পরী ও পেত্নী হবার গল্প

সংখ্যা:

 

প্রতিদিন সকালে লেকের মাঝ দিয়ে হেঁটে কলেজে পৌঁছি। আবার ক্লান্ত দুপুরে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরি। ফেরার পথে আমার একটু বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে পার্কের বেঞ্চিতে। আমার নিঃসঙ্গতায় তখন সঙ্গী হয় লেকে সাঁতার কাটতে থাকা হাঁসগুলো। আমি যেন তাদের চেনা অতি আপন। আমি লেকের পাড়ে বসলে তারা সাঁতার কেটে আমার সামনে এসে হাজির হয়।

আমার ব্যাগে থাকা টিফিনের অবশিষ্ট অংশ, রুটি বা বিস্কুটের টুকরো আমি পরম আদরে তুলে দিই তাদের মুখে। কৃতজ্ঞতায় তারা শব্দ করে ওঠে। আমার জন্মভূমি থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরে এই দেশে এই আমার আনন্দের জায়গা। এখানে এলে এক অদ্ভূত মায়া খুঁজে পাই। লেকের মনোরম দৃশ্য আমাকে স্মৃতিকাতর করে দেয়। অতীত হাতড়ানোর মতো নিয়ে যায় আজ থেকে এক যুগেরও বেশি সময় আগে, আমার নানুবাড়ির গ্রামে।

বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, বাড়ির কাছে সুবিশাল পুকুর। গাছের ছায়ায় তার পানির রঙ গাঢ় সবুজ। আমার চোখে সুন্দর ভয়ংকর তার টলমলে জল। মনে হয় সেই পুকুরের প্রতিবিম্ব আমার চোখের সামনে থাকা এই লেক।

আমার শৈশবের অজস্র সুখময় স্মৃতির বেশির ভাগই এই গ্রামে কিংবা এই পুকুর পাড়ে। ছোটবেলার কত খেলাধুলা দাপাদাপি মিশে আছে পুকুরের জলে। মনে পড়ে এক সন্ধ্যাবেলার কথা। আমরা দুই কেশবতী বোন পুকুরের পাড়ে এক গাছে ওঠে বসেছিলাম। দস্যিপনায় অনেক ছেলেদের চেয়ে আমরা এগিয়ে। আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল। গাছের ডালে বসে দেখছিলাম দুরন্ত ছেলেদের খেলা। আমাদের চেয়ে বয়সে তারা ছোট বলে ভয় দেখাতে লাগলাম তাদের। সন্ধ্যা হঁয়ে এঁসেছে, এঁখনো তোঁরা বাড়ি যাঁসনি? কিছুটা নাঁকি সুরে ডাক দিলাম আমরা তাদের।

আবছা অন্ধকারে আমাদের ভালো করে দেখতে পায়নি দুষ্টু ছেলের দল। বিরাট গাছের ছায়া আর সন্ধ্যার অন্ধকার ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি করেছিল। আধো অন্ধকারে আমার ও আমার বোনের লম্বা চুল আর ফর্সা মুখ দেখে তাদের কাছে মনে হয়েছিল পেত্নী। আমাদের ধমক শুনে ভোঁ দৌড় দিয়ে পালিয়ে যায় তারা। পরদিন গ্রামে খবর রটে যায়, দুটো পেত্নী দেখা গিয়েছিল গতকাল সন্ধ্যায়, পুকুর পাড়ে এই গাছের ডালে।

পেত্নী যেমন হয়েছিলাম তেমনি পরীও হয়েছিলাম একবার। কোনো এক ঈদে বাবা হলুদ একটা জামা কিনে দিয়েছিলেন আমাকে। জামাটি পরলে পরীর মতো লাগত আমাকে। পরীর মতোই তো ছিলাম দেখতে আমি ছোটবেলায়। একদিন দুপুরবেলা পাখির মতো দু হাত মেলে হেঁটে যাচ্ছিলাম সরিষা ক্ষেতের মাঝ দিয়ে। আকাশের উজ্জ্বল রোদ, হলুদ সরিষা ক্ষেত আর আমার হলুদ জামা—সব মিলিয়ে আমাকে সত্যি যেন পরী বানিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ দেখি দূর থেকে এক মহিলা বিস্ফারিত নয়নে চেয়ে আছেন আমার দিকে। তার চাহনিতে প্রশ্ন, ওই কে হেঁটে যায়? মানুষ না পরী?

 

যুক্তরাজ্য থেকে

সেপ্টেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১