তখন আমার বয়স সাত কি আট হবে। আম্মু একদিন কী কারণে যেন শাসন করেছিলেন, রাগে অভিমানে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে যাই বাড়ি থেকে। কী জেদটা না ছিল তখন, নিয়ত করে ফেলেছি আর বাড়ি ফিরব না। পকেটে মাত্র সামান্য কয়েকটা টাকা। চলে যাই স্টেশনে। কীভাবে যেন পেয়ে যাই আরেকটা সঙ্গী। সাঈদ। ওর কথায় ট্রেনে উঠে পড়ি। ভয়ে গায়ের রক্ত হিম যায়। নামতে চাইলেও আর পারি না। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ট্রেনের গতির আর শব্দের সাথে মনের ধুকধুকানিও বেড়ে চলছে সমান তালে। কাঁদো কাঁদো অবস্থা। চলতে চলতে ট্রেন এসে থামল টঙ্গী স্টেশনে। নেমে দাঁড়িয়ে রইলাম। মান-অভিমান সব ভেঙে গেল। হয়তো ভয়েই। আবার নরসিংদীমুখী অন্য একটা ট্রেনে উঠে পড়লাম।
ট্রেন চলছে তো চলছেই। এতক্ষণ তো লাগার কথা না। সন্ধ্যা গড়াচ্ছে। কিছুই বুঝে উঠতে না পারে জিজ্ঞেস করলাম পাশের এক আপুকে। তিনি জানালেন এটা রাজশাহীগামী ট্রেন। কথাটা শুনে আমার প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। মনে হচ্ছিল আমার এই ছোট্ট হৃদয়ে কেউ যেন হাতুড়ি পেটা করছিল।
কিছুক্ষণ পর ট্রেনটা থেমে গেল। কোনো স্টেশন না। ইঞ্জিন নষ্ট হয়েছে। রাত তখন আনুমানিক এগারোটা হবে। অবুঝ আমি কী করব, ভেবে উঠতে পারছিলাম না। ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। ভাবলাম, আর এগুনো যাবে না। হেঁটে হলেও বাড়িতে যেতে হবে। নেমে উল্টো দিকে হাঁটা দিলাম। এক পর্যায়ে পা দুটো যেন অবশ হয়ে গেল। প্রচুর ভয় করছিল। সাঈদ আর আমি একটি চাদরের ভেতর এঁটে সেঁটে হাঁটছিলাম। অনেকদূও হেঁটে আসার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়লাম হাঁটা পথের একপাশে। চোখে জল। মনে মনে ভাবছি, আম্মু কেন মারতে গিয়েছিল! আর আমিই-বা কে ট্রেনে উঠতে গেলাম। এসব ভাবতে ভাবতে একটা সময় গভীর নিদ্রায় ডুবে গেলাম।
শিশিরসিক্ত প্রভাতে ঘুমটা ভেঙে গেল। আলো ফুটেছে আবছা আবছা। অন্ধকার এখানে ওখানে লেগে আছে এখনও। সাঈদ তখনো জাগেনি। হঠাৎ অদূরেই ঝাপসা চোখে দেখতে পেলাম, কুয়াশার পর্দা দোলাতে দোলাতে একটা ধীরগামী ট্রেন আসছে। এক ঝাটকায় সাঈদকে টেনে উঠালাম। আল্লাহর কী অপার কুদরত! আমাকেও জাগিয়ে তুললেন, ট্রেনটাকেও ধীর করে দিলেন কুয়াশার মাধ্যমে! আবার সে পথেই হাঁটতে লাগলাম। আশেপাশে কিছুই চোখে পড়ছে না। বিরানভূমি। সবুজ ও বিস্তৃত। একটু পর কোত্থেকে যেন এক ঝাঁক মৌমাছি ধেয়ে আসলো আমাদের দিকে। সাঈদ দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু আমি দিলাম দৌড়। আশ্চর্য! সেগুলো আমার পেছন পেছনই ছুটলো। বেশি যেতে পারলাম না। পড়ে গেলাম। দু হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কাঁদতে লাগলাম। আমার জন্য একটুও মায়া হলো না মৌমাছিগুলোর। কামড়ে দিলো মনের মতো। তখন নিজেকে এতো অসহায় মনে হচ্ছিল যে, লাগছিলো পৃথিবী এটুকুই। সংকুচিত। কান্নার আওয়াজ কাঁপিয়ে তুলছিল আশপাশ, কিন্তু শোনার মতো কেউ ছিল না।
ডুকরে কাঁদছিলাম। উঠে এবার উল্টো দিকে হাঁটতে লাগলাম। সারা দুপুর হেঁটে পৌঁছলাম এক স্টেশনে। টাঙ্গাইল, করটিয়া। স্টেশনের সংস্কার কাজ চলছিল। একটু দূরে সাত-আট ফুট নিচে একটা দোকান দেখে নিচে নামলাম। দোকান থেকে আম্মুকে ফোন দিলাম।
এখনো মনে হলে রক্ত হিম হয়ে আসে। আম্মু কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘বাবা, তুই কোথায়?’
আমি শুধু বলতে পারলম, ‘করটিয়া।’ তারপর দোকানের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়লাম।
আমার কান্না ও অসহায়ত্ব আঁচ করতে পেরে দোকানি লোকটি কার সঙ্গে যেন কথা বলল। তারপর আমাকে ও সাঈদকে জোর করে একটা টিনের ঘরে আটকে রাখল। লোকটার কোনো উত্তর না দিয়ে আমি শুধু ফুঁসছিলাম আর কাঁদছিলাম। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার।
কিছুক্ষণ পর আরো পাঁচজন লোক এলো। দোকানদারটি বলল, ‘সরদার! এই ছোকরাডিই।’
সরদার অভিহিত লোকটি আমাদের জিজ্ঞেস করল আমাদের বাড়ি কোথায় আর কেন এসেছি। আমি সব বলে দিলাম। একেবারে সবিস্তারে। লোকটির বোধহয় আমার ক্ষুধার্ত, বেদনাক্লিষ্ট মুখ, ভয়ার্ত, আতংকিত চোখ আর কাঁপা কাঁপা গলা দেখে মায়া লেগেছিল। আমাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেল। দুদিন পর তৃপ্তি ভরে ভাত খেলাম। লোকটির কিশোরী মেয়েটি আমাদের জন্য বিছানা করে দিল। শুতে না শুতেই হৈচৈ আওয়াজ শুনলাম। ২০-২৫ জন মহিলা আমাকে দেখতে এসেছে। তারা একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ছিল। মনে হচ্ছিল যেন তীর ছুড়ছিল। আমি নিঃশব্দে কাঁদছিলাম। কিছুক্ষণ পর্যন্ত পালাক্রমে চলতে থাকে পরিদর্শন।
তারপর রাত নটার দিকে শুয়ে পড়লাম। সে বাড়ির একটাই রুম ছিল। খাটও একটা। জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি আমার আশ্রয়দাতা বাড়িওয়ালা লোকটি সস্ত্রীক বাইরে খরকুটোয় কাঁথা বিছিয়ে শুয়েছেন।
গভীর রাতে কথার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। ঝাপসা চোখে চেয়ে দেখি আব্বু দাঁড়িয়ে। কাঁদছিলেন। আমি উঠেই লেপ্টে গেলাম আব্বুর বুকে। এভাবে অনেকক্ষণ।
আশ্রয়দাতা মহৎপ্রাণ সেই লোকটির কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে চোখে আবারও অশ্রুর বান নেমে এলো। আব্বু লোকটির কৃতজ্ঞতা আদায় করছিলেন বারবার। অশ্রুসজল চোখে বিদায় নিলাম তাদের কাছ থেকে।
লোকটির কাছে আমরা সবাই চির ঋণী হয়ে আছি। তারপর কত বছর হলো। জীবনের কত কিছুতে কত পরিবর্তন ঘটল। কিন্তু স্মৃতির পাতায় পলায়নের সেই কাহিনি এবং আশ্রয়দাতা মহৎপ্রাণ সেই লোকটির কথা স্মৃতির পাতায় আজও জ্বলজ্বল করছে।
লোকটির বাড়িতে তারপর আরও যাওয়া হয়েছিল। যে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছিলেন তিনি, সেই দায় শোধ করতে। সে আরেক গল্প, আরেকদিন হবে এই নিয়ে আলাপ।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়াতুল মাআরিফ আলইসলামিয়া, উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা ১২০৪
জানুয়ারি 2020

