কাশগড় কোথায় কাশগড়?
কাশগড় নামটা নিলেই বন্ধুদের, এমনকি খুব কাছের অনেক চিন্তক বন্ধুরও এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কখনো খেদে, কখনো মজা করে বলি- তোদের বাড়িতে পাকঘর আছে না? রান্নাশালা? রান্নাশালার পেছনের জানালা দিয়ে পাঁচশো পাওয়ারের চশমা পরে তাকাবি, কাশগড় দেখা যাবে।
জানার অভাবে যতোটা না, তার চে ঢের বেশি বেখেয়ালির কারণে আমরা কাশগড় চিনি না। নসিম হিজাজি পড়ে পড়ে নির্ঘুম রাত পার করি, কাশগড়ের কথা তবু আমাদের মনে থাকে না। মনে থাকে না পূর্ব-তুর্কিস্তানের ঐতিহ্য। উইঘোর মুসলমিদের আবাসভূমি হিশেবে আমরা জিনজিয়াংয়ের নাম জানি। অথচ আমরা জানি না, উইঘোর মুসলিমরা পারতপক্ষে এই নাম কখনো মুখে নেয় না। একান্ত প্রয়োজনে কিংবা চীনা শাসনের রাঙানো চোখের সামনে এক-আধবার যদি জিনজিয়াং বলেও ফেলে, তবে তাদের বুকের ভেতরটা, বরং পুরো সত্ত্বাটাই হৈ হৈ করে ওঠে। নহরে জায়হুনের কলনাদের মতো সেখানে ধ্বনিত হয়– পূর্ব-তুর্কিস্তান। মুসলমানদের হাজার বছরের ঐতিহ্য মণ্ডিত কাশগড়। আমাদের কাশগড়। কোতায়বা বিন মুসলিমের কাশগড়।
উইঘোর মুসলিমরা নামের এই চেতনা যুগ যুগ ধরে তাদের বুকের মাঝখানটায় সযতেœ লালন করে আসছে। চীন সরকারের চরম নির্যাতনও এই চেতনা থেকে তাদেরকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারে নি।
কাশগড় নিয়ে কিছু বলতে গেলে পূর্ব-তুর্কিস্তান এবং উইঘোর মুসলমানদের সুখ-দুঃখের কথা আপসেআপ এসে যায়। কারণ, কাশগড় পূর্ব-তুর্কিস্তানেরই একটি শহর এবং এখানকার সংখ্যাগুরু অধিবাসী উইঘোর। আজকের চীন যে অঞ্চলকে জোর-জবরদস্তি করে দখলে নিয়ে নাম দিয়েছে জিনজিয়াং, সেটাই মুসলিম ঐতিহ্যের স্মৃতিমাখা পূর্ব-তুর্কিস্তান। আমরা জিনজিয়াং বলবো না, প্রায় সাড়ে ষোলো লাখ বর্গকিলোমিটারের এই অঞ্চলকে উইঘোর মুসলিমদের সুরে সুর মিলিয়ে পূর্ব-তুর্কিস্তানই বলবো। যদিও উইকিপিডিয়া ভূখণ্ডটির পরিচয় দিতে গিয়ে একটিবারের জন্যও পূৃর্ব-তুর্কিস্তান শব্দটা উল্লেখ করেনি। অন্তত সেখানকার পূর্বনাম বা ঐতিহাসিক পরিচিয় হিশেবেও শব্দটা লিখতে পারতো। লিখেনি। আহা, কী কারিশমা উইকিপিডিয়ার
ছেয়ানব্বই হিজরিতে দিগ্নি জয়ী মুসলিম সেনানায়ক কোতায়বা বিন মুসলিম সর্বপ্রথম কাশগড়ে ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন করেন। তারপর থেকেই গড়ে ওঠে এখানে ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির অবারিত উদ্যান। জ্ঞান-বিজ্ঞানে কাশগড় এতোটাই এগিয়ে গিয়েছিলো, সবাই শহরটাকে ছোট্ট বোখারা নামে অভিহিত করতো।
ইন্টারনেট ঘাটতে গিয়ে সদ্য কাশগড় ঘুরে আসা এক পর্যটকের সফরনামা পেলাম। বর্তমান কাশগড় দেখতে কেমন, কেমন সেখানকার জীবনমান আর কোলাহল– জানতে আসুন একটা চুমুক দিয়ে আসি তার সফরনামায়।
কাশগড় এখনো লতার মতো প্যাঁচানো সব আঞ্চলিক সড়কের নাড়ি হয়ে আছে। এখন লরি ও সাইকেল চলে এখানকার পথে। সাইক্লিস্টদের অনেকে একই হোটেলে ঘাঁটি গেড়েছে। পরস্পরের সঙ্গে তারা পথের অবস্থা সম্পর্কিত তথ্য বিনিময় করছে, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক করছে, ক্লান্তি মুছে সতেজ হচ্ছে। কাশগড় ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। শহরটির ইতিহাস দুই হাজার বছরের। চীনের এ শহরসহ পুরো জিনজিয়াং প্রদেশ মূলত উইঘোর অধ্যুষিত এলাকা। তবে এখানে উইঘোরদের পাশাপাশি তাজিক ও কিরগিজরাও বসবাস করে। চেহারা সুরতে একটি জাতির সঙ্গে অন্যটির পার্থক্য বুঝা যাবে না। পোশাকেই শুধু ভিন্নতা দেখা যায়। কাশগড় শহরটি নতুন ও পুরনো দুই অংশে বিভক্ত। নতুন শহরটিতে আধুনিক জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় সবকিছু রয়েছে। বিরাট সুপারমার্কেটে প্রয়োজনীয় মনিহারি ও অন্যান্য দ্রব্য মিলে। উঁচু ভবনগুলোর মধ্যিখানে চওড়া সড়কে চলে বিদ্যুৎ ও সিএনজিচালিত সব যানবাহন। পুরনো শহরটি অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। এখানে মিলে পুরোদস্তুর মধ্য এশীয় আবহ। হাজার বছর ধরে উইঘোরদের প্রথাগত জীবনযাত্রা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ধরে রেখেছে এ কাশগড়। ইটের বাড়িগুলোর প্রতিটিতে ভারী দরোজা, রয়েছে পাখি রাখার খাঁচা ও মধ্য এশিয়ায় পরিচিত কাঠের বর্গাকার বিছানা, যাকে তখত বলা হয়। কয়েক বছরের পুরনো বাড়িগুলো অনেক ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
কাশগড়ের ঈদগাহ মসজিদটি চীনে সবচেয়ে বড় মসজিদ। জিনজিয়াং প্রদেশের ইসলামিক সেন্টার এ মসজিদ। মসজিদের সামনে চারপাশে বিরাট সব গাছের ছায়ায় ঢাকা বিরাট মাঠ। পপলারগুলো যেন আকাশছোঁয়ার খেলায় মেতেছে। পাইন গাছেরা সেদিকে না তাকিয়ে মনোযোগী হয়েছে চারপাশে জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায়। মসজিদের সিঁড়ির কাছে প্রবীণ মানুষেরা বসে আড্ডা দিচ্ছে। ঈদগাহের উল্টো দিকেই পুরনো কাশগড় শহর। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা দেখা ও বুঝার জন্য এটাই সেরা জায়গা। অনেকটা যেন প্রাচীন সিল্করুটের আবহ রয়ে গেছে কাশগড়ে। ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, টুপি, দোলনা, কাঠের আসবাবপত্র ও অলঙ্কারের কাজ করছেন কারিগররা। ঠেলাগাড়িতে করে বিক্রি হচ্ছে বাগান থেকে সদ্য সংগৃহীত আপেল, পিচ, খোবানি, তরমুজ ও আঙ্গুর। দোকানগুলোর ভেতরে-বাইরে হরেক পণ্য : মধু, সেলাই মেশিন, পণের ঝুড়ি, ভেষজ ওষুধ, সাপের শুঁটকি, চা থেকে আরম্ভ করে কল্পনায় আসতে পারে এমন বহু কিছু। খাবারের দোকানে পরিবেশিত হচ্ছে ভেড়ার মাথা, খাসির মগজ, গরম পুডিং ইত্যাদি। একটি চায়ের দোকানের দোতলায় বসে নিচের ব্যস্ত বাজারের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তুর্কি সালতানাতের পতন অবধি পূর্ব-তুর্কিস্তান তুর্কিদের শাসনাধীনেই ছিলো। তারপর গেলো শতাব্দীর চল্লিশের দশকে এক গৃহবিবাদের সুযোগে মুসলিম অধ্যুষিত বিশাল এই অঞ্চলটি চীন দখল করে নেয়। দখল করে নেয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও খনিজ সম্পদের শহর কাশগড়ও। কাশগড়সহ পূর্ব-তুর্কিস্তানের সংখ্যাগুরু উইঘোর মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে জারি করা হয় নানা কিসিমের নিষেধাজ্ঞা। চীন যে-বছর পুর্ব-তুর্কিস্তান অধিকার করলো, তার পরের বছরই কাশগড়সহ এই ভূখণ্ডের মুসলিম নেতারা পুর্ব-তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র নাম দিয়ে এখানকার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য স্বতন্ত্র একটি জাতীয় সঙ্গীত এবং চাঁদ-তারা খচিত পতাকাও তৈরি করে ফেলেন। কিন্তু চীনা সেনাবাহিনী সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে তাদের এই স্বপ্ন-সাধ চুরমার করে দেয়। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সাধারণ উইঘোরদের উপর চালায় নির্যাতনের স্টিম রোলার।
১৯৬৬ থেকে ৭৬ ইংরেজির মধ্যকার সময়টাতে চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই সময়টাতে পূর্ব-তুর্কিস্তানে সবধরনের ধর্মীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেয় চীন। তালা লাগিয়ে দেয় অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসায়। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিকভাবেও পর্যুদস্ত করতে থাকে উইঘোর মুসলমানদেরকে। নির্যাতনের সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। বরং দিনদিন বাড়ছে এই পাশবিকতা। চিন্তা করা যায়, চীনা আইনে একজন চীনা যুবক ফ্যাশনের জন্য দাঁড়ি রাখলে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু একজন মুসলমান কোনো অবস্থাতেই দাঁড়ি রাখতে পারবে না দাঁড়ি রাখলে ছয় বছরের কারাদ- মুসলিম মেয়েরা বোরকা তো দূর কি বাত, মাথায় হিজাবটা পর্যন্ত পরতে পারবে না। এই তো কিছুদিন আগে এই আইন লঙ্ঘনের কারণে এক উইঘোর দম্পতিকে ছয়বছরের কারদ- দিলো চীনের এক আদালত।
অফিস-আদালতে যারা চাকরি-বাকরি করবে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করবে, রমজানের দিনে তারা রোজা রাখতে পারবে না। আটারো বছরের নিচের কেউ জামাতে নামাজ পড়তে পারবে না। এই হলো আধুনিক চীনের অত্যাধুনিক আইন
এতো কিছুর পরও উইঘোরদের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেমে নেই। ১৯৯০ ইংরেজিতে স্বাধীনতার জন্য উইঘোররা ব্যাপকভাবে আন্দোলন গড়ে তুললে চীনা সেনাবাহিনী ৫০ জন স্বাধীনতাকামীকে নির্বিচারে হত্যা করে আন্দোলনকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ করে। কয়েক বছর পর সাতানব্বইতে উইঘোররা স্বাধীনতার জন্য আবারও মাথা উঁচু করলে চীনা প্রশাসন প্রায় দুইশো জন স্বাধীনতাকামীকে গ্রেফতার করে। এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে পুরো পূর্ব-তুর্কিস্তান জুড়ে। চীনা সরকার বড়ো নিন্দয় এবং বর্বরভাবে দমন করে এই আন্দোলন। নির্মমভাবে শহিদ করে দেয় মুক্তিপাগল প্রায় একহাজার মানুশকে। আরো প্রায় চারহাজার উইঘোরকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করে আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে। এমনকি উইঘোর মুসলমানদের ঘর-বাড়িতেও হামলা চালায়। বাজেয়াপ্ত করে প্রচুর ইসলামি বই-পত্র। এরপর থেকে উইঘোরদের স্বাধীনতা আন্দোলন বাহ্যিকভাবে কিছুটা স্তিমিত হলেও ভেতরে ভেতরে তারা আগুন পুষছে সেই আগের মতোই। যে-আগুন একদিন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। যে-আগুন একদিন পুড়িয়ে ছারখার করবে জালিমের সিংহাসন।
উইঘোর মুসলমানরা যেখানেই যায়, এই আগুন হƒদয়ে করে নিয়ে যায়। এই আগুনের ভেতর লালিত হচ্ছে স্বাধীন একটি উইঘোরিস্তান-এর স্বপ্ন। যেখানে পতপত করে উড়বে চাঁদ-তারকা খচিত হেলালি নিশান। হেলালি সেই নিশানবরদার উইঘোরিস্তানের রাজধানী কোথায় হবে জানেন? অবশ্যই কাশগড়। কোতায়বা বিন মুসলিমের কাশগড়। আমাদের হারানো ঐতিহ্যের কাশগড়।
