পরীক্ষা বিষয়টাই একটা সিরিয়াস ব্যাপার। এর প্রতি অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কিন্তু কী এক কারণে যেন পরীক্ষার ব্যাপারটাকে আমি কোনো কালেই সিরিয়াস হিসেবে নিতে পারিনি। তাই একে চাপ মনে করার যথেষ্ট কোনো কারণও আমার কাছে ছিলো না। সব কিছুই পারতাম বলে এমন মনোভাব ছিলো তা না; আবার তাই বলে যে একেবারেই গবেট ছিলাম, জানা-শোনা একেবারেই ছিলো না এমনও না। মাঝারি টাইপের ছিলাম। আনন্দ নিয়ে পড়তাম। পরীক্ষা এলে পরীক্ষা দিতে বসতাম; এবং এটা করতাম আনন্দের সাথেই; চাপের কিছুই এতে আমার চোখে পড়েনি।
আসলে পড়া-শোনার পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে একটা আনন্দদায়ক ব্যাপার ছিলো। পৃথিবীতে জানার চেয়ে অধিক আনন্দ আর কী হতে পারে?
সুতরাং যা-পড়লে আমার জানা-শোনা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে, তাতেই আমার আগ্রহ। সেটা যা-কিছুই হোক না কেন। কি ক্লাসের বই, কি বাইরের; কি গল্প কি উপন্যাস সবই আমি তীব্র সুখবোধ আর আগ্রহ-আকর্ষণ নিয়ে পড়ি। কোনো কারণ ছাড়াই, এ-থেকেই কেন যেন আমার মধ্যে পরীক্ষার ব্যাপারে কোনো ধরনের ভয়-ভীতি কাজ করে না।
পরীক্ষার হলে বসেই বুঝতে পারলাম আমার আজকের পরীক্ষাটা কেমন হবে। গতকাল রাত তিনটে পর্যন্ত পড়েছি। মাঝে একঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়ে আবার টানা পড়েছি ফজর পর্যন্ত। সকালে নাশতাটাও করিনি। বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে বেল বাজার আগ পর্যন্ত পড়েছি। হঠাৎ আমার এ সিরিয়াস পড়া দেখে ক্লাসের সিরিয়ালের ছাত্রটাও চোখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এটা বুঝতে পেরেছিলাম ঠিক যখন রুম থেকে বের হই হলে যাবার জন্যে।
প্রশ্নটা সামনে নিয়ে বসে আছি। আনমনেই নাড়াচাড়া করছি। মাঝে-মধ্যে বাঁকা চোখে প্রশ্নটার দিকে তাকাচ্ছিও। কী প্রশ্ন করেছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। মাথাটা শোঁ শোঁ করছে। কপালের ঠিক বাম পাশটায় তীব্র ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে। মাঝে মাঝে বাঁ চোখের পাতাটাও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে লাফিয়ে উঠছে। গতকাল রাতে এতোটা চাপ নিয়ে পড়াটা বোধহয় ঠিক হয়নি। রাতে বেশ দীর্ঘ একটা ঘুম দরকার ছিলো। তাহলে এমন খারাপ লাগাটা আসতো না।
যেহেতু পরীক্ষার ভালো-মন্দ দিক নিয়ে আমার এতোটা চিন্তা নেই, তাই ভাবলাম যাক কষ্ট করে পরীক্ষাটা দিই; যেমন হয় হোক। আমার পড়াটা দরকার ছিলো সেটা হয়েছে। এখন পরীক্ষা কী হবে, কেমন হবে ভেবে কোনো লাভ নেই।
কলমটা হাতে তুলে নিয়ে বিষয় বস্তু পুরোটা গুছিয়ে নিয়ে লিখতে শুরু করবো বলে ভাবতে লাগলাম
হিজরি চুরানব্বই সন। দামেশকের খেলাফতের আসনে সমাসীন তখন খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। পুরো ইসলামি খেলাফত তখন দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা ধ্বংসাত্মক ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্ত। চারদিক শান্ত। সর্বদা উন্মাদনায় ভরা ইরাকের প্রতিটা অলি-গলিও তখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসনে সুস্থির। ফলে ইসলামি সাম্রাজ্য নিজেদের পরস্পর বিবাদ থেকে মুক্ত হয়ে বহির্বিশ্বে ইসলাম প্রচারের প্রতি একনিষ্ঠভাবে মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়। যার ধারাবাহিকতায় তখন মুসলমানরা একদিকে আফ্রিকা হয়ে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলো স্পেনে; অন্যদিকে কিশোর সেনাপতি মোহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে ইসলাম জয় করে নিচ্ছিলো সিন্ধু সভ্যতার জনমানুষের মন-হৃদয়। জয় করে যাচ্ছিলো দেবল উপত্যকা। আর অন্যখানে ঠিক একই মুহূর্তে মধ্যএশিয়ায় ইসলামি ঝাণ্ডা দুন্দান্ত প্রতাপে এগিয়ে যাচ্ছিলো কোতায়বা ইবনে মুসলিমের নেতৃত্বে। নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি এমন এক দূরত্বে, যার আশপাশে অন্য কোনো মুসলিম সেনাপতিকে যাওয়ার সুযোগ ইতিহাস আর কখনো দেবে না।
ঠিক সেই চুরানব্বই হিজরিতেই কোতায়বা ইবনে মুসলিম তার সেনাদল নিয়ে বের হয়ে আসেন চতুর্থবারের জন্যে। পার হন ইতিহাস বিখ্যাত সেই আমু দরিয়া, ইতিহাসের পাতায়-পাতায় যা নহরে জায়হুন নামে সুপ্রসিদ্ধ। এরপর তিনি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে জয় করে নিতে থাকেন একের পর এক শহর-নগর-বন্দর-গ্রাম। জয় করে ইসলামি সাম্রাজ্যের অধীন করে ফেলেন ফারগানা এবং খাজান্দা; যা ক্যানভাসে আঁচড় দেয়া কড়া সবুজের মতোই চোখ জুড়ানো একটা গ্রাম, একটা শহর। বিজয় অভিযান অব্যাহত থাকে। মুসলমানরা এগিয়ে যায় আরো-আরো সামনে ইসলামি ইতিহাসকে হিমালয়সম উচ্চতায় নিয়ে যাবার জন্যে।
তখন হিজরি ছেয়ানব্বই সন।
মুসলিম সেনাদল দুন্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছে সামনের দিকে। লক্ষ তাদের পূর্ব-তুর্কিস্তান বিজয়। গত একদশকে তাদের হাতে পদানত হয়েছে পশ্চিম তুর্কিস্তানের প্রায় সবগুলো অঞ্চল। পশ্চিমাঞ্চল জয় করে তারা এখন ছুটছে পূর্বে। তাদের সর্বশেষ বিজয় ছিলো ফারগানা। ফারগানায় নিজেদের আধিপত্য এবং শাসন অটুট রাখতে অভিযান চালাতে হচ্ছে পূর্ব-তুর্কিস্তানের রাজধানী কাশগড়ে। কারণ ফারগানা কাশগড়ের রাজবংশ কুলতুর্কের অধীনে একটা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিলো। জানা কথা এ-ফারগানাকে উদ্ধার করতে এখন কাশগড় থেকে অভিযান পরিচালিত হবে। কোনো ধরনের সমস্যা যেন আর সামনে মোকাবেলা করতে না হয়, সেজন্যে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এ অভিযান পরিচালিত। তাছাড়া কাশগড় জয়ও কিন্তু একটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে মুসলমানদের জন্যে। চীনা সীমান্তে বা চীনা রাজার উপর চাপ তৈরি করা বা চীন-বিজয়ের একটা ক্ষেত্র তৈরি করা। কাশগড় বিজয় এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করবে। এছাড়াও কাশগড়ের অবস্থানের বিচিত্রতার কারণে সেখান থেকে বহির্বিশ্বে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য এ শহর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বাণিজ্যের মাধ্যমেই অন্যান্য দেশে মুসলমানদের ইসলাম প্রচারের পথ সাবলীল ও সুগম হবে।
কাশগড় শব্দটা সেখানে বাসরত উইঘুরদের দেয়া নাম। ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেকের মতেই কাশগড় সে-সময়ে পূর্ব-তুর্কিস্তানের রাজধানী ছিলো। উইঘুর ভাষায় এর অর্থ হলো রেশমের বাজার। এমন অদ্ভুত নামের কারণও আছে। তখন এ কাশগড় ছিলো পুরো মধ্যএশিয়ার একমাত্র শহর, যেখান থেকে পুরো বিশ্বজুড়ে রেশমের বাণিজ্য হতো। চীনা রাজা ও রাজবংশীয় পরিবারগুলোর জন্যে প্রয়োজনীয় সকল রেশম এখান থেকেই রফতানি হত। তাছাড়া যতো বণিকদল ছিলো, যারা রেশম বিকি-কিনি করতো, তারা এখান থেকে রেশম নিয়ে গিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতো। এছাড়া কাশগড় তখন ছিলো যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ রুট। যার ফলে এর একটি পথের নামই হয়ে যায় সিল্করুট; আরবিতে তরিকুল হারির; বাংলায় রেশমি পথ। সে পথ আজও অক্ষুণœ রয়েছে তার ঐতিহাসিক নাম নিয়ে।
কাশগড়ের অবস্থান মধ্য-এশিয়ায় হওয়ার কারণে এর উত্তর পাশজুড়ে অবস্থান বর্তমানের রাশিয়ার, যা সে সময় খণ্ড-খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। পশ্চিমে বর্তমান তুর্কিস্তানের অবস্থান। সেটা সে-সময় পশ্চিম তুর্কিস্তান হিসেবে পরিচিত ছিলো। দক্ষিণে হিন্দুস্তান। অর্থাৎ বর্তমানের পাকিস্তান এবং কাশ্মীর। আর পূর্ব-দক্ষিণে চীন; মানে প্রাচীন চীনের অবস্থান এবং অন্যপাশে তিব্বত নগরী।
পুরো কাশগড় ও তার পাশজুড়ে ছিলো প্রায় চল্লিশের উপর নদী। প্রায় সাতশো কিলোমিটার বর্গমাইল জুড়ে একে আগলে রেখেছিলো এক ধু-ধু মরুভূমি।
কাশগড়ের এ ঐতিহাসিক অবস্থানের ফলেই মুসলমানদের জন্যে তা বিজয় করা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। যদিও এটাই একমাত্র কারণ ছিলো না; বরং এটা ছাড়া অন্যান্য আরো বহু কারণ বিদ্যমান ছিলো। এবং সেগুলো একটা থেকে অপরটা কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না।
কাশগড়-সভ্যতা-সামাজিকতা তখন প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো ছিলো। বর্তমানে হিসেব করলে তো আড়াই হাজার বছরেরও অধিক কাল ধরতে হবে। ঐতিহাসিকগণ ধারনা করে থাকেন এ-সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিলো আর্য-সভ্যতা ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতার মিশেলে। সেই স্মরণাতীত কাল থেকেই সেখানকার জন-মানুষের প্রধান উপজীব্য ছিলো কৃষি এবং পশু-পালন। পাশাপাশি তাদের তুমুল আগ্রহ ছিলো সমরবিদ্যায়। জাতি হিসেবে ছিলো তারা তুখোড় সাহসী এবং তুমুল আত্মমর্যাদাবোধ-সম্পন্ন। যে-জন্যে তখন পর্যন্ত চীনা রাজাদের প্রবল আগ্রহ থাকা সত্তে¦ও তারা কাশগড়কে প্রাচীন চীনের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়নি বারবার সেনা অভিযান পরিচালনা করেও। যদিও এখন সেই কাশগড় চীনেরই অন্তর্ভুক্ত। এবং এর আধুনিক চৈনিক নাম জিনজিয়াং।
সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে, এ কাশগড় জয় করা মুসলমানদের জন্য খুব সহজ কোনো বিষয় হবে না। তারপরও মুসলমানরা আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করে সামনে এগিয়ে গেলো। জয়-পরাজয় সব তো তার হাতেই।
ছেয়ানব্বইতেই কাশগড়ের উপত্যকায় মুসলমানদের সাথে পূর্ব-তুর্কিস্তানের রাজবংশ কুলতুর্ক-এর রাজার তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। প্রবল বাধা সত্ত্বেও আল্লাহর রহমতে মুসলমানরা বিজয় অর্জন করে এবং প্রচুর গনিমত লাভ করে। রাজবংশের পুরুষদের উপর গোলামির মোহর অঙ্কিত হয়। অসংখ্য বন্দি হস্তগত হয়। আর এভাবেই কাশগড় জয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব-তুর্কিস্তান পূর্ণভাবে মুসলমানদের অর্থাৎ ইসলামি খেলাফতের অধীনে আসে।
কাশগড়-বিজেতা মহান সেনানায়ক কোতায়বা ইবনে মুসলিম এ বিজয়ের পর চীন-বিজয়ের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। এটাকে শুধু ইচ্ছে বলাটা ভুল হবে কোতায়বা আসলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন, চীন বিজয় তিনি করবেনই। সে-জন্যে সেনাদলকে পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। চীনের রাজা এর কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি তাৎক্ষণিক কোতায়বা ইবনে মুসলিমের নিকট রাজদূত প্রেরণ করেন এ বলে যে কোতায়বা ইবনে মুসলিম যেন চীনা রাজদরবারে এমন কিছু লোক পাঠান, যারা তাকে ইসলাম এবং মুসলমানদের সম্পর্কে অবহিত করবে। ফলে কোতায়বা ইবনে মুসলিম একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। সে-দলের প্রধান থাকেন হোবায়রা আল কিলাবি। দীর্ঘ আলোচনার পর চীনারা মুসলমানদের সাথে সন্ধি করে। এবং অনেক উপহার উপঢৌকন চীনারাজা মুসলমানদের নিকট প্রেরণ করেন। কোতায়বা ইবনে মুসলিম সেটা সসম্মানে গ্রহণও করেন, এবং চীন বিজয়ের ইচ্ছা ত্যাগ করেন।
এরই মধ্যে খেলাফতের আসনে ঘটে পরিবর্তন। একদিকে ওফাত হয় খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের এবং অন্যদিকে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ফলে ইসলামি খেলাফতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। দামেশকে খেলাফতের মসনদে খলিফা ওয়ালিদের স্থলাভিষিক্ত হন খলিফা সোলাইমান ইবনে আবদুল মালিক। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রতি তার ব্যাক্তিগত দ্বেষের কারণে তিনি খেলাফতে এসেই হাজ্জাজের নিয়োগ দেয়া সকল দিগ্বিজয়ী সেনানায়কদেরকে অপসারণ ও লাঞ্চিত করেন। এবং অনেককে চক্রান্ত করে হত্যাও করেন। যার ধারাবাহিকতায় ছিলেন মোহাম্মদ বিন কাসিম। আবদুল আজিজ বিন মোসা বিন নোসাইর। এবং সর্বশেষ কোতায়বা ইবনে মুসলিম। কাশগড় বিজয়ের বছরই জিলহজ মাসে তিনি খলিফা সোলাইমানের এক চরের হাতে শহিদ হন। ফলে মুসলমানদের বিজয়-অভিযানের সমাপ্তি এখানে এসেই শেষ হয়। কোতায়বা ইবনে মুসলিমের মৃত্যুতে কোনো এক অনারবি আক্ষেপ করে বলেছিলেন তিনি যদি আমাদের মাঝে থাকতেন, তাহলে আমাদের সাথে থেকেই তার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটতো। আমরা তাকে সম্মানিত এক বাক্সে সযত্নে রেখে দিতাম, এবং যখন আমাদের কোনো বিজয় অর্জন হতো আমরা এর ডালি খুলে তাকে সম্মান নিবেদন করতাম।
কাশগড়ে বসবাসরত অধিবাসী যারা, তাদের অধিকাংশই ছিলো উইঘোর। আসলে কাশগড় বলতে আমি পুরো পূর্ব তুর্কিস্তান বুঝাতে চাচ্ছি। উইঘোরদের পরে বসবাসরত জাতি হিসেবে ছিলো কিরগিজ, তাজিক, তুর্কি, উজবেক এবং মঙ্গোলিয়ান। তারাও কিন্তু উইঘোরদের তুলনায় কোনো অংশেই সংখ্যালঘু ছিলো না।
কোতায়বা ইবনে মুসলিমের হাত ধরে সর্বপ্রথম এ-ভূখণ্ডে ইসলামের আগমন ঘটে। এবং তার সফল বিজয়ের পর এখানের প্রচুর মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসে। তবে পরিসংখ্যান হিসেবে এতো এতো জাতির মাঝে সে সংখ্যাটা নেহায়েতই কম ছিলো।
পূর্ব-তুর্কিস্তানে বা কাশগড়ে ইসলাম আগমনের কথা বলতে গেলে কোতায়বা ইবনে মুসলিমের আলোচনা বাধ্যতামূলকভাবে আসে। এবং এখানে ইসলাম আগমনের সর্বপ্রথম ওয়াসায়েল তিনিই ছিলেন। দ্বিতীয় ধাপে এখানে ইসলামের চর্চা হতে থাকে আরব বণিকদের হাত ধরে। তাদের চলন-বলন, কথা-বার্তা, আচার-ব্যবহার ও সামাজিকতায় আরো বেশ কিছু লোক ইসলামে দীক্ষিত হয়। এবং এভাবে এ অঞ্চলে ইসলামের প্রচার-প্রসার চলতে থাকে।
তবে পুরোপুরিভাবে উইঘোর, উজবেক, তাজিকএ সকল জাতির ইসলামে প্রবেশ করার কথা বলতে গেলে সম্রাট সাতাক বোঘরা খানের আলোচনা করতেই হবে। তার আলোচনা ছাড়া পূর্ব-তুর্কিস্তানের বা কাশগড়ের ইসলাম প্রচারের কথা পূর্ণ হবে না। সাতাক বোঘরা খান খাকান কুরাখান রাজবংশের রাজা ছিলেন। ৩২৩ হিজরিতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার এ ইসলামগ্রহণের ফলে তার সাম্রাজ্যের সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে রাজবংশের জনমানুষও ইসলাম গ্রহণ করে। তার নাতি হারুন বুগরা খান ৩৩২ হিজরিতে নিজস্ব নামে মূদ্রার প্রচলনও করেন এবং ঠিক সে বছরই হারুন বোঘরা খান তার উপাধী গ্রহণ করেন শিহাবুদদৌলা এবং জাহিরুদ দাওয়াত নামে। তার শাসনামলেই সর্বপ্রথম তুর্কিভাষা আরবি হস্তাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়।
যদি বলতে চাই তবে বলতে হবে, পূর্ব-তুর্কিস্তান থেকে নিয়ে শুরু করে আশপাশের সমগ্র জাতির মাঝে ইসলামকে ছড়িয়ে দেবার কাজটা এই কোরাখানিরা মানে কোরাখান রাজবংশীয় লোকেরাই করেছেন, এবং তাদের হাতধরে এ কাজ নিষ্ঠার সাথেই পালিত হয়েছে। আশপাশের সকল জাতির মাঝে তারা ইসলামকে তার সকল সৌন্দর্য দিয়ে উপস্থাপন করেন। এর ফলশ্রুতিতে ৪৩৫ হিজরিতে কোরাখানিরা অন্যান্য আরো অনেক জনগোষ্ঠীকে পরিপূর্ণভাবে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, যাদের মাঝে ছিলো তুর্কমেনিয়া, সালজুক এবং ওসমানিরা। এরপর এদের খেদমত ইসলামের জন্যে কতোটা উৎসর্গিত ছিলো তা সবারই জানা। মধ্যযুগে সেলজুকদের খেদমত আর আব্বাসি খেলাফতের পতনের পর, ওসমানিদের দুন্দান্ত প্রতাপের সাথে নতুনভাবে আবার ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথা ইতিহাসের পাতায় পাতায় আজও অম্লান-চিরসবুজ হয়ে আছে।
এরপর থেকে নিয়ে পূর্ব-তুর্কিস্তানের সাধারণ জনগণ এবং জাতি সকলেই ইসলাম এবং ইমানের পথে এসে পড়ে। গত কয়েক শতাব্দী তাদের উপর চীনাদের বারবার আক্রমণ এবং সর্বশেষ তাদেরকে পদানত করে চূড়ান্তভাবে পূর্ব-তুর্কিস্তানকে নিজেদের রাজ্যের অন্তর্গত করে নেয়া সত্তে¦ও তারা নিজেদের ধর্ম ও আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেনি। বরং ধর্ম ও আদর্শের জন্যে তাদের অনেকেই নিজেদের ঐতিহাসিক পিতৃভূমিকে পর্যন্ত ছাড়তে কুণ্ঠাবোধ করেনি। আর এমন লোকের সংখ্যা কিন্তু খুব কম নয়। বরং নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে দেখা যাবে যে এদের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আজও যখন সমগ্র বিশ্ব তাদেরকে চৈনিকদের দেয়া নামে জানে, তখন তারা বিশ্ব দরবারে নিজেদেরকে কাশগড়ি হিসেবে ঘোষণা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সত্যি তাদের অটল এ মানসিকতাকে সালাম না-করে কোনো উপায় নেই।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমাদের নিকট একটা কথা খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কোতায়বা ইবনে মুসলিম ইসলামের ঝাণ্ডা নিয়ে সেই চীন-সীমান্ত (সেসময়কার চীন) পর্যন্ত গিয়েছিলেন। চীন তার হাতে বিজিত হয়নি। বরং চীনের সাথে মুসলমানদের সন্ধি চুক্তি হয় এবং বিজয়-অভিযান সেখানেই স্থগিত হয়।
কিন্তু আধুনিক চীনের সীমানা এবং তাদের প্রদেশ যদি আমরা নির্ণয় করি তাহলে অবলীলায় আমরা বলতে পারবো যে তিনি চীনও বিজয় করেছিলেন। কিন্তু সে কথা বলতে আমি নিজেকে গর্বিত নয়, খুব খুব লজ্জিত বোধ করি। কারণ এখনকার চীন আমাদের বিজিত অঞ্চল ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। ফলে আজ আমাদের অঞ্চলকে চীনের অঞ্চল হিসেবে আমাদেরকে বলতে হচ্ছে। যে-অঞ্চল একসময় মুসলমানদের হাতে বিজিত হয়ে ইলম-আমল-জ্ঞানে এতোটাই উঁচুতে উঠেছিলো যে, তাকে ইতিহাসের পাতায় ছোট্ট বোখারা নামে অভিহিত করা হয়েছে, সে-অঞ্চল আজ তার ঐতিহাসিক মধুর নাম খুইয়ে ফেলে চীনাদের দেয়া নাম একটা কলঙ্কের মতো নিজের শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে। আহ
পরীক্ষার হলে সতর্ক-ঘণ্টা বাজতেই ভাবনার জালে ছেদ পড়লো। ধীরে-সুস্থে খাতার দিকে তাকালাম একটা অক্ষরও লিখিনি। এতোক্ষণ ভাবতে ভাবতেই সময় পার করে দিয়েছি। শূন্য খাতায় নিজের নাম-ঠিকানা লিখে জমা দিয়ে বের হয়ে এলাম। বের হয়ে এলাম একজোড়া বিমূঢ এবং খুশিতে চকচক করতে থাকা চোখের সামনে দিয়ে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে জয়-পরাজয় কেবল পরীক্ষার খাতার মাধ্যমে নির্ণিত হয় না; পরীক্ষার খাতাটাই শেষ কথা না বলতেন প্রথাবিরোধী আমার এক প্রিয়জন। কথাটা মনে পড়তেই আলতো হাসির একটা রেখা ফুটে উঠলো ঠোঁটে।
লেখক : তরুণ ইতিহাসপিয়াসী
