মওলানা ভাসানী : সংগ্রাম-সাধনায় মুখরিত জীবন

সংখ্যা:

 

রাজনীতিকে যিনি কখনও রমরমা রোজগারের পেশা বানাননি, জনকল্যাণ আর মানবসেবার মহান ব্রত নিয়েই যিনি রাজনীতিতে নেমেছিলেন, মজলুম-মজদুর আর অসহায়-গরিব মানুষের আপনজন হয়ে যিনি কাজ করেছেন আজীবন, যখন যেখানে মজলুম মানুষের আহাজারি শুনেছেন কোনোরকম সাতপাঁচ না ভেবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গেছেন আর্ত-আহত মানুষগুলির প্রয়োজনে; এককথায় যে মানুষের জীবনটাই ছিল অসহ্য দুঃখ-দুর্দশায় কাতর এবং অসামান্য সংগ্রাম-সাধনায় মুখর, তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

স্বদেশ ও স্বজাতির কাছে মাওলানা ভাসানী কী ছিলেন এবং কেমন ছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা বরং জানার চেষ্টা করব, বাইরের পৃথিবীর ভাসানীকে। আমরা জানতে পারি, মওলানা ভাসানী একবার ‘বিশ্বশান্তি সম্মেলনে’ যোগ দিতে গিয়েছিলেন স্টোকহোমে। ১৯৫৪ সালের ২৮ মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ইউরোপে অবস্থান করেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ খোন্দকার মুহাম্মদ ইলিয়াস। তিনি তাঁর ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ গ্রন্থে ইউরোপ সফরের নানান বিষয় তুলে ধরেন। তিনি লেখেন—‘ইউরোপের সংবাদপত্রে তুমুল বিতর্ক মওলানা ভাসানীকে নিয়ে। কেউ বললেন : মিস্টার মওলানা একজন অনলবর্ষী নেতা। তাঁর বক্তৃতায় আগুনের হল্কা বের হয়। আর কেউ বললেন, পূর্ব আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সংগ্রামী জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। পুঁজিপতিরা বললেন, মি. মওলানা কম্যুনিস্ট সাম্যবাদে বিশ্বাসী। আর বুদ্ধিজীবীরা বললেন, ‘তিনি ইসলামি সাম্যবাদের এক নতুন প্রেরণা। এক নয়া বার্তাবাহক।’

লন্ডন থেকে স্টোকহোম আর স্কটল্যান্ড থেকে রোম। সর্বত্রে সবাই ঘিরে ধরলেন তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা মিস্টার মওলানাকে। তাঁকে একনজর দেখতে চান আর জানতে চান। চোখেমুখে জ্বলন্ত বিশ্বাস নিয়ে মওলানা ভাসানী ঘোষণা করলেন—‘এজিদ নমরুদের জালেম বংশধরদের বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ায় মজলুমদের বেঁচে থাকবার যে সংগ্রাম চলছে পাকিস্তানের জনগণ সে সংগ্রামে শরিক। আমরা সকল দেশের সকল মানুষের বন্ধুত্বকামী। যুদ্ধ আর ধ্বংস আমাদের কাম্য নয়—আমরা চাই শান্তি আর সৃষ্টি। এই হচ্ছে আমার ইসলামের মূল শিক্ষা। এই হচ্ছে পাকিস্তানবাসীর জীবনদর্শনের প্রাণকথা।’

পাকিস্তানের কোনো জননেতা এমন দৃঢ় আওয়াজ এর আগে কখনো তোলেননি। দুনিয়ার মানুষ শোনেনি কখনো।

তাই বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে ধীরেধীরে এগিয়ে এলেন বর্তমান পৃথিবীর সেরা মনীষীরা মাওলানাকে জানতে। এলেন সাহিত্যিক-সম্পাদক, সাংবাদিক- বুদ্ধিজীবী, এবং দার্শনিক-রাজনীতিবিদ। এসে বললেন—‘পাকিস্তানের মাটির মানুষের নেতাকে আগে দেখবার সৌভাগ্য হয়নি। প্রথম দেখলাম।’ (প্রাগুক্ত)

এইসব মূল্যায়ন ও অভিব্যক্তি থেকে মূলত ভাসানীর রাজনৈতিক-তৎপরতার সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং তাঁর রাজনৈতিক আদর্শবাদিতার একটা স্বতন্ত্রধর্মী পরিচয়ই ফুটে ওঠে। তিনি যে কেবল তাঁর ‘স্বদেশের সাধারণ’ মানুষের কাছেই নয়, তার রাজনৈতিক আবেদন ও অর্জন যে বিশ্বজনীন—সেটা স্বীকার করেছেন সমকালীন পৃথিবীর সেরা সব মনীষীও।

এখানে যে প্রশ্নটা স্বভাবতই উঠে আসে তা হলো, তাঁর মতো একজন অসহায় সাধারণ মানুষের এমনতর জগৎজোড়া খ্যাতি ও অবস্থান কেমন করে অর্জিত হলো? কোন শক্তি আর চেতনার বলে তিনি হয়ে উঠেছেন সাধারণ্যে অসাধারণ? কী করে সম্ভব হয়েছে তাঁর পক্ষে শক্তিশালী এক শাসকগোষ্ঠীর আমূল উৎখাত-আন্দোলন?

হ্যাঁ, সেই রহস্যের সন্ধানে নেমেছিলেন সমকালীন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক বিশ্লেষক। কিন্তু তাঁরা তাঁদের বস্তুবাদী দর্শন আর থিওরিতে তাঁকে ঠিক ধরতে পারেননি। না পেরে অনেকেই অনেক কথা বলেন। অনেকের সাথে তাঁকে তুলনা করেন। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখলেন, না, ওরা আর ভাসানী তথাপি ভিন্নতর! শেষমেশ কারো সাথে যখন তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ আর জীবনদর্শনের মিল খুঁজে পাওয়া গেল না, তখন অগত্যা বিলাতের এক কম্যুনিস্ট নেতা তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞাস করে বসলেন, ‘আপনি তাহলে কী চান? মানে আপনার রাজনীতির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? কী আপনার জীবনাদর্শ?’

ভাসানী জবাব দিলেন, ‘সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা!’

তারপর সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে সেই নেতাকে উদ্দেশ্য কওে তিনি বললেন, ‘আমার চিন্তা ও জীবনাদর্শের সঙ্গে আপনাদের মানে কম্যুনিস্টদের যদি মিলে যায়, তবে দুঃখিত বা আনন্দিত হবার কিছু নেই। আপনারাও যদি সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলান, তবে আমার হাতে আপনাদেরও রেহাই নেই। কারও নেই। আর আমার আদর্শের সহিত অন্য কারো আদর্শ যদি মিলে যায় এবং আমার সংগ্রামে কেউ যদি শরিক হতে চান গভীর আনন্দে আমি তাঁকে আলিঙ্গন করে নেব।’

খোন্দকার (‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ গ্রন্থের লেখক) এখানে এসে ভাসানীর সেই সাহসী উচ্চারণের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘অধুনা পৃথিবীর রাষ্ট্রদর্শনের যারা পথনির্দেশক তাদের বেলাভূমি ইউরোপের বুকে বসে পূর্ব বাংলার মওলানা ভাসানী তাঁর রাজনৈতিক মতামত ব্যক্ত করলেন। কোথাও স্বীকার করতে তিনি দ্বিধাবোধ করেননি যে, তাঁর দেশ শিল্প-বিজ্ঞানে অনগ্রসর। সঙ্গে সঙ্গে গর্ববোধ করেছেন নিজের মাতৃভূমির সম্পদ প্রাচুর্যের!’ (প্রাগুক্ত)

পাঠক, এটুকু থেকেই আমরা বুঝে নিতে পারি, মওলানার রাজনৈতিক বিজয়ের পেছনকার শক্তি ও চেতনার মূল রহস্যটা। সেটা তাঁর একনিষ্ঠ দেশপ্রেম। সেটা তাঁর রাজনৈতিক আদর্শবাদিতা। সেটা তাঁর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির সাথে বৈরিতা ও আপোষহীনতা। সেটা তাঁর নৈতিক সততা আর চারিত্রিক দৃঢ়তা। সেটা তাঁর গণমানুষের প্রতি অগাধ আস্থা ও ভালোবাসা। সেটা তাঁর বৈষম্যহীন এক স্বাধীন সাম্যবাদী ইসলামি সমাজের প্রয়াসচেতনা। যেখানে মজুূর শ্রমিক পাবে তার উপযুক্ত সম্মান ও সমাদর। যেখানে আশরাফ-আতরাফ বলে থাকবে না কোনো ব্যবধান। যেখানে মানুষে মানুষে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ।

সত্যি বলতে কি, বর্তমানকার আদর্শহীন নোংরা রাজনীতি আর ভূয়া দেশপ্রেমের আড়ালে স্বাধীনতাকে বেচে দেওয়ার এমন এক নাজুক সময়ে মওলানা ভাসানীর মতো একজন খাঁটি দেশ ও স্বাধীনতাপ্রেমী এবং আপোষহীন জননেতাকে স্বরণ না করে পারি না। শুধু স্মরণ কেন, এ দেশের প্রতিটি জনগণ মনেপ্রাণে, শয়নে-জাগরণে আশা করে তাঁর মতো আরেকজন মওলানা ভাসানীর আগমনের; যাঁর আবির্ভাবের আলোকে আবারও উদ্ভাসিত হবে পরাধীন এই পোশাকি স্বাধীনতার তমসাচ্ছন্ন আকাশ। যাঁর পরশে আবারও নিজেদেও অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবে পরাজিত মজলুম জনতা।

লেখক : ছাত্র, মারকাজুল ফিকরি ওয়াল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ, ঢাকা

 

নভেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১