সুখে-দুঃখে যে আমাদের পাশে দাঁড়ায়, যাপিত জীবনে সকল বিষয়ে কল্যাণকর পরামর্শ দেয়, সময়ের করুণ সব মুহূর্তে কাছে থাকে, মানবিক কায়দায় আমরা তাকে বন্ধু বলি। মানবজীবনে বন্ধু ও বন্ধুত্বের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য বলেই ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষেরই বন্ধু থাকে। আর এ থাকাটা প্রতিটি সুস্থজীবনের কামনাও বটে।
রাসুল সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মর্যাদা বুঝাতে গিয়ে বলেন– যদি আমি আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম তবে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম। নবিজির এ কথা থেকে স্পষ্ট হলো যে, তার কাছেও বন্ধুত্ব বিষয়টি স্বীকৃত এবং ভালো লোকের সাথে বন্ধুত্ব পছন্দনীয়।
মানবতার ধর্ম ইসলাম তাই সবকিছুর মতো বন্ধুত্বের পূর্ণাঙ্গ একটি রূপরেখা এঁকে দিয়েছে। কার সাথে বন্ধুত্ব করবে আর কার থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে সর্বোপরি বন্ধুত্বের উপকার-অপকার সম্পর্কে মানবসমাজের চির উন্নত ও সমুচ্চ প্রশংসিত চরিত্রের পতাকাবাহী মহামানব নবি মোহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদিস রয়েছে। যেগুলোর পুঙ্খানোপুঙ্খ অনুসরণেই রয়েছে মানবজাতির শান্তি ও মুক্তি।
নবিজি সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ভালো ও মন্দ বন্ধুর উপমা দিয়ে বলেন– ভালো বন্ধু হলো মৃগনাভী বাহকের মতো। তার সান্নিধ্যে গেলে তুমি সুগন্ধি যদি নাও গ্রহণ করো তার ঘ্রাণ অবশ্যই পাবে। আর মন্দ বন্ধু হলো হাপর চালকের মতো। সে হয় তোমার কাপড় পোড়াবে; না হয় দুর্গন্ধ শুঁকিয়ে মারবে। ( সহিহ বোখারি, হাদিসক্রম : ৫৫৩৪)
আর স্বভাবতই বন্ধু তার বন্ধুর পথ ও মতকে গ্রহণ করে। তার ধ্যান-ধারণাকে নিজের ভেতর লালন করে এবং সময়কালে জীবনচলার অভিধানে সেগুলোকে স্থান দিয়ে থাকে। ভালো- মন্দের বাছ-বিচার করার বিবেক-বুদ্ধি তখন স্বভাবের কাছে হেরে যায়। বলতে গেলে চিন্তাজগত থেকেই লুপ পেয়ে যায়। নবি সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এক হাদিসে বলেন– বন্ধু তার বন্ধুর পথের পথিক হয়। মানবজীবনের এ যাত্রাপথের শেষ সীমান হয়তো বেহেশত, নায় দোজখ। তাই তুমি এমন কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না যার চলার পথ গিয়ে মিশেছে ভয়াল নরকে। নবি সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেন– যে ব্যক্তি কোনো জালেমের সাথে চলাফেরা করলো সেও অপরাধ করলো। (আলমাকাসিদুল হাসানা– হাদিস : ১১৮৮)
নবিজির আরেক হাদিস যা আমাদের কাছে খুবই প্রসিদ্ধ। তিনি বলেন– যার সাথে যার মোহব্বাত তার সাথে তার কেয়ামাত। তাছাড়া এ ব্যাপারে বাস্তবতামুখী একটি প্রবাদও আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে– সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।
প্রিয়পাঠক, একটু গভীরভাবে লক্ষ কর দেখুন যে, উপর্যুক্ত হাদিস এবং প্রবাদকথার বাস্তবতা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। সুতরাং বন্ধু নির্বাচনে আমাদের অবশ্যই এমন ব্যক্তিকে গ্রহণ করতে হবে যার সংস্পর্শপ্রভাবে আমার ধর্ম-সমাজ এবং পরিবার-পরিজনের কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়। এদিকে ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ তার পুত-পবিত্র কালাম মহাগ্রন্থ আলকোরআনে নবিকে সম্বোধন করে বলেন– তুমি নিজেকে ধৈর্যসহ তাদের সাথে রেখো যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের প্রভুকে তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ডাকে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না। তুমি তার আনুগত্য করো না যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি; যে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমাতিক্রম করে। (সুরা কাহাফ, আয়াতক্রম : ২৮)
জীবনের আবশ্যকীয় বন্ধুত্ব-সম্পর্কের একটা সীমারেখা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন– দতুমি তোমার বন্ধুকে ভালোবাসতে গিয়ে সীমা ছাড়িয়ে যেও না; কারণ হয়তো এ বন্ধুই একসময় তোমার শত্রুতে পরিণত হবে। আর শত্রুর প্রতি ঘৃণা এবং শত্রুতারও সীমাতিক্রম করো না; কারণ হয়তো এ শত্রুই একদিন তোমার বন্ধু হবে। (তিরমিজি, হাদিসক্রম : ১৯৯৭)
সুতরাং বন্ধুকে নিজের গোপনীয় এমন কোনো কথা, যা সে জেনে ফেললে ঘটনাচক্রে যদি বন্ধুত্বের বন্ধন চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে ক্ষতি সাধনের প্রবল আশঙ্কা থাকে, তা বলা যাবে না। তেমনি শত্রুর বেলায় সীমাতিক্রম বা বাড়াবাড়ি করা যাবে না। অর্থাৎ শত্রুতা মেটাতে গিয়ে তার সাথে পাশবিকতায় মেতে ওঠা যাবে না।
আজকাল আমরা অনেকেই বন্ধুত্বে গোল খাই। শখের বশে কিংবা উপকারের প্রতিদান দিতে গিয়ে এমন মানুষের সাথে সম্পর্ক করে ফেলি যার ধ্যান-ধারণা এবং স্বভাব-চরিত্র সম্পূর্ণই আমার জীবনের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর। আবার কখনও এমন হয় যে, বন্ধুর চাল-চলন কোনো কিছুই আমার ধর্ম-পরিবার ও সমাজ গ্রহণীয় চোখে দেখে না। কিন্তু শখের বশে আমি ওসবের পরোয়া করি না। ফলে অল্পদিনেই আমি হয়ে যাই সমাজচ্যুত। সুন্দর জীবনে তখন নেমে আসে অশান্তির সাইক্লোন। বাস্তবতা হলো– একজন ভালো বন্ধুর কল্যাণে অর্জিত হতে পারে শান্তিময় সুন্দর একটি সুখের জীবন। আর মানবের শান্তি-সুখের আবশ্যকীয় ফলাফল হলো- সুন্দর ও সুস্থসমাজ।
অতএব, প্রিয় পাঠক সুন্দর-সুখময় সুস্থসমাজ গঠনে আসুন ভালো মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে খারাপ লোকদের বর্জন করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন
লেখক : শিক্ষার্থী, জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা, সিলেট
