কুউ-উ… কুউ-উ-উ…
কোকিলের ডাক শুনে কারো চোখমুখ কুচকে যাবার কথা না। কোকিলের ডাক মিষ্টি। ভালো লাগার কথা। আদিলার ভালো লাগছে না। তার চোখমুখ কুচকে গেছে। কারণ এই ডাকটা আসল কোকিলের না। নকল কোকিলের। তাদের বাড়ির কলিংবেলে কোকিলের আওয়াজ সেট করা। আইডিয়াটা আদিলার বাবার। তার যুক্তি- কলিংবেল শুনে অধিকাংশ সময়ই মানুষ বিরক্ত হয়। হয়তো কেউ বিশেষ কোনো কাজে ব্যস্ত, এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। এখন সব কাজ ফেলে আগে দরজা খোলো। ব্যাপারটা বিরক্তিকর। এই বিরক্তির সাথে কলিংবেলের আওয়াজটাও যদি হয় বিশ্রী, তবে তো কথাই নেই। বিরক্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে। আর কোকিলের ডাক শুনলে নাকি মন ভালো হয়ে যায়। তাই এ ব্যবস্থা। ব্যবস্থাটা কতোটা কার্যকর এ ব্যাপারে ঢের সন্দেহ আছে আদিলার। কারণ কলিংবেলে যতো মধুর আওয়াজই সেট করা থাকুক, এই সময়ে শব্দটা তার কাছে ভীষণ বিরক্তিকর। দুপুরে খাওয়ার পর বই নিয়ে বসেছিলো আদিলা। এই সামান্য একটু আগে বিছানায় এসেছে। এখন আবার উঠতে হবে।
বালিশের নিচ থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখলো আদিলা। দু’টো বেজে সাতচল্লিশ মিনিট। বাবা অফিস থেকে ফেরেন পাঁচটায়। আশপাশে কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই যে এসময়ে আসবে। তবে এই অসময়ে কে এলো? কিছুটা কৌতূহল কিছুটা বিরক্তি নিয়ে দরজা খুললো আদিলা। সামনে মধ্যবয়েসী এক মহিলা দাঁড়িয়ে। কিন্তু সাজগোজের এমন বাহার, আজকালকার টিনএজরাও এরকম সাজে না। আদিলাকে দেখে মহিলা কথা বললো- ‘এটা সুরুজ সাহেবের বাসা?’
বিরক্তিটা এবার চরম পর্যায়ে পৌঁছুলো আদিলার। কারণ দরজার পাশেই বাড়ির মালিকের নাম, বাড়ির নাম্বার সব লেখা আছে। অথচ মহিলা সেটা না দেখেই কলিংবেল টিপেছে। ইচ্ছে হলো, কোনো কথা না বলে ঠাস করে দরোজাটা বন্ধ করে দেয় অথবা মুখ ভেঙচিয়ে বলে- ‘না এইডা চান্দের বাসা!’ কিন্তু ইচ্ছে হলেই সবকিছু করা যায় না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভদ্র ভদ্র গলায় আদিলা বললো- ‘না, এর বাম পাশে যে বাড়িটা দেখছেন, সেটাতে যান।’
মহিলা লাল টকটকে রঙকরা ঠোঁটে মৃদু একটা হাসি দিয়ে চলে গেলো। আদিলা দরোজা বন্ধ করে এসে একগ্লাস পানি খেলো। মা বলতো, পানি খেলে নাকি রাগ কমে যায়।
ধ্যাৎ! দুপুরটাই মাটি হয়ে গেলো। ঘুমও আসবে না আর। ক্লাসের পড়ায়ও মন বসবে না। এখন কী করা যায়? হ্যাঁ, গল্পের বই পড়া যায়। বুকশেলফ থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘অন্ধকারের গান’ বইটা বের করলো আদিলা। এর আগেও পড়া হয়েছে। তাই সবটা না পড়ে শেষের দিকে পড়তে শুরু করলো। হুমায়ূন স্যারের লেখাগুলো প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়ে যায় আদিলাকে। ওর গায়ের রঙ একটু চাপা ধরনের বলে আগে কখনো কাজল পরতো না চোখে। কিন্ত এর আগে একটা বইয়ে পড়েছে, কাজল নাকি শ্যামলা মেয়েদের জন্য। ব্যস, তারপর থেকে কাজল পরতে শুরু করেছে।
আদিলা বইটা পড়ছে আর চোখ মুছছে। সব বাবা-মা’ই তার সন্তানদেরকে নিজের মতো করে ভালোবাসে। এই মুহূর্তে মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব। আদিলা মনে মনে ভাবে, আচ্ছা, আমার কথাও কি তার কখনো মনে পড়ে? আমার মাও কি আমাকে ভালোবাসে? তাহলে এভাবে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলো কেন? আর ভাবতে পারে না কিছু, গাল বেয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ে।
বাবার কথাও ভাবে আদিলা। মা চলে যাবার পর নতুন আর কোনো মাকে ঘরে আনেননি বাবা। নিজেই মায়ের অভাব পূরণ করার চেষ্ট করেছেন। প্রতিদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে যখন মা মা বলে ডাকেন তখন আদিলা পৃথিবীর সব দুঃখ ভুলে যায়। বিকেলে বাপ-বেটি একসাথে চা খায় আর গল্প করে। আদিলা খায় চায়ের কাপে আর ওর বাবা খান মগে। বড় মগ। ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলেন- ‘বুঝলি মা, এই এতোটুকু চায়ের কাপে চা খেয়ে শান্তি নেই।’ একথা বলে নিজেই হেসে ওঠেন। আদিলাও হাসে। বাবার এই হাসিটা বড়ো ভালো লাগে আদিলার। বাবাকে প্রচ- ভালোবাসে ও।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চোখ মুছলো আদিলা। পাঁচটা বাজতে আর দশ মিনিট মাত্র বাকি। বাবা ফেরার আগেই স্বাভাবিক হতে হবে। আদিলার মন খারাপ দেখলে বাবারও মন খারাপ হবে। আদিলা কোনোভাবেই বাবাকে কষ্ট দিতে চায় না।
কিন্তু আজ অফিস থেকে ফিরে হামিদ সাহেব কোনো কথা বললেন না। আদিলা চা নিয়ে গেলে চুপচাপ চা খেয়ে বাইরে বের হয়ে গেলেন। আদিলা বুঝতে পারছে না কিছু। কোনো কারণে বাবার মনখারাপ হলে আদিলাকে বলেন। কিন্তু আজ কোনো কথাই বলতে চাইছেন না। তাড়াতাড়ি বাইরে চলে যাওয়ায় জিজ্ঞেসও করতে পারেনি। হঠাৎ মনে পড়লো আদিলার, আজ ১০ ফেব্রুয়ারি। আজ থেকে বিশ বছর আগের ঠিক এই দিনে বাবা বর সেজেছিলেন, আর মা লাল টুকটুকে সারি পরে বধূ সেজে এসেছিলো এই বাড়ি। বাবার মনখারাপের কারণ বুঝতে অসুবিধা হলো না আদিলার।
দরোজা খুলে সে বাইরে বেরোলো। বাসার পাশের একাকী কবরটার দিকে এগুলো। হামিদ সাহেব কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। কবরটা আদিলার মায়ের। আদিলার বয়েস যখন ছয়, দীর্ঘ রোগে ভুগে আদিলার মা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
আদিলার হঠাৎ মনে হলো- সে-ও তো একদিন মা হবে। সে-ও কি একদিন তার গর্ভের সন্তানকে রেখে এভাবে একাকী চলে যাবে? তার সন্তানও কি তার জন্য বিষণ্ন মন নিয়ে তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদবে? আদিলার মনটা হু হু বেদনায় মোচড় দিয়ে ওঠে। অতীতের হারানো দুঃখের চেয়ে ভবিষ্যতের অজানা বেদনা তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।
মাদরাসা খাতুনে জান্নাত, বগুড়া
