে না পড়ে পড়েছিলো আমার পিঠে। হে রাসূল! আমি তার বদলা নিতে চাই। আজ আমি নিজ হাতে তার বদলা নেবো। রাসূল বিনীত, বলেন- তুমি এক্ষুণি তার বদলা নিয়ে অনুগ্রহ করো। রাসুল তার হাতে চাবুক দিয়ে আপন পিঠ পেতে দিলেন। উপস্থিত সাহাবারা সবাই তাজ্জব!
খিচি মারিবারে চাবুক ঘোড়ার উপর – সেই কোড়া পড়েছিলো মোর পিঠ পর
পাইয়াছি বড় দুঃখ আমি তব হাতে – নবি বলি কহি নাই কিছুই লজ্জাতে
মোর কাছে মুক্ত হতে যদি চাও তুমি – লইবো তাহার দাদ না ছাড়িবো আমি
আবু বকর, উমর, হাসান, হুসাইন সবাই কাকুতি মিনতি করলেন- আমাদের পিঠ থেকে বদলা নিয়ে নাও, তবু নবিজির শরীরে আঘাত করো না। আক্কাস অনড়। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে সিনাটান হয়ে। হাতে মাজছে তেলতেলে চাবুক- আমি অন্যকে মারবো কিসের জন্য? আমাকে যেভাবে মারা হয়েছে আমি ঠিক সেভাবে বদলা নিবো। আমার পিঠে যখন চাবুক পড়ে তখন জামা ছিলো না। এ যেন তপ্ত বালুরাশিতে দিনের পর দিন রোদেপোড়া পাথরের চেয়েও কঠিন হৃদয়। শুষ্ক মরুর চেয়েও আরো ঊষর আরো পাষাণ। উপস্থিত কারো কাকুতি তাকে গলাতে পারছে না। কোনো চোখের জলও পাষাণ হৃদয়কে সিক্ত করতে পারছে না। সে তার সিদ্ধান্তে ইস্পাতশক্ত কঠিন। প্রতিশোধে অনড়।
রাসুল তার গায়ের জামা খুলে উদাম পিঠ সমর্পণ করলেন আক্কাসের চাবুকের কাছে।
এমন নিষ্ঠুরতা দেখে সবার অন্তর কেঁদে উঠলো হু হু করে। হাসান, হুসাইন অবোধের মতো কাঁদছেন। ভীষণ হুলস্থল! এমন সময় আছহাব আক্কাস এমন এক কাণ্ড করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো।
আক্কাস চাবুক তবে রাখিলো জমিনেতে – চুম্ব দিলো রাসুল আল্লাহর মোহর নবুয়তে
কান্দিয়া চুম্বিলো তার নুরানি বদন – কদমের ধূলি লই শিরেতে আপন
বলিলো এই আশা ছিলো অন্তরে আমার – মোহর নবুয়ত করি আখেরি দিদার
সে জন্য বাহানা আমি করি এরূপেতে – ধন্য হইলাম চুম্বি আজ মোহর নবুয়তে
হাল ছাহাবাগণ তাজ্জব তামাম – আক্কাসকে দোয়া দিলো নবি নেক নাম।
পাঁচ
ইসলাম ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। অর্ধ পৃথিবীর শাসক উমর। তপ্ত দুপুরে ঝাঁ ঝাঁ রোদে উত্তপ্ত বালুরাশি পায়ে দলে খলিফা ছুটছেন জেরুসালেমের দিকে। উটের পিঠে ভৃত্য, তার হাতে লাগাম। দরদর করে ঝরছে ঘাম। তবুও খলিফা টেনে চলছেন অবিরাম। জেরুসালেমের লোকেরা সংবর্ধনা দিতে এসে উটের পিঠে বসা ভৃত্যকে খলিফা ভেবে আনন্দে হৈ-হোল্লোড় শুরু করলো। ভৃত্য লজ্জায় কুকড়ে যাচ্ছে। কি করে বুঝায়, খলিফা যিনি তিনি তো উটের রশিতে!
দিনগুলো যেন দ্রুত ফুরিয়ে গেলো। উসমানের শাহাদাতের পর দেখা দিলো বিশৃঙ্খলা। আলি-মুয়াবিয়ার রাজনৈতিক মতানৈক্য চরমে উঠলো। মুনাফিকদের চক্রান্ত। জঙ্গে জমল, জঙ্গে সিফিফনের দামামা। তরবারির ঝনঝনানি, রক্তের বন্যা।
পুঁথির ঝংকারে সব মনের পর্দায় ভেসে ভেসে জোৎস্না প্লাবিত রাতে তন্ময় আসরে কাহিনি ক্রমেই এগোতে লাগলো জঙ্গে কারবালার দিকে। দাদা রুস্তম মুন্সির পাশে বসে দুলে দুলে শুনছেন। কখনো চোখ মুচছেন। গড়গড় করে হুক্কা টানছেন। ঘরে মা একের পর এক পান সুপারি কেটে সাজিয়ে দিচ্ছেন। বারান্দায় মহিলারা শুনছেন নীরব নিস্তব্ধ হয়ে। কেউ কেউ পান চিবাচ্ছেন। কারো কোলে শিশু বাচ্ছা বেহুঁশ ঘুমাচ্ছে। ছন্দ সুরে জীবন্ত হয়ে উঠছে সহ¯্রাধিক বছর আগের সেই দিন। সেই কাহিনি । সবাই জেগে আছেন সেই মক্কা,মদিনা,কুফা, বসরা আর দামেস্কের দাস্তানে।
খেলাফতের বিলুপ্তি, রাজতন্ত্রের পত্তন।
পুঁথি প্রবেশ করলো ইয়াজিদের যুগে।
প্রথমে অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত ভয়ে অনেকেই ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। অস্বীকৃতিতে অটল থাকলেন খেলাফতের ন্যায্য হকদার ইমাম হুসাইন। শুরু হলো ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র। টের পেয়ে ইমাম চলে গেলেন পবিত্র মক্কায়। তখন তার হাতে এসে পৌঁছলো কুফাবাসীর অনুরোধপত্র। হে ইমাম! আমরা ইয়াজিদের বাইয়াতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছি। আপনিই আমাদের পথপ্রদর্শক। আপনিই আমাদের নেতা। আসুন হে ইমাম। উম্মাহর হাল ধরুন। কথা দিচ্ছি, আপনার পাশে থাকবো সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে।’ প্রথমে হোসাইন অস্বীকৃতি জানালেও একে একে তাদের বারো হাজার অনুরোধপত্র উপেক্ষা করতে পারলেন না। স্বল্প কিছু সঙ্গী-সাথী, পরিজন নিয়ে রওয়ানা দিলেন কুফার অভিমুখে। অনেক হিতাকাক্সক্ষী বিজ্ঞ সাহাবি প্রতারক কুফাবাসীর ফাঁদে পা না দেয়ার অনুরোধ করেন। বারণ করলেন কুফায় যেতে। ইমাম হুসাইন কি আর এতোসব কূটকৌশল বুঝেছিলেন? নিষেধাজ্ঞা পেছনে ফেলে ইমাম সাদামনে ছুটে চলেন কুফার পথে। যাত্রাপথে পদেপদে একের পর এক বিপর্যয় নামে। প্রেরিত দূত মুসলিমকে হত্যার সংবাদ আসে। তবুও ইমাম দমলেন না। ঝাণ্ডা নিয়ে ছুটতে লাগলেন। যাত্রা পথে ভাগ্য তাকে এমন এক ময়দানে নিয়ে এলো যেখানে কোনো বসতি নেই। না আছে গাছপালা, না পানি। বিরান এই প্রান্তর যেন শতাব্দী ধরে জ্বলছে ক্ষোভের আগুনে। লু হাওয়ায় শোনা যাচ্ছে সেই ক্রোধের ফুঁসফুঁসানি। সূর্যের কিরণে চিকচিক করছে উত্তপ্ত বালুরাশি । জিজ্ঞেস করলেন অজানা এক পথিককে। যেই শুনলেন মাঠের নাম কারবালা- ইমাম চমকে ওঠেন! মলিন হয়ে যায় তার মুখ।
নন্দিঘোষ পুঁথির ফাঁকে ফাঁকে বুঝার সুবিধার্থে ঘটনা গল্পের মতো বর্ণনা করেন। নন্দিঘোষ যতোক্ষণ বর্ণনা করেন, রুস্তম মুন্সি ততোক্ষণ গড়গড় করে হুক্কা টানেন। নন্দিঘোষের বর্ণনা শেষে রুস্তম মুন্সি হুক্কা একপাশে রেখে আবার পুঁথিতে সুর দেন-
কারবালা ময়দানে যবে হোসাইন পৌঁছিলো – চলিতে ঘোড়ার পাও জমিনে গাড়িলো
হায় হায় তিনবার শব্দ শিরের পরেতে – শুনিতে পাইলেন তিনি গায়েব হইতে
যেখানে জমিতে রাখে কদম ঘোড়ার – খুনের ফোয়ারা ওঠে পাতির আকার
সওয়ারী যতেক পশু পড়িলো বসিয়া – সামনে না যায় কভু সে জায়গা ছাড়িয়া…।
পুঁথির আসরে সময় ঘনিয়ে রাত্রি দ্বি-প্রহর। আমার নাবালক চোখে তখন পর্দা নেমে আসে। পুঁথির ছন্দ সুর আর পটভূমিতে হারাতে হারাতে এক সময় হারিয়ে যাই নিদ্রার অতলে।
রাতজাগা এ-আঙিনায় পুঁথিমুগ্ধ মানুষ তখন দেখছে কারবালার নিদারুণ হাহাকার। শুনতে পাচ্ছে পানির পিপাসায় শিশুদের ক্রন্দন। নারীদের আর্তচিৎকার। ঘোড়ার হ্রেষা ধ্বনি। ঢাল তলোয়ারের ঝনঝনানি। বীর হোসাইন একাই কুপোকাত করছেন শত শত এজিদ সেনা। তরবারির আঘাতে সিটকে পড়ছে মস্তক। রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে কারবালা। ধূলিঝড় তোলে এজিদ ঘোড়সওয়ারীদের পলায়ন, পুনরায় আগমন। আপোসহীন ইমামের অটল সাহসী লড়াই…।
ছয়
তমালের আলতো ধাক্কায় চোখ খুললাম। জেগে ওঠে প্রথমে পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলাম না। চোখ মুছে কেবল পুঁথির সুরে কান দিলাম।
এবার নন্দিঘোষ পাঠ করছেন-
হুসাইন শহিদ হলো কারবালার ময়দানে – কান্দনে পড়িলো সুর আকাশ-জমিনে
মানুষ ফেরেস্তা আদি মাখলুক খোদার – পশু-পক্ষী কান্দে হইয়া কাতর
হৃদয় বিদারী শুনিলো যে জন – কান্দিলো মাতমে হায় হুসাইন
ইমামের খিমার মধ্যে যে কেহ আছিলো – কেহবা কান্দিলো কেহ মুর্ছিত হইলো…।
তমাল আমাকে ধাক্কা দিয়ে ইশারা করলো বারান্দার মাটির সিঁড়ির এককোণ বসা ময়নার মা’র দিকে। ময়নার মা কেমন নাকি স্বরে হুহু করে কাঁদছেন। তার এমন কান্না দেখে খুব হাসি পেলো। দৌড়ে গেলাম আম্মুর কাছে। বলবো যে, দেখো ময়নার মা কেমন কাঁদছেন। আম্মুর কাছে গিয়ে আর বলা হয়নি। দেখলাম আম্মুর চোখ থেকেও টপটপ পানি পড়ছে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। চলে এলাম উঠানে। সবার চোখে অশ্রু ঝরছে। কারো চোখ টলমল করছে। বুড়ো মজিদের মতো পাষাণ হৃদয়ও বরফের মতো গলে গেছে। অশ্রুতে ভিজে গেছে তারও দাড়ি।
কারবালার মর্মন্তুদ শোকে ছেয়ে গেছে রাতজাগা এ-আঙিনা। এ বারান্দা। সেই শোকে ভারি বাতাসও। বাতাসের শব্দে কেবল হুহু কান্না শোনা যাচ্ছে। গর্তের ব্যাঙরাও জমিনের আইলে উঠে অবিরাম মাতম করছে। বেদনায় ভারি হয়ে গেছে আকাশের মনটাও। ততোক্ষণে শোকের কালো মেঘে ছেয়ে গেছে পুরো গগণ। টলটল করছে দিগন্ত। চাঁদটাও পশ্চিমাকাশে ঝুলে মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে রোদন করছে। শেষ পর্যন্ত আকাশ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। ঝমঝম বৃষ্টি নামলো।
লেখক : তরুণ গল্পকার
