লজিংবাড়ির স্মৃতি

সংখ্যা:

 

আমি প্রথম যখন লজিংয়ে যাই, আমার বয়স তখন সাত কি আট। পাশের গ্রামে মাদরাসা। মাদরাসায় থাকব এবং তিনবেলা লজিংয়ে গিয়ে খেয়ে আসব—এই ছিল সিদ্ধান্ত। আমি আজন্ম মা পাগল মানুষ। ফলে এই সিদ্ধান্তটি আমার জীবনে একটি বিভীষিকার মতো উদয় হলো।

মাদরাসা থেকে কিলোমিটার মতো দূরে কাছাকাছি দুটো বাড়িতে দুই বছর লজিং থেকেছি। লজিং বাড়ির লোকজন ছিলেন খুবই সাদামাটা, সরল। তাঁরা আমাকে ঘরের ছেলের মতোই মনে করতেন। তাঁদের স্নেহ আর আদরের কথা আমি ভুলবো না। বয়সে ছোট ছিলাম বলে পাক-ঘরে সকলের সাথে বসে খাবার খেতাম। এবং বৃষ্টির দিনগুলোতে লজিং-ছেলের সাথে প্রায়ই মাছ ধরতে যেতাম আশপাশে আর দূরের খালবিলে, ধানি জমিতে।

প্রথম পরিবারটি ছিল খুবই দরিদ্র। তাদের খাবারের কষ্ট ছিল। কোনো কোনো দিন এমনও হয়েছে শুধু লবণ দিয়ে ভাত খেয়েছি। কোনোদিন নিমপাতা ভাজা দিয়ে। কখনো কেবলই একটি শুকনো রুটি। এরকম দরিদ্র অবস্থায়ও বাড়তি একটি মানুষকে আহারসঙ্গী করার মতো বিশাল হৃদয় তাঁদের ছিল। একেবারে গ্রামীণ আর্দ্র মমতাটি আমি তাঁদের কাছে পেয়েছি।

একটা খুবই সাধারণ ঘটনার কথা বলি। ছোটোবেলায় আমি নির্জন অন্ধকারে ভয় পেতাম। ছোটোবেলার মতো প্রাবল্য না থাকলেও ভয়টা এখনো আছে। তো, একবার রাতের বেলা খাবার খেতে গিয়েছি। অমাবশ্যার রাত ছিল। অন্যান্য দিন আশপাশের বাড়িতে সঙ্গী থাকলেও সেদিন আমি একা ছিলাম। খাবার শেষ করে ফেরার সময় ভয়ে আমার মুখ শুকিয়ে গেল। লজিংয়ের চাচি বুঝলেন ব্যাপারটা। বললেন, ‘আমি এগিয়ে দিচ্ছি, আসো।’

তিনি একটি কেরোসিনের বাতি হাতে মূল সড়ক পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ছোট পথের মুখে প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি একটু এগোই আর পেছন ফিরে তাকিয়ে তাঁর উপস্থিতি থেকে নির্ভয় ও নির্ভরতা সঞ্চয় করি। বহুদূর থেকেও দেখলাম তিনি কুপি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। এটা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা, কিন্তু এ সময়ের লজিং-জীবনের কথা ভাবলেই আমি দেখি গাঢ় অন্ধকারের ভেতর প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মমতাময়ী, মায়ের স্নেহ বুকে নিয়ে। কথাটা হাস্যকর শুনালেও আমার কাছে মনে হয়, আমাদের হৃদয়ে যে শিল্পবোধ, শিল্পমগ্নতা, রুচি, মননশীলতা ও কোমলতা—এ জিনিসগুলো গড়ে ওঠার পেছনে এইসব অসাধারণ ও অপার্থিব দৃশ্যগুলো নেপথ্যে সংগোপনে কাজ করে যায়।

আমি ক্ষিদের কষ্ট কখনো সহ্য করতে পারি না। তখনও পারতাম না। আমার সারাদিনই ক্ষিদে থাকতো। বিশেষ করে আসর মাগরিব আর ফজর পরের সময়গুলোতে। কোনো কিছু কিনে খাওয়ার মতো টাকা-পয়সা থাকতো না। সে সময়ে আমাদের আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। ফলে খিদে পেলে আমি অসহায়ত্ব বোধ করতাম এবং ছুটির সময় হলে বোকার মতো রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়িযে থাকতাম। চুপচাপ দাঁড়িযে লোকজনের আসা-যাওয়া আর গাড়ি চলাচলের দৃশ্য অবলোকন করতাম। দৃশ্যটি কল্পনা করে আমার নিজেরই এখন খারাপ লাগছে। মজার ব্যাপার হলো, এই খারাপলাগার মধ্যে একটা আনন্দও আছে।

খুবই অদ্ভুত। জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো, যেগুলো কোনোরূপ হিংস্রতা বা অস্বস্তির ব্যাপার নয়, বেদনা বিধুর ও নির্মম, এগুলোও স্মৃতির ভেতর গিয়ে কেমন কোমল হয়ে ওঠে। মানুষের জীবনে স্মৃতি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। শেষের দিকে যে বাড়িতে গিয়েছিলাম, তারা মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার। এই বাড়ির ফুলের মতো ফুটফুটে পিচ্চি মেয়েটা আমার জুতা আর টুপি নিয়ে পুকুরে ফেলে দিয়ে খিলখিল করে হাসত। এটা ছিল তার মজার একটা খেলা। লজিং-ছেলের নাম ছিল মাহমুদ। আমি চলে আসার কিছুদিন পর শুনলাম মাহমুদের বাবা মারা গেছেন, এর কিছুদিন পর তাঁর বড়োভাই, এরপর দাদা, এরপর হঠাৎ শুনলাম মাহমুদও মারা গেছে। দাদিও তো মনে হয় নাই। সেই পিচ্চি মেয়েটার বিয়ে হয়েছে, তার ছোটোবোনের বিয়ে হয়েছে। একজন ফুফু ছিলেন, বিয়ে হয়ে তিনিও চলে গেছেন স্বামীর বাড়ি। এভাবে অল্প কয়েক বছরের ভেতর তাঁদের পুরো বাড়িটি নির্জন ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। একদা যে বাড়িটি লোকারণ্য ছিল, জীবনব্যস্ততায় মুখরিত ছিল, হঠাৎ করে সেই বাড়িটি হয়ে পড়ল পুরোপুরি নির্জন প্রান্তর। আসা-যাওয়ার পথে আমি তাকিয়ে থাকি। দেখি বাড়ির প্রবেশমুখে, রান্নাঘরের সামনাটায় ছোট আমি দাঁড়িয়ে আছি, পিচ্চি মেয়েটা দৌড়ে আসছে আমার দিকে, মাহমুদের আম্মু হাসিমুখে আমাকে খেতে ডাকছেন—এইসব দৃশ্য চোখে ভাসে আর বুকে অদ্ভুত কষ্ট জাগে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে আমার লজিং-জীবন শুরু হয় হেফজখানায় যাওয়ার পর। এই পর্যায়টি পাঁচ বছরের সুদীর্ঘ এক সময়। হেফজখানায় ভর্তি হওয়ার কয়েকদিন পর হুজুর বেশ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে দূরবর্তী এক গ্রামে প্রবেশ করলেন। হুজুর ছিলেন খুবই সুন্দর গড়নের মানুষ। চেহারার গাম্ভীর্য আর সহজতার মিথস্ক্রিয়া তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটা আকর্ষণ তৈরি করে রাখত। তিনি আগে আগে হাঁটছেন, আমরা দলবেঁধে পেছনে। বছরের শুরুর দিনগুলোতে বিভিন্ন গ্রামে তিনি এভাবে পরিভ্রমণ করে ছাত্রদের লজিংয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। একান্ত অপারগতা না থাকলে কেউ না করতো না। ছাত্রদেরকে লজিং রাখা আশপাশের গ্রামগুলোর বিশেষ একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল।

প্রথমে আমার যেখানে লজিং হলো, মাদরাসা থেকে মাইলখানেক বা তার চেয়ে বেশি দূর হবে। বছর-দুই পরে অবশ্য আরেকটু কাছে এসেছিলাম। শেষ দুই বছর মাদরাসার একেবারে নিকটে আমার খাবার-দাবারের ব্যবস্থা হয়েছিল। কাছে লজিং হওয়া ছিল তখনকার সময় আমাদের জন্য বিশেষ এক গর্বের ব্যাপার।

শেষ যে বাড়িতে লজিং ছিলাম, সেখানে একজন বৃদ্ধা মা ছিলেন। তাঁর কথা আমার আজীবন মনে থাকবে। এই মাতা আমাকে আপন ছেলের মতো আদর করতেন। রীতিমতো শাসন করতেন আমাকে। আমার ছিল মাদরাসা পালানোর রোগ। এ নিয়ে কত বকা খেয়েছি তাঁর। পাশে বসিয়ে তিনি খাবার খাওয়াতেন এবং বকা দিতেন।

একবার বাড়িতে আসার পর আমার কেন যেন মনে হলো আমাকে খুব ভালো ফুটবল খেলোয়ার হতে হবে। এই মনে করে একটা ক্রিকেটবল দিয়ে আমি দীর্ঘ সময় ধরে লাফিয়ে উঠে বিশেষ এক রকমের কেতাদুরস্ত কিক মারা অনুশীলন করলাম। খুব উঁচুতে উঠে কিক মেরে নিচে নামার পর শরীরের পুরো চাপটা পড়ত বাম পায়ের গোড়ালিতে। পরদিন মাদরাসায় এসে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমার ঘাড় বিশ্রী রকমে ফুলে গেছে। ঘটনা শুনে এই স্নেহশীলা বৃদ্ধাটি আমার ওপর খুব ক্ষেপে গেলেন। আমাকে কেন এইসব ভূতে পায়—নানা রকমের আদুরে ভর্ৎসনা দিয়ে জবাবদিহি করতে লাগলেন বারবার। এরপর দীর্ঘদিন পর্যন্ত তৈলমর্দন করে ঝেড়ে ঝেড়ে তিনি ঘাড়ের সে ফোলা কমিয়ে দিয়েছিলেন।

মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘এখন তো কাছে আছো, কিন্তু গেলে পরে কি আর দেখতে আসবে?’ আফসোসের বিষয়, চলে আসার পর একটি বারের জন্যও তাঁকে দেখতে যাইনি। প্রায় আঠারো বছর আগের কথা। আমি জানি না এখনো তিনি জীবিত আছেন কি না। নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হয়।

আমার স্মৃতির ভেতরে যে আনন্দের অনুভব আছে, এর অনেকখানি জুড়ে আছে সে গ্রামের গাছপালা, নদী, সাঁকো আর মেঠো পথগুলো। একটু কেমন শুনাচ্ছে হয়তো। কিন্তু আমার অনুভবটা এমনই। আমি যে সময়টাতে সেখানে জীবনযাপন করেছি, সদ্য কৈশোরকাল। মানুষের জীবনে এই সময়টা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়ে সচেতনভাবে স্মৃতিরা গড়ে উঠতে শুরু করে, মননের ভিত তৈরি হয় এবং ভেতরের কোমল স্বপ্ন ও কল্পনার এক অভূতপূর্ব যাত্রার সূচনা হয়।

আমাদের লজিংয়ে যাওয়ার পথ ছিল দুটো। একটা পথ ছিল কিছু দূর পর্যন্ত লোকালয়ের ভেতর দিয়ে, ঘরবাড়ির জানালা ছুঁয়ে, রান্না ঘরের ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর হঠাৎ করে হা হা মাঠ। পথের দুপাশে উঁচু উঁচু ঘাস। একটু পর ঝিরঝিরে ছোট্ট নদী, বাঁশের সাঁকো। ঐপারে গাছপালা-ঘেরা বাড়িঘর। এরপর দিগন্ত। সেই ছোট সময়টিতেও আমি এই পথে যেতে যেতে অজানা এক আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়তাম। আমার মনে হয়, প্রত্যেকের জীবনেই নানাবিধ অনুভবের কিছু মূর্তপ্রতীক তৈরি হয়। আমি যখন কোনো সাঁকো দেখি, বা কারও মুখে সাঁকোর গল্প শুনি, আমার চোখে সেই সাঁকোটি তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়। সাথে আসে সে সময়কার গন্ধ, দৃশ্য আর নানাবিধ শব্দের কোলাহল। আমার যখন দুঃখের কথা মনে হয়, তখন চোখে ভাসে হেফজখানার বিকেল ফুরিয়ে আসা সন্ধ্যার কথা, পশ্চিমের রক্তিম আকাশের ছবি, রেললাইনের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দীর্ঘ একটি রাত্রির দিকে, যেখানে আমি আবারও বন্দী হবো, একটুখানি স্বাধীনতার পর।

যখন প্রেমের কথা মনে হয়, তখন চোখে ভাসে সেই মসজিদের ছাদে নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে জেগে থাকা বিশাল চাঁদের দৃশ্য। একদিন খুব গরমের রাত ছিল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। গরমে হাঁসফাঁশ করে শেষ রাতের দিকে আমরা কয়েকজন গোসল করতে এলাম। টিউবলের পাড়ে ছিল লম্বা একটা নারকেল গাছ। পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে আছে। চারদিকে সুনসান নীরবতা। বিস্তৃত আকাশের বুকে বিশাল এক লাল চাঁদ। এই দৃশ্য আমাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল। বিরহের কথা মনে হলে আমার চোখে সেই দৃশ্য ভাসে।

এইভাবে এই গ্রামের পথ, গাছপালা, পুকুর আমার স্মৃতির নানা অনুভূতির ভেতর জেগে আছে বহুবিধ অনুভবের চিহ্ন হয়ে।

 

লেখক : তরুণ আলেম ও কথাসাহিত্যিক

ফেব্রুয়ারি ২০২০

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১