সাক্ষাতকার

সংখ্যা:

তামীম রায়হান

গণমাধ্যম গবেষক: মানবাধিকার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কাতার।
কাতার প্রতিনিধি: দৈনিক প্রথম আলো (সাপ্তাহিক উপসাগরীয় সংস্করণ)
সম্পাদক: মাসিক নবধ্বনি। চেয়ারম্যান: নবপ্রকাশ, ঢাকা।

: পড়াশোনার জন্য বিদেশে গেলেন কেন? আর কাতার বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেওয়ার কারণ কী ছিল?

২০০৭ সালে আমি যখন লালবাগে জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়ায় ভর্তি হই, তখন দেখি- আমার সহপাঠীদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন বিষয়ে বেশ পারদর্শী। কেউ ছাত্র রাজনীতিতে, কেউ লেখালেখিতে, কেউ ব্যবসায়, কেউ সুরে। আমি ভাবলাম, আমারও এক বিষয়ে সবার চেয়ে আলাদা হতে হবে। আমার অবচেতন মন ইঙ্গিত দিল, পড়াশোনা ছাড়া আমার অন্য কোনো উপায় নেই। দাওরায়ে হাদিসের বছর থেকে বিদেশে পড়াশোনার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। সেসময় অনেকগুলো আরব বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যোগাড় করি। এক পর্যায়ে কাতার বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপ দেয়। প্রথম বাংলাদেশি ছাত্র হিসেবে আমি সেখানে অধ্যয়নের সুযোগ পেলাম। ফলে কাতার আমার গন্তব্য হয়ে গেল। এক কথায়, নিজের ভেতর পড়াশোনার জন্য যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি জেগেছিল, তাতে ভর করে আমি বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে যাই।

: এরপর সেখানে কাজে জড়িয়ে গেলেন। এটা কি সুযোগ হয়ে গেল বলে নাকি পরিকল্পনা ছিল?

অনার্স প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালেও ভাবিনি যে কাতারে চাকরি করবো বা উচ্চতর পড়ালেখার সুযোগ পাবো। একদিন এক অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমিও কি ডক্টর হতে পারবো আপনার মতো? তিনি হেসে বলেছিলেন, তবে আর কারা পারবে? এই চারটি শব্দ আমাকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়। অনার্স চতুর্থ বর্ষে থাকাকালে টের পেলাম, আমার ভেতর আরও পড়ালেখার শপথ জন্মেছে। আমাদের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে নানা দেশের ছাত্রদের সঙ্গে মিশে মিশে জীবনকে শিক্ষাসফর ভাবতে শিখেছি ততদিনে। অনার্স শেষে কাতার ফাউন্ডেশনে মাস্টার্স অধ্যয়নের সুযোগ পেলাম। কিন্তু এর জন্য কাতারে থাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ ও স্পন্সরশিপ কেবলমাত্র অনার্সের জন্য ছিল। ফলে কাতারে থাকা এবং উচ্চতর পড়ালেখা অব্যাহত রাখা এবং জীবিকার তাগিতে চাকরির সিদ্ধান্ত নিলাম। কাতারের আরবি দৈনিক আলশারকে সুযোগ পেলাম। সঙ্গে মাস্টার্সের ক্লাসও শুরু করলাম। এর আট মাস পর কাতারে সরকারি চাকরি হয়ে গেল। এক কথায়, বিশদ পরিকল্পনা ছাড়াই কীভাবে যেন সব সম্ভব হয়ে গেল। তবে এসবের মূলে আল্লাহর করুণা ও মা-বাবার দুআই আমার প্রথম ও শেষ সম্বল ছিল।

: কাতার ও বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার মান ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কিছু বলুন।

এটি অত্যন্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন। বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষা অর্থাৎ মাদরাসানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাথমিক ধাপে যতটা শক্তিশালী, উপরের স্তরে ততটা নয়। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ ও উন্নয়নমূলক গবেষণা এবং যোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য ক্ষমতাসম্পন্ন কার্যকর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। পাশাপাশি বাংলাদেশে কিতাবভিত্তিক পড়াশোনা প্রাধান্য পায়, আর বিদেশে বিষয়ভিত্তিক পড়ালেখা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় এর গুণগত মান যেমন আগের মতো নেই, তেমনি একটি পর্যায়ে যাওয়ার পর অনেক মেধাবীকেও থেমে যেতে হয়। অন্যদিকে কাতারে আলাদাভাবে কোনো ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা নেই, সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে ইসলামভিত্তিক বিষয়গুলোতে পড়ার সুযোগ থাকায় এটিতে অনেক দূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। এক কথায়, ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন কওমি ও আলিয়ায় বিভক্ত, তেমনি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও এগুলোর বিভাজন স্পষ্ট। বিদেশে একই শিক্ষা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এসব অত্যন্ত গোছালোভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে।

: আপনার আগামী পথচলা ও স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাই।

মানুষের স্বপ্নের কোনো শেষ নেই। তবে স্বপ্ন দেখার জন্য যে সাহস লাগে, সেটি আমার আছে। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের শক্তি চাই মহান শক্তিমানের কাছে। আমি একজন কীর্তিমান হতে চাই। কিছু উপার্জন ও সংসার প্রতিপালন বা সুনাম-খ্যাতি আমাকে কোনোদিন আকর্ষণ করেনি। আমি অনার্স করেছি গণমাধ্যম ও দাওয়াহ সম্পর্কে, মাস্টার্স পড়ছি ধর্মতত্ত্বে, চাকরি করছি মানবাধিকার নিয়ে- এ তিনটি বিষয়ে এই তারুণ্যে কাজ করছি। ভবিষ্যতে কোন অঙ্গণে স্থির হবো, তা এই অস্থির তারুণ্যে বলা কঠিন। তবে সবগুলো বিষয়ই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক কথায়, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা আছে। আর যদি শিক্ষকতার সুযোগ পাই, তবে ধর্মতত্ত্ব বেছে নেব।

: জীবনের পথচলায় কাকে অনুসরণ করেন?

মানুষ হিসেবে সিরিয়ার মরহুম আলেম ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব শায়খ সাইদ রামাদান আল বুতিকে ভালো লাগে। তাঁর উদার ও দরদি চিন্তা-চেতনা বৈশ্বিকভাবে আমাকে টানে। কৈশোর ও তারুণ্যের সূচনায় সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভীকেও ভালোবেসেছি। তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে দীক্ষা নিয়েছি।

: আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও আমাদের দেশীয় গণমাধ্যমের তুলনা করলে কী কী বিষয় আপনার চোখে পড়ে?

আমাদের দেশীয় গণমাধ্যমগুলোতে যোগ্য সাংবাদিকের অনেক অভাব। ইতিবাচক সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত ব্যক্তিগত যোগ্যতা- সেটা একাডেমিক শিক্ষা থেকে হোক বা কোনো অভিজ্ঞজনের সান্নিধ্যে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে হোক। বাংলাদেশে এখন প্রচুর পত্র-পত্রিকা ও ম্যগাজিন এবং টিভি ও রেডিও স্টেশন, কিন্তু যোগ্য লোকের সংখ্যা হাতেগোনা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম অনেক পিছিয়ে। আমরা গোনায় বাড়ছি, গুণে নয়। অযোগ্য লোকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নেতিবাচক ও দলীয় সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সংবাদ সংগ্রহ ও তুলে ধরা যে এক মহান দায়িত্ব, সেটি আমরা ভুলে যাচ্ছি। গুণগত মানের চেয়ে পুরো ব্যাপারটা বাণিজ্যিক হয়ে পড়েছে। কিন্তু কাতারে এখনও সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে ধরা হয়। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা, সমাজ ও সরকার এবং দেশের নিরাপত্তার প্রতি আপোষহীন শপথ সাংবাদিকদের অন্যতম গুণ হিসেবে ভাবা হয়।

: দেশ ও বিদেশে পড়ালেখা ও কর্মজীবন থেকে অনেক অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই হয়েছে। সেখান থেকে কিছু বলুন।

আমি তরুণ। তাই আমার চেয়ে যারা বয়সে ছোট, তাদের উদ্দেশ্যেই বলবো। যুগ যতই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হোক, যোগ্যতার বিকল্প নেই। আর যোগ্য হতে হলে লাগবে প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং সাধনা। যে কোনো অঙ্গনে বড় হওয়ার ইচ্ছা থাকুক, সেই বিষয়ে অবশ্যই সেরা এবং যোগ্য হতে হবে। আর জীবনভর যোগ্যতা বা শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কখনো আত্মতৃপ্তিতে বুঁদ হওয়া যাবে না। যদি যোগ্যতা থাকে এবং নিজের আত্মশক্তি ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকে, তবে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় থাকা বা কাজের সুযোগ হোক, কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমি অত্যন্ত ক্ষুদ্র, কিন্তু আমার ভেতর যে ইচ্ছাশক্তি এবং সাধনার সাহস আছে, তাতে ভর করে আমি ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আর সবশেষে বলি, মা-বাবার হাসিমুখ ছাড়া সব শ্রমই বৃথা।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১