বাংলাদেশে ইসলামি সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ, অগ্রপথিক, ইসলামি রেনেসাঁর অগ্রদূত, নন্দিত অনুবাদক, শেকড়সন্ধানী লেখক ও সফল সম্পাদকÑ একসঙ্গে সবক’টি বিশেষণের স্বার্থক অধিকারী ব্যক্তিত্ব খুঁজতে গেলে মনের ক্যানভাসে প্রথমেই যার নামটি ভেসে ওঠে, তিনি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। বাংলাভাষায় ইসলামচর্চা ও অনুবাদশাখাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে যে ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের নাম না নিলে নয় তিনি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য। বাংলাভাষায় ইসলামি সাহিত্যরচনা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে অনন্য ও অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন আজীবন। বাংলাভাষায় সিরাতসাহিত্য বিকাশে তার অবদান অবিস্মরণীয়। হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনচরিত যে সাহিত্যের আলাদা একটা বিষয় হতে পারে, এবং সেটা হতে পারে অতুলনীয়, বাংলাভাষী সাধারণ মুসলমানকে তিনি প্রায় হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন। আজ সিরাতসাহিত্য বাংলাভাষায় একটি সমৃদ্ধ শাখা।
ধর্মীয় গ্রন্থাবলি অনুবাদেও মাওলানা খান বিস্ময় জাগানিয়া অবদান রেখেছেন। প্রায় শতাধিক গ্রন্থ তিনি উর্দু এবং আরবি থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত করেছেন। এর মধ্যে আল্লামা শিবলি নোমানি রহ. লিখিত ‘আল-ফারুক’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি তিনি যুবা বয়সে অনুবাদ করেন। যা রাজধানীর এমদাদিয়া লাইব্রেরী থেকে প্রকাশিত হয়। তাফসির, সিরাত ও ইতিহাসনির্ভর গ্রন্থের ওপর তার কাজ সবচেয়ে বেশি। বাংলাভাষায় পবিত্র কোরআন শরিফের নির্ভরযোগ্য তাফসির তিনিই প্রথম এ জাতিকে উপহার দেন। আল্লামা মুফতি মোহাম্মদ শফি রহ. রচিত ৮ খ-ের কালজয়ী তাফসিরগ্রন্থ ‘মাআরেফুল কোরআন’ তিনি উর্দু থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ১৪১৩ হিজরিতে সৌদির বাদশাহ ফাহাদ কুরআন-মুদ্রণ প্রকল্পের উদ্যোগে ‘মাআরেফুল কোরআন’ সংক্ষিপ্তাকারে এক খ-ে বাংলায় ছেপে সারা দুনিয়ার বাংলাভাষীর মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।
গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত তাফসির ও টীকা সম্পর্কে কিছু বলা যাক। তাফসিরে কবির, তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে রুহুল বয়ান ও তাফসিরে ইবনে কাসিরের মতো পৃথিবীবিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ অধ্যয়নকারীরা মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত তাফসিরটি পড়লে আশ্চর্য না হয়ে পারবেন না। কারণ উল্লিখিত তাফসিরগ্রন্থগুলো বর্ণিত প্রায় সব ঘটনা, উপাখ্যান অতি সংক্ষেপে অথচ বোধগম্য ও সহজবোধ্য করে পবিত্র কোরআনুল কারিমে সংযোজিত করা হয়েছে। কোনো বৃহৎ বিষয়কে অল্প ভাষায় বর্ণনা করার জন্য কী পরিমাণ মেধা, দক্ষতা ও লিখনীর কৌশল দরকার পড়ে, তা কেবল উচ্চমার্গের লেখক এবং বোদ্ধা পাঠককুলই অনুধাবন করতে সক্ষম।
এই গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বোঝানোর জন্য টীকা সংযোজন। মুহিউদ্দীন খানের মতো বিচক্ষণ মুফাসসিরের পক্ষেই কেবল সম্ভব আল-কুরআনের সাধারণ পাঠকদের মনের অবদমিত প্রশ্ন, বোঝার সমস্যা এবং হৃদয়ঙ্গম করার দাওয়াই সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া। ফলে তিনি কুরআনের কিছু শব্দ, চরিত্র, অক্ষর, ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ে নিজস্ব মতামত টীকা আকারে সংযোজিত করেছেন, যা তাফসিরের মধ্যে উল্লেখ করা সম্ভব ছিলো না। আল-কুরআনের মতো একটি মহাগ্রন্থের তাফসিরের নির্ভুল সংকলন, যথার্থ বঙ্গানুবাদ, টীকা সংযোজন, সম্পাদনা, অলঙ্করণ, গ্রন্থনা, মুদ্রণ, বাইন্ডিং ও বিতরণÑ তা-ও আবার বিনামূল্যে এবং সারাদেশে এবং দুনিয়ার অন্য প্রান্তের বাংলাভাষী লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দুরূহ কাজটি কেবল তার মতো কর্মবীরের পক্ষেই সম্ভব। তাফসিরগ্রন্থটির ভূমিকা লিখতে গিয়েও মাওলানা মুহিউদ্দীন খান যে মেধা, মনন ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বর্তমানের অন্য কোনো লেখকের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি না, ঢের সন্দেহ আছে।
এবার তার অন্যান্য সৃষ্টি সম্পর্কে কিছু বলা যাক। তার লিখিত মৌলিক-অনুবাদ গ্রন্থের সংখ্যা একশো পাঁচ। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি রহ. লিখিত পৃথিবীবিখ্যাত বই ‘এহইয়াউ উলুমিদ্দিন’-এর অনুবাদ। সম্মানিত পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, ইমাম গাজালি রহ.-এর এ বইটি পৃথিবীর সর্বকালের ইতিহাসে মানবরচিত সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান মানবজাতির অমূল্য সম্পদরূপে বিবেচিত গ্রন্থটিকে সুনিপুণ ও সুদক্ষ কারিগরের মতো এতো চমৎকারভাবে অনুবাদ করেছেন, বাংলাভাষাভাষী পাঠকদের একবারও মনে হবে না যে এটি একটি অনুবাদকর্ম। বরং গ্রন্থটির সুধা-রস আস্বাদন করতে করতে পাঠকদের মনে হবে- স্বয়ং ইমাম গাজালি রহ. উপস্থিত হয়ে পাঠকের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে তার বক্তব্যগুলো বাংলায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘ইনসানিয়ত মওত কে দরওয়াজে পর’ (জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ) গ্রন্থেরও স্বার্থক অনুবাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ.। গ্রন্থটির অনুবাদ আরো দু’টি হলেও পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছে মাওলানা খান সাহেব রহ.-এর অনুবাদই। এমন একটি বক্তব্য ফুটে উঠেছে স্বমহিমায় ভাস্বর লেখক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর ‘প্রিয় পদরেখা’ গ্রন্থের ‘বটবৃক্ষের ছায়ায়’ প্রবন্ধে।
আল্লামা বদরে আলম মিরাঠি রহ. কর্তৃক লিখিত হাদিস সংকলন ‘তরজুমানুস সুন্নাহ’-এর অনুবাদও তিনি করেন। মুসলিম শরিফ থেকে সংকলিত নির্বাচিত হাদিসের একটি উর্দু অনুবাদও তিনি বাংলায় তরজমা করেন। যা প্রথমে মাসিক মদীনায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। আরবি জানা ও বুঝার জন্য আরবি-বাংলা ও বাংলা আরবি অভিধানের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই তিনি ‘আল কাউসার’ নামক অভিধান রচনা, সম্পাদনা ও প্রকাশ করে এ শূন্যতা পূরণ করেন। ইলমে তাসাওউফের ওপর কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থও তিনি অনুবাদ করেন।
সিরাতসাহিত্যে মাওলানা খানের ভূমিকা অতুলনীয়। তিনি জাতীয় সিরাত কমিটি গঠন করেছেন এবং আজীবন এর সভাপতি ছিলেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সমস্ত জ্ঞানী-গুণীদের লেখা নিয়ে সিরাতস্মারক প্রকাশ করেছেন এবং পুরো দেশজুড়ে সিরাতের শিক্ষা পৌঁছে দিতে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছেন। আজ সিরাতসাহিত্য বাংলাভাষায় সমৃদ্ধ একটি শাখা, এর সিংহভাগ অবদানই তার। তিনি যখন মাসিক মদীনার কার্যক্রম শুরু করেন, তখন প্রথম সংখ্যাটি ছিলো সিরাতসংখ্যা। আজও মাসিক মদীনা প্রতি রবিউল আউয়াল মাসে সিরাতসংখ্যা প্রকাশ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মাসিক মদীনাই প্রথম এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলো।
সিরাতবিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ যেমন তিনি লিখেছেন তেমনি অনুবাদও করেছেন মূল্যবান বেশ কয়েকটি গ্রন্থ। যার কারণে বাংলাভাষায় সবচেয়ে বেশি সিরাতগ্রন্থ অনুবাদের স্বীকৃতি তিনিই অর্জন করেছেন। বাংলাদেশি আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে তিনি অগ্রপথিক।
‘খাসায়েসুল কোবরা’ বাংলাসাহিত্য-সংস্কৃতি ও বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য এক অমূল্য দলিল এবং মহামূল্যবান রতœ বলে চিরদিন চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প-িত ও বুজুর্গ আল্লামা জালালুদ্দিন আবদুর রহমান সুয়ুতি রহ. রচিত ‘খাসায়েসুল কোবরা’ হলো সেই গ্রন্থ, যেখানে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের আশ্চর্যজনক দিকগুলো সহিহ ও শুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে। বইটি সম্পর্কে খোদ আল্লামা সুয়ুতি বলেন- ‘আমার শ্রমসাধ্য এ রচনাটি এমন উচ্চ মরতবাসম্পন্ন একখানা কিতাব, যার অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলেম ব্যক্তিমাত্রই সাক্ষ্য দেবেন। এটি এমন এক রহমতের মেঘখ-, যার কল্যাণকর বারি সিঞ্চনে কাছে ও দূরের সবাই উপকৃত হবেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি অসাধারণ মূল্যবান রচনা। অন্যান্য সিরাতগ্রন্থের মোকাবেলায় এটি এমন একটি কিতাব, যাকে কোনো স¤্রাটের মাথার মুকুটে সংস্থাপিত একখানা উজ্জ্বল হীরকখ-ের সাথেই কেবল তুলনা করা যেতে পারে। এটি এমন একটি সুগন্ধি, ফুলের সাথেই শুধু তুলনীয় হতে পারে; যার সুগন্ধ কখনো বিনষ্ট হয় না।’
অমূল্য এ কিতাবের স্বার্থক অনুবাদ করেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.। আল্লামা শিবলি নোমানি রহ. ও আল্লামা সৈয়দ সুলাইমান নদভি রহ. লিখিত বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ ‘সিরাতুননবি’রও অনুবাদ করেন তিনি। শায়খুল হাদিস আল্লামা জাকারিয়া কান্ধলভি রহ. লিখিত শামায়েলে তিরমিজির উর্দু তরজমা ও ব্যাখ্যার বাংলা অনুবাদ করেন তিনি। এছাড়াও সিরাতবিষয়ক ও অনুবাদশীর্ষক ঐতিহাসিক আরো অনেক গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ‘স্বপ্নযোগে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ ‘হৃদয় তীর্থ মদিনার পথে’ ‘উসওয়ায়ে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ ‘প্রিয়নবির অন্তরঙ্গ জীবন’ ‘প্রিয়নবির প্রিয় প্রসঙ্গ’ ‘শাওয়াহিদুন নবুওয়্যাহ’ ‘রওজা শরিফের ইতিকথা’ ‘হাদিসে রাসুল’ ‘তাজরিদুল বোখারি’ ‘আল-মোরশিদুল আমিন’ ‘চেরাগে মোহাম্মদ’ ‘মোমিনের জীবনযাপন পদ্ধতি’ ‘প্রিয়তম নবির প্রিয় সুন্নতসমূহ’-সহ প্রায় দুই শতাধিক মৌলিক ও অনুবাদগ্রন্থ তিনি পাঠকদের উপহার দেন।
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেবের তত্ত্বাবধান ও সরাসরি দিক-নির্দেশনায় তৎকালীন মাসিক মদীনার সহসম্পাদক, বর্তমান সম্পাদক ড. আহমদ বদর উদ্দীন খানের সম্পাদিত সিরাত অ্যালবাম প্রিয়নবি ও তার জীবনচরিত জানতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। তাছাড়া, সিরাত সংক্রান্ত মাসিক পত্রিকা, বিভিন্ন রচনা, গবেষণা, অনুবাদ, প্রবন্ধ এবং নিবন্ধের সর্বাধিক প্রচার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে খান সাহেবের মদীনা পাবলিকেশান্সের ভূমিকাও অতুলনীয়।
রাসুলপ্রেমিক আল্লাহর প্রিয় এ বান্দা জান্নাতের বাসিন্দা হয়ে সুখে থাকুন। বাংলা সাহিত্যের ফল-ফুল পত্রপল্লব তার রচনার রসে তাজা হোক। বাংলাদেশে গড়ে ওঠুক সিরাতপ্রেমের অবারিত উদ্যান।
