গ্রাম তুমি স্মৃতিময়

সংখ্যা:

 

আমি গ্রামের ছেলে। গ্রামের উন্মুক্ত বাতাস জুড়ে আমার প্রথম নিশ্বাস, প্রথম শ্বাস ও প্রশ্বাস। গ্রামের আলতো মাটি ছুঁয়েই এই পৃথিবীর বুকে আমার প্রথম চিৎকার। আমার প্রথম হাসি ও কান্না যেমন ছিল গ্রামের প্রকৃতি জুড়ে, আমার প্রথম চোখ খুলে পৃথিবীটা দেখাও ছিল গ্রামের পরম সৌন্দর্যে বিস্মিত হয়ে। এককথায়, গ্রামের হাত ধরেই এই পৃথিবীতে আমার প্রথম পদার্পণ এবং জীবনের পথে প্রথম পথচলা।

সেদিন আমি আরো কোমল ছিলাম, ছোট্ট একটি শিশু ছিলাম। এবং শিশু ছিল আমার হৃদয় ও আত্মা। সেই শিশু হৃদয় থেকেই হয়তো একদিন আমি পূর্ণিমার চাঁদ দেখে বলে উঠেছিলাম—‘আব্বু, এই লাইটটাকে এতো উপরে কে ওঠালো? ছোট লাইটটা পুরো গ্রাম কিভাবে আলোকিত করে?’ ছোটদের প্রশ্নের উত্তরে বড়দেরকেও ছোট হয়ে যেতে হয় এবং শিশুর মতো একটি হাসি দিয়ে বলতে হয়—‘এগুলো আল্লাহর কুদরত।’

তারপর সেই শিশুত্ব পেরিয়ে যখন আমি বুঝমান, তখন থেকেই গ্রামকে অনুভব করতে শুরু করি হৃদয় ও প্রাণ দিয়ে, প্রাণের ভাব ও আবেগ দিয়ে। দূরের চাঁদটিকে আমার খুব বেশি কাছে মনে হতো। ভাবতেই ভাল লাগত, চাঁদের সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব। কারণ আমি যেদিকে ছুটি চাঁদও আমার সাথে ছোটে, আমি যেদিকে ফিরি চাঁদও আমার সাথে ফেরে।

আমার গ্রাম, খুব বেশী কিছু না। দুই তিনটা বাঁক নিয়ে চওড়া একটি মেঠোপথ। দুপাশ জুড়ে সারি সারি গাছ। আরেকটু দূরে মানুষের ঘরবাড়ি। প্রায় সবগুলো ছনের। টিনের চালা হাতেগোনা কয়েকটা। মাঝে মাঝে আবার বিস্তৃত বিল। সেখানে রাখালদের গরু-ছাগলের পাল। আর বর্ষা হলে থৈ থৈ জল। আমাদের বাড়ির সামনে অবশ্য ছোট একটি খালও আছে। বর্ষায় পানির সাথে সাথে মাছেও থাকে টইটম্বুর। তাই শিকারীদের ভিড় জমতো সেখানে সকাল-বিকাল। বর্ষির টানে শরপুটি আর টাকি উঠে আসার দৃশ্য খুব উপভোগ করতাম আমি।

সেই খালটির পাশে একটি বিশাল বিল ছিল। বর্ষায় যেখানে হাজারো শাপলার মেলা বসত। গ্রামের ছেলেপেলেরা কেউ হাফপ্যান্ট পরে, কেউ লুঙ্গি পরে, খালি গায়ে শাপলা তোলার জন্য নেমে যেত হৈ-হল্লা করতে করতে। আমি তাদের সাথে যেতাম না। জোসনাভরা পূর্ণ চাঁদটির জন্য অপেক্ষায় থাকতাম আমি। বর্ষার যে রাতে চাঁদ পূর্ণ হবে  সে রাতে আমার খুশির অন্ত নেই। সন্ধ্যা নামার পরেই গিয়ে দাঁড়াতাম জলে থৈ থৈ করা শাপলা-ফোটা বিলটির ধারে। জোসনা-ভরা চাঁদটি বিলের জলে প্রতিবিম্বিত হতো। পানির হালকা তরঙে চাঁদটি আরো ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে, এবং দুলতে থাকত জলের কোলে। পুরো বিলটা হয়ে উঠত চাঁদময়। কী অপরূপ দৃশ্য! যেন হাজারও শাপলার মেলা বসেছে জোসনা-ভরা আকাশের বুকে। শহুরে ছেলেপেলেরা এমন একটি দৃশ্য কোথায় পাবে!

আর গ্রামে চাঁদরাতে ছেলেমেয়ে সবাই মিলে লুকোচুরি খেলার স্মৃতিটা তো হৃদয়ে এখনো চির অম্লান। আমাদের টিনের চালে বৃষ্টির অঝোর বর্ষণের মূর্ছনা কী যে তন্ময়তা নিয়ে আসত, সে কি আর ভাষায় প্রকাশ করা যায়!

ঝাড়ু নিয়ে ফড়িংয়ের পিছে ছোটাছুটি, বন্ধুদের নিয়ে অলস দুপুরে নিরামিষ সময় যাপন—সবই এখন শুধু স্মৃতি।

আমার সেই অপরূপ সৌন্দর্যের মেঠো গ্রামটি ফেলে ইটপাথরের ঢাকায় এসে মাঝেমাঝেই আনমনে বলে উঠি : গ্রাম তুমি স্মৃতিময়, বড্ড নস্টালজিক।

 

লেখক : ছাত্র, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া, ঢাকা

 

অক্টোবর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১