পাখি পুষতে খুব ভালোবাসে জাইফা। ছোটোবেলা থেকেই পাখির প্রতি তার এই ভালোবাসা। অসাধারণ ভালোবাসা! পাখির জন্যে জাইফা’র ভালোবাসা অগাধ! ছোটোবেলায় খেতে না চাইলে পাখির কাছে নিয়ে গেলেই খেতো। ও ঘুমাতোও পাখিদের খেলা দেখে। জাইফা পাখিদের সাথে কথা বলে প্রাণ খুলে। ওর ধারণা, পাখিরাও কথা বলে ওর সাথে। কেউ না বুঝলেও, জাইফা ঠিকই বুঝে। জাইফা এখনো ছোট্টটিই রয়েছে। মাদরাসাপড়ুয়া। তীক্ষ্ম মেধার অধিকারী। ক্লাসে সবসময়ই প্রথম স্থান অধিকার করে। সবার কাছে প্রিয়পাত্রী সে। সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল ফুটফুটে একটি মেয়ে। যেন ডানাকাটা জান্নাতি পাখি!
জাইফার বাবার সব ভালোবাসা একমাত্র মেয়ে জাইফাকে ঘিরে। জাইফাও খুব ভালোবাসে বাবাকে। বাবার মন বুঝে। বাবার চেহারা দেখলেই অনুমান করতে পারে তাঁর এখন কী প্রয়োজন। সাধ্য থাকলে জাইফা বাবার জন্যে তা হাজির করবেই। জাইফার মা প্রায়ই ঈর্ষা করে বলেন- ‘মেয়ে যেন শুধু তোমারই! আমার না! মেয়ে ছাড়া কিছুই বুঝে না মানুষটা। মেয়েটাও হয়েছে এমন। যেমন বাবা, তেমন মেয়ে!’
মেয়ে জাইফার কোনো ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখতে পারেন না বাবা। এদিকে জাইফার সর্বপ্রথম চাওয়াই হচ্ছে পাখি আর পাখি। জাইফার কামরার বারান্দাজুড়ে রয়েছে খাঁচাভর্তি অনেক পাখি। বিভিন্ন রঙের। বিভিন্ন ঢঙয়ের। বিভিন্ন জাতের। সব পাখি জাইফার জন্যেই। বাবাই কিনে দিয়েছেন মেয়েকে ভালোবেসে।
প্রতিদিন মাদরাসায় যাওয়ার পূর্বে পাখিদেরকে খাবার দিয়ে যায় জাইফা। সাথে বিদায়ও নেয় পাখিদের কাছ থেকে হাত নেড়ে। আবার মাদরাসা থেকে এসেই পাখিদের সাথে সময় কাটায়।
২
অন্যদিনের মতো আজও মাদরাসায় যাওয়ার আগে পাখিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলো জাইফা। আজ ওর মনটা ভালো। অন্যদিনের মতোই। ওর কাছে ভালো লাগে বাংলা শিক্ষিকাকে। বাংলা ক্লাস করতে। আপা ওদেরকে প্রায়ই ইসলামি সত্য গল্প শোনান। আপা ভালোবাসেন সবাইকে, ক্লাস শেষে সবাইকে চকোলেট দেন।
আপা ক্লাসে এলেন। সবাইকে সালাম দিলেন, কুশল বিনিময় করলেন। তারপর সবাইকে বললেন- ‘আজ আমি তোমাদেরকে পাখির প্রতি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসার গল্প শোনাবো। তোমরা শুনবে?’
সবাই স্বমস্বরে বললো- ‘জি আপা!’
জাইফা চকিত হলো। নড়ে-চড়ে বসলো। ভাবলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-ও পাখিদেরকে ভালোবাসতেন! তাহলে তো আমার সাথে মিলেই গেলো! কী মজা! গল্পটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
আপা গল্প বলা শুরু করলেন।
একবার আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হলেন। তার সাথে একজন মাত্র সাহাবি। মরুভূমিতে বালু আর বালু। পায়ের নিচে গরম বালু। উপরে সূর্যের ভীষণ তাপ। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নবিজি পৌঁছলেন এক ছোট্ট মরুদ্যানে। মরুদ্যানে ছিলো কিছু গাছ-পালা আর পানির কূপ। পথচারীরা মরুদ্যানে আশ্রয় নেয়। তারপর নতুন উদ্যমে আবার পথ চলা শুরু করে। নবিজিও বিশ্রামের জন্য বসলেন একটি বড় খেজুরের গাছের নিচে। সাহাবি গেলেন গাছ-পালার ঝোপের কাছে।
কিছুক্ষণ পর নবিজি শুনলেন একটি পাখির আর্ত-চিৎকার। ভীষণ কান্না। তারপর দেখলেন পাখিটিকে। অস্থির হয়ে ছটফট করছে। এদিক-ওদিক ওড়াউড়ি করছে। কখনও মাটিতে নামছে, কখনো বসছে গাছের ডালে। মনে হচ্ছে কী যেন খুঁজছে। নবিজি বুঝতে পারলেন পাখিটি তার বাচ্চা হারিয়েছে।
তিনি সাহাবিকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘তোমার চাদরের নিচে কী? তুমি কি পাখির বাচ্চা নিয়ে এসেছো?’
সাহাবি বললেন- ‘পাখির বাচ্চাটি আমি পুষবো। ভালো করে খাওয়াবো।’
মা পাখিটির প্রতি নবিজির খুব মায়া হলো। তিনি সাহাবিকে বললেন- ‘এ বাচ্চাটি হারালে তুমি কি পাখির মায়ের মতো ছটফট করবে? তুমি কি পাখির মায়ের মতো আদর-যত্ন করে বাচ্চাটিকে লালন-পালন করতে পারবে?”
সাহাবি কোনো উত্তর দিলেন না।
নবিজি তাকে বললেন- ‘যাও, পাখির ছানাটিকে পাখির বাসায় ফেরত দিয়ে এসো।’
নবিজির আদেশ শোনামাত্রই সাহাবি পাখির ছানাটিকে পাখির বাসায় রেখে এলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যারা দয়া করে, মহান দয়াময় আল্লাহ তাদের ওপর দয়া করেন। তাই তোমরা যদি জমিনবাসীর ওপর দয়া করো, তাহলে আসমানওয়ালা তোমাদের ওপর দয়া করবেন।’
৩
জাইফার বাবা খেয়াল করলেন জাইফার মুখে আজ হাসি নেই। চেহারায় চিন্তার ছাপ। ওর উৎফুল্লতা-হাস্যোজ্জ্বলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বাবা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। জাইফার কাছে গেলেন। ওর মাথায় হাত রাখলেন। বললেন- ‘কী হয়েছে জাইফা?’
জাইফা মুচকি হাসলো। বাবাকে শোনালো পাখির প্রতি নবিজির ভালোবাসার গল্প। আরও বললো হাদিসটির কথা। বাবা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। খুব খুব ভালো লাগলো তার। তিনি জাইফাকে বললেন- ‘তোমার পাখিগুলো এখন কী করবে তুমি?’
-‘আমি সবগুলোকে মুক্ত করে দেবো বাবা।’
জাইফার বাবা অনেক খুশি হলেন জাইফার সিদ্ধান্তে।
জাইফা বাবার হাত ধরলো। নিয়ে গেলো বারান্দায়, পাখিদের কাছে। পাখিদের দেখামাত্রই জাইফা’র মনটা কেমন যেন হয়ে গেলো। অবুঝ হৃদয়ে পাখিদের প্রতি মায়ার উদ্রেক হলো। জাইফার অজান্তেই তার কপোল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুজল। পাখিদেরকে ভালোবেসে খুলে দিলো খাঁচার দরোজাগুলো। পাখিগুলো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলো না। কী হচ্ছে এখন! যখন বুঝতে পারলো, তখন পাখিগুলো খাঁচা থেকে বের হয়ে গেলো। তড়িঘড়ি করে। ডানা মেলে উড়াল দিলো মুক্ত ওই নীল আকাশে। আর জাইফা’র কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো তপ্ত ক’ফোটা লোনা জল। এ-জল নবিজির ভালোবাসায় ছোট্ট জাইফার সমর্পিতির জল। এ জল যেমন কষ্টের তেমন আনন্দের।
