তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ

সংখ্যা:

 

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই তার শ্রদ্ধেয় নামটির সাথে আমি পরিচিতি হয়েছিলাম। আমার জান্নাতবাসী আব্বার মুখে গফরগাঁওয়ের মাওলানা রিয়াজ উদ্দীন রহ. মাওলানা শামসুল হুদা পাঁচবাগী রহ., মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এবং মাওলানা আবদুর রহমান রহ. প্রমুখের নাম খুব শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হতে শুনতাম। অবসর সময়ে আব্বা তাদের জীবনের নানা গল্প আমাদেরকে শোনাতেন।

শুনতে শুনতে আমরা যেমন তাদের জীবন থেকে প্রেরণা লাভ করতাম তেমনি তারা আমাদের এলাকার মানুষ বলে গর্বে আমাদের বুক ভরে উঠতো।

তারপর ২০০০ সালে ‘মাসিক মদীনা’ সিরাতুন্নবী সংখ্যাটি আমার হাতে এলো। তখন আমার বয়স দশ বছর। টুকিটাকি ছড়া ও রচনা লেখার অভ্যাস করছিলাম। একটি পত্রিকার শিশু পাতায় কয়েকটি কবিতা ছাপাও হয়েছিলো।

ভাসা ভাসা হলেও মদীনার মান ও গুরুত্ব অনেকটাই অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। এর সম্পাদক হিসেবে তার কথা অনেক আগে থেকেই জানতাম। সদ্য শৈশব পেরোনো কচি মনে তখন সবকিছুকে সহজ সুন্দর মনে হতো। কোনো কিছু নিয়েই গভীর ভাবনার উন্মেষ তখনও ঘটেনি। সেই অপরিপক্ব বোধের কারণেই হোক কিংবা অদৃশ্য ইঙ্গিতেই হোক, একটি চিঠি এবং একটি কবিতা লিখে সরাসরি তার নামে ‘মাসিক মদীনা’র ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম। বিষয়টা তখন এতোই সহজ মনে হচ্ছিলো যে, পৃথকভাবে তা আব্বা-আম্মাকে জানানোরও প্রয়োজন মনে করিনি। অন্য আরো খামের সাথে আব্বার হাতে দিয়ে দিয়েছিলাম। আব্বা দেখে থাকলেও হয়তো শৈশবের চপলতা ভেবেই নিয়েছিলেন। এখন ভাবতে গিয়ে আশ্চর্য হই, এখনের মতো পরিণত বুদ্ধি তখন থাকলে এমন দুঃসাহসিক কাজ কখনও করতে সাহস করতাম না এবং জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য সওগাতও আমার অধরাই রয়ে যেতো।

চিঠি ও কবিতা পাঠানোর মাসখানেক পর, সেদিন খুব বৃষ্টি ছিলো, আমার নামে একটি পত্র এলো। উপরে আমার নাম লেখা দেখে প্রথমটা সবাই ভয় পেয়ে গেলেন। খোলার পর আনন্দে বিস্ময়ে তারা যেন নির্বাক হয়ে গেলেন। সরাসরি আমাকে সম্বোধন করে লেখা হজরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের পত্র! মনে আছে, আনন্দে আবেগে সেদিন আমার চোখে পানি চলে এসেছিলো। আমি ভাবতেই পারছিলাম না যে, এতো বড় ও কর্মব্যস্ত একজন মানুষ এক কিশোরীর এলোমেলো লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়বেন এবং তার পত্রের উত্তর দেয়া প্রয়োজন মনে করবেন।

পত্রের ভাষ্য ছিলো এমন-

প্রিয় মাহমুদাতুর রহমান!

তোমার পত্র এবং একটি কবিতা পেয়েছি। প্রেরিত কবিতা প্রকাশ উপযোগী হয়নি। তবে লেখার ধরন দেখে মনে হয় তুমি চেষ্টা করলে ভালো লিখতে পারবে। আশা করি ভাষাজ্ঞান অর্জন এবং কবিতা লেখার অনুশীলন অব্যাহত রাখবে। আমাদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস রইলো।

মুহিউদ্দীন খান ৩১. ০৮. ২০০০

 

তার পবিত্র হস্তলিখিত কয়েক ছত্রের এই পত্রটি আমার পড়ালেখা ও সাহিত্যচর্চায় তখন কতো যে সহায়ক এবং অভাবনীয় রকম ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিলো এখন তা ভাবতে গেলে স্বপ্নের মতো মনে হয়।

আমার সাহিত্যচর্চার বিষয়টি তখন আমাদের পারিবারিক চিন্তা চেতনা ধ্যান-ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো না।

তার এই পত্র পাওয়ার পর পরিস্থিতি অনেকটাই অনুকূলে আসতে শুরু করলো। আম্মা কিছুটা নমনীয় হলেন, আব্বা আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি মনোযোগী ও আগ্রহী হলেন।

আমি সত্যিই একসময় ভালো লিখতে পারবো- এই অস্পষ্ট ধারণা তাদের মনেও উঁকি দিয়ে গেলো। এই পত্র পাওয়ার পর থেকে আব্বা দৈনিক পত্রিকায় মাওলানা খান রহ.-এর ছবি বা কোনো খবর দেখলে আমাকে ডেকে দেখাতেন ও বলতেন- ‘এই দেখো তোমার দাদাজী’। আব্বাকে তখন খুব আনন্দিত মনে হতো। আব্বা প্রতিমাসে নিয়মিত ‘মাসিক মদীনা’ এবং অন্য আরো কয়েকটি পত্রিকা ছাড়াও ‘মাসিক মদীনা’র পুরনো বছরের কয়েকটি সিরাতসংখ্যা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন।

২০০৩ সালের মার্চে দীর্ঘ অসুস্থতার পর আব্বা জান্নাতবাসী হয়ে গেলেন। তখন পর্যন্ত আমি লেখালেখির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উন্নতি করতে পারিনি। সে বছরেই আমার ব্যথাহত হৃদয়ে সান্ত¡নার জন্যই যেন আল্লাহ পাকের রহমতের বারিধারা আমাকে সিক্ত করে গেলো। অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই বেশ কয়েকটি লেখা তৈরি করতে সক্ষম হলাম এবং তখনকার শীর্ষপর্যায়ের একটি ইসলামি পত্রিকায় ছদ্মনামে চার-পাঁচটি লেখা ছাপাও হলো। এতোদিনে চেষ্টা করলে ভালো লিখতে পারবো, এ ব্যাপারে কিছুটা আত্মবিশ্বাসী হলাম।

২০০৪ সালের জানুয়ারিতে ছাপা একটি লেখার ফটোকপি এবং একটি পত্র তার ঠিকানায় পাঠিয়েছিলাম। মনে আশা ছিলো ভয়ও ছিলো। কয়েক সপ্তাহ পর তার উত্তর পেলাম। পত্রটি পড়ে আমার কাছে বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমি কি জেগে আছি না স্বপ্ন দেখছি।

তার দীর্ঘ সেই পত্রটি এখানে উল্লেখ করে দিচ্ছি। এই পত্রটিকে আমি জীবনের সেরা প্রাপ্তি ও পুরস্কার বিবেচনা করি। তিনি লিখেছিলেন-

 

প্রিয় মাহমুদাতুর রহমান!

তোমার একটি পত্র এবং কবিতা ও তৎসহ একটি মুদ্রিত লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। আল্লাহর শোকর আদায় করেছি এবং তোমার জন্য প্রাণ খুলে দোআ করেছি। আমার খুব কাছের মেয়ে তুমি। আত্মজার চাইতে কম নও। এটা আমার পরম আনন্দ। আমি বিগত ছয়মাস যাবত অসুস্থ। কোনো কাজ-কর্ম করতে পারি না। আজ পি.জি হাসপাতালের কেবিনে বসে তোমার পত্রের জবাব দিতে চেষ্টা করছি। তোমার মধ্যে আমি একটা চমৎকার সম্ভাবনা সুপ্ত দেখতে পাচ্ছি। আমি তোমাকে সর্বোতভাবে সহায়তা করতে আগ্রহী।

আমার সাথে যোগাযোগ রেখো। তোমার লেখালেখির জন্য একটি ছক তৈরি করে দিতে চেষ্টা করবো। তোমার লেখা ‘মাসিক মদীনা’ ও ‘সাপ্তাহিক মুসলিম জাহানে’ প্রকাশ করতে চেষ্টা করবো। আল্লাহ যদি আরও কিছুদিন হায়াত দেন তবে সরাসরি যোগাযোগ করতে চেষ্টা করবো। তোমার বই যাতে প্রকাশ করা যায় সে চেষ্টাও করবো। তোমার সাধনার পথে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে জানিও।

তুমি উর্দু ভাষা আয়ত্ব করতে চেষ্টা করো। উর্দু থেকে তরজমা করে অনেক বেশি কাজ করতে পারবে। অসুস্থতার কারণে আর লিখতে পারছি না। দোআ করো।

 

মুহিউদ্দীন খান, ১১. ০৩ .২০০৪

 

তার এ পত্রটি আমার মনে যেন অদৃশ্য জীয়নকাঠির পরশ বুলিয়ে দিলো। আমি জেগে উঠলাম নতুন প্রত্যয়ে দীপ্ত হয়ে। আমার হলদে জীর্ণ হয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের চারাগাছটি যেন নতুন করে সবুজ-সজীব হয়ে উঠলো। তারপর থেকে লেখায় আর বিরতি দেইনি। যখনই নানা প্রতিকূলতায় হতাশা দানা বাঁধতে চায় তখনই তার এই পত্রটির কথা মনে হয়, সাথে সাথে যেদিন তার প্রথম পত্রটি পেয়েছিলাম সেদিনকার আমার জান্নাতবাসী আব্বার আনন্দিত তৃপ্ত চেহারা স্মৃতির কোণে উঁকি দিয়ে উঠে। এরপর থেকে এ ক’ বছরে মদীনা ও মুসলিম জাহানে আমার অনেক ক’টি লেখা ছাপা হয়েছে।

যখনই তিনি প্রয়োজন মনে করেছেন লেখালেখির বিভিন্ন বিষয়ে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন, যা আমার কলমের যাবতীয় দীনতা ও ক্ষুদ্রতাকে ঘুঁচিয়ে মহিমাময় করে তুলেছে। সরাসরি যোগাযোগের জন্য আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়া মুফতী হেমায়াতুল ইসলাম আমার প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলেন। ভাইয়ার সাথে তিনি খুবই স্নেহপূর্ণ আচরণ করেছিলেন এবং সময় দিয়েছিলেন। এরপর ভাইয়া আরও অনেকবার গিয়েছেন। প্রতিবারই তিনি একই রকম স্নেহ ও আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করেছেন। তার যে অপরিমেয় স্নেহ ও সুদৃষ্টি আমি পেয়েছি যার যোগ্য আমি কখনো ছিলাম না এবং এখনও নই। এর সবই তার অনন্য সাধারণ মহানুভবতা এবং হৃদয়ের উদারতারই প্রমাণ বহন করে।

আসলে কী লিখতে গিয়ে লিখবো, তার মতো মহান ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মের কোন দিক নিয়ে আলোচনা করার কথা কল্পনায় আনাও আমার জন্য ধৃষ্টতাস্বরূপ। প্রাণের অন্তরতম অন্তর থেকে কবিতার ভাষায় বলি-

তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ

তাই তব জীবনের রথ

কীর্তিরে তোমার

পশ্চাতে ফেলিয়া যায় বারংবার।

 

জান্নাতে আপনি চিরঞ্জীব সুখে থাকুন, দয়াময়ের কাছে আজ এই কেবল প্রার্থনা।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১