মাওলানা মুহিউদ্দীন খান : তার লেখা ও বলার ভঙ্গি আমাকে বিমোহিত করতো

সংখ্যা:

(মুফতি ইমাদুদ্দীন। প্রথিতযশা আলেম-দায়ি। একজন সুলেখকও। রাজধানীর ফরিদাবাদ জামিয়ার মোহাদ্দিস। সিরাত ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর আহ্বায়ক। মুহিউদ্দীন খানকে নিয়ে তার ও তার ফাউঘেণশনের আলাদা কিছু ভাবনা ও পরিকল্পনা আছে। আছে কিছু স্বপ্ন ও ভালোবাসা। নবধ্বনি’র ফেব্রুয়ারি ’১৭ সংখ্যার কথা মাথায় রেখে এক বিকেলে উপস্থিত হয়েছিলাম হুজুরের খেদমতে। বেশ খানিক সময়ের আন্তরিক আলোচনায় উঠে আসে খান সাহেব সম্পর্কে তার মূল্যায়ন ও স্মৃতিচারণের নানাদিক। সেসবই তুলে ধরছি নবধ্বনির পাঠকদের জন্য।

– হামমাদ রাগিব।)

 

: আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। হুজুর কেমন আছেন?

:: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো?

: আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

:: তো কোনো প্রয়োজনে আসা হয়েছে?

: জি, মাসিক নবধ্বনির ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সংখ্যা আমরা হজরত মুহিউদ্দীন খান রহ.-কে নিয়ে করতে চাচ্ছি…।

:: আচ্ছা আচ্ছা, ভালো তো! চমৎকার উদ্যোগ। জানুয়ারি সংখ্যায় জুনায়েদ জামশেদকে নিয়ে তোমাদের কাজটাও তো অনেক সুন্দর হয়েছে।

: শোকরিয়া। খান সাহেব রহ.-কে নিয়ে আপনার ভাবনা ও স্মৃতিগুলো একটু জানতে চাচ্ছি।

:: হ্যাঁ বলো, কী জানতে চাও?

: হজরত খান সাহেব রহ.-এর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিলো এবং এই সম্পর্কের সূচনা কবে?

:: সম্পর্ক বলতে কী, হুজুরের সোহবত ও একান্ত সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য কি সুযোগ খুব একটা পাইনি। এমনিতে ছাত্রজীবন থেকেই হুজুরের লেখা পড়তাম, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনতাম। তার কর্ম ও চিন্তার ব্যাপ্তি দেখে ভাবতাম এবং বিস্মিত হতাম। এভাবেই তার প্রতি আলাদা একটা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মে যায় আমার ভেতর।

আট-দশ বছর আগের কথা। জামালুল কোরআন মাদরাসার শিক্ষক মুফতি আবদুল্লাহ বিক্রমপুরির সম্পাদনায় আমরা ক’জন একবার ‘দৈনিক আরাফাত’ নামে একটা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সরকারি ডিক্লারেশন নিয়ে নিয়মিত প্রকাশও শুরু করে দিয়েছিলাম। পত্রিকার সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা লাভের জন্য আমরা একদিন হজরত খান সাহেব রহ.-এর গেণ্ডরিয়ার বাসায় গেলাম। কাছে থেকে হুজুরের সাথে আমার সাক্ষাত ও সরাসরি কথাবার্তা এই প্রথম। আমাদের উদ্যোগ দেখে হুজুর খুশি হলেও খুব একটা আশান্বিত হতে পারলেন না। দৈনিক প্রকাশের কথা শুনে প্রথেমই তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন- ‘দৈনিক করতে তো নেমেছো, পকেটে ক’শো কোটি টাকা আছে?’

আজকের দৈনিক নয়া দিগন্ত ও আমার দেশ পত্রিকা তখনও বাজারে আসেনি। হুজুরের কাছে প্রথম শুনলাম পত্রিকা দু’টোর কথা। বললেন- ‘দৈনিক পত্রিকা করতে হলে অনেক কিছুর প্রয়োজন আছে। সবচে’ বড়ো প্রয়োজন টাকার। আমার দেশ ও নয়া দিগন্ত নামে কিছুদিনের ভেতর দু’টো দৈনিক আসছে বাজারে। শ’ শ’ কোটি টাকা ইনভেস্ট করে তারপর তারা মাঠে নামছে। তোমরা কতো টাকা ইনভেস্ট করেছো?’

তো দীর্ঘ সময় নিয়ে হুজুর সেদিন আমাদের সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। নিজের বেড়ে ওঠার গল্প শুনিয়েছিলেন। শুনিয়েছিলেন ঘামঝরানো পরিশ্রম করে কিভাবে মাসিক মদীনা চালু করেছিলেন। আমরা তন্ময় হয়ে শুনেছিলাম।

: সেই আখ্যানের অল্প একটু যদি আমাদের শুনাতেন…।

:: এগুলো তো পড়েছোই তোমরা। হুজুরের আত্মজীবনী ‘জীবনের খেলা ঘরে’-তে সব আছে না?

: জি আছে। তারপরও আপনার কাছ থেকে আবার শুনতে চাই।

:: মাসিক মদীনার সূচনার কথা আসলে বিস্ময় জাগানিয়া একটা গল্প। কতোটা হিম্মত ধৈর্য ও কষ্টসহিষ্ণু মেজাজ ছিলো খান সাহেবের, ভাবা যায়!

মাসিক মদীনার সূচনার গল্প শুনাতে গিয়ে সেদিন আমাদেরকে তিনি বলেছিলেন- ‘পকেটে পর্যাপ্ত টাকা ছিলো না, কাগজের দোকান থেকে নিজে গিয়ে মাথায় করে কাগজ এনে ছাপাখানায় দিয়েছি। তারপর পত্রিকা ছাপা হয়ে এসেছে। টাকার অভাবে কাগজের দোকানের বিলও বাকি রাখতাম, ছাপাখানার বিলও বাকি রাখতাম। পত্রিকা বিক্রি হবার পর টাকা হাতে এলে সেগুলো পরিশোধ করতাম। লোকজন রাখা তো দূর কি বাত, পত্রিকার জন্য ছোট্ট একটা অফিস ভাড়া নেয়াও ছিলো আকাশকুসুম ব্যাপার। বাংলাবাজারে প্রধান পোস্ট অফিসে গিয়ে দেশের নানা প্রান্তের গ্রাহক-এজেন্টদের কাছে পত্রিকা পাঠাতাম। ছাপাখানা থেকে মাথায় করে পত্রিকা এনে পোস্ট অফিসের বারান্দায় রাখতাম। তারপর সেখানে বসে একা একা পত্রিকাগুলো প্যাকেট করতাম। প্যাকেট করা শেষ হলে এজেন্ট-গ্রাহকদের ঠিকানায় পোস্ট করে দিতাম। বাংলাবাজারের লাইব্রেরিওয়ালারা পত্রিকা রাখতে চাইতো না। অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে তাদেরকে পত্রিকা দিতাম। বলতাম বিক্রি না হলে মাস শেষে আমি ফেরত নিয়ে যাবো। পরে ঘুরে ঘুরে দেখতাম লাইব্রেরিগুলো থেকে কেমন বিক্রি হচ্ছে। মাস শেষে যদি দেখতাম কোনো লাইব্রেরিতে এখনও পত্রিকা রয়ে গেছে, তাহলে পরিচিত কাউকে টাকা দিয়ে বলতাম পত্রিকাগুলো কিনে নিয়ে আসতে। যাতে পরবর্তী মাসে লাইব্রেরিওয়ালা পত্রিকা রাখতে আর অনীহা না দেখায়।

ঢাকার মাটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে এই যে বসবাস করছি, দু’বেলা চারটা ডালভাত খেতে পারছি, বিভিন্ন কাজে এদিক-ওদিক যেতে নিজস্ব গাড়ি চড়তে পারছি, এসবই আমার মাসিক মদীনার অবদান।’

সেদিনের ওই সাক্ষাতের পর আরও কয়েকবার যাওয়া হয়েছে হুজুরের বাসায়। একবার গিয়েছিলাম আল্লামা ওলিপুরির সাথে। ওলিপুরিকে হুজুর খুব মুহাব্বত করতেন। খুব। এতোটা হৃদ্যতা ও মুহাব্বত যে ছিলো তাদের মাঝে, সেদিন ওলিপুরির সাথে না গেলে কোনোদিন জানাই হতো না।

তারপর তার অসুস্থতার সময়ে দু’বার গিয়েছিলাম আলেম মুক্তিযোদ্ধা প্রবীণ লেখক মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদীর সাথে। জালালাবাদীও ঢাকা আলিয়ার ফারেগ, খান সাহেবও ঢাকা আলিয়ার ফারেগ। ক্লাসমেট না হলেও দু-এক ক্লাসের সিনিয়র-জুনিয়র ছিলেন। দু’দিনই দুজনে মিলে দীর্ঘক্ষণ ধরে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। আমি ছিলাম নীরব শ্রোতা। গল্পগুলো শুধু স্মৃতি না যেন জীবন্ত একেকটা ইতিহাস।

: পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লালকুঠি হলে সিরাত ফাউঘেণশন বাংলাদেশ-এর ব্যানারে কিছুদিন আগে খান সাহেবের জীবন ও কর্ম নিয়ে বেশ বৃহদাকারে একটা সেমিনার করেছিলেন আপনারা। কোন সে তাড়না, যা আপনাদেরকে এমন আয়োজনে উদ্বুদ্ধ করলো?

:: ইন্তেকালের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার জীবন ও কর্ম নিয়ে বিভিন্নভাবে চর্চা হচ্ছে। পুরান ঢাকার এই এলাকায়- গেণ্ডারিয়ায়, জানোই তো, দীর্ঘ একটা সময় তিনি বসবাস করেছেন। এমনকি মৃত্যু অবধি এই এলাকারই বাসিন্দা ছিলেন। তার মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব আমাদের এলাকার বাসিন্দা ছিলেন, এটা আমাদের গৌরব ও গর্বের ব্যাপার। এলাকার লোক হিসেবে আমাদের ওপর তার একটা হক আছে। এই দায়বোধ থেকেই মূলত সেমিনারের আয়োজন। বিশেষত ফরিদাবাদ জামিয়ার ওপর তার আলাদা একটা হক রয়েছে। এখানের আকাবির আসাতিজায়ে কেরামের সাথে তার গভীর সম্পর্ক ছিলো। একসময় প্রচুর আসা-যাওয়া করতেন ফরিদাবাদ। বাংলাভাষায় ইসলামি সাহিত্যের সৃষ্টি সমৃদ্ধি ও বাংলাভাষী মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় বই-পুস্তকের পাঠসচেতনতা তৈরি ইত্যাদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে হজরত ফরিদপুরী রহ.-এর তত্ত্বাবধানে অনেকদিন আগে একবার ‘ইদারাতুল মাআরিফ’ নামে একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। কওমি-জেনারেল উভয় ধারার খ্যাতিমান লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীগণ ইদারার সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, নুর মোহাম্মদ আজমি, ড. কুদরতে খোদা, হারুন ইসলামাবাদী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। হজরত খান সাহেব রহ.-ও ইদারার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ইদারার কার্যালয় ছিলো ফরিদাবাদ জামিয়ায়। ইদারার সুবাদে মাসে অন্তত একবার হলেও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ ইদারার সদস্যগণ ফরিদাবাদ আসতেন। আসতেন খান সাহেবও। এভাবে ফরিদাবাদের সাথে খান সাহেবের আত্মিক সম্পর্কের একটা সেতুবন্ধন তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। তার এই সম্পর্ক ও অধিকারের দায়বোধ থেকেই মূলত সিরাত ফাউঘেণশনের সেমিনারের আয়োজন।

: সিরাত ফাউঘেণশন থেকে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে আর কোনো কাজের পরিকল্পনা আছে?

অবশ্যই আছে। আমরা মনে করি, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান বাংলাভাষায় সিরাতচর্চার জনক ছিলেন। বাংলাভাষী সাধারণ মুসলমানদেরকে সিরাতপাঠ শিখিয়ে গেছেন তিনি। সিরাত যে আলাদা একটা বিষয় হতে পারে, তা এর আগে এদেশের মানুষের ধারণায়ও ছিলো না। খান সাহেবের সিরাতচর্চা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই মূলত আমাদের সিরাত ফাউঘেণশনের জন্ম। তাই তার জীবন ও কর্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের একটা সেমিনার করার পরিকল্পনা আছে আমাদের হাতে। তাছাড়া সাহিত্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের ওপর তার নামে একটা পদক প্রবর্তনেরও ইচ্ছা আছে। আছে আরো নানা স্বপ্ন। পর্যায়ক্রমে এগুলোর বাস্তবায়ন হবে ইনশাআল্লাহ।

: খেয়াল করলে দেখা যায়, তার সাথে আপনার বাহ্যিক সম্পর্ক খুব একটা ঘনিষ্ট ছিলো না। তারপরও তাকে নিয়ে এতো আগ্রহ ও ভালোবাসা কিভাবে তৈরি হলো?

:: কাউকে ভালোবাসতে হলে তার সাথে ঘনিষ্টতা থাকার খুব কি দরকার? তার নিঃস্বার্থ ও নিষ্ঠাপূর্ণ কাজ, উম্মাহর প্রতি দরদ আমার খুব ভালো লাগতো। শুরুতেও বলেছি, তার লিখনী ও বক্তৃতার প্রতি আমার আকর্ষণ সেই ছাত্রজীবন থেকেই। তার লেখা ও বলার ভঙ্গি আমাকে বিমোহিত করতো। প্রেরণা যুগাতো। এসব নানাবিধ কারণেই হয়তো তাকে নিয়ে আমার এতো আগ্রহ।

: আপনার মূল্যবান সময় থেকে খানিকটা ব্যয় করার জন্য শোকরিয়া। জাযাকাল্লাহ।

:: আল্লাহ তোমাদেরকেও উত্তম বিনিময় দান করুন। তোমরা এগিয়ে যাও। অনেক শুভকামনা তোমাদের জন্য।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১