হজরত আবদুল হক আজমি রহ. : নিভে যাওয়া এক আলোর পিদিম

সংখ্যা:

জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই যারা আমরণ সাধনা করেন, তাদের লক্ষ থাকে অনেক বড় হওয়া। ধ্যানে জ্ঞানে পরমে থাকে ডানা মেলে আকাশে ওড়ার অদম্য বাসনা। তাদের অনেকে বড়ও হন একদিন। যশ-খ্যাতি তাদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। সবাই তাদের চেনে। শ্রদ্ধার সাথে বরণ করে। তারা নন্দিত হন সর্বমহলে। কিন্তু এর বাইরে আরও অসংখ্য মনীষী এমন আছেন, যারা আমাদের সবার আড়ালে নিভৃতে জীবনযাপন করে এ দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেন। তারা নীরবে নিরালায় সবার অজান্তে মানুষের জন্য, সমাজের কল্যাণে, দেশের হিতে এবং বিশ্ব মানবতার সেবায় তিলতিল করে আপন অস্তিত্বের সবটুকু বিলিয়ে দেন। জীবনের ঊষালগ্ন থেকে ব্রতী হন উন্নত ভবিষ্যত বিনির্মাণ, আদর্শ জাতি গঠন এবং বিশ্ব সংসারের মঙ্গল কামনায়। সাফল্য ও কর্মবৈচিত্রের পড়ন্ত বেলায়ও নিরন্তর সাধনায় নিমগ্ন রাখেন নিজেদের। তাদের ভুলে যাওয়া বড় অন্যায়। বরং তারাই তো বেশি শ্রদ্ধা পাবার উপযুক্ত। তাদেরকে শ্রদ্ধা করতে হয় অন্তরের গহীন থেকে।

এম্নিভাবে কোনো কোনো মানুষ সবার প্রিয় হয়েও বাস করেন নিভৃতে। কোনো কোনো মানুষ সবার মান্য হয়েও বাস করেন নৈশব্দে। তারা আল্লাহর দুনিয়ায় এসে আল্লাহর দীনের কাজে ডুবে থাকেন। নিজের চেষ্টা, শ্রম-সাধনা বিলিয়ে যান অকাতরে। নিন্দিষ্ট সময় এলে আবার আল্লাহর হুকুমে দুনিয়া ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে যান। দুনিয়ার মানুষ তাকে হারিয়ে বুঝতে পারে তিনি কতো বড়ো আশ্রয় ছিলেন। কতো বড়ো ঠিকানা ছিলেন। কতো বড়ো মনীষী ছিলেন। তখন তারা অফসোস করে, আহা, এমন মহান মানুষের কদর আমরা করতে পারলাম না ঠিকমতো।

এমনি একজন ব্যক্তিত্ব ও সর্বজনমান্য মনীষী ছিলেন উম্মুল মাদারিস দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খে সানি হজরত আবদুল হক আজমি রহমতুল্লাহি আলায়হি। গত ৩১-১২-২০১৬ খ্রিস্টাব্দ শুক্রবার বাদ মাগরিব শায়খ পরমজনের ডাকে সাড়া দিয়ে পরপাড়ে পাড়ি জমান।

আহ চলে গেলেন শায়খে সানি। বিদায় নিলেন এ নশ্বর ধরণী থেকে। মিলিত হলেন রফিক আলার সাথে। এতোদিন বলেছি আদামাল্লাহ, হায়্যাহুল্লাহ আর এখন বলতে হচ্ছে রাহিমাহুল্লাহ

একাধারে প্রায় ৩৪ বছর দারুল উলুম দেওবন্দের মসনদে সহিহ বোখারি দ্বিতীয় খন্ডের দরস দিয়েছেন শায়খ। আলাদা একটা প্রাণ থাকতো শায়খের দরসে। শেষ দিকে এসে শারারিক অসুস্থতার কারণে সাধারণত হুইল চেয়ারে করেই শায়খ দরসে আসতেন। আসা-যাওয়াবস্থায় মুখে থাকতো সবসময় গুনগুন জিকিরের শব্দ। দরসে কিছুটা গরম মেজাজের মনে হলেও যে-ই হজরতের কাছে যেতো, মুহূর্তেই আপন করে নিতেন। সবসময় সবার হালপুরসি করতেন। সামান্য হলেও কিছু দ্বারা আতিথেয়তা করতেন। এটা ছিলো হজরতের অনন্য এক বৈশিষ্ট্য।

শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি রহ-এর খাস শাগরেদদের একজন ছিলেন শায়খ। বোখারি ১ম ২য় ছাড়াও তিরমিজি প্রথম খণ্ড তিনি মাদানি রহ-এর কাছে পড়েন। তিরমিজি দ্বিতীয় খণ্ড, শামায়েল এবং সুনানে আবু দাউদ পড়েন আল্লামা ইবরাহিম বলয়াবি রহ-এর কাছে। মাদানি রহ-এর কাছে বোখারি পড়াকালীন একটা সবকও তার ছুটেনি। সবসময় দরসের পাবন্দি করতেন।

আমরা যখনই শায়খের কাছে যেতাম, পরম মোহাব্বাতে আমাদের আগলে নিতেন। বলতেন– সবসময় নিজের সময়কে কিতাবাদি মোতালাআয় কাটাবে।মনোযোগ দিয়ে মোতালাআ করবে। বুঝে বুঝে পড়বে। উসতাদদের খেদমত করবে। পাঁচওয়াক্ত নামাজে জামাতের পাবন্দি করবে। কখনও অলসতা বশত নামাজ ফাঁকি দেবে না। দেখবে জীবনটা অনেক শানদার হবে। আল্লাহ ইজ্জতের জিন্দেগি নসিব করবেন।

সাদামাটা এই কথাগুলোই হজরত যখন বলতেন, আলাদা একটা প্রেরণা আমাদের ভেতর জাগ্রত হতো। শায়খের ইনতেকালের আগেরদিন বিকেলেও কিছু ছাত্র গিয়েছিলো তার খেদমতে। তাদের দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন- কীরে, তোমরা ছুটি কিভাবে কাটাচ্ছো? সবাই বললো- আলহামদুলিল্লাহ্ শায়খ, পড়ালেখায়ই কাটাচ্ছি।

একজন বললো- শায়খ, ইচ্ছে ছিলো এ ছুটিতে হিন্দের কিছু পর্যটন এলাকা ঘুরে দেখবো

শায়খ তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন- আরে ভাই, এসবে ঘুরে বেপন্দা নারীদের দেখে গোনাহ কামিয়ে লাভ কী এর চেয়ে ভালো অই রুপি দিয়ে ছুটিতে ভালো খাবার খাও। তাহলে শরীরের সুস্থতা বাড়বে। ভালো করে পড়ালেখা করতে পারবে।

দরস-তাদরিসের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে ইলমি সফরও করতেন শায়খ। বাংলাদেশে এসেছেন অনেকবার। বাংলাদেশের বিভিন্ন মাহফিলে অংশগ্রহণ করে হেদায়েতের আলো বিলিয়েছেন অকাতরে। বাংলাদেশে প্রচুর ছাত্রও আছেন শায়খের। শায়খ নিজেই বলতেন– আমার শুধু হাদিসের ছাত্রের সংখ্যাই তিরিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

১৩৪৫ হিজরি মোতাবেক ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুস্তানের আজমগড় এলাকায় শায়খের জন্ম। প্রাথমিক লেখাপড়া নিজের এলাকাতেই করেন। পরবর্তীতে দারুল উলুম আসেন এবং ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে দারুল উলুম থেকে তাকমিল ফিল হাদিস সম্পন্ন করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে শায়খ তিনটে বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ে আজমগড়ের বসিয়া গ্রামে, দ্বিতীয় বিয়ে আজমগড়ের নন্দুয়া গ্রামে এবং তৃতীয় বিয়ে করেন ইউপির প্রসিদ্ধ এলাকা বানারসে। তিন তরফে শায়খ মোট ছয় ছেলে ও তিন মেয়ের জনক ছিলেন।

দারুল উলুমের নওদারা আঙ্গিনায় লাখো আলেম-তালাবা ও তাওহিদি জনতার উপস্থিতিতে হজরতের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ পড়ান আওলাদে রাসুল মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানি হাফিজাহুল্লাহ। নামাজ শেষে হজরতকে আকাবেরের কবরের মিছিল মাকবারায়ে কাসেমিতে দাফন করা হয়।

শায়েখে ছিলেন আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন, আত্মার খোরাক, মনের শান্তি, চোখের শীতলতা, ক্লান্তির অবসান, আমাদের একটু পেরেশানিতে হাজারও সান্ত্বনার কেন্দ্রবিন্দু।

আল্লাহপাক শায়খের মরতবাকে বুলন্দ করে জান্নাতের আলা মাকাম দান করুন। আমিন।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, দারুল উলুম দেওবন্দ, ইউ পি, ভারত

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১