সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। পুব আকাশের নক্ষত্ররা এখনো জেগে উঠেনি। পঞ্চমীর চাঁদের আলো ত্যারছাভাবে গায়ে এসে পড়ছে। আনিস হাইকোর্ট মোড় পার হয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটা দিল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা হলুদ আলোয় দু’পাশের প্রকাণ্ড গাছগুলো ভূতুরে দেখাচ্ছে। মাঝেমাঝে শুকনো পাতা মাড়ানোর খসখস শব্দ হচ্ছে। রাস্তার ওপারে বখাটে কিছু ছেলে বেয়াড়া সুরে গান ধরেছে। আনিসের অবশ্য শুনতে খারাপ লাগছে না। একটু শীত শীত লাগছে। আনিসের গায়ে আকাশি রঙের ফিনফিনে একটা পাঞ্জাবি।
হাঁটতে হাঁটতে এক সময় বিশাল ফুটপাত অর্ধেক হয়ে আসে। ফুটপাতের বাকি অংশটা জুড়ে কিছু মানুষের বসবাস। মানুষই বটে। তবে এদের কোনো ঠিকানা নেই। নেই কোনো পরিচয়। রঙিন ত্রিপল দিয়ে বানানো ছোট্ট ঝুপড়িটা এদের স্বপ্নের ঘর, স্বপ্নের পৃথিবী। ধুলোমাখা মলিন চট আর ছেঁড়া কাঁথা এদের স্বপ্নের বিছানা। এই ঘরে বসে এক মা তার সন্তানদের নিয়ে স্বপ্নের রাজ্যে ঘুরে বেড়ান। তাদের এই স্বপ্ন কখনো ভঙ্গ হয় না। স্বপ্ন দেখার অধিকার নিয়েই তারা বেঁচে থাকে।
আনিস প্রতিদিন এই ফুটপাতে আসে। নিষ্ঠুর জীবনের প্রতি ত্যক্ত মানুষগুলোর খোঁজখবর নেয়। মাসের শুরুতে কিছু পয়সা পকেটে জমা পড়লে এদের সাথে ভাগাভাগি করে। দারিদ্রের তীব্র কষাঘাতে মৃতপ্রায় মানুষগুলোর শুষ্ক মুখে সজীব হাসি ফোটাবার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা সফল হয় না খুব একটা। হেঁটে যাওয়ার সময় কিছু লোক বড় বড় চোখে আনিসকে দেখে। আনিস থোড়াই কেয়ার করে।
স্তব্ধ রজনী। নক্ষত্রের শুভ্রতায় সমস্ত আকাশটা মাখামাখি। পেঁজা মেঘের আড়ালে অস্পষ্ট হয় চাঁদের উজ্জ্বল আলো। রাস্তার ডান পাশে একটা মসজিদ চোখে পড়ে। টুপিটা মাথায় চাপিয়ে মসজিদে ঢুকে যায় আনিস।
এশার জামাত শেষ হয়েছে ঘণ্টাখানেক। পুরো মসজিদে সাকুল্যে একজন নামাজ পড়ছে মাথায় রুমাল বেঁধে। এক কোণ থেকে কোরআন তেলাওয়াতের মৃদু স্বর ভেসে আসছে।
আজ তেলাওয়াতে কোনোভাবেই মন বসাতে পারছে না আনিস। প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে। অস্বস্তির কারণ একটা প্যাকেট। একটা লাল প্যাকেট। বেশ বড়সড়। বাঁ দিকের একটা পিলারের আড়ালে পড়ে আছে ওটা। আনিস যেখানে বসে আছে ঠিক ওখান থেকেই দেখা যাচ্ছে প্যাকেটটা। চিন্তায় পড়ে গেল আনিস। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। দুরু দুরু বুকে প্যাকেটটা হাতে নিল সে। আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও মুয়াজ্জিন বা খাদেম কাউকে পাওয়া গেল না। ভাল বিপদেই পড়া গেল বোধহয়। শেষতক সিদ্ধান্ত নিল আনিস, প্যাকেটটা সাথে করেই নিয়ে যাবে। অসাধু লোকের তো আর অভাব নেই এ দেশে। সকালে ইমাম সাহেবের হাত তুলে দিলেই কেসসা খতম।
রাতে চারটে খেয়ে শুয়ে পড়ল আনিস। কিন্তু ঘুম আসছে না মোটেও। প্রচণ্ড কৌতূহল হচ্ছে। অন্যায় এই কৌতূহল কোনোভাবেই হজম করতে পারল না সে। প্যাকেটটা খুলে ফেলল সে। সুন্দর দুটি চেক আর কিছু কাগজপত্র বেরিয়ে এল। চেক দুটি হাতে নিয়ে টাকার অঙ্কের দিকে চোখ বুলাতেই আঁতকে উঠল আনিস। হৃৎপিণ্ড এমনভাবে লাফাতে লাগল যেন, যে কোনো মূল্যে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দুটো চেকে ত্রিশ লাখ করে মোট ষাট লাখ টাকা!
হতবিহ্বল ভাবটা দ্রুত কাটিয়ে উঠে আনিস। পরিকল্পনা স্থির করে। ফুটপাতে পড়ে থাকা বুভুক্ষু মানুষগুলোর করুণ চেহারা ভেসে উঠে চোখের সামনে। পাঞ্জাবী গায়ে চড়ায়। ডান হাতে শক্ত থাবায় প্যাকেটটা নিয়ে ছুটতে থাকে।
দুই লেনের রাস্তাটা পার হলেই পৌঁছে যাবে ওদের বস্তিটায়। ক্ষুধার তাড়নায় চিরমলিন কতগুলো মুখ দেখতে পায় আনিস। এরা জানে না, আজ এদের ভাগ্যাকাশে শুকতারার উদয় হচ্ছে। অদ্ভুত এক পুলক অনুভব করে আনিস। রাস্তা পার হবার জন্য পা বাড়ায়। হঠাৎ যেন অদৃশ্য এক দেয়ালের সাথে প্রচণ্ড ধাক্কা খায়। হাত-পা কাঁপতে থাকে থর থর করে। আর এক চুলও এগুনোর শক্তি নেই তার। চিন্তার জগতে বোধোদয় ঘটে। উল্টো দিকে দৌড়াতে থাকে আনিস।
রাত বেশই হয়নি। সবে এগারটা। মসজিদে খাদেম-টাদেম কাউকে পাওয়া যাওয়ার কথা। খাদেমকে পাওয়া গেল। স্বস্তি বোধ করল আনিস। সব শুনে চিৎকার করে উঠল খাদেম
‘হ একটু আগেই তো খুইজা গেল একটা লোক। আপনে খাড়ান আমি ডাইকা আনি।’
হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসল খাদেম। হতাশার ভঙ্গিতে ঠোঁট উল্টাল, ‘দাড়ান, আমারে নাম্বার দিয়া গেসে, একটা ফোন লাগাই।’ ফোনে পাওয়া গেল লোকটাকে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো।’
‘কই, পাইসেন?’
‘হ, এই যে লন।’ প্যাকেটটা হাতে তুলে দিল খাদেম। আধটেকো মাথার মধ্যবয়সী লোকটার হর্ষোৎফুল্ল চেহারাটা বেশ উপভোগ করল আনিস। তীক্ষ্ম চোখে লোকটার কাণ্ড দেখতে লাগল। খুশি হয়ে লোকটা যা দিবে আনিসকে সেটার অঙ্কটাও কম হবে বলে মনে হয় না। খুব বেশি বোকা বলেই হয়তো নিজের কথা ভাবে না আনিস। মাঝে মাঝে বোকা মানুষেরা পৃথিবীর জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে।
জিনিসগুলো বুঝে নেয়া শেষ হল লোকটার। সহজ একটা হাসির রেখা আশা করছিল আনিস। সেটা পাওয়া গেল না। চোখ তুলে আনিসের দিকে তাকাল সে, ‘অ আপনিই তাহলে সেই লোক? আমি তো আগেই সন্দেহ করেছিলাম। ভালোই হলো, পুলিশের কাছে যাচ্ছিলাম। টাকাটা যেহেতু পাওয়া গেল, ভাবছি ঝামেলা বাড়াব না। ভালো হয়ে যান।’ হন হন করে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল লোকটা।
উদভ্রান্তের মত হাঁটছে আনিস। মনে হলো কোনো কারণে পৃথিবীটা দুলছে। দু’চোখে অন্ধকার দেখছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সামনের বিজন চত্বরটা বিশাল ফাঁকা মাঠের মত দেখাচ্ছে।
বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শেষ শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টি ধুয়ে দিচ্ছে ছোট্ট শহরের যাবতীয় পঙ্কিলতা।
বাইতুল উলুম, গেণ্ডারিয়া
অক্টোবর 2019

