ঐতিহ্যবাহী হাতির মাহুতের গল্প

সংখ্যা:

শত শত তারা দেখো, দূর হয় না আঁধার

এক চন্দ্র আলো করে জগত সংসার

 

জ্যোৎস্না রাতের মাতাল করা আলোয় আম্মা গুনগুন করে শ্লোক বলতে থাকেন। খোকা আম্মার কোলে দুলুনি খেতে খেতে ভাতের প্লেটের মতো ঝকঝকে চাঁদমামা দেখতে থাকে। হরিণের পিঠের মতো নক্ষত্রভরা নীল আকাশ দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। খোকারও ইচ্ছে করে আকাশের চাঁদ হতে। চারপাশে তারাদের মিছিল থাকবে, আর খোকা চাঁদের মতো আলোকিত করবে সারা পৃথিবীকে।

খুব ছোটবেলাতেই খোকার চাঁদ হবার স্বপ্ন। একদিন আম্মার মুখে শুনে, চাঁদ হতে হলে খোকাকে অনেক পড়তে হবে। বড় হতে হবে। আম্মার হাত ধরেই খোকার যাত্রা শুরু হয়। স্বপ্নপথ পাড়ি দিয়ে স্বপ্ন ছোঁয়ার। আম্মার স্কুল থেকে খোকা পাড়ার স্কুলে যায়। পাড়ার স্কুল মানে সেকালের ধূলো-কাদার মেঠোপথের মাইল পেরিয়ে যাওয়া কোনো বিদ্যালয়। বাড়ির সামনে দিয়ে তিরতির করে প্রবাহিত পথ ধরে রোজ রোজ হেঁটে যাওয়া কোনো গ্রামের পাঠশালা। পাখির পালকের মতো আম্মার নরম আঁচল ছেড়ে ওই দূরের পাঠশালা, মাস্টার বাবু, এপাড়া-ওপাড়ার সব বালকদলের হৈ-হুল্লোড়ে খোকার কচিমন হাঁপিয়ে ওঠে।

খোকা আম্মার কাছে আবদার করে, এতো দূরের স্কুলে যেতে কষ্ট হয়। স্কুলের পড়া তো আমি বাসায় বসেও পড়তে পারি।

খোকার আম্মা বলেন, পাঠশালায় পড়লে তুমি অনেক কিছু জানতে পারবে।

খোকার কৌতূহলী প্রশ্ন- ‘কী হবে এতো পড়ে আম্মা?’

-‘বেশি পড়লে তোমাকে একটা হাতি কিনে দেবো।’

আম্মার মুখের সবকথাই জগতের সবচেয়ে মূল্যবান ও সত্য ভেবে খোকা আবারো নতুনোদ্যমে লেখাপড়ায় মন দেয়। বই-খাতার খসখসে পাতার ভাঁজে ভাঁজে খোকার শত কল্পনা লুকিয়ে থাকে হাতিকে নিয়ে। হাতি কী খায়, কিভাবে ঘুমায়, কিভাবে হাতিকে আদর করতে হয়।

ঘনিষ্ঠ কাউকে পেলেই খোকা হাতির কথা জিজ্ঞেস করে। বলে বেড়ায়, স্কুল থেকে ভালো একটা পাশ দিতে পারলেই আম্মা আমাকে হাতি কিনে দেবেন।

খোকার এসব বাল্যসুলভ কথা নিয়ে যদি কেউ হাসিঠাট্টা করে, খোকার সে কি রাগ তার উপর। খোকা ঘোষণা দেওয়ার ভঙ্গিমায় বলে, তাকে কিছুতেই আমার আশেপাশে আসতে দেবো না।

এরপর একদিন সত্যি সত্যিই জমিদারবাড়ির হাতিটি খোকাদের পাঠশালার সামনে আসে। খোকার খেলার সঙ্গী, পড়ার সঙ্গীরাই তখন পাঠশালাজুড়ে ছড়িয়ে দেয় খোকার স্বপ্নের কথা। পাশ করে হাতি কেনার কথা। খোকা স্কুলে এলে ঠিকই জমিদার কাছারির নায়েব মশাই চশমার উপর দিয়ে বলে ওঠেন কৌতুক করে- ‘কি হে খোকা! তুমি নাকি হাতি কিনবে? এই হাতিটি তো বিক্রি হবে। তুমি কিনতে চাও শুনে হাতির মালিক হাতিটি নিয়ে এখানে এসেছেন।’

বিশাল হাতির সামনেও খোকার দ্বিধাহীন উত্তরÑ ‘আমি কিনবো না। আমার আম্মা আমাকে কিনে দেবেন।’

-‘তোমার আম্মার বুঝি অনেক টাকা?’

খোকা বড় বড় চোখ করে মাথা নাড়ায়- ‘হুম অনেক টাকা।’

খোকার এসব নির্ভীক বাক্যালাপে নায়েব মশাই গভীর দৃষ্টিতে খোকার দিকে তাকিয়ে থাকেন। বলেনÑ ‘খোকা, তোমার হাতটি দেখাও তো!’

খোকা আলতোভাবে নায়েব মশাইয়ের সামনে হাত মেলে ধরে। অনেকক্ষণ হাতটি নাড়াচাড়া করে তিনি বললেন- ‘খোকা! বড় হয়ে সত্যিই তুমি একদিন হাতি কিনতে পারবে।’

খোকার জীবনের ছয় বছরে নায়েব মশাইয়ের এই ভবিষ্যদ্বাণী একদিন ঠিকই নতুন চরের মতো জেগে ওঠে। অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে জীবনের তীব্র রহস্যের জট খুলে খুলে খোকা একদিন ঠিকই হাতির মাহুত হয়ে যায়। সভ্যতার হাতির মাহুত। সে হাতির পদচারণায় ঘুমন্ত চৈতন্যে নিত্য জাগরণ শুরু হলো। খোকা যখন যাপিত জীবনের একজন বলিষ্ঠ ও স্বার্থক শ্রমিক হয়ে উঠলো তখন সত্যি সত্যিই ছোটবেলার স্বপ্নের হাতিটি তার প্রাচুর্যপূর্ণ কর্মজীবনের রূপে জগত সংসারে প্রকাশিত হয়। শৈশবে নক্ষত্রের ভিড়ে চাঁদের মতো হবার স্বপ্নবীজ আম্মা বুনে দিয়েছিলেন। নায়েব মশাই বলেছিলেন হাতির কথা। সংগ্রামমুখর জীবন তাকে এসব স্বপ্ন পূরণে সর্বক্ষণ তাড়া করে ফিরেছে। অবশেষে সেদিনের সেই খোকা আমাদের ঐতিহ্যের আকাশের চাঁদ হলেন। তার সমকালীন সবাই যেনো সেই আলোকিত চাঁদের পাশে নক্ষত্রের মতো জ্বলতে লাগলো। প্রদীপ্ত কর্মক্ষেত্রে তার একেকটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ সত্যিই যেনো হাতির কদমের মতো আশপাশের সব অস্থিরতাকে কাঁপিয়ে দিতো।

সেই চাঁদের আলোয় স্নান করতে আমরা নিবিড়ভাবে ছুটে যেতাম তার কাছে। সিরাত বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক, দেশের প্রাচীনতম মাসিক পত্রিকার কার্যকরী সম্পাদকদের সাথে গিয়েছি। পরিচিত বন্ধু-স্বজন অনেকের সাথেই আলোর ফোয়ারার সান্নিধ্যে আমরা যেতাম। সেদিনের সেই খোকা আজকের মহীরুহ হয়ে নতুন দিনের বংশধরদের কাছে সোনালি ইতিহাসের সূত্রকে তুলে দিতেন। পার্থিব জৌলুসহীন গেণ্ডারিয়ার সেই বাড়িতে তিনি যখন কথা বলতেন তখন একটা শতাব্দী কথা বলে উঠতো। তার জীবন, ধুমকেতুর মতো তার একেকটা কর্ম, তার ওই কণ্ঠের আওয়াজে আমরা সত্যিই অনুভব করতাম, ঐতিহ্যের ধারকবাহী হাতি ও হাতির মাহুতের অস্তিত্ব।

২৫ জুন ২০১৬ তারিখে তার মৃত্যুর পর এখনো মনে হয় তিনি আমাদের আকাশে চাঁদ হয়ে বেঁচে আছেন। আমাদের এই পৃথিবীর ধুলোবালি, আমাদের মতোই শৈশব, কৈশোরের খোকার জীবন বুকে নিয়ে, জীবনের বহুকৌণিক সীমাবদ্ধতার ভেতরেও তিনি একজন মুহিউদ্দীন খান হয়েছেন। একটি ইতিহাস হয়েছেন। আমাদের স্বপ্নাতুর মন আরেকবার প্রবলভাবে আলোড়িত হয় এসব চিন্তায়, একজন মুহিউদ্দীন খান হয়ে উঠবার পিপাসায়।

 

লেখক : তরুণ সম্পাদক, কথাশিল্পী

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১