সহজিয়া সুখ

সংখ্যা:

স্বামীর সবচে’ পছন্দের যে জুব্বাাঁ, ওইটার বুকের একটা বোতাম ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গেছে। মারইয়াম সুঁই-সুতা নিয়ে আরেকটা বোতাম লাগাচ্ছেন ওইখানে। স্বামীর ছোঁ ছোঁ এই কাজগুলো করতে বড় বেশি ভালো লাগে মারইয়ামের। সংসারের সব কাজই মারইয়াম নিজ হাতে করেন, সব কাজেই ভালোলাগা আছে, কিন্তু ছোঁ ছোঁ এধরনের কাজগুলোতে যেন আলাদা একটা ভালোলাগা। স্বামীর চশমার কাঁচে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে নিজের আঁচল দিয়ে তা পরিষ্কার করা, সকালে বাইরে বেরোনোর সময় তার জুব্বায় পারফিউম স্প্রে করা, আবার রাতে যখন ঘরে ফেরেন, দরোজাাঁ খুলে দেয়া, হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা ধরা, কোনো রাতে ফিরতে দেরি হলে তার অপেক্ষায় জেগে থাকা- তুচ্ছ তুচ্ছ এই ব্যাপারগুলোতে অপার্থিব এক ভালোলাগা অনুভব করেন মারইয়াম। পঁচিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে কাজগুলোর প্রতি তার আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে বৈ কমে নি।

বোতাম ছেঁড়ার ব্যাপারটা খুব ঘন ঘন ঘটে। চরম কাজপাগল মানুষটার নিজের খাওয়া-দাওয়া পোশাক-পরিচ্ছদের দিকে একটুও খেয়াল নেই। কীভাবে বোতামগুলো ছিঁড়ে, বলতেই পারে না। সারাক্ষণ যারা অন্যকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তারা বোধহয় নিজেদের নিয়ে ভাববার এতোুঁকু ফুরসত পায় না। অন্যদের বেলায় সদা সচেতন মানুষটা নিজের ব্যাপারে হামেশাই উদাসীন। মারইয়াম তাই স্বামীর এসব ব্যাপারে খুব খেয়াল রাখেন। লোকটার মাঝে কেমন একটা সারল্য খুঁজে পান মারইয়াম। এই সারল্যই তাকে সবচে’ বেশি আকৃষ্ট করে। গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু গাম্ভীর্যতার মধ্যেও লোকটার ভেতর অদ্ভুত রকমের একটা ভালোবাসা আছে। মারইয়ামের ধারণা, স্বামীর এই ভালোবাসা অনুবাদ করার ক্ষমতা কুদরত একমাত্র তাকেই দান করেছেন।

একমনে বোতাম লাগাচ্ছিলেন মারইয়াম। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের মাথায় কীভাবে যেন হঠাৎ বেশ খানিকটা সুঁই গেঁথে যায়। সরু ক্ষতচিহ্ন থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। রাত এখন দশটার কাঁটা ছুঁইছুঁই। মওলানা আবদুর রহমান ফেরার সময় হয়ে গেছে। ফিরেই যদি স্ত্রীর আহত হাত দেখেন, পেরেশান হয়ে পড়বেন। ক্ষতটা যদিও খুব মামুলি, কিন্তু মওলানা আবদুর রহমানের পেরেশানির জন্য এটাই যথেষ্ট। সারাদিনের কর্মক্লান্ত মানুষটাকে মারইয়াম এখন আর পেরেশান করতে চান না। অল্প একটু সেন্ট স্প্রে করলেই রক্তটা বন্ধ হয়ে যাবে।

হাতের সুঁই-সুতা রেখে তিনি ড্রয়ার থেকে সেন্ট বের করতে যাবেন, এমন সময় কলিং বেল কথা বলে উঠলো। মওলানা আবদুর রহমান চলে এসেছেন। ড্রয়ার পর্যন্ত আর যাওয়া হলো না মারইয়ামের। তড়িঘড়ি করে দরোজা খুলে দিলেন। আর কি অবাক কাণ্ড- দরোজা খুলতেই মওলানা আবদুর রহমানের চোখ মারইয়ামের বুড়ো আঙুলের দিকে গিয়ে পড়লো। শশব্যস্ত হয়ে হাতটা ধরলেন আবদুর রহমান। পেরেশান গলায় জিজ্ঞেস করলেনÑ কী হয়েছে?

‘ও কিছু না। আপনার জুব্বায় ছিঁড়ে যাওয়া বোতামটা একটু লাগাতে বসেছিলাম, বেখেয়ালে সুঁইয়ের মাথা একটু গেঁথে গেছে।’ মারইয়ামের ঠোঁটে শান্ত-মৃদু হাসি।

‘কতোদিন বলেছি, বোতাম ছিঁড়লে দর্জি আছে, দর্জির কাছে নিয়ে গেলে ঝটপট লাগিয়ে দেবে। তারপরও শুনো না তুমি। এই যে এখন হাত কাঁলে, এতোাঁ রক্ত ঝরল, ব্যথা পেলে, খুব ভালো লাগছে!’ মওলানা আবদুর রহমানের গম্ভীর কণ্ঠে মধুর বিরক্তি। বিরক্তি ঝাড়তে ঝাড়তে ড্রয়ার থেকে তিনি সেন্ট বের করলেন। স্ত্রীর ক্ষতচিহ্নে স্প্রে করে দিলেন হালকা। স্বামীর মামুলি এইসব অন্তরঙ্গতাও মারইয়ামের খুব প্রিয়। তার সামান্য কোনো অসুবিধায় স্বামীর সীমাহীন পেরেশানিমাখা আচরণগুলো বড় ভালো লাগে। কিন্তু ভালোলাগার এই মওকাগুলো খুব কমই আসে। মারইয়ামের অবচেতন মনে আফসোস জাগে, ইশ, এই মওকাগুলো যদি ঘন ঘন আসতো! পরক্ষণেই আবার সচেতন হন। এ কী ভাবছেন তিনি! মুসিবতকে কি এভাবে কেউ ডেকে আনে?

নিজের বোকামিতে আপন মনে হাসেন মারইয়াম।

 

দুই

মারইয়ামের রাতদিনের বেশিরভাগ সময় একা একাই কাটে। মওলানা আবদুর রহমান সেই সাত সকালে যে বেরোন, আর ফেরেন রাতে। একটা মহিলা মাদরাসার প্রিন্সিপাল আবদুর রহমান। নিজের মেধা শ্রম ও মেহনত বিলিয়ে তিলে তিলে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটি। এজন্যে এর প্রতি তার ভালোবাসাও অপরিসীম। দিনরাত এই মাদরাসা নিয়ে তার যতো ব্যস্ততা। বাসা থেকে মাদরাসার দূরত্ব পায়ে হাঁটা পথে মিনিট বিশেক। তারপরও মাঝবেলা একবার বাসায় আসার সুযোগ হয় না আবদুর রহমানের। মারইয়ামকে তিনি প্রায়ই জোর দেন, একা একা বাসায় থাকার চে’ দিনের বেলাাঁ মাদরাসায় কাাঁনোর জন্য। এতে একাকিত্বটাও ঘুঁচলো, মাদরাসায়ও কিছু সময় দেয়া হলো। মারইয়াম রাজি হন না। মাদরাসায় গিয়ে খামাখা ঝামেলা পাকানোর চে’ এই একাকিত্বটাই তার কাছে ভালো।

সন্তান বলতে মারইয়ামদের এক ছেলে। পড়ালেখার জন্যে সেই ছেলেবেলা যে মায়ের কোল ছেড়েছিলো, আর ফেরা হয়নি। দাওরায়ে হাদিস শেষ করে রাজধানীর একটা মাদরাসায় হাদিস পড়ায় বছর খানেক। পড়াশোনাও করেছে রাজধানীতে। পড়াশোনা শেষে মারইয়াম চেয়েছিলেন ছেলেকে কাছে নিয়ে আসবেন। মফস্বলে থেকে চাকরি-বাকরি যা করে করবে। কিন্তু মফস্বল আর রাজধানীর সুযোগ-সুবিধায় তো বিস্তর ফারাক। রাজধানীতে থাকলে সহজেই ভালো একটা ক্যারিয়ার গড়া যাবে। মফস্বলে যা কষ্টসাধ্য।

ছেলের ক্যারিয়ারের দিকটা ভেবে তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসার চিন্তা বাদ দেন মারইয়াম। ছেলে বড় হোক, ভালো একটা ক্যারিয়ার গড়ুক, এটাই তো একজন মায়ের সবচে’ বড় চাওয়া। কিন্তু ছেলের বিচ্ছেদ-ব্যথা মাঝে মাঝেই প্রচণ্ড ঝড় হয়ে দেখা দেয় মারইয়ামের মাতৃহৃদয়ে। ঝড়ের নীরব আঘাতে জর্জরিত হয় স্নেহদানে উদগ্রীব একটা বুভুক্ষু হৃদয়। নিজের একাকিত্ববোধটাও তখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ বড় অসহ্য যন্ত্রণা! যন্ত্রণা অনূদিত হয় মারইয়ামের চোখের জলে।

 

তিন

নুজহাকে মারইয়ামের ভীষণ ভালো লাগে। এই ক’বছরে ভয়াবহ রকমের ভালোবাসা জন্মে গেছে মেয়েটার প্রতি। ভালো না বেসে অবশ্যি উপায়ও নেই, ভালোবাসার ভাগটা সে ঠিক ঠিক আদায় করে নিতে জানে। ভালোবাসা আদায়ের অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মেয়েটির। বাসায় এলেই ‘আন্টিমনি এটা খাবো! ওটা দাও! এ কী, তোমার চুলে চিরুনি লাগাওনি ক’দিন! কতোদিন বলেছি চোখে কাজল পরতে! কাজল নেই কেন! কাজল ছাড়া তোমাকে বুড়িমা লাগে!’ ইত্যাদি হুলস্থূল কাণ্ড। নিষ্প্রাণ বাসাাঁকে তখন বড় প্রাণবন্ত লাগে মারইয়ামের।

মওলানা আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর মেয়ে নুজহা। নুজহার আব্বু-আম্মু মধ্যপ্রাচ্য থাকেন। নুজহাও ছিলো। পড়াশোনার জন্য ক’বছর ধরে দেশে। মওলানা আবদুর রহমানের মাদরাসাতেই পড়ে। বিভিন্ন ছুটি-ছাাঁয় কিংবা বৃহস্পতিবারে নুজহার আর আর ক্লাসমেট মা-বাবার কাছে যায়। নুজহা আসে মারইয়ামের কাছে। মারইয়ামের অমায়িক আদরে সে দূরপ্রবাসে থাকা তার আম্মুকে খুঁজে পায়।

পরীক্ষার ছুটিতে নুজহা এসেছে। আজ তার খিঁচুড়ি রাঁধা শেখার কথা। প্রতিবার এলে একেক পদের রান্না শেখে সে। আজকের আইটেম খিঁচুড়ি। সকালের নাশতা হিশেবে কিচেনে খিঁচুড়ি রাঁধছে নুজহা। মারইয়াম এটা ওটা দেখিয়ে দিচ্ছেন। হঠাৎ দুষ্টুমি একটা বুদ্ধি খেলে গেলো মারইয়ামের মাথায়। মুচকি একটা হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। হাসিটা ধরে রেখেই তিনি নুজহাকে বললেন- এই আইটেমটা ভালো করে রাঁধতে শেখো বেটি, সামনের জীবনে অনেক কাজে লাগবে!

আন্টি কী মিন করছেন, বুঝতে কষ্ট হলো না নুজহার। খিঁচুড়িটা আফিফের ভীষণ পছন্দ, নুজহা এটা ভালো করেই জানে। আন্টির কথায় লজ্জায় লাল হয়ে এলো তার চেহারা। লাজুক একটা হাসিও খেলে গেলো ঠোঁটে। কিছু বললো না সে।

মেয়েটার এই লাজ-রাঙা চেহারাাঁ অসম্ভব ভালো লাগে মারইয়ামের। মুগ্ধ হয়ে বারবার তাকাচ্ছেন তিনি তার দিকে। এই মেয়ে খুব শিগগির তার পুত্রবধূ হবে, ভাবতেই ভালো লাগছে। ক’দিন আগে নুজহার আম্মুর সাথে কথা বলেছিলেন এ ব্যাপারে। তিনি হেসে জবাব দিয়েছেন, মেয়েকে তো সেই কবে আপনাদের দিয়ে দিয়েছি। আপনাদের যা ইচ্ছা করুন। আমাদের কেবল জানাবেন।

আফিফের পছন্দটাও মারইয়াম ভালোভাবে বুঝেন। তিনি যে মা! তারপরও সরাসরি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন। লাজুক হাসি দিয়ে সে বলেছে, তোমার পছন্দই আমার পছন্দ আম্মু।

 

চার

আফিফেরও মাদরাসা ছুটি হয়েছে। আজ বাড়ি আসবে আফিফ। অনেকদিন পর ছেলেকে দেখবেন, অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করছে মারইয়ামের ভেতর। এতোক্ষণে হয়তো রওনা হয়ে গেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে আফিফের নাম্বার ডায়াল করেন মারইয়াম। কয়েকবার রিং হবার পর কল রিসিভ হয়। ওপাশ থেকে ভেসে আসে আফিফের মৃদু উচ্ছ্বাসমাখা কণ্ঠ- ‘আসসালামু আলাইকুম। হ্যাঁ আম্মু, আমি বাসে উঠে গেছি। এই খানিকক্ষণ পরেই বাস ছেড়ে দেবে। আর শুনো আম্মু! তোমাদের না-বলে আমি একটা কাজ করে ফেলেছি কিন্তু! এই ছুটিতে আমরা, মানে তুমি আমি আর আব্বু কক্সবাজার যাবো। আমি অগ্রীম টিকিট করে ফেলেছি। আব্বুকে যেভাবেই হোক তুমি ম্যানেজ করো! মজার একটা ট্যুর হবে তাই না আম্মু?’

‘মজার তো হবে, কিন্তু তোর আব্বুকে ম্যানেজ করা মুশকিল। তিনি শত অজুহাত দেখাবেন। শেষমেশ বলবেন, তুমিই বরং ঘুরে আসো ছেলেকে নিয়ে। আমার কাজ আছে।’

‘আমি এসব কিচ্ছু জানি না। আব্বুকে তোমার ম্যানেজ করতেই হবে। কীভাবে করবে সেটা তুমি জানো।’

‘আচ্ছা বাবা ঠিক আছে! আমি চেষ্টা করবো। তো টিকিট তিনটা করলি কেন? লোক আমরা চারজন না?’

‘চারজন মানে?’

‘নুজহাকে কী করবি?’

‘তা-ও তো ঠিক। কিন্তু ওকে সাথে নেবে কীভাবে…?’ আফিফের কণ্ঠে খানিকটা লজ্জা ও চিন্তার মিশেল।

‘সে টেনশন তোকে করতে হবে না। তুই চুপচাপ টিকিট কর আরেকটা।’

‘কিন্তু এভাবে যাওয়াাঁ কেমন দেখায় না আম্মু?’

‘কেমন দেখাবে না বেটা, ট্যুরের আগেই তোদের আকদ দেবো আমরা। তুই নিশ্চিন্তে আরেকটা টিকিট কাঁ!’

ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর আসে না। পিপ পিপ আওয়াজ তুলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মারইয়াম বুঝতে পারেন স্বভাবজাত লজ্জাই আর কথা বলতে দেয়নি ছেলেকে। কেমন লাজুক টাইপের হয়েছে তার ছেলেটা। এই সেদিনের খোকা, দেখতে দেখতেই বড় হয়ে গেলো। এখন বউ আনারও সব ইনতেজাম সম্পন্ন। নিজেকে বড় সুখী মনে হয় মারইয়ামের। হাত বাড়ালেই সুখ। হাতের মুঠোয় সুখ। ইচ্ছে হলেই সুখের ছোঁয়া। মাতৃজীবনে এরচে’ বেশি আর কী চাই!

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১