রাজশাহী টু বগুড়া

সংখ্যা:

রাত ১২ টা পনেরো মিনিট থেকে ভোর ৫ টা ৩০ মিনিট

দারুল উলুম মাদরাসা, মালোপাড়া, রাজশাহী। রাজশাহীর প্রবীণতম কওমি মাদরাসা। ১১ মার্চ ২০১৭। আজ ৫৭ তম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল। সময় এখন রাত ১২ টা বেজে ১৫ মিনিট। বয়ান পেশ করছেন, জামেয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মাদপুর, ঢাকার শাইখুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক। আজ তার টানেই বগুড়া থেকে ছুটে এসেছি। সঙ্গে আছেন, তরুণ আলেম ও লেখক মাওলানা আশিকুর রহমান। সাড়ে বারোটায় মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের ফিরতি গাড়ির টিকিট।

আশিকের প্রশ্ন, তিনি কি গাড়ি মিস করবেন?

মুচকি হেসে বললাম, তাঁর স্পিড তুমি জানো না, আমি জানি না। দেখবে, ঠিক দশ মিনিট পূর্বে বয়ান শেষ করবেন এবং ড্রাইরেক প্রাইভেট গাড়িতে উঠে ঠিক সময়েই ফিরতি বাসে উঠবেন।

এখনো আমার কথা শেষ হয়নি, ১২ টা ১৭ মিনিটে তিনি দুআ আরম্ভ করলেন। ঠিক ১২ টা ২০ মিনিটে দুআ শেষ করলেন।

চোখ মুখে হাত মুছে স্টেজের দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি আর নেই। আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন বোধ হয়। স্টেজের পেছনের সংক্ষেপ পথ দিয়ে বের চলে গেছেন। মাহফিলে আগত মানুষের ভিড় ঠেলে মাদরাসা ময়দান থেকে বের হলাম, এক রাশ হতাশা আর এক ডালি রাগ আমাকে ভারী কওে তুলল। দেখতে পাচ্ছি, মাওলানা মামুনুল হক সাহেবকে আরোহনকারী প্রাইভেট গাড়িটি দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে।

তার উপর প্রচন্ড রাগ হলো। আমাকে দেখা করার সুযোগ না দিয়েই চলে গেলো? আমি সুদূর বগুড়া থেকে ছুটে এসেছি শুধুমাত্র তার সাক্ষাতের জন্য। বয়ানের পূর্বে খুব বেশি সময় পাইনি। অনেক কথা ছিল। এভাবে চলে গেলো? রাগ, ক্ষোভ আর অভিমান যেন হাত পা অবশ কওে দিচ্ছিল।

ঠিক এই সময় হাতের মোবাইলটি বেজে উঠলো। মামুনুল হক নামটি ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রাগ, ক্ষোভ আর অভিমান সলাত করে যেন পথে পতিত হলো।

আসসালামু আলাইকুম মাসউদ ভাই!

ওয়াআলাইকুমুস সালাম! চলে গেলেন?

আপনি কই?

এই তো আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনাকে নিয়ে প্রাইভেট কার ছুটে চলেছে। কেমন হলো বলুন? কথা তো হলো না।

আপনি একটি রিকশা নিয়ে দ্রুত বাসস্টান্ডে চলে আসুন। পরিস্থিতি তো বুঝতে পারছেন। ওখানে একটু দেরি করলে গাড়ি লেট হয়ে যেতো।

দৌড় দৌড়। আশিক জলদি এসো। যেন দৌড়ের গাড়িটি ধরে ফেলবো। অবশেষে একটি অটো রিকশা পেলাম। পাঁচ মিনিটের মাথায় বাসস্ট্যান্ড পৌঁছে গেলাম।

মাওলানা মামুনুল হক সাহেব একান্তভাবে কাছে টেনে নিলেন। হাতটা ধরে কিছু সময় কথা বললেন। তাঁকে গাড়িতে তুলে দিতে আসা অন্যরা আমাকে খুব দেখছিল। লোকটা আসলে কে? হুজুরের এতো প্রিয় লোকটা কি তাঁর ছাত্র নাকি সাথী?

আশিকের হাতে কিছু কাজ করে নিবেন বলে জানালেন। আমি বললাম, কম্পোজ করা কপি মেইল করে দিবেন, বাকি প্রুফ সম্পাদনার কাজ আশিক করে দিবে, সমস্যা নেই।

রাত ১২ টা ৪৫ মিনিটে তিনি গাড়িতে  উঠলেন। ঢাকাগামী দেশ গাড়িটা দেখতে ভালো। এসি। মানসম্মত গাড়ি। তিনি চলে গেলেন। রাস্তায় ফেলে আসা হতাশাগুলো যেন পিছু পিছু হাঁটছিল। খুব দ্রুত সময়ে তাকে ছেড়ে দেয়ায় তারা আবার ঘাড়ে চেপে বসলো। আজ সময় কম দিতে পেরেছেন বলে তিনি নিজেও কষ্ট পাচ্ছেন বলে জানালেন। এটাই আমার জন্য বড় ধরনের সান্ত্বনা। মোসাফাহ করার সময় তিনি আমাকে বেশ কিছু টাকা হাদিয়া দিয়েছেন, পকেটে হাত দিয়ে দেখি দুই হাজার পাঁচ শত টাকা। তার উদারতা, বদান্যতা এভাবেই আমাকে মুগ্ধ করে বারবার।

তিনি চলে গেলেন। আশিক আর আমি। রাতেই বগুড়া চলে যাবো কি না ভাবছি। ওদিকে মালোপাড়া মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা বদরুজ্জামানকে বলেছি, থাকবো। সাত পাঁচ ভাবছিলাম। আশিক বলল, চলুন। ঐ দেখা যায় রেলস্টেশন। ট্রেন পেলে চলে যাবো।

চলো দেখি।

রেলস্টেশনে ঢুকছিলাম। অনেক অসহায় আর পাগল মানুষের ঠিকানা হয় রেলস্টেশন। এক নারী পাগল আমাদেরকে লক্ষ্য করে বলল, রমজান মাস আসছে না? আমি বললাম, হ্যাঁ। দ্রুতই আসছে। সে রাগান্বিত হয়ে বলল, রমজানে যাকাত নিতে আসবি না? পিটিয়ে তাড়িয়ে দেবো। খুব মার দিবো।

হঠাৎ তার মুখে এমন কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে দুই সেকেন্ট ভাবলাম। দ্রুতই উত্তর করে বললাম, ঠিক বলেছেন। খুব করে পেটাবেন। সে খুশি হলো।

ঘটনার আগে পওে কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে পাগলিটাকে ভালো করে লক্ষ্য করে যতটুকু আন্দাজ করলাম, তার পোশাকাদি ভালো। চেহারা সুরতও বংশীয় বলে মনে হয়। হয়তো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হবে। পাগল হয়ে এখন স্টেশনে স্টেশনে ঘোরাফেরা করে। এক সময় হয়তো রমজান এলে হুজুরদেরকে যাকাত দিতো এবং সে বিষয় নিয়ে তার ভেতরে কোনো ক্ষোভ কাজ করছে। হতে পারে অন্যকিছুও।

স্টেশনের ভেতরে গেলাম। রাতে সান্তাহারমুখী কোনো ট্রেন নেই। ভোরে আছে। আবারো হতাশ।

ফিরে এলাম বাসস্ট্যান্ডে। একটি বাস কন্ট্রাকটরের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পালিয়ে এলে বাঁচি। বেটা সিরাজগঞ্জ রোড পর্যন্ত ভাড়া যায় একেকজনের তিনশ টাকা। মাথা খারাপ?

আমরা যাবো বগুড়া তবে সিরাজগঞ্জের গাড়ি খুঁজছি কেন? ব্যাপার আছে। ব্যাপারটি হলো, রাতে রাজশাহী টু বগুড়ার কোন বাস নেই। এখন উপায় একটাই, ঢাকার বাসে সিরাজগঞ্জের মোড় পর্যন্ত যেতে হবে। সেখান থেকে বগুড়াগামী কোনো ঢাকার বাসে বগুড়া পৌঁছতে হবে। এর বিকল্প কোন পথ খোলা নেই। পথ খোলা নেই বললে ভুল হবে, পথে গাড়ি নেই। পথ তো সব খোলা।

কী করবো। আজ কি আমরা রাতেই ফিরবো? নাকি সকালে যাবো? ভাবছি আর ওদিকটাতেই হাঁটছি।

বাসস্ট্যান্ড  থেকে একটি বাস বের হলো। ঢাকাগামী। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, আশিক দৌড় দিল। কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে কী যেন কথা বলে আমাকে ইশারা করে বলল, দৌড়ে আসেন ভাই। আতালে পাতালে দৌড় দিয়ে বাসে উঠলাম।

আহ কী শান্তি। বাসের সিটগুলোও নরম। দুটি ফাঁকা সিট দেখে বসে পড়লাম। তবে এই আরাম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সামনের স্টপিজ থেকে দুজন যাত্রী উঠে ঠিক আমাদের সিটে এসে টিকিট বের করে নাম্বার মেলাচ্ছে। ততক্ষণে বুঝে গেছি, আরামের সিটটা নিশ্চিত হারাতে হবে। ফাঁকা আছে শুধু পেছনে সিটগুলো। বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো। লোক দুটো আমাদের দিকে তাকাতেই বললাম, ভাই! আপনাদের কাছে কি টিকিক আছে? তাদের মুখ থেকে হ্যাঁ শব্দটি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লাম এবং সোজা পেছনের সিটে। আহা কী ধাক্কা। মনের ভেতর আবার সিটের নিচ থেকে। ধাক্কা খেতে খেতে শহর ছেড়ে বের হলাম।

কিছুক্ষণ পর কন্ট্রাকটর সাহেব স্লিপ নিয়ে হাজির। ভাড়া দেন। কতো দেবো ভাই? এই তো তিনশ তিনশ ছয় শ টাকা হয়, আপনারা পাঁচশ দেন।

বলে কি রে? এই সিরাজগঞ্জ মোড় পর্যন্ত তিনশ করে ভাড়া নিবেন? আমরা তো ঢাকায় যাবো না।

ঢাকায় না গেলেও আপনার উঠেছেন ঢাকার বাসে।

আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে আশিক বলল, আমি তো বলে উঠেছি যে, দেড়শ দেড়শ তিনশ টাকা দেবো।

কন্ট্রাক্টর অস্বীকার করে বসলো, না। আপনারা বলেননি।

আর কথা বাড়ালাম না। জানি এরা কতো বড় বদমাইশ। আমি পকেট থেকে পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললাম, এই নিন পাঁচশ টাকার নোট। দেখি, বিবেক করে আপনি কতো ফেরত দেন।

তিনি মাত্র একটুখানি বিবেক দেখালেন এবং একশ টাকার একটি নোট আমার দিকে তুলে ধরলেন। আমি মনে মনে খুব খুশি হতে না পারলেও মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে টাকাটা হাতে নিলাম এবং তাকে বললাম, খেয়াল করে আমাদেরকে সিরাজগঞ্জ মোড়ে নামিয়ে দিবেন। আবার ভুলে ঢাকা নিয়ে যাইয়েন না। আপনার লস হবে। তিনি হয়তো হালকা বাঁশটা একটু হলেও অনুভব করলেন। জি আচ্ছা বলে চলে গেলেন।

পেছনের সিটের লাফালাফির কাহিনী কে না জানে? আশিকের জন্য আমার বেশি কষ্ট হচ্ছিল। ওর অপারেশন হয়েছে কয়েক সপ্তাহ আগে। বেচারার অনেক কষ্ট হচ্ছে বোঝা গেলো। কিছুদূর পথ আগাই আর আশিককে বলি, গুগল ম্যাপটা দেখো, আমরা কোথায় আছি। আশিক পকেট থেকে মোবাইলটা বের কওে গুগল ম্যাপ বের করে। আমরা একসাথে দেখি।

আমার মোবাইলে চার্জ নেই। ও ফেসবুক টিপছিল আমার হাত পিশপিশ করছিল। মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের ওয়াজটি ফেসবুক লাইভে দিচ্ছিলাম। তখনই চার্জ শেষ হয়ে গেছে। সেই থেকে মোবাইল বন্ধ।

এক পর্যায়ে চোখে ঘুম এসে গেলো। নাটোরের বনপাড়ায় চলে এসেছি। এখান থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তা অনেক ভালো। পেছনের সিটের ধাক্কাধাক্কি অনেকটাই কমে গেছে আর চোখজুড়ে রাজ্যের ঘুমেরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।

তবে মাঝে মাঝেই ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠছিলাম আর আশিককে বলছিলাম, গুগল ম্যাপটি বের করো। আবার ঘুম।

এক পর্যায়ে ঘড়িতে দেখলাম, সময় এখন রাত আড়াইটা। আমরা কি সিরাজগঞ্জ ছেড়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছি? আশিক আশিক! মোবাইলটা বের করো দেখি। গুগল ম্যাপ। নাহ্, আর মাত্র বারো কিলোমিটর পথ বাকি আছে। নামার প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করলাম। ইতিমধ্যে কন্ট্রাকটর এসে বলল, ভাই! গামনে সিরাজগঞ্জ মোড়। বেটা ভোলেনি। ২০০ টাকায় কি সে ঢাকায় নিবে?

বাস থেকে নেমে পেটে মোচড় দিলো। সেই বাদ মাগরিব খাওয়া হয়েছে। এতক্ষণ কি পেটে আর কিছু আছে? সিরাজগঞ্জের মোড় থেকে বগুড়ার রাস্তার যেখানে বাস থামে, ওখানে একটি দোকান আছে বলে আমি জানি। বেশ কয়েকবার মাঝরাতে পাউরুটি চা খেয়েছি। ওদিকটাতে এগিয়ে গেলাম। পেটের মোচড় আরো বেড়ে গেলো। দোকানটি আজ বন্ধ। বেশ কয়েকজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বগুড়া যাবে, কেউ যাবে রংপুর। একজন বক্তার সাক্ষাৎ হলো। তাঁকে আমি চিনি। সালাম বাদ জানতে পারলাম, তিনি আজ টাঙ্গাইলে মাহফিল করেছেন, আগামীকাল মাহফিল আছে রংপুর। তিনি রংপুর যাবেন। তিনি জানালেন, দু ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছেন, রংপুরগামী কোনো বাস থামছে না। হতাশা যেন আরো বৃদ্ধি পেলো।

তখন সময় রাত তিনটা। বুদ্ধি করে আশিক একটি গরুও গাড়ি থামালো। বগুড়া যাওয়া যাবে? হ্যাঁ, একশ টাকা করে ভাড়া লাগবে।

গরুর গাড়ি মানে গরু বহনকারী একটি ট্রাক। তবে ট্রাকে গরু ছিল না। নামিয়ে দিয়ে আসে। গরু বহনকারী ট্রাক দেখলেই চেনা যায়। হরহর শব্দ করে বগুড়া অভিমুখে ছুটে চলল গরুর গাড়ি। এখান থেকে বগুড়া যেতে বড় জোর এক ঘন্টা থেকে সোয়া এক ঘন্টা সময় লাগে। মনে মনে ভাবছিলাম, বাসায় গিয়ে তাও ঘন্টা দেড়েক ঘুম হবে। যাক, মন্দ হয়নি। হোক গরুবহনকারী, তবু যাওয়া হচ্ছে তো।

ঘুমের সেই আশায় গুড়েবালি পড়লো মাত্র দশ মিনিট বাদেই। সময় তখন রাত তিনটা বেজে পনেরো মিনিট। জোরে ব্রেক কষে ট্রাক থেমে গেলো। কী ঘটনা? জ্যাম। ওহ্, হতেই পারে। বসে আছি। কীরে ভাই! জ্যাম ছোটে না কেন? পাঁচ মিনিট যায়, দশ মিনিট যায়। উঁহুঁ, জ্যাম ছুটছে না। অবশেষে ট্রাকড্রাইভাব পরিস্থিতি আঁচ করার জন্য নিচে নামলো। সে এসে জানালো, সামনে মারাত্মক এক্সিডেন্ট হয়েছে। আল্লাহ মালুম, কতক্ষণ থাকবে এই জ্যাম। মাথা কি ঠিক থাকে? কখন বাসায় যাবো, কখন ঘুমাবো? মিনিট পাঁচেক বসে থাকলাম। নাহ্, মশার উৎপাত শুরু হয়ে গেছে। আর ট্রাকের সামনের সিটটাও কতো বড় হয়, অনেকেই জানেন। তার উপর উন্নতমানের কোনো ট্রাক নয়, গরুর গাড়ি মানে গরুবহনকারী ট্রাক। আমি আশিক আর ট্রাকের হেলপার। বুঝতেই পারছেন, কতোটা আরামে বসে আছি। এর উপরে যদি মশার অত্যাচার সৃষ্টি হয়, আর কি টেকা যায়? হেলপারকে বললাম ভাই! গেটটা খুলে দাও। নিচে নামি। নিচে নামলাম। সারি সারি বাস আর ট্রাক। চোখ যতদূও যায়, জ্যাম আর জ্যাম। আশিককে বললাম, চলো এক্সিডেন্ট দেখে আসি। মৃদ ঠান্ডা বাতাস বইছিল। ট্রাকে বসে থাকা চরম বিরক্তির পর এ যেন অন্যরকম এক ভালো লাগা। হাঁটছি তো হাঁটছি। প্রায় আধা কিলো হাঁটার পর ওদিক থেকে হেঁটে আসতে থাকা লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই! এক্সিডেন্ট কত দূর? একজন বলল, অনেক দূও হেঁটে গিয়ে ঘুওে এলাম। আরো অনেক সামনে যেতে হবে।

ওরে বাপরে বাপ্, আমরা এতো দূর হেঁটে এসেও শুনছি আরো অনেক দূর। থাক্, এক্সিডেন্ট দেখতে হবে না। চলো ঘুরে যাই।

ফিরতি পথে দেখতে পেলাম, রাস্তার পাশে একটি দোকান খোলা। পেটের ডেবে যাওয়া মোচর যেন পট পট শব্দ তুলে জেগে উঠতে আরম্ভ করলো। ছুটে গেলাম। যদি পাউরুটি শেষ হয়ে যায়?

দোকানটাতে অনেক ক্রেতা। এই গভীর রাতে দোকানির কপাল যেন খুলে গেছে। আজ সারাদিনেও মনে হয় এতো বিকিকিনি হয়নি। আটকে থাকা লোকগুলো হুমড়ি খেয়ে কলা পাউরুটি, বিস্কুট আর পান সিগারেট কিনছে। বেশ মজা করে আমি দুইটি পাউরুটি আর তিনটি সাগর কলা পেটে চালান করে দিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললাম। এরপর একটি পান মুখে দিয়ে পরম শান্তি অনুভব করলাম। আশিক একটি রুটি ও একটি কলা খেলো। ঐ দোকানে একটি ট্রাকের হেলপারের সঙ্গে গাইবান্ধার ভাষায় আশিকের কিছুক্ষণ খোশালাপ শুনতে খুব মজার ছিল।

ধীরে ধীরে আমাদের গরুর গাড়ির দিকে এগুলাম।

ঘড়ির কাঁটা চারটা পার হয়ে গেছে। রাস্তায় এদিক সেদিক হাঁটছি। ইতিমধ্যে আশিক বলল, ভাই! আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কিভাবে? ঐ দেখুন, জ্যামের ঐ দিকটা থেকে মনে গাড়ি ছেড়েছে।

তাই তো। মনের কোণেও একরাশ আলো জ্বলে উঠলো। এবার বুঝি বাসায় যাওয়া যাবে।

মিনিট পাঁচ সাতেক বিপরীত দিকের গাড়িগুলো আসছিল। এরপর আমাদের গরুর গাড়ির সামনের গাড়িগুলোও নড়ে উঠলো। নড়ে উঠলো আমার ভেতরটাও। লাফিয়ে গরুর গাড়িতে উঠে বসলাম। তখন সময় রাত চারটা বেজে পনেরো মিনিট। ঘড়ঘড় শব্দে আমাদের বহনকারী গরুর গাড়ি স্ট্রার্ট হলো। এগিয়ে চলে ধীরগতিতে। মিনিট পাঁচেক এভাবে চলার পর স্পিড বাড়তে আরম্ভ করলো। দেখতে পেলাম, এক্সিডেন্ট হওয়া তিনটা গাড়ি রাস্তার পাশে টেনে নেয়া হয়েছে। দুটি বাস আর একটি ট্রাক। আজব এক এক্সিডেন্ট। এজন্যই সময় বেশি নিলো। তবে বেশসংখ্যক মানুষ আহত হলেও কেউ নিহত হয়নি বলে শুনলাম। এগিয়ে চললাম। গরুর গাড়ির সে কি বিকট শব্দ। এর মাঝেও কোত্থেকে যেন ঘুমেরা  এসে চেপে বসে। কিন্তু হেলান দেয়ারও তো জায়গা নেই। ঘুমদের মেহমানদারী করতে পারছিলাম না। বারবার তাড়িয়ে দিতে হচ্ছিল। চলছি তো চলছি। পথিমধ্যে ফজরের আজানের আওয়াজ ভেসে এলো। বগুড়ার বনানীর মোড়ে নামতে হবে। ট্রাকটি যাবে চার মাথার দিকে। আমাকে যেতে হবে কলোনী। নেমে সময় দেখলাম, সময় তখন ভোর পাঁচটা বেজে ত্রিশ মিনিট।

সিএনজি চালিত একটি রিকশা নিয়ে সোজা জামিল মাদরাসা গেটে নামলাম। পাঁচটা বেজে বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিটে ফজরের জামাতে শরিক হলাম। পাশেই বাসা। মসজিদ থেকে বের হয়ে সূরা  ইয়াসিন তেলাওয়াত করতে করতে বাসা অভিমুখে রওয়ানা। এরপর সোজা বিছানায়। আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১