০১
তখন হেফজখানায় পড়ি। আমাদের হাফেজ সাহেব হুজুরকে দেখতাম প্রত্যেকমাসে ‘মদীনা’ নামের নতুন মলাটের একটি করে বই আনতে। কয়েকদিনের মাথায় আবিষ্কার করলাম, কিতাব বিভাগের সিনিয়র কিছু ছাত্র এবং কয়েকজন হুজুরও ওটা রাখেন। আমার কৌতূহলের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে লাগলো; ভাবলাম খোঁজ নেয়া দরকার ওতে কী আছে।
হাফেজ সাহেব হুজুরের ডেস্কের ওপরই থাকতো বইটা সবসময়। হুজুরের অগোচরে একদিন ভালো করে উল্টে পাল্টে দেখলাম। কিন্তু প্রচ্ছদ আর বিজ্ঞাপনের ছবিগুলো ছাড়া কিছুই আমার মাথায় ঢুকলো না। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে যখন বইটা বন্ধ করলাম তখন আমার ভেতর হাজারবার ধ্বনিত হলো- ‘এইটা পড়ে কী হয় রে…!’
এর প্রায় বছরখানেক পর আমার এক আত্মীয়ের বাসায় তাদের শোকেসের গ্লাসে ইনভেলাপ সাইজের এক টুকরো সাদা কাজের ওপর সবুজ কালির সিগনেচার পেনে যে কথাটা লেখা দেখেছিলাম তা আজ ও আমার মানস পটে জ্বল জ্বল করছে-
১৯৯২ সাল থেকে মাসিক মদীনা আমার প্রিয় পত্রিকা।
-কাজী আ. মুত্তালিব
বুঝলাম, আমি কিছু না বুঝলেও বইটা পড়ে কিছু একটা হয় এবং দারুণ কিছু হয়। না হলে মানুষের ওটা ‘প্রিয়’ হবে কেন।
০২
‘মাসিক মদীনা’ কী? তখন তা ঠিকমতো বুঝে উঠতে না পারলেও আমার হৃদয়ের পাড়ায় পাড়ায় এর সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানকে নিয়ে একটা শোরগোল পড়ে গিয়েছিলো। শোরগোল তো শোরগোলই, মুহিউদ্দীন খানকে আমি দেখার জন্য ব্যাকুল, একথা অনেকেই জেনে গিয়েছিলো। আমার সহপাঠী মুকুল একদিন বললো- ‘চল, তোকে মুহিউদ্দীন খানকে দেখিয়ে আনি।’
-‘বলিস কীরে!’ বলে মুকুলের পিছু পিছু চললাম। মুকুল তাদের বাসায় এসে সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান-এর একটার পর একটা কপি উল্টে পাল্টে দেখাতে লাগল। সব কপি শেষ কিন্তু মুহিউদ্দীন খানকে একটাতেও পাওয়া গেলো না। মুকুল বললো- ‘জাহিদ! বিশ্বাস কর, আব্বু সেদিন এর একটার মধ্য থেকেই আমাকে মুহিউদ্দীন খানের ছবি দেখিয়েছিলো। দাঁড়া, আব্বুকে জিজ্ঞেস করি-’ বলে সে তার আব্বুকে বললো- ‘আব্বু! মুহিউদ্দীন খানের ছবিওয়ালা বইটা কোথায়?’
-‘ওখানেইতো থাকার কথা, খুঁজে দ্যাখ।’
-‘খুঁজেছি নেই।’
-‘তাহলে নেই।’
-‘কেন?!’
-‘কেন আবার! কেউ হয়তো নিয়ে গেছে…।’
আমাকে ঘিরে রাখা হতাশার কালো মেঘগুলো ততক্ষণে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে শুরু করেছে। ক্রমে আমি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছি। আরো ঠাণ্ডা…।
০৩
সেদিন আমি, আবদুল মুত্তালিব দাদু, রতন ভাই এবং আরো কয়েকজন চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম আর আলাপ করছিলাম।
মুজিব-জিয়া-হাসিনা-খালেদা-তারেক জিয়া বিষয়ক চায়ের দোকানের কমন আলোচনা থেকে কীভাবে যেন একসময় আমরা ‘ইসলাম ও মুসলমান’ বিষয়ে এসে পড়ি। আর চায়ের দোকান হোক বা যেখানেই হোক বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমান বিষয়ে কিছু বলতে গেলে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের কথা অবশ্যই বলতে হবে; না হলে সেই আলোচনা আদৌ আলোচনা হয়ে উঠবে না। আর ১৯৯২ থেকে যার প্রিয় পত্রিকা ‘মাসিক মদীনা’ সেই আবদুল মুত্তালিব দাদু যেখানে আছেন সেখানে তো মুহিউদ্দীন খানকে আসতেই হবে। এবং তিনি আসলেনও। প্রসঙ্গক্রমে রতন ভাই বললেন- ‘আচ্ছা তাকে কি আপনি দেখেছেন?’
-‘তাকে আমি চাক্ষুষ দেখিনি, ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই যাবো দেখা করতে। তবে স্বপ্নে তাকে যেমন দেখেছি এবং দেখি সেটা শোন। একটা এবড়ো থেবড়ো এবং সংকীর্ণ, খুবই সংকীর্ণ রাস্তা। রাস্তার দু’ধারজুড়ে হাজার হাজার ফিট নিচে ভয়ংকর সব খানা-খন্দক। সেখানে বাস করে সাপ বিচ্ছুসহ বিষাক্ত সব প্রাণী। কোনো কোনো গর্তে আবার জ্বলছে আগুন। গনগনে আগুন। বুঝতেই পারছিস কেমন বিপজ্জনক পথ ওটা। এক মুহূর্তের জন্যও যদি পৃথিবীর আলো নিভে যায় তাহলে ও পথ দিয়ে কেউ হাঁটতে পারবে না। কিন্তু হলো সেটাই; হঠাৎ পৃথিবীর সব আলো নিভে গেলো। পৃথিবীজুড়ে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। অসংখ্য মানুষ রাস্তা থেকে হুমড়ি খেয়ে খেয়ে পড়ে যাচ্ছে নিচে। মানুষের হৈ হুল্লোড় চিৎকার চেঁচামেচিতে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে কেয়ামতের বিভীষীকা নেমে এসেছে। হঠাৎ মানুষের কণ্ঠে আনন্দধ্বনি ধ্বনিত হলো- ‘মুহিউদ্দীন খান আসছেন… মুহিউদ্দীন খান আসছেন…।
আমি তাকালাম। ভালো করে তাকালাম। দেখলাম আলোর মশাল হাতে একজন ছুটে আসছেন। যার আকার আকৃতি এবং ব্যক্তিত্বের বর্ণনা আমি এক কথায় দেবো- ‘অসাধারণ।’ অসাধারণ ওই পুরুষের আলোয় অসংখ্য মানুষ আবার নির্বিঘেœ হাঁটতে শুরু করলো তাদের গন্তব্যে।’
এপর্যন্ত বলে দাদু থামলে রতন ভাই বললেন- ‘স্বপ্নের মানুষের ব্যাপারে আমি একটু স্বপ্নের মতো করেই প্রশ্ন করি। সেটা হলো, ঘোর বিপদের সময় তিনি যেহেতু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আলো দিয়ে রক্ষা করেছেন, এজন্য পৃথিবী তাকে কী দিলে পৃথিবীর মান মোটামুটি রক্ষা পাবে বলে আপনি মনে করেন?’
দাদু বললেন- ‘পৃথিবী নিজের মান রক্ষার জন্য বলুক অথবা শুধু বলার জন্যই বলুক; যে জন্যই বলুক পৃথিবীকে বলতে হবে এবং পৃথিবী না বলতে চাইলেও পৃথিবীর অবচেতন মুখে তিনি উচ্চারিত হবেন, বারবার উচ্চারিত হবেন, সকাল সন্ধ্যা উচ্চারিত হবেন এবং যুগ যুগ ধরে উচ্চারিত হবেন ‘মহাকালের অমর বাতিওয়ালা’ হিসেবে।
