শীত। ষড়ঋতুর পঞ্চম ঋতু। পৌষ আর মাঘ—এই দুই মাস মিলে হয় শীত। হেমন্তের নবান্নের উৎসবের পরে আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে শীতের হিমহিম সমীর। এ সমীর তনুমনে শীতল ভালোলাগার জানান দিয়ে যায়।
আমাদের পাড়া-গাঁয়ে শীত আসে দেহমন কাঁপিয়ে। প্রভাতে ঘন কুয়াশায় দশদিকের সবকিছু ঝাপসা ঝাপসা লাগে। মনে হয় পুরো পৃথিবী বুঝি ঘোলাটে হয়ে আছে। তবু ভোরপাখিদের কিচিরমিচির আর বড়ই পড়ার টুব টুব শব্দ শোনা যায়। এ শব্দে গ্রামবাসীদের ঘুম ভাঙে।
কনকনে শীতের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা গাঁয়ের খেটে খাওয়া মানুষের জন্য যেন কিছুই নয়। ভোরের কুসুম ফুটলে কিংবা হালকা রোদের উদয় হলে কৃষক ছুটে যায় লাঙল কাঁদে। তার প্রিয় ক্ষেতফসলে। মাঝি চলে নদীর তটে বৈঠা লগি নিয়ে। ঘুম ভেঙে রাখাল ছোটে গরু নিয়ে। তার চিরচেনা গবাদিপশুর চারণভূমিতে। ভরদুপুরে বাঁশের বাঁশির সুরে সুরে মাতিয়ে তোলে আশপাশের সবাইকে। প্রত্যুষে পাতিল হাতে ঘরণী যায় চুলোর পাশে। গ্রাম-বাংলার এসব দৃশ্য আজও বিদ্যমান।
গ্রামের ফেলে আসা অনেক স্মৃতিই মাঝে মাঝে নাড়া দিয়ে ওঠে। কারণ, আমার শৈশব কেটেছে গ্রামের মাটিতে। যে মাটির সাথে মিশে শুঁকতে চেয়েছি মাটির গন্ধ। মাটির খাতায় এঁকেছি কত আল্পনা। আজ ওগুলো কেবল কল্পনার মতো মনে হয়।
মনে পড়ে, সাতসকালে কেমন করে দূর্বাঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে যেতাম সাদা সাদা শিশিরবিন্দু মাড়িয়ে। সকালবেলার এ শিশিরবিন্দু আমার কাছে মহৌষধ মনে হতো। মাঝে মাঝে নানাকে নিয়ে ছুটে যেতাম ‘নয়নজোড়া’ বনে সবুজ ধানচারার ক্ষেতে। ঝকঝকে শিশিরবিন্দু শিশিতে ভরে নিয়ে আসতাম। গোধূলিতে খেলাধুলা করে বন্ধুবান্ধব মিলে আগুন পোহানোর সেই দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভাসমান। হরেক রকম পিঠপুলির গন্ধে মন আকুল হয়ে থাকতো। ধামাপিঠে কলাপিঠের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্মৃতির বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে থাকা সেই দৃশ্যগুলো খুব মনে পড়ে এখন।
আমাদের পাড়া-গাঁয়ে শীত মৌসুমে ওয়াজ মাহফিলের ধুম পড়ে যেত। সুযোগ পেলেই চলে যেতাম এসব মাহফিলে। কখনো মায়ের অনুমতি নিয়ে, আবার কোনো কোনো সময় মায়ের অনুমিত ছাড়াই, লুকিয়ে। ফিরে আসার পর মায়ের কী যে বকুনি খেতে হতো এখনো তা কানে ভাসে। বকুনি খেয়ে খেয়ে বলতাম, ‘আম্মু, আর কক্ষণো যাব না!’ কিন্তু পরবর্তী কোনো মাহফিলের সময় সেই কথা বেমালুম ভুলে যেতাম।
জীবনের প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়ে ইট-পাথরের শহরে এখন আমার বসবাস। শীতের মওসুম যায়, গাঁয়ের শীতলভেজা সেই রূপ দেখার সৌভাগ্য আমার আর হয় না। দেখা হয় না ঘাসের ডগায় গাছের পাতায় শিশিরের জমে থাকা আর বাঁশঝাড়ের কঞ্চি বেয়ে পানি ঝরে পড়ার আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্যগুলো। এ সবই আজ হয়ে গেছে ধূসর স্মৃতি।
চনমনে শৈশবের কাছে ফিরে যাবার অসম্ভব আকুতি নিয়ে এই তো আমাদের বেঁচে থাকা
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা
জানুয়ারি 2020

