ছোটবেলা মফস্বল শহরে বেড়ে উঠেছি। সে-সময়ের অনেক স্মৃতি বর্তমানকে তাড়া করে ফেরে হরহামেশা। শহরের যে পাড়াাঁয় আমরা থাকতাম, পাড়ার একপাশে বাজার আর আরেক পাশ দিয়ে কলকল রবে বয়ে গেছে একটা নদী। বাজার আর নদীর ঠিক মাঝ বরাবর মসজিদ। মসজিদের পাশে মাদরাসা। আমি তখন ওই মাদরাসার হেফজখানায় পড়ি।
পাড়ার মসজিদে মুরব্বি গোছের এক মুখলিস লোক নিয়মিত নামাজ পড়তেন। তাবলিগি ছিলেন। তাবলিগের পাঁচকাজ চালু করেছিলেন তিনি মসজিদে। আমরা ছোটরা তাকে দাদু ডাকতাম। দিনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি মসজিদে কাটাতেন। ফজরের আজানের অনেক আগেই মসজিদে চলে আসতেন। আজান পর্যন্ত একমনে তেলাওয়াত করতেন। আজানের সময় হলে আজান দিতেন। তারপর সুন্নত নামাজ শেষ করে জামাত দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত আবার তেলাওয়াত। এভাবে জোহরের সময়ও বারোটার দিকে মসজিদে চলে আসতেন। এসেই তেলাওয়াত। দাদু তেলাওয়াত করতেন উচ্চস্বরে। সাথে আয়াতের তরজমাও পড়তেন।
তবিয়ত যখন ভালো ছিলো, তাবলিগে সময় লাগিয়েছেন। অসুস্থ হবার পর থেকে আর পারেন না। শারীরিকভাবে প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিলেন তখন। ভারি শরীরের কারণে মাটিতে বসতে পারতেন না। মসজিদে সামনের কাতারের বাম পাশে তিনি চেয়ার নিয়ে নামাজ পড়তেন। আমাদের খুব আদর করতেন দাদু। নামাজের সময় ছাড়া পেলেই আমরা দৌড়ে চলে আসতাম দাদুর কাছে। তার চুলে দাড়িতে হাত বুলিয়ে মজা করতাম। আমরা সহপাঠীদের মধ্যে তখন দু’টো প্রতিযোগিতা ছিল। নামাজের ছুটি হলে আমাদেরকে লাইন ধরে মসজিদে আসতে হতো। লাইনের প্রথমে কে থাকবে এ নিয়ে আমরা প্রতিযোগিতা করতাম। আরেকটা প্রতিযোগিতা ছিলো মসজিদে এসে। মসজিদে দাদু যে চেয়ারে বসেন, সে চেয়ারের সামনে দাদুর দুই পায়ে হেলান দিয়ে কে বসবে, এ নিয়ে।
মসজিদের আশপাশের লোকজন তাবলিগের কাজে খুব একটা সময় দিতো না। দাদু আমাদেরকে নিয়েই এই কাজ আঞ্জাম দিতেন। সপ্তাহে একদিন গাশত ও বয়ান, প্রতিদিন নিয়মিত তালিম- এসব কাজে আমরাই ছিলাম দাদুর সঙ্গী। এমনিতে দাদু শিশুদেরকে অনেক ভালোবাসতেন, তার ওপর আমরা ছিলাম তার প্রিয়কাজের সহযোগী, এজন্যে আমাদের প্রতি তার ভালোবাসার মাত্রাটা ছিলো অতুলনীয়। অপার্থিব এক ভালোবাসায় তিনি জড়িয়ে নিয়েছিলেন আমাদের।
আত্মীয়তার সূত্রে কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু এতোদিন পর এই তরুণ বয়সে এসেও দাদুকে ভুলতে পারিনি একটুও। বাড়ি গেলেই দাদুকে একনজর দেখে আসতাম। এই নভেম্বরে দাদু পাড়ি জমিয়েছেন ওপারে, পরমজনের প্রগাঢ় আহ্বানে সাড়া দিয়ে। বাড়ি গেলে এখন আর কাউকে একনজর দেখে আসার তাড়া নেই। আছে দাদুর কবর। কবর জিয়ারতের তাড়না। আল্লাহ আমাদের প্রিয় এই দাদুর কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দিন।
শিক্ষার্থী, জামিয়া ফরিদাবাদ, ঢাকা
