কেউ কেউ লেখালেখি করে

সংখ্যা:

 

লেখালেখি বিষয়ে বিস্তর লিখেছি, অনলাইনে এবং অফলাইনে। বেঁচে থাকলে আরও লিখবো। কেননা এ ধরনের ‘সদুপদেশ প্রদান’ কখনো দায়িত্ববোধ থেকে আসেনি; কখনো নিজ গরজে, কখনো পত্রিকার সম্পাদকের দাবি মেটাতে, কখনোবা মনের রাগ মেটাতে লিখেছি।

রাগের কথা কেন এলো সে ইতিহাস বলি। আমার বন্ধু-বান্ধবদের অনেককেই দেখি লেখক হওয়ার জন্য পনেরো দিন বা মাসকালব্যাপী নানা ধরনের লেখক তৈরির কোর্স করান। তাদের এসব কোর্সের আগরবাতি দেখে আমার বড় আফসোস হয়, কোর্স করে কি লেখক হওয়া যায়? আরও দুঃখ লাগে যখন দেখি এসব কোর্সে বেশকিছু তরুণ মহাসমারোহে ভর্তি হচ্ছে এবং মাসকালব্যাপী কোর্স শেষ করে একটা সনদ হাতে নিয়ে বেশ আত্মতৃপ্তির গর্বে এখানে সেখানে লেখক লেখক ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রাগের এটা একটা অনুষঙ্গ।

আমার পরিচিত কিছু সম্পাদক আছেন যারা পুরস্কার-সম্মাননার বড় সমঝদার। সমাজের নানাজীবী মানুষকে তারা ধরে এনে সম্মাননা গছিয়ে দেন। দু’দিন ধরে লিখতে শিখেছে যে ছোঁড়া, তাকেও স্টেজে ডেকে এনে বরেণ্য ছড়াকারের খেতাব লটকিয়ে গলায় সম্মাননার ক্রেস্ট গছিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, তারা সম্মাননা দেয়ার জন্য নিত্য-নতুন এবং অভিনব সব বিষয় আবিস্কার করেন। উদাহরণ হতে পারেÑ শ্রেষ্ঠ প্রায়লেখক সম্মাননা। বাস্তবতা হয়তো এমনই। আমার কখনো এ ধরনের সম্মাননা অনুষ্ঠানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। সাদরে এসব সম্মাননাজীবীদের থেকে এড়িয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

রাগের আরেকটি অনুষঙ্গ বয়ান করি। সেটা ফেসবুককেন্দ্রিক। ফেসবুকে প্রায়ই নতুন নতুন লেখালেখি শুরু করা ছেলেমেয়েরা মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করে- ভাই, অমুকের মতো লেখক হতে চাই। কীভাবে লিখবো? কীভাবে লেখক হওয়া যাবে? লেখালেখি শেখার আমার খুব আগ্রহ, কোন বই পড়লে কবিতা লেখা যাবে? প্রথম প্রথম এসব মেসেজের উত্তর দিতাম। অনেককেই সদুপদেশ দিয়ে বলতাম- ভাইয়েরা আমার! লেখালেখি শেখার জন্য কোনো বই নেই। ব্যকরণ বই পড়ে আপনি প্রুফরিডার হতে পারবেন বড়জোর, কোনোদিন লেখক হতে পারবেন না। এটা সত্ত্বাগত গুণ, ভেতরে না থাকলে হাজারখানেক আব্দুল মান্নান সৈয়দ গুলিয়ে খাওয়ালেও দু’ লাইন লিখতে পারবেন না। যদি ভেতরে সত্যিই থাকে আর আপনার লেখক হওয়ার গরজ থাকে, তাহলে পড়ুন এবং পড়ুন। সামনে যা পাবেন তাই পড়ুন, লেখকের নাম আর গুণগত মানের কোনো বাছ-বিচার না করেই পড়ুন।

এসব প্রথম প্রথম বলতাম। পরে যখন দেখলাম এমন সুধীলেখকদের বিচরণ সমাজে প্রচুর এবং দু-একদিন পরপরই কেউ না কেউ আমাকে মেসেজ দিয়ে লেখক হওয়ার এসমে আজম জানতে চাচ্ছেন, তখন জবাব দেয়া বাদ দিয়ে ফিরতি বার্তায় লিখে দেই- ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি!

 

দুই

বর্তমান অনেক তরুণই ভালো লিখছেন। অন্তত পাঁচ বছর আগের চেয়ে এখনকার তরুণদের লেখার কসরৎ অনেক সুডৌল, সুচারু। একটা খেদের কথা বললে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। আজ থেকে দশ বছর আগে আমি যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন আমার লেখালেখির শুরুটাই ছিলো পত্রিকায় কলাম লিখে। লিখি লিখি করছি যখন, তখন এই নবধ্বনি আর মাসিক রহমতে নিয়মিত কলামলেখক হিসেবে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে পরিচিত হয়ে গেলাম। অথচ তখন আমার লেখা উচিত ছিলো দু-চারটে গল্প, দুটো-একটা ছড়া বা কবিতা, কোনো একটা গবেষণা নিবন্ধ- এই। কিন্তু আমার ওপেনিংটাই হলো কলামলেখক হিসেবে!

আসলে তখনকার ক্রেজটাই ছিলো কলামলিখিয়ে হিসেবে। পত্রিকায় তখন ওই একটা জিনিসই বিকতো ভালো। নতুন যারাই কলম চালানোর কসরৎ করতা, সম্পাদক সাহেবরা তাকেই ধরে এনে কলামলেখক বানিয়ে দিতেন। কেউ ছড়া লেখায় এবতেদা করেছে, দু-চার মাস পরে দেখা যেতো সে দিব্যি কলাম লিখছে কোনো এক পত্রিকায়।

আসলে তখন পর্যন্ত ইসলামি অঙ্গনে লেখার এতো ধরনের অনুষঙ্গ আবিষ্কার হয়ে উঠেনি। লেখালেখির জন্য গোটা কয়েক মাসিক পত্রিকা বাদে লেখা প্রকাশের আর তেমন কোনো অনুষঙ্গ ছিলো না। এখন মাাসিক পত্রিকা ছাড়াও দৈনিক, সাময়িকীতে ছাত্ররা বেশ গুছিয়ে লেখালেখি করছেন।

বর্তমানে লেখক হওয়ার অন্যতম একটি প্রকাশমাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন। ফেসবুক বা অনলাইন পত্রিকায় লেখালেখির বেশ ধুম চলছে। এটা একদিক থেকে আশার কথা। ফেসবুকে যে যার ইচ্ছামতো লিখতে পারেন। যারা ভালো লিখেন, সহজেই তাদের পরিচয় ও হাতযশ ধরে ফেলা যায়। কে সত্যিকারের লেখক আর কে সম্মাননাজীবী,  এটা ফেসবুকে বিচরণ করলেই অনুধাবন করা যায়।

লেখালেখির সর্বোচ্চ মাধ্যম হলো বই প্রকাশ। আশার কথা হলো, এখন অনেক তরুণ লেখকই বই প্রকাশের সাহস দেখাচ্ছেন। লেখার নানাধর্মী প্রকার ও স্টাইল তৈরি করছেন অনেকে।

 

তিন

বই প্রকাশ নিয়ে দু-চার কথা বলি।

মাদরাসাপড়ুয়া যেসব ছাত্র লেখক হতে চায় তারা মনে করে, দু-চারটে বই উর্দু-আরবি থেকে অনুবাদ করে দিন গুজরান করলেই তো লেখক হয়ে গেলাম। অনেকে শুধু অনুবাদকেই লেখক হওয়ার মানদণ্ড বিবেচনা করে রেখেছেন। কওমি অঙ্গনের তরুণদের এই ট্র্যাডিশন থেকে বের হয়ে আসা উচিত।

যারা এক-আধটু লেখালেখির কসরৎ করছেন, তারা তকি উসমানি বা আলি মিয়া নদভির কোনো একটা বই অনুবাদ করেই লেখক হিসেবে বেশ এক আত্মতৃপ্তিতে ভুগেন। কিন্তু অনুবাদ আসলে কোনো লেখকের প্রাথমিক লেখার অনুষঙ্গ করাটা উচিত নয়। এতে তার লেখকসত্তা অনেকাংশেই মরে যায়। অন্যের লেখা অনুবাদ করা মানে অন্য লেখকের সৃষ্টিশীলতা নিজের ভাষায় প্রকাশ করা। নিজের সৃষ্টিশীলতা এখানে খুব একটা প্রকাশ করা যায় না। ফলে একজন তরুণের ভেতরে লেখক হওয়ার যেসব গুণাবলি প্রস্ফুটোন্মুখ, সেসব গুণাবলি অন্যের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ করতে গিয়ে ঢাকা পড়ে যায়। এ কারণে তরুণ লেখকদের উচিত নয় শুধু অনুবাদ করে নিজের লেখকসত্তার সলীল সমাধি ঘটানো। ছোট হোক, ক্ষুদ্র হোক, আয়তনে কম হোক- নিজের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে নিজের লেখকসত্তার বিকাশ ঘটানো। অনুবাদ ট্র্যাডিশন থেকে আমাদের তরুণরা বের না হতে পারলে কোনোদিন আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে না।

অনেক কিশোর-তরুণরা বইমেলা উপলক্ষে বা বিভিন্ন সময় নিজেদের কবিতা, ছড়া, গল্প-উপন্যাস বা অন্যান্য অনেক বিষয়ে বই প্রকাশ করছেন। এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আবার অনেকেই এসব তরুণদের ‘অকালপক্ক’ বলে নাক সিঁটকানোর ভঙ্গি করেন- দু’দিন ধরে লেখা শিখে এখনই বই প্রকাশ! এমন কথা অনেকেই বলে থাকেন। তবে আমি বলবো- তরুণ বয়সে বই প্রকাশ করাটাও লেখক হওয়ার একটি অন্যতম মাধ্যম। রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন কেবল পঁচিশ, তখন কবিতা-গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছিলো প্রায় কুড়িটি! প্রথমজীবনের এসব বইয়ের কাব্যমান ততোটা উৎকৃষ্ট না হলেও এর পরবর্তী রবি ঠাকুরের প্রতিটি রচনাই কালজয়ী হয়েছে। রবি ঠাকুরের অকাল গ্রন্থপ্রকাশই ছিলো তার জন্য এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট। এক্সপেরিমেন্ট করতে করতেই তিনি একসময় বিখ্যাত হয়েছেন, সাহিত্যে নোবেল অর্জন করেছেন।

সুতরাং অল্প বয়সে গ্রন্থপ্রকাশ অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ।

 

চার

এবার একটু কষ্টের কথা বলি। আমি অনেক এমন তরুণকে জানি, যারা কেবল লেখালেখিতে হাঁটতে শিখছে, ছড়া-কবিতা, গল্প-সল্প লিখছে, কী এক অজ্ঞাত কারণে যেনো তাদের তীর্থভূমি হয়ে ওঠে শাহবাগ আর টিএসসি। তারা সেখানে গিয়ে ফুঁক ফুঁক বিড়ি টানে আর উন্নতমানের গঞ্জিকাসেবীদের থেকে সাহিত্যের তালিম নেয়- ‘বুঝলা মৌলভি সাব, নন্দনতত্ত্ব হইলো গিয়া আপেলবৎ। হাওয়াও খাবে, আদমকেও খাইতে হবে…! বুঝো নাই ব্যাপারটা?’

মৌলভি সাব আদম-হাওয়ার মধ্যে নন্দনতত্ত্বের কী খুঁজে পায় সেটা অনুদ্ঘাটিত রয়ে যায় যদিও, তবে বিড়ি-সিগারেট রপ্ত করার তালিমটা সে ভালোমতোই শিখে নেয়। বিড়িতে টান দিয়ে আকাশের ঝলসানো রুটি হওয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কবিতার মশক করে।

তরুণদের বলছি- টিএসসি বা শাহবাগ অথবা অন্য যেকোনো বিড়িকেন্দ্রিক সাহিত্যআড্ডা কখনোই কারো লেখকসত্তাকে শাণিত করে না। বরং আমার পরিচিত অনেক তরুণকে দেখেছি, এই বিড়িময় আড্ডাবাজির কারণে তাদের সাহিত্য প্রতিভা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে গেছে। অনেকে বিড়ি টানতে টানতে শিখে গেছে আরও নানা কিছু টানার ধোঁয়াময় বিদ্যা। অনেকের পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। এসব সাহিত্যআড্ডা থেকে ঘোড়ার ডিম্ব হাসিল করে তরুণের জীবনেও একসময় নেমে আসে পরাজয়ের পিছুটান। তখন আর কিছু করবার থাকে না, তার তখন দিন চলে কোনো অনলাইন পোর্টালে প্রুফরিডিং করে অথবা গঞ্জিকাসেবীদের পদলেহন করে।

এসব তরুণদের একটা বড় সমস্যা হলো, নিজেকে স্রোতের বিপরীতে প্রকাশের অদম্য ইচ্ছা। নিজেকে আর সবার চেয়ে আলাদা করে চেনানোর একটা মানসিক পীড়ন সবসময় কিশোর-তরুণদের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এ কারণেই তারা মনে করে, শাহবাগীয় কিছু আদবকেতা রপ্ত করলেই নিজেকে বেশ একটা কেউকেটা মনে করবে সবাই। কিন্তু তারা ভুলে যায়, ¯স্রোতের বিপরীতে চলার জন্য আসলে বিড়ি টানার দরকার হয় না, মসজিদের বারান্দা থেকেও ¯স্রোতকে উল্টে দেয়া যায়।

 

পাঁচ

এবার নিজের ঢোল পেটানোর পালা।

আমি আমার লেখায়, বিশেষত কবিতায় চেষ্টা করছি একটা নতুন ভাবধারা তৈরি করতে। আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দ বাংলা সাহিত্যে আগেও ব্যবহৃত হয়েছে, আমি সেখান থেকে একটু ভিন্নভাবে এ জিনিসগুলোই ব্যবহারের কোশেষ করছি। আমি শুধু আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দই ব্যবহার করছি না, আমি এর ভেতর দিয়ে একটা ধর্মীয় আবহও আমদানি করার চেষ্টা করছি। কুরআনের আয়াত, হাদিসের বাক্যাংশ, বহুল ব্যবহৃত ইসলামি পরিভাষা বেশ কায়দা করে কবিতায় প্রতিস্থাপন করছি। শুধু আয়াত কিংবা হাদিসের ভাবার্থ নয়, আমি কবিতার পঙক্তির ধারা অনুসরণ করে আরবিতে আয়াতাংশ বা হাদিসের বাক্যাংশ নিয়ে আসছি।

একথা সত্য, সুফি বা ধর্মীয় মানসে রচিত কবিতায় অনেকেই চেষ্টা করেছেন বা করছেন আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহারের, কিন্তু রোমান্টিক কবিতায় এ ধারা খুব একটা সচল হয়নি বাংলাভাষায়। আমি সুফি এবং রোমান্টিক দু ধারার কবিতাতেই তা ব্যবহারে ব্রতী হয়েছি।

এই স্পর্ধিত প্রচেষ্টার একটা গূঢ় কারণ হচ্ছে- অন্যদের অনুকরণ না করে নিজের একটি আলাদা প্রকাশভঙ্গি পরিচিত করা এবং কুরআন-হাদিস থেকেও যে কবিতা বা সাহিত্যের প্রচুর রসদ সংগ্রহ করা সম্ভব, সে বোধ ও বিশ্বাসের সঙ্গে অন্যদের পরিচিত করানো। তাছাড়া, সাহিত্যের সকল মাধ্যমেই কুরআন এবং হাদিসকে উৎকীর্ণ করার একটা ইচ্ছাও আছে এর দ্বারা।

আমাদের তরুণদের কথা তো আগেই বলেছি, তারা নতুনত্ব তালাশে বিড়িমুখী সাহিত্যের প্রতি আসক্ত হয়ে যায়। অথচ তারা কখনো সাহস করে কুরআন-হাদিসের সাহিত্য সম্ভার নিয়ে চিন্তা করেনি। কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে সাহিত্যে যেমন নতুন নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, তেমনি এর মাধ্যমে সাহিত্যের অনেক নতুন উপধারাও তৈরি করা সম্ভব।

মেধাবী তরুণরা এ বিষয়টি যদি অনুধাবন করতে পারেন, বাংলাসাহিত্যে ইসলামি বিপ্লব ঘটাতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১