নীলার মনটা ভেঙে যায়। খুব কষ্ট পায় সে। সারাদিন ক্লাস করে শ্রান্তমুখে বাড়ি ফেরে। এসেই বড়াপ্পি শীলার বকা শুনতে হয়। ফেরার পথে কতোবার যে বড়াপ্পির শেখানো ওই বাক্যটা জপে। বারান্দায় পা রাখতেই মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে স্যারের শেখানো বাক্য- গুড আফটারনুন আপ্পি!
বাংলিশে কথা বলা একদম সহ্য করতে পারে না শীলা। খুব খারাপ লাগে। কেউ বাংলিশে কথা বললে ভেতরজগতকে সামাল দিতে পারে না। গাল বেয়ে গড়ায় বিরহস্মৃতির নোনাজল। স্মৃতিরা বাজপাখির মতো এসে হানা দেয় তার হৃদয়-আঙিনায়। একেবারে হৃদান্তে। ক্ষুধার্তের মতো স্মৃতির পাখিরা বিষদাঁতে ঠোকর মারে শীলার হৃদয়ে।
দুই
মেহেদীর রঙ এখনো মেটেনি। দেশে চলছে ভাষা আন্দোলন। আদিল নামি দামি একটা দৈনিকে কাজ করতো। সম্পাদক স্যারে ফোন করেছেন এক্ষুণি তাকে ঢাকায় চলে আসতে। জরুরি মিটিং।
-‘স্যার আমি যে…?’
-‘না তোমাকে আসতেই হবে আদিল, আসতেই হবে। মৃত্যুপথযাত্রী হলেও।’
-‘কেন কী হয়েছে স্যার?… কী! ওরা আমাদের মায়ের ভাষাকে লুপ্ত করতে চায়! আমাদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়! কে ওদের এ সাহস দিলো?’
-‘বাবা! কাল রাজপথেই না হয় তোমার দেশপ্রেমদীপ্ত ভাষণ শুনবো। এখন রাখি। আসবে কিন্তু!’
আদিলের পুরো শরীর বেয়ে ঝরছে ক্রোধাগ্নিঘাম। মাতৃভাষাপ্রেমের রক্ত তপ্ত হয়ে উঠছে ক্রমশ।
তিন
শীলা, শীলা… এই শীলা!
বাসর সাজানো খাটের কাছে এগিয়ে ফিসফিসে গলায় কয়েকবার ডাকলো আদিল। শীলা কোনো শব্দ করলো না। ঘোমটা সরিয়ে শীলার ঘাড়ে হাত রাখলো সে। এবার মৌনতা ভেঙে শব্দ করলো শীলা। যে শব্দের আভিধানিক কোনো অর্থ নেই। আছে শুধু হৃদ্যিক প্রেমাকর্ষণ। শীলার ভেতরফাটা কান্নায় মনোবল ভেঙে পড়ে আদিলের।
দীর্ঘ পনেরো বছর যে রাতের অপেক্ষায় চাতকের মতো অপেক্ষমাণ ছিলো সে রাত কি এখনই শেষ হয়ে যাবে? নাহ, শীলার কান্না থামাতে হবে, নয়তো তার যুদ্ধযাত্রা শুভ হবে না। ওকে মাতৃভাষার কথা বুঝাতে হবে। ঘুরেফিরে আবারো সাজানো বাসরে ঢুকলো আদিল। শীলাকে আদর করে শুয়ালো। তাকে কাছে টেনে আনলো। খুব কাছে- ‘শীলা! আমি কালই ফিরে আসবো। তোমার যতো প্রাপ্তি, পিপাসার যতো আকুলতা সবই পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলবে কাল। দয়া করে আজ আমাকে…!’
শীলা হাসছে। কাঁচভাঙা আওয়াজে হাসছে। কান্নামাখা কণ্ঠে সহসা বেপরোয়া হাসি দেখলে কার না ভয় লাগে? আদিলের চেহারায় বিস্ময়। দেহজুড়ে কাঁপা কাঁপা ভাব। হাসি বন্ধ করে শীলা। শাড়িটাকে ভালো করে টেনেটুনে বসলো সে- ‘চাচা আমার আম্মাকে সেদিন বলেছিলেন, আমাদের শীলার জন্যে খুব ভালো একটা ছেলে দেখেছি। চলনে বলনে যেমন ভদ্র, সৌন্দর্যেও তেমন শুভ্র। চরিত্রে তার উপমাই হয় না। তাছাড়া ছেলেটার আলাদা একটা মহৎ গুণ আছে, সে সাহসিকতায় অনন্য। এই তো সেদিন বৈপ্লবিক সংবাদ করায় সাংবাদিক সংস্থা তাকে পদকে ভূষিত করেছে। চাচার মুখে আমার হবু স্বামীর এসব গুণকীর্তনে যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম। স্বপ্নের একটা পৃথিবী এঁকেছিলাম হৃদয়মন্দিরে। আজ সবই ইথারে হারিয়ে গেলো। দেশ-জাতি সর্বোপরি চলমান মাতৃভাষা ইস্যুতেও আপনার স্ত্রীপ্রেম দেখে বিস্মিত হলাম। ব্যথিত হলাম। খুব ব্যথিত…!’
আবেগ-অনুযোগে ভারী হয়ে ওঠে শীলার গলা। নিজের মতো একটা স্ত্রী পেয়ে আনন্দ আর তৃপ্তিতে ভরে উঠলো আদিলের হৃদয়।
চার
মা-বাবা ও স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে পা বাড়াতে যাবে আদিল, অমনি হাত ধরে পিছু টানলো শীলা। নিয়ে গেলো বাসরঘরে। আদিলকে বিছানার সাজ দেখিয়ে বললো- ‘আগামীকালই কিন্তু ফিরে আসবে!’
-‘আসবো অদ্বিতীয়া। অবশ্যই আসবো।’
পাঁচ
আলো-আঁধারের পৃথিবীতে দশটি বছর আজ অতীত হলো। কতোবার সূর্য উঠলো পূবাকাশে। কতো নিশিতে চন্দ্র ছড়ালো জোছনালো, কিন্তু আদিলের আর কাল হলো না। ভাষাশহিদ আদিল আর ফিরলো না।
অর্পণ : বায়ান্নোর সব শহিদকে
